📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আকিদার পরিচয়

📄 আকিদার পরিচয়


‘আকিদা’ (العقيدة) শব্দের শাব্দিক অর্থ জানাশোনা, ধারণা, বিশ্বাস ইত্যাদি। প্রায়োগিকভাবে আকিদার একটি অর্থ হলো: সংশয়মিশ্রিত ধারণা ও অনুমান। যেমন বলা হয়, ‘প্রচলিত ধারণা বা বিশ্বাস অনুযায়ী...’। আকিদার আরেকটি অর্থ হলো দৃঢ় ও অনড় বিশ্বাস, যাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমরা যখন ইসলামি আকিদা এবং মুসলিম আকিদার কথা বলি, তখন দ্বিতীয় অর্থ তথা দৃঢ় বিশ্বাস উদ্দেশ্য নিয়ে থাকি।

ইসলামি পরিভাষায় ‘আকিদা’ শব্দটি ‘ঈমান’-এর সমার্থক। ফলে আকিদার পারিভাষিক সংজ্ঞার্থ হলো: ‘আল্লাহ তায়ালা, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি-রাসুল, আখেরাত এবং তাকদিরের ভালোমন্দের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ (ﷺ) কর্তৃক আনীত সকল অদৃশ্যের বিষয় (علم الغيب) স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেওয়া এবং সকল দৃশ্যমান মৌলিক বিধিবিধান (أصول الدين وأحكام الشريعة)-এর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা।

যুগে যুগে আকিদা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। একটি নাম হলো ‘আল-ফিকহুল আকবার’ (শ্রেষ্ঠ ফিকহ), যেটা সর্বপ্রথম ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. ব্যবহার করেছেন। আরেকটি নাম হলো ‘ইতিকাদ’ (বিশ্বাস), যেটা ইমাম আজম তাঁর ‘আল-ফিকহুল আকবার’ ও ‘আল-ফিকহুল আবসাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আরেকটি নাম হলো ‘উসুলুদ্দিন’ (দ্বীনের যাবতীয় মৌলিক বিষয়)। এটাও ইমাম আজমের ‘আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম’-সহ বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান। ‘আকিদা’ শব্দটিও সালাফে সালেহিন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন। ইমাম আবু জাফর তহাবি রহ. তাঁর আকিদার শুরুতে এ শব্দটি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নামই রেখেছেন ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’। কখনো কখনো এটাকে ‘ইলমুত তাওহিদ ওয়াস সিফাত’ (আল্লাহর একত্ববাদ ও গুণাবলিবিষয়ক শাস্ত্র) বলা হয়। আরেকটি দল মুহাক্কিক আলেম এটাকে ‘ইলমুল কালাম’ (তর্কশাস্ত্র) হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

টিকাঃ
১. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, আবুল মুনতাহা মাগনিসাভি (১০৩)।
২. দেখুন: শরহুল আকায়িদ আন-নাসাফিয়্যাহ, সাদ তাফতাযানি (১৪)।
৩. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ লিকাওয়াইদিত তাওহিদ, আবু ইসহাক সাফফার বুখারি (৬৫)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আকিদার গুরুত্ব

📄 আকিদার গুরুত্ব


আকিদা দ্বীনের মূল ভিত্তি, মানবদেহের মাথার মতো। এটা ঠিক থাকলে সব ঠিক থাকবে। এখানে সংকট দেখা দিলে বিপর্যয় অনিবার্য। এর কারণ সুস্পষ্ট। মানুষের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেলে কাজকর্মও এলোমেলো হয়ে যায়। কেউ কোনো কিছুতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে না পারলে সে কাজটাও করতে পারবে না—এটাই স্বাভাবিক। ফলে হালাল-হারামের মাসআলা জানার আগে আকিদা জানা আবশ্যক। ইমাম আজম রহ. বলেন, “দ্বীন সম্পর্কে ‘তাফাক্কুহ’ তথা জ্ঞান অর্জন বিধিবিধানের তাফাকুহ অর্জনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বিপুল পরিমাণ ইলম অর্জনের চেয়ে স্রেফ কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে সেটুকু ইলম অর্জন করা ঢের উত্তম।” তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, সর্বোত্তম ফিকহ (জ্ঞানশাস্ত্র) কোনটি? তিনি বললেন, “ঈমান শেখা। শরিয়ত, সুন্নাত, হদ-কিসাস ও উম্মাহর ইমামদের মতামত ইত্যাদি জানা। আকিদা (الاعتقادیات) সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই ‘আল-ফিকহুল আকবার’ তথা সর্বোত্তম জ্ঞান।”

আকিদার গুরুত্ব বোঝাতে এবং আমলের চেয়ে ঈমানের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট করতে ইমাম আজম রহ. একটি প্রায়োগিক উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন চোখের অনুকরণ করে, একইভাবে আমলও ইলমের অনুসরণ করে। ফলে ইলম অর্জন জরুরি। অজ্ঞতার সঙ্গে বিপুল আমলের পরিবর্তে ইলমের আলোকে সামান্য আমলও অধিক উপকারী। এর উদাহরণ হলো মরুভূমিতে সফরকারী দুই মুসাফিরের মতো, যাদের একজনের কাছে স্বল্প পাথেয় আছে কিন্তু সে পথ চেনে; আরেকজনের কাছে প্রচুর পাথেয় ও রসদ আছে কিন্তু সে পথ চেনে না। এই দুই ব্যক্তির মাঝে নিঃসন্দেহে প্রথম ব্যক্তি অধিক সৌভাগ্যবান। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْلأل

অর্থ : ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? কেবল বিবেকবানরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’ [যুমার: ৯]

কারণ, আকিদা বিশুদ্ধ থাকার পরে আমলের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও একদিন সুপথপ্রাপ্তির আশা করা যায়, পরকালে ক্ষমা ও মুক্তির প্রত্যাশা রাখা যায়। কিন্তু যার মৌলিক আকিদায় বিচ্যুতি থাকবে, তার আমল যত সুন্দর হোক, সেটা কাজে আসবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنথُورًا অর্থ : ‘আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।’ [ফুরকান: ২৩] আল্লাহ আরেক আয়াতে বলেন, وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِ، فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ অর্থ : ‘তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে (মুরতাদ হয়ে) যাবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোযখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে।’ [বাকারা: ২১৭] অন্য আয়াতে বলেন, وَمَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَنِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ، وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَাসِرِينَ অর্থ : ‘যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করে, তার সকল আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ [মায়িদা: ৫] আল্লাহ আরও বলেন, وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ অর্থ : আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে—যদি আপনি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হয়ে পড়বে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ [যুমার: ৬৫]

ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আকিদার (সবিস্তার ও খুঁটিনাটি) আলোচনা জরুরি কেন? সাহাবায়ে কেরাম রাজি. তো এমন করেননি। তারা আকিদার যাবতীয় বিষয় নিয়ে বিস্তৃত ও বিস্তারিত কথা বলেননি। তাহলে আমরা কেন বলব? ইমাম জবাবে বলেন, ‘আমরা যদি সাহাবাদের যুগে তাদের পর্যায়ে থাকতাম, তাহলে তাঁরা যা করতেন যতটুকু করতেন, আমাদের ক্ষেত্রেও তা শতভাগ প্রযোজ্য হতো। কিন্তু আমাদের যুগ তাদের যুগ নয়। আমরা যেসব সমস্যার মোকাবিলা করছি, সেগুলো তাদের যুগে ছিল না। আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের সামনে এসে পড়েছি, যারা আমাদের আঘাত করে, আমাদের রক্তকে হালাল মনে করে। তাহলে তাদের মাঝে কারা সঠিক কারা বেঠিক সেটা না জেনে বসে থাকা যাবে? আমরা আমাদের জানমালের হেফাজত না করে বসে থাকব? সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল না; ফলে তাদের হাতিয়ার হাতে নিতে হয়নি। আমাদের যুগে তারা আছে; ফলে হাতিয়ার হাতে নিতে হবে। তা ছাড়া, মানুষ মতভেদপূর্ণ এসব বিষয় শুনে মুখ বন্ধ রাখলেও হৃদয় বন্ধ রাখতে পারে না। ফলে হৃদয়ে এগুলো প্রভাব ফেলে। দুটো বিষয় শুনলে যেকোনো একটার দিকে মন চলে যায়। মনের মাঝে এগুলো নিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলতে থাকে। আল্লাহ না করুন, যদি মিথ্যা ও বাতিলের দিকে মন ঝুঁকে পড়ে, তবে তো সে বাতিলপন্থিদের পছন্দ করতে শুরু করবে। আর যখন তাদের পছন্দ করবে, তখন সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। বিপরীতে যদি হকের দিকে হৃদয় ঝুঁকে পড়ে, তবে হকপন্থিদের বন্ধু হিসেবে গণ্য হবে।’

ইমামের কথায় স্পষ্ট যে, ইসলামি আকিদা সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের অন্যতম মৌলিক কারণ হলো বিশ্বাসগত বিচ্যুতি ও পদস্খলন থেকে সুরক্ষিত থাকা। অন্ধকার চিনলে আলোতে পথ চলা সহজ হয়। মন্দ সম্পর্কে জানলে মানুষ ভালোটা গ্রহণ করতে পারে। আলো-আঁধার ও ভালোমন্দের পার্থক্যই যদি কারও জানা না থাকে, সে ভালো ও আলো গ্রহণ করবে কী রূপে? একইভাবে ঈমানের বিপরীতে কুফর, তাওহিদের বিপরীতে শিরক-সহ যাবতীয় ভ্রান্ত আকিদা সম্পর্কে জানা না থাকলে মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত আকিদার জালে ফেঁসে যেতে পারে, বিশুদ্ধ আকিদা খুঁইয়ে ফেলতে পারে। এখানেই সহিহ আকিদা শেখার তাৎপর্য প্রকাশ পায়।

ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ভুল-শুদ্ধ, হকপন্থি ও বাতিলপন্থিদের সম্পর্কে যদি জ্ঞান না থাকে, তাহলে কি কোনো ক্ষতি আছে? তিনি বললেন, ‘হয়তো এক দিক থেকে ক্ষতি হবে না, কিন্তু দশ দিক থেকে ক্ষতি হবে। যে ক্ষেত্রে ক্ষতি হবে না তা হলো, তাদের কর্ম সম্পর্কে তুমি জিজ্ঞাসিত হবে না। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে ক্ষতি হবে তন্মধ্যে কয়েকটি হলো: এক. তুমি মূর্খ গণ্য হবে। কারণ, তুমি ভুল-শুদ্ধের মাঝে ফারাক করতে পারবে না। দুই. অন্যদের মতো নিজেও হয়তো একসময় সন্দেহে পতিত হবে এবং সেখান থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাবে না। কারণ, তুমি ভুল না শুদ্ধ সেটাই জানো না। ফলে সেখান থেকে পরিত্রাণের চেষ্টাও করবে না। তিন. কাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে আর কাকে ঘৃণা করবে, সেটা বুঝতে পারবে না। কারণ, তুমি কে হক আর কে বাতিল সেটাই জানো না। ফলে নিজের ঈমান রক্ষার জন্যই বিশুদ্ধ আকিদা শিখতে হবে।

টিকাঃ
৪. আল-ফিকহুল আবসাত, আবু হানিফা (৪০)।
৫. আল-ফিকহুল আবসাত (৪০)। আল-উসুলুল মুনিফাহ, কামালুদ্দিন বায়াযি (৮)।
৬. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম, আবু হানিফা (র)।
৭. প্রাগুক্ত (১-১০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আকিদা শেখা মুস্তাহাব নয়, ওয়াজিব

📄 আকিদা শেখা মুস্তাহাব নয়, ওয়াজিব


অনেকে আকিদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনকে নফল বা মুস্তাহাব পর্যায়ের মনে করেন। তাদের ধারণা—আকিদা জেনে কী হবে? নামায-রোযা, ইবাদত-আমল নিয়ে থাকাই যথেষ্ট। অথচ এটা সম্পূর্ণ গলত কথা। আকিদার বিষয়ে নিরপেক্ষ স্থানে থাকার সুযোগ নেই। অন্যকথায়, ঈমান ও কুফর, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝামাঝি থাকার অবকাশ নেই; বরং ঈমান গ্রহণ করতে হবে, কুফর বর্জন করতে হবে; তাওহিদ মেনে নিতে হবে, শিরক প্রত্যাখ্যান করতে হবে। স্পষ্ট যে, কোনো কাজ করতে গেলে সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা প্রধান শর্ত। তাই ঈমান গ্রহণ যেমন আবশ্যক, ঈমান সম্পর্কে জ্ঞান থাকাও আবশ্যক। কুফর থেকে বিরত থাকা যেমন আবশ্যক, কুফর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাও আবশ্যক। ফলাফলে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আকিদার জ্ঞান লাভ করাও আবশ্যক (ওয়াজিব)।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে ঈমান, আকিদা ও তাওহিদ শেখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, (فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ) অর্থ : ‘সুতরাং জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার এবং মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্বন্ধে সম্যক অবগত আছেন।’ [মুহাম্মাদ : ১৯] আরও বলেন, (وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُوحِي إِلَيْهِمْ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ) ‘আপনার পূর্বেও আমি প্রত্যাদেশ-সহ মানবকেই তাদের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম। অতএব, তোমরা না জানলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।’ [নাহল : ৪৩]

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজের ও সাহাবাদের জীবনে এই নীতি বাস্তবায়িত করেছেন। তিনি যখনই সাহাবাদের কোথাও পাঠাতেন, সর্বপ্রথম মানুষকে ঈমানের দিকে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়ামানে পাঠানোর সময় তাকে বললেন, ‘তুমি আহলে কিতাব (তথা একটি খ্রিষ্টান) সম্প্রদায়ের কাছে যাবে। সর্বপ্রথম তাদের তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করবে। যখন তারা তাওহিদ শিখে ফেলবে, তখন তাদের জানাবে—আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যখন তারা নামায পড়া শুরু করবে, তাদের জানাবে—আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্পদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে। যখন তারা মেনে নেবে, তখন তাদের থেকে সেটা গ্রহণ করবে। কিন্তু মানুষের প্রিয় ও মূল্যবান জিনিস নেওয়া থেকে বিরত থাকবে...।’

সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসুলুল্লাহর দেখানো পথেই হেঁটেছেন। তারা সবকিছুর আগে আকিদা শিখেছেন। বিশুদ্ধ সূত্রে সাহাবি জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা কিশোররা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে কুরআন শেখার আগে ঈমান শিখেছি, অতঃপর কুরআন শিখেছি। তখন আমাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।’ তাবারানির বর্ণনায় এসেছে, ‘আর আজ তোমরা আগে কুরআন শিখছ। ঈমান শিখছ পরে!’ বাইহাকি হুযাইফা রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আমরা কুরআন শেখার আগে ঈমান শিখেছি। আর আজ তোমরা ঈমান শেখার আগে কুরআন শিখছ।’ সাহাবাদের উলটো পথে চলা আজও অব্যাহত আছে। মুসলিম উম্মাহ আজ সবকিছু শিখছে, স্রেফ ঈমানটাই শিখছে না।

ফলে মানবজীবনের সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো তাওহিদ শেখা, ঈমান ও আকিদা শেখা। এক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শন করার সুযোগ নেই। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘যখন কারও মনে তাওহিদের কোনো সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তৎক্ষণাৎ তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে যেটা সত্য, সেটার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যতক্ষণ না জিজ্ঞাসা করার জন্য কোনো আলেম পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার ক্ষেত্রে দেরি করা যাবে না। নীরব বসে থাকলেও পার পাওয়া যাবে না। যদি নিরপেক্ষ হয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে বসে থাকে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।’ কারণ, ঈমানের জরুরি বিষয়গুলোতে ঈমান আনা আবশ্যক। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ঈমানের পথে অন্তরায়, সত্যায়ন ও স্বীকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এসব বিষয়ে কেউ নিরপেক্ষ থাকলে সেটা কুফরের পর্যায়েই থাকবে, ঈমান গণ্য হবে না। ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি কোনো জায়গা নেই। তাই ঈমানবিষয়ক জ্ঞান লাভ করা ফরয। একইভাবে ঈমানের বিপরীত তথা কুফরবিষয়ক জ্ঞান লাভ করাও ফরয। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত সম্পর্কে জানা আবশ্যক।

এবার আমরা আকিদা শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু মুহাক্কিক আলেমের মতামত উল্লেখ করব, যাতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আকিদা কোনো নতুন বিষয় নয়। আজকের যুগে এসে আমরাই আকিদা শিখতে এবং চর্চা করতে বলছি এমন নয়; বরং যুগে যুগে আমাদের উলামায়ে কেরাম আকিদা শেখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন।

ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি (৩৩৩ হি.) লিখেন, ‘আল্লাহ সম্পর্কে এবং তাঁর নির্দেশাবলি সম্পর্কে জানার জন্য দলিল-প্রমাণ ও গবেষণা প্রয়োজন। ফলে যতটুকু জানলে মানুষের কল্যাণ এবং যতটুকু না জানলে অকল্যাণ রয়েছে, ততটুকু জানা এবং সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা আবশ্যক।’

আবু সালামাহ সমরকন্দি (৩৪০ হি. পূর্ব) বলেন, ‘উসুলুদ্দিন (তথা দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো) ও আহকামুদ্দিন (তথা হালাল-হারাম, বিধিবিধান) হলো সত্যকে জানা, (আল্লাহর) নির্দেশ পালন করা, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। আর এগুলো জ্ঞানের আলো ব্যতীত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সত্যকে জানতে হলে, শরিয়তের বিধিবিধান মানতে হলে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ কারণে এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয।’

আল্লামা আবু ইসহাক সাফফার বুখারি (৫৩৪ হি.) বলেন, ‘আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা আবশ্যক। এটা শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান। ... উসুলuদ্দিন তথা দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান হলো সকল জ্ঞানের আধার ও ভান্ডার; দ্বীন, দুনিয়া ও আখেরাতের সকল কল্যাণের চাবিকাঠি। যে ব্যক্তি এই ইলম থেকে বঞ্চিত থাকল, সে সবকিছু থেকেই বঞ্চিত। কারণ, এটা মৌলিক, গোড়া; বাকিগুলো গৌণ, শাখা-প্রশাখা। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা কুরআন শেখার আগে তাওহিদ শিখতাম। আর তোমরা এখন আগে কুরআন শেখো, এরপর তাওহিদ শেখো।’ ...তাফসিরবিদদের মতে, কুরআনের আয়াতসংখ্যা প্রায় ছয় হাজার দুই শত ছত্রিশটি। এর মাঝে শরিয়তের আহকাম (হালাল-হারাম)- সম্পর্কিত আয়াত প্রায় পাঁচ শত। বাকি সবগুলো তাওহিদ, শিক্ষণীয় ঘটনা, কাফেরদের বিরুদ্ধে নবি-রাসুলদের ঈমানি সংগ্রাম ও মুনাযারা (বিতর্ক) ঘিরে। এর দ্বারা বোঝা যায়, তাওহিদের ইলমই সর্বোত্তম ইলম। তা ছাড়া, নিজের দ্বীন রক্ষা ও বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্যও এই ইলম অর্জন করা আবশ্যক।’

আলাউদ্দিন উসমান্দি (৫৫২ হি.) লিখেন, ‘উসুলুদ্দিন তথা দ্বীনের মৌলিক বিষয় হলো সঠিক আকিদা বর্ণনা করা, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। এর মাধ্যমে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে জান্নাতে যাওয়া।’

সুলতানুল উলামা খ্যাত ইয ইবনে আবদুস সালাম (৬৬০ হি.) বলেন, ‘আলেমরা নবিগণের উত্তরসূরি। সুতরাং নবিদের উপর যেমন সত্য প্রকাশ আবশ্যক ছিল, আলেমদের উপরও আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলছেন, وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ অর্থ : ‘তোমাদের মধ্যে একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে আর সৎকর্মের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকর্ম থেকে নিষেধ করবে। বস্তুত তারাই সফলকাম।’ [আলে ইমরান : ১০৪] তাজসিম ও তাশবিহ (দেহবাদ ও সাদৃশ্যবাদ-অন্যকথায়, আকিদাকেন্দ্রিক ভ্রান্তি) বড় ধরনের অসৎ কাজ। আর সবচেয়ে সৎ ও পুণ্যের কাজ হলো তাওহিদ ও তানযিহ (বিশুদ্ধ দেহবাদমুক্ত একত্ববাদ)। সালাফে সালেহিন প্রথমে এ ব্যাপারে দীর্ঘ কথা বলেননি; কারণ, তাদের যুগে বিদআত প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীকালে যখন বিদআত প্রকাশিত হয়, তখন তারাই সেসবের খণ্ডনে ময়দানে নেমে পড়েন; সব ধরনের বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি ঠেকিয়ে দেন। কাদারিয়্যাহ, জাহমিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ-সহ সকল ভ্রান্ত ফিরকার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেন।

টিকাঃ
৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১০)।
৯. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৩৭২)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৯)।
১০. সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৬১)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ঈমান: ১০২)।
১১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ: ২/১৬৫; হাদিস নং: ১৬৭৮)।
১২. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (কিতাবুস সালাত : ৫৩৭৪)।
১৩. আল-ফিকহুল আকবার, আবু হানিফা (৮)। জামেউল মুতুন, গুমুশখানতি (৩০)।
১৪. আত-তাওহিদ, আবু মনসুর মাতুরিদি (১০২)।
১৫. জুমাল মিন উসুলিদ্দিন, আবু সালামাহ সমরকন্দি (১৩)।
১৬. তালখিসুল আদিল্লাহ, সাফফার বুখারি (২৮-৩২)।
১৭. লুবাবুল কালাম, আলাউদ্দিন উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি: ৩৪ ডান)।
১৮. রাসায়েল ফিত তাওহিদ, ইয ইবনে আবদিস সালাম (১৮)। এসব ফিরকার পরিচয় সামনে উল্লেখ করা হবে।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আকিদা শেখার ন্যূনতম পরিমাণ

📄 আকিদা শেখার ন্যূনতম পরিমাণ


আকিদা শেখার গুরুত্ব স্পষ্ট হওয়ার পরে প্রশ্ন আসতে পারে, আকিদা ঠিক কতখানি শিখতে হবে? একজন দাঈ ও ইমামের আকিদা সম্পর্কে যতটা জ্ঞান থাকা আবশ্যক, সমাজের একজন সাধারণ মুসল্লির কি ততটা জ্ঞান থাকা আবশ্যক? তা ছাড়া, আবশ্যক বলা হলেও সবার জন্য তো সমান পর্যায়ে শেখা সম্ভবও নয়। একজন আলেম যতখানি আকিদা শিখতে পারবেন, একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে ততখানি শেখা সম্ভব হবে না। বোঝা গেল, আকিদা শেখার আবশ্যকতা, পর্যায় ও স্তর সবার জন্য সমান নয়। ফলে ‘আকিদা শেখার পরিমাণ’ সম্পর্কে কিছু কথা বলা আবশ্যক মনে করছি।

সংক্ষেপে প্রথমেই যে বিষয়টি বুঝে নিতে হবে সেটা হলো, আকিদা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন জরুরি হলেও আকিদার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন জরুরি নয়। কারণ, আকিদার আলোচনায় এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো দ্বীনের কোনো মৌলিক মাসআলা নয়, ঈমানের জরুরি বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়।

যেমন—আল্লাহর সিফাতসংক্রান্ত বিস্তৃত আলোচনা, ঈমান ও কুফরের বিস্তৃত সংজ্ঞায়ন, প্রকারভেদ ও ব্যাখ্যা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাবসমূহ, পরকাল ইত্যাদির সবিস্তার বিবরণ ঈমানের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। সবার উপর এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা আবশ্যক নয়। বরং এ ব্যাপারে মোটা দাগে ধারণা থাকাই যথেষ্ট। তবে যদি কোনো বিষয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, সে সন্দেহ দূর করা আবশ্যক। অন্যকথায়, ঈমানের ছয় রুকন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকাই যথেষ্ট, বিস্তারিত জানা আবশ্যক নয়। যেমন—নবি-রাসুল সম্পর্কে ঈমান আনা আবশ্যক; কিন্তু প্রত্যেক নবির নাম, তাঁর বংশপরিচয় ও গোত্রের নাম, তাঁর দাওয়াতের বিস্তারিত ইতিহাস জানা আবশ্যক নয়। তবে যদি কোনো নবি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তখন তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি।

ইমাম আজম আবু হানিফাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ঈমান ও কুফর সম্পর্কে অজ্ঞতার বিধান কী? তিনি বললেন, ‘মানুষ মুমিন হিসেবে গণ্য হয় আল্লাহকে চেনা ও স্বীকার করার মাধ্যমে। একইভাবে কাফের হয় আল্লাহকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। ফলে কেউ যখন আল্লাহকে রব ও মাবুদ হিসেবে স্বীকার করবে, তাওহিদকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে, আল্লাহর কাছ থেকে আগত সবকিছু মেনে নেবে, তার জন্য ঈমান কিংবা কুফরের সংজ্ঞার্থ জানা থাকা জরুরি নয়। কারণ, সে জানে ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ, ঈমান কল্যাণ আর কুফর অকল্যাণ। এটুকু জানা ও মানাই যথেষ্ট। যেমন—কেউ মধু ও মাকাল ফল দুটোই মুখে দিয়ে পরীক্ষা করে মধুর মিষ্টতা আর মাকালের তিক্ততা অনুভব করল। তার জন্য মধু কিংবা মাকালের নাম বা সংজ্ঞার্থ জানা জরুরি নয়। তার ব্যাপারে এ কথাও বলা যাবে না যে, সে মিষ্টতা বা তিক্ততা চেনে না। বেশির চেয়ে বেশি এটুকু বলা যাবে যে, সে এগুলোর সংজ্ঞার্থ জানে না। একই কথা ঈমান ও কুফরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন কেউ জানবে যে, ঈমান ভালো আর কুফর মন্দ, এটুকু জানলে ও মানলেই যথেষ্ট হবে। আলাদা করে ঈমান ও কুফরের সংজ্ঞার্থ জানার দরকার নেই। কেউ এই সংজ্ঞার্থ না জানলেই তাকে অস্বীকারকারী বলা যাবে না।’

বরং এগুলো নিয়ে যখন অর্থহীন বিতর্কের আশঙ্কা থাকবে, তখন এগুলো নিয়ে আলোচনা বর্জন করাই কর্তব্য হবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, “তোমরা দ্বীন নিয়ে বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করো। কেননা, দ্বীন স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা কিছু ফরয বিধান দিয়েছেন, কিছু সুন্নাত দিয়েছেন। কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন। হালাল বলে দিয়েছেন। হারাম স্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ﴿الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ নِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ অর্থ : ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ [মায়িদা : ৩] সুতরাং কুরআনে যা হালাল করা হয়েছে, সেটা হালাল হিসেবে গ্রহণ করো। কুরআনে যা হারাম করা হয়েছে, সেটা হারাম মানো। কুরআনের স্পষ্ট বিষয়গুলোর উপর আমল করো। অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকো। যদি দ্বীন নিয়ে বিতর্কের মাঝে তাকওয়া থাকত, তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর পরে সাহাবায়ে কেরাম সবার আগে সেটা করতেন। তারা কি দ্বীন নিয়ে বিবাদ করেছেন? হ্যাঁ, তারা ফিকহ নিয়ে আলোচনা করেছেন, ফারায়েজ নিয়ে মতভেদ করেছেন। নামায, হজ, হালাল-হারাম, তালাক ইত্যাদি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কিন্তু কেউ দ্বীন (তথা আকিদা) নিয়ে বিতর্ক করেননি। এ বিষয়ে বিবাদ করেননি। সুতরাং তোমরা তাকওয়ার উপর থাকো। সুন্নাতের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকো। এটুকুই যথেষ্ট হবে। পরবর্তী লোকেরা দ্বীন নিয়ে যেসব ঝগড়া সৃষ্টি করেছে, যেগুলো নিয়ে বিবাদ-বিতর্কে জড়িয়েছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকো। কারণ, সুন্নাতের অনুসরণের মাঝেই মুক্তি।”

আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي ءَايَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ، وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ অর্থ : ‘যখন আপনি তাদের আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাস করতে দেখবেন, তখন তাদের থেকে সরে যান যে পর্যন্ত না তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর জালেমদের সাথে আর বসবেন না।’ [আনআম : ৬৮] আল্লাহ চাইলে কুরআনের মাঝেও বিতর্ক ও বিবাদ অবতীর্ণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেটা করেননি; বরং নিষেধ করেছেন। সুতরাং বিতর্ককারীদের সঙ্গ পরিহার করো। তাদের সঙ্গে বসো না। যদি তারা গায়ে পড়ে বিতর্ক করে, তবে কুরআনের আইন মানো : فَإِنْ حَاجُّوكَ فَقُلْ أَسْلَمْتُ وَজْهِيَ لِلَّهِ وَمَنِ اتَّبَعَنِ وَقُل لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ وَالْأُمِّينَ أَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوا وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ وَاللَّهُ بَصِيرُ بِالْعِبَادِ অর্থ : “যদি তারা আপনার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি এবং আমার অনুসারীগণও।’ আর যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের ও নিরক্ষরদের বলুন, ‘তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তবে নিশ্চয়ই তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনার দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ বান্দাদের সবকিছু দেখছেন।” [আলে ইমরান : ২০] এখানে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে, বিতর্ক করতে বলা হয়নি।’

বরং ইমাম আবু ইউসুফ থেকে ‘দ্বীন নিয়ে বিতর্ক নিষিদ্ধ’ শিরোনামে একটি পুস্তিকাতে এসেছে, ‘দ্বীন নিয়ে বিতর্ক বিদআত। বাতিলপন্থিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যা করে, সেগুলো বিদআত। যদি তাতে কোনো কল্যাণ থাকত তবে সাহাবিরা এবং সাহাবিদের সন্তানরা এগুলো আগে করতেন। কারণ, তারা এগুলো করতে বেশি সক্ষম ছিলেন। এগুলো সম্পর্কে বেশি জ্ঞান রাখতেন; দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং সুন্নাতের সুরক্ষা ও প্রচারে অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। যদি তাতে কোনো কল্যাণ থাকত, তারা সবার আগে সেটা অর্জনের চেষ্টা করতেন। একদল দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করে বিদআতি হয়ে গেছে। আরেক দল দ্বীন থেকে উদাসীনতা দেখিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। আহলে সুন্নাতের অবস্থান এই দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি সিরাতে মুস্তাকিমের উপর প্রতিষ্ঠিত।’

তথাপি প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে ঈমানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সীমারেখা কী? ইসলাম, ঈমান, তাওহিদ এবং আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কতটুকু জানা জরুরি? কতগুলো সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি?

ইমাম আজমসহ আমাদের ইমামগণ বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, এখানে যার সবকিছু উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ফলে আমরা কেবল তাদের আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরার চেষ্টা করব।

(ইমাম মুহাম্মাদের ছাত্র) আবু সুলাইমান জুযজানি থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইমাম আজমের কাছে এসে বলল, (দ্বীনের) বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের বিভিন্ন কথা শুনে আমি পেরেশান হয়ে পড়েছি। কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক বুঝতে পারছি না। তাই আমি চাই, আপনি আমাকে এমন একটা পথ দেখান, যার উপর অটল থাকলে আমি কাল জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে পারি। আপনি নিজের জন্য যা পছন্দ করেন আমাকেও তা-ই বলুন। আমার বিশ্বাস, আপনাকে অনুসরণ করলে আমি নিন্দিত হব না। ইমাম বললেন, ‘আমি এমন একদল মানুষ পেয়েছি (সাহাবা ও তাবেয়িন) যারা বলতেন, “যে ব্যক্তি ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসুল।”- এমন সাক্ষ্য দেবে, সে আল্লাহর একনিষ্ঠ (বান্দা) হয়ে যাবে। আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয় সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহর জন্য শরিক ও প্রতিপক্ষ নির্ধারণ করা থেকে পবিত্র থাকবে। এভাবে আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়ার পরে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত যাবতীয় ফরয ইবাদত, যথা—নামায, রোযা, যাকাত ও হজ ইত্যাদির স্বীকৃতি দিতে হবে। সেগুলোর উপর আমল করতে হবে। কুফর ও শিরক থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। যদি কেউ এ সবকিছুর উপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে আল্লাহর ওলি গণ্য হবে। আর যদি কেউ শাহাদাতের উপর অটল থাকে, কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি করে, তবে তার পরিণতি আল্লাহর উপর সমর্পিত থাকবে—চাইলে তিনি তাকে বিচ্যুতির শাস্তি দেবেন অথবা চাইলে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করবে না। তাদের অন্তরের অবস্থা আল্লাহর কাছে সঁপে দেবে। কারণ, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘তারা এক গত সম্প্রদায়। তারা যা করেছে সেটার ফল তারা পাবে। তোমরা যা করছ সেটার ফল তোমরা পাবে।’ তাকদিরের সবকিছুর উপর ঈমান আনবে। আল্লাহর ব্যাপারে কোনো অন্যায়-অশোভন কথা বলবে না। নিজের জন্য যা পছন্দ করো, মানুষের জন্য তা পছন্দ করবে। নিজের জন্য যা অপছন্দ করো, মানুষের জন্য তা অপছন্দ করবে। দ্বীনের ক্ষেত্রে মনগড়া কথা বলবে না। আল্লাহর উপর নিজের ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেবে না। তাঁর কোনো নির্দেশের উপর আপত্তি করবে না। কারণ, তিনি যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন না, মানুষ যা করে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [আম্বিয়া : ১২৩]

ইমাম আজমের উপরের কথাগুলো মূলত ঈমানের ছয় রুকনের সারমর্ম। এটুকুই দ্বীন। এটুকুর উপর অবিচল থাকলেই পরকালে মুক্তি মিলবে, আল্লাহর দিদার লাভ হবে। জান্নাত পাওয়া সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। এর বাইরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানলে ভালো, না জানলে অসুবিধা নেই। কিন্তু বিস্তারিত জানতে গিয়ে যদি বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতিতে নিমজ্জিত হতে হয়, দ্বীন বিকৃতির শিকার হয়, তবে সেটা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্য।

এ বক্তব্য ইমাম আজমের নিজের নয়, বরং তিনি—যেমনটা শুরুতেই বলেছেন—এগুলো সাহাবি ও তাবেয়িদের বলতে শুনেছেন। এ জন্য আমরা একাধিক হাদিসে ইমামের বক্তব্যের সত্যতা দেখি। যেমন—তালহা বিন উবাইদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত; নজদ থেকে এলোকেশী (সাধারণ) এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে।’ সে বলল, আর কিছু? তিনি বললেন, ‘না। তবে চাইলে অতিরিক্ত (নফল নামায পড়তে পারো)।’ অতঃপর রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘রমযানের রোযা রাখবে।’ সে বলল, আর কিছু? রাসুল বললেন, ‘না। তবে চাইলে অতিরিক্ত (নফল রোযা রাখতে পারো)।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, ‘যাকাত দেবে।’ সে বলল, আর কিছু? তিনি বললেন, ‘না। তবে অতিরিক্ত (নফল সদকা করতে পারো)।’ তখন লোকটি এ কথা বলে চলে গেল: আল্লাহর শপথ! আমি এগুলোর উপর কিছু বাড়াবাব না, কমাবও না। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘যদি সত্য বলে, তবে সে সফল!’

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত; এক গ্রাম্য সাহাবি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যেটা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করব। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। ফরয নামাযগুলো আদায় করবে। ফরয যাকাত দেবে। রমযানের রোযা রাখবে।’ লোকটি বলল, ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! আমি এর উপর কিছু বাড়াব না। সে চলে যাওয়ার পরে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘যদি কেউ জান্নাতি কাউকে দেখতে চায় তবে যেন তাকে দেখে!’

আল্লাহর দ্বীনের সারল্য দেখুন! আল্লাহর দ্বীনের সহজ প্রকৃতি দেখুন! দেখুন জান্নাতের পথ কত সংক্ষিপ্ত! দ্বীনের এসব মৌলিক বিষয় মেনে নেওয়াই যথেষ্ট। বাকি সব অতিরিক্ত। সবার উপর অপরিহার্য নয়। ইমাম আজমের উপরের বক্তব্য আর এই হাদিসগুলোর সামঞ্জস্য বিস্ময়কর, কিন্তু অদ্ভুত নয়। কারণ, সকল সালাফে সালেহিনের মানহাজ এটা। জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্ত ফিরকাগুলোর কারণে।

কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের এই আলোকিত মানহাজের উপরই হেঁটেছেন আহলে সুন্নাতের অন্যান্য ইমাম। ফলে এবার আমরা এ ব্যাপারে আলেমদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করব :

* ফখরুল ইসলাম বাযদাবি (৪৮২ হি.) লিখেন—ঈমান ও ইসলামের অর্থ হলো আল্লাহর সকল গুণের সত্যায়ন করা এবং স্বীকৃতি দেওয়া; তাঁর শরিয়তের সকল বিধান কবুল করে নেওয়া। এটার দুটো পর্যায় রয়েছে। এক. মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত বিশ্বাস—মাতা-পিতা ও পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইসলামের বিধান। দুই. দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সকল গুণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। এটাই প্রকৃত কামালত তথা পূর্ণাঙ্গতা; কিন্তু এটা সবার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেননা, আল্লাহ তায়ালার গুণাবলির তফসিলি জ্ঞানের ক্ষেত্রে সকল মানুষ সমস্তরের নয়। ফলে কামালত দ্বিতীয় পর্যায় থেকে প্রথম পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে। ইজমালিভাবে সত্যায়ন ও স্বীকৃতিই ঈমানের ক্ষেত্রে কামালত গণ্য হবে; ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত দলিল-প্রমাণ-সহ জানা জরুরি হবে না। এ কারণে মুসলমানকে (ঈমানের তফসিল) প্রশ্ন না করে তার কাছে বরং ঈমান তুলে ধরে বলা হবে, ‘ঠিক আছে?’ যদি সে বলে, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে’, তাহলে তার ইসলাম পূর্ণ হয়ে যাবে। এটা যদি কোনো আলামত দ্বারা প্রকাশ পায়, তবে জিজ্ঞাসা করাও নিষ্প্রয়োজন। যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তিকে তোমরা জামাতে (নামাযে) অভ্যস্ত দেখবে, তার ঈমানের সাক্ষ্য দেবে।’ আরেক হাদিসে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের নামায পড়বে, আমাদের কিবলা অভিমুখী হবে, আমাদের যবাইকৃত পশু খাবে, তোমরা তার জন্য ঈমানের সাক্ষ্য দাও।’ (কারণ, এগুলোই প্রমাণ করে সে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর শরিয়তকে স্বীকার করে। তফসিল জানা আবশ্যক নয়।) হ্যাঁ, যদি কারও সামনে তফসিল উপস্থাপন করে বলা হয়, ‘ঠিক আছে?’ তদুপরি সে অজ্ঞতা জাহির করে, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না।

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের মতে ইজমালি ঈমান যথেষ্ট, তফসিলি ঈমান আবশ্যক নয়। ফলে কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (এ) আল্লাহর রাসুল, তাঁর নিয়ে আসা দ্বীন আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য—এটুকু মেনে নেয়, তাতেই যথেষ্ট। তবে যদি কোনো মাসআলাতে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়, সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং সন্দেহ দূরীভূত করা আবশ্যক।’

আলাউদ্দিন আবদুল আযিয বুখারি (৭৩০ হি.) লিখেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি অন্তরে আল্লাহকে সত্যায়ন করবে, মুখে তাঁর অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেবে, একত্ববাদ (তাওহিদ), জ্ঞান (ইলম), কুদরত, জীবন-সহ আল্লাহর সকল গুণ, পরম করুণাময় (রহমান), দয়ালু (রহিম), সর্বশক্তিমান (কাদের), মহাজ্ঞানী (আলিম) ইত্যাদি সকল সুন্দর নামের স্বীকৃতি দেবে, সে মুসলিম হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু আমাদের ইন্দ্রীয়-অনুভবের ঊর্ধ্বে, ফলে এমন কিছু নাম ও গুণ দরকার, যার মাধ্যমে তাকে চেনা সম্ভব। আল্লাহর পাশাপাশি আল্লাহর ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুল, পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালোমন্দে বিশ্বাসও দরকার। আর এ সবকিছু মুসলিম পরিবারে এবং ইসলামি সমাজে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান থাকে। একটা শিশু যখন এখানে বড় হয়, এগুলোর সাক্ষ্য এবং এগুলোর মাধ্যমে ইবাদতের উপরই বড় হয়। এটা হলো সত্যায়ন ও স্বীকৃতির এক পর্যায়। আরেকটা পর্যায় হলো দলিল-প্রমাণের মাধ্যেমে ইয়াকিনি পদ্ধতিতে আল্লাহকে জানা ও মানা; পরিবার ও সমাজ অনুসরণের মাধ্যমে নয়। এটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে ইজমালিভাবে ঈমানকেই গ্রহণযোগ্য ও কামালত ধরা হবে। ঈমান সাব্যস্ত করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে।’

এগুলো ইমাম তহাবিরও সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা, যেটা তিনি আকিদাহ তাহাবিয়্যাহতে এভাবে দিয়েছেন, ‘আমরা আমাদের কিবলার অনুসারীদের ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম-মুমিন হিসেবে আখ্যায়িত করব, যতক্ষণ তারা নবি কারিম (ﷺ) আনীত সকল বিষয়ের স্বীকৃতি দেবে, তাঁর সকল বক্তব্য এবং সংবাদকে সত্যায়ন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয় না, যতক্ষণ না সে সেসব মূলনীতি অস্বীকার করে, যেগুলোর স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে ঈমানে প্রবেশ করেছিল।’ প্রথম বাক্যে সকল বিষয়ে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ঈমানের সবগুলো বিষয় জানা ও শেখা সবার জন্য জরুরি; বরং ইজমালি সাক্ষ্য দেবে। এটার প্রমাণ হচ্ছে ইমামের দ্বিতীয় বাক্য। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় (ঈমানের ছয় রুকনের) ইজমালি সাক্ষ্যদানের মাধ্যমেই প্রত্যেকে মুমিন গণ্য হবে।

কিন্তু যদি এমন কোনো কথা বলে বা কাজ করে, যা ঈমানের তফসিলি আলোচনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে।

আবদুল আযিয বুখারি আরও লিখেন, “যদি কাউকে বলা হয়—তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ তায়ালা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, তিনি শক্তিমান, তিনি জ্ঞানী, তিন সর্বশ্রোতা, তিনি সর্বদ্রষ্টা, তিনি সবকিছুর ইচ্ছা ও ফয়সালাকারী ইত্যাদি...? অথবা বলা হয়—তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আল্লাহ সকল পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী, আল্লার রাসুল মুহাম্মাদ (ﷺ) যা-কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন সব সত্য? প্রশ্নের জবাবে যদি সে ‘হ্যাঁ’ বলে, তার ঈমানকে বিশুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এসব সাক্ষ্যের তফসিলি আলোচনা তার কাছে চাওয়া হবে না। তবে এটা স্বাভাবিক অবস্থায়। ফলে সে ব্যক্তি যদি ইসলামবিরোধী কোনো আকিদা লালন করে, তবে তার জন্য স্রেফ ‘হ্যাঁ’ বলা যথেষ্ট হবে না, বরং সেই আকিদা পরিবর্তন করা জরুরি হবে।”

সাফফার বুখারি বলেন, ‘কেউ যদি ঈমানের ছয়টি বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, সে মুমিন গণ্য হবে। তবে বিস্তারিত বিশ্বাস এই সংক্ষিপ্ত ঈমানের মূলনীতিতে হতে হবে। ফলে কেউ ছয়টি বিষয়ের উপর ঈমান আনার পরে যদি বিস্তারিত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সৃষ্টির সঙ্গে আল্লাহকে সাদৃশ্য দেয়, তবে সে মুমিন গণ্য হবে না। তাই এসব সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ব্যাখ্যা জানা জরুরি।’

টিকাঃ
১৯. দেখুন: ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/৩)।
২০. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৯)।
২১. ফাযায়িলু আবি হানিফাহ, ইবনে আবিল আওয়াম (৩২৮-৩২৯)।
২২. দেখুন: ফাযায়িলু আবি হানিফাহ, ইবনে আবিল আওয়াম (৩২৮-৩২৯)।
২৩. দেখুন: আল-ইতিকাদ, সাইয়েদ নিশাপুরি (১৭৪-১৭৫)।
২৪. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯৫-৯৬)।
২৫. বুখারি (কিতাবুল ঈমান: ৪৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৪)।
২৬. বুখারি (কিতাবুয যাকাত : ১৩৯৭)।
২৭. উসুলুল বাযদাবি (১৬৭)। প্রথম হাদিসটি তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩০৯৩) এবং ইবনে মাজাতে (আবওয়াবুল মাসাজিদ ওয়াল জামাত: ৮০২) এসেছে। আর দ্বিতীয় হাদিসটি বুখারি (কিতাবুস সালাত : ৩৯১), নাসায়ি (কিতাবুল ঈমান ওয়া শারায়িউহু: ২/৫০১২)-সহ একাধিক গ্রন্থে এসেছে।
২৮. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৫৪)।
২৯. কাশফুল আসরার, আলাউদ্দিন বুখারি (২/৫৮৭)।
৩০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০-২১)।
৩১. কাশফুল আসরার (২/৫৮৭)।
৩২. তালখিসুল আদিল্লাহ (১৫০-১৫১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00