📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ

📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ


এরপর আমার স্বতঃস্ফূর্ত বক্তব্য হল- ইসলামী শরী‘আতে হাদীছের এরূপ গুরুত্ব ঐ হাদীছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা মুহাদ্দিছদের নিকট গবেষণার ভিত্তিতে ছহীহ সনদে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত। তাফসীর, ফিকহ, তারগীব (উৎসাহ প্রদান), তারহীব (ভীতি প্রদর্শন), মনগলানো উপদেশ, নছীহত প্রভৃতি গ্রন্থাবলীতে যে হাদীছগুলো রয়েছে (ঢালাওভাবে) সেগুলো নয়। কেননা এ সকল গ্রন্থে অনেক যঈফ ও জাল হাদীছ রয়েছে। এসব গ্রন্থে এমন কিছু হাদীছও রয়েছে, যেগুলোর সাথে ইসলামের কোন সম্পৃক্ততা নেই। যেমন : হারূত, মারূত ও সুন্দরী যুবতীর কাহিনী। এ ঘটনা নাকচকরণে আমার একটি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।১৯

আমার বিশাল বই ‘সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যঈফা ওয়াল মাওযূ‘আহ ওয়া আছারুহাস সাইয়ি ফিল উম্মাহ’ (سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة وأثرها السيء في الأمة) গ্রন্থে আমি এ জাতীয় অনেক হাদীছ তাখরীজ (সংকলন) করেছি। এগুলোর মধ্যে কিছু হাদীছ যঈফ ও কিছু জাল।

বিদ্বানগণ বিশেষ করে যারা মানুষের নিকট তাদের ফিকহ ও ফাতাওয়া প্রচার-প্রসার করেন, তারা হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করার দুঃসাহস দেখাবেন না। কারণ যেসব ফিকহের গ্রন্থাবলীকে তারা সাধারণত উৎস হিসাবে ব্যবহার করেন, সেগুলো যঈফ, জাল ও ভিত্তিহীন হাদীছে পরিপূর্ণ। ওলামায়ে কেরামের নিকট এটা সুবিদিত।

আমার দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আমি শুরু করেছিলাম। ফিকহ চর্চাকারীদের জন্য তা অত্যন্ত উপকারী। আমি সেই গ্রন্থের নাম রেখেছি ‘আল-আহাদীছ আয-যঈফা ওয়াল মাওযূ‘আহ ফী উম্মাহাতিল কুতুব আল-ফিকহিয়্যাহ’ (الأحاديث الضعيفة والموضوعة في أمهات الكتب الفقهية)। ফিকহের উৎস গ্রন্থসমূহ দ্বারা আমার উদ্দেশ্য হল-
১. মারগিনানী রচিত হানাফী ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-হেদায়া’ (الهداية)।
২. ইবনুল কাসেম রচিত মালেকী ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-মুদাওয়ানাহ’ (المدونة)।
৩. রাফেঈ রচিত শাফেঈ ফিকহ গ্রন্থ ‘শারহুল ওয়াজীয’ (شرح الوجيز)।
৪. ইবনু কুদামা রচিত হাম্বলী ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-মুগনী’ (المغنى)।
৫. ইবনু রুশদ আল-আন্দালুসী রচিত তুলনামূলক ফিকহ গ্রন্থ ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ (بداية المجتهد)।

কিন্তু দুঃখজনক হল, এ গ্রন্থটি সমাপ্ত করার সুযোগ আমার হয়নি। কারণ ‘আল-ওয়াই আল-ইসলামী’(الوعي الإسلامي) নামে যে কুয়েতী পত্রিকাটি এটা ছাপানোর অঙ্গীকার করেছিল এবং এ প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছিল, এটা পাওয়ার পর তারা আর তা ছাপেনি। যেহেতু আমার ঐ প্রকল্প ভেস্তে গেছে, সেহেতু ইনশাআল্লাহ অন্য কোন উপলক্ষে আমার ফিকহ চর্চাকারী ভাইদের জন্য এমন এক সূক্ষ্ম গবেষণা পদ্ধতি উদ্ভাবনের তৌফীক লাভ করব, যা তাদেরকে সহযোগিতা করবে এবং হাদীছের যে সকল উৎস গ্রন্থের দিকে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে হাদীছের মান জানা যায় তা তাদের জন্য সহজ করে দিবে। এবং আমি তাদের জন্য ঐ সকল গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলী ও সেগুলোর মধ্যে কোনগুলোর উপর নির্ভর করা যায় তাও বর্ণনা করব। আল্লাহই উত্তম তৌফীক দাতা।

টিকাঃ
১৯. উক্ত গ্রন্থটির নাম ‘নাছাবুল মাজানীক ফী নাসফি কিছছাতিল গারানীক’। প্রকাশক : আল-মাকতাবুল ইসলামী।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 ইজতিহাদ সম্পর্কিত মু‘আয (রাঃ)-এর হাদীছের দুর্বলতা ও তার মন্দ দিক

📄 ইজতিহাদ সম্পর্কিত মু‘আয (রাঃ)-এর হাদীছের দুর্বলতা ও তার মন্দ দিক


আমার আজকের বক্তব্য শেষ করার পূর্বে একটি প্রসিদ্ধ হাদীছের দিকে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা অতীব যরূরী মনে করছি। উছূলে ফিকহের প্রায় সকল গ্রন্থেই এ হাদীছটি উল্লিখিত আছে। কারণ সনদের দিক থেকে হাদীছটি দুর্বল এবং ইসলামী শরী‘আতে কুরআন ও হাদীছের মধ্যে পার্থক্য করা জায়েয নয় ও দু’টিকে এক সাথে আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব মর্মে আমাদের আজকের বক্তব্যে উপনীত সিদ্ধান্তের বিরোধী। আর সেটা হচ্ছে মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)-এর হাদীছ। তাঁকে ইয়েমেনে প্রেরণকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছিলেন, ‘তুমি কি দিয়ে বিচার করবে’? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব তথা কুরআন দ্বারা। রাসূল (ছাঃ) বললেন, যদি তাতে না পাও? তিনি বললেন, রাসূলের হাদীছ দ্বারা। রাসূল (ছাঃ) বললেন, যদি তাতেও না পাও? তিনি বললেন, আমি আমার বিবেক দ্বারা ইজতিহাদ করব এবং ত্রুটি করব না। রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর রাসূল যা পছন্দ করেন তা তাঁর প্রেরিত দূতকে যে আল্লাহ করার তৌফীক দিয়েছেন তার জন্য যাবতীয় প্রশংসা’।২০

এ হাদীছের সনদের দুর্বলতা বর্ণনা করার অবকাশ এখন নেই। ‘সিলসিলা যঈফা’য় এর কারণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। এখন আমার জন্য আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে। তিনি উক্ত হাদীছ সম্পর্কে বলেছেন, ‘হাদীছটি মুনকার’।

এরপর যে দ্বন্দ্বের দিকে আমি ইঙ্গিত করেছি তা বর্ণনা করা আমার জন্য সঙ্গত হবে। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল-মু‘আযের এই হাদীছটি বিচার-ফায়ছালার ক্ষেত্রে বিচারকের অনুসৃত পদ্ধতির ব্যাপারে তিনটি স্তর প্রবর্তন করে। কুরআনে না পাওয়া পর্যন্ত হাদীছে রায় অনুসন্ধান করা এবং হাদীছে না পাওয়া পর্যন্ত ইজতিহাদের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিচারকের জন্য বৈধ নয়। ইজতিহাদের ক্ষেত্রে সকল আলেমের নিকট এটা একটা সঠিক মানহাজ বা পদ্ধতি। তারা এও বলেছেন, ‘হাদীছ পাওয়া গেলে যুক্তি বাতিল’। কিন্তু সুন্নাহর ক্ষেত্রে এটি সঠিক নয়। কারণ হাদীছ আল্লাহর কিতাবের উপর ফায়ছালা প্রদানকারী এবং তার ব্যাখ্যাকারী। তাই কুরআনে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও হাদীছে বিধান তালাশ করা আবশ্যক। কারণ কুরআনের সাথে হাদীছের সম্পর্ক, হাদীছের সাথে ইজতিহাদের মতো কস্মিনকালেও নয় (فليست السنة مع القرآن، كالرأى مع السنة، كلا ثم كلا)। বরং কুরআন ও হাদীছকে এক উৎস গণ্য করা আবশ্যক। এদের মধ্যে কখনো কোন পার্থক্য নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এদিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘জেনে রাখ! আমি কুরআন ও তার ন্যায় আরেকটি বস্তু (হাদীছ) প্রাপ্ত হয়েছি’।২১ তিনি আরো বলেছেন, ‘হাওযে কাওছারে আমার নিকট পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত এ দু’টো কখনো পৃথক হবে না’।২২ সুতরাং কুরআন ও হাদীছের মধ্যে উল্লিখিত বিভাজন সঠিক নয়। কেননা এটা উভয়ের মধ্যে পার্থক্যের দাবি করে। পূর্ববর্তী বর্ণনার আলোকে যেই দাবি ভিত্তিহীন।

আমি এই বিষয়টার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম। যদি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকি তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকলে আমার নিজের পক্ষ থেকে। আল্লাহর কাছে মিনতি, তিনি যেন আমাদেরকে ও আপনাদেরকে পদস্খলন ও তার যাবতীয় অসন্তুষ্টিমূলক কাজ থেকে রক্ষা করেন।

টিকাঃ
২০. আবূদাঊদ, হাদীছ নং ৩৫৯২, ‘বিচার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১১; তিরমিযী, হাদীছ নং ১৩২৭, ‘বিধি-বিধান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩; মিশকাত, হাদীছ নং ৩৭৩৭, ‘নেতৃত্ব ও বিচার’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২; সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যঈফা ওয়াল মাওযূ‘আহ, হাদীছ নং ৮৮১।
২১. আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬০৪, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬; মিশকাত, হাদীছ নং ১৬৩, ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ।
২২. মুওয়াত্তা মালেক, হাদীছ নং ৩৩৩৮, ‘আল-জামে’ অধ্যায়, ‘তাকদীরের বিষয়ে বিতর্ক করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ; হাকেম, হাদীছ নং ৩১৯, ‘ইলম’ অধ্যায়, সনদ হাসান।

ফন্ট সাইজ
15px
17px