📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 ইসলামে হাদীছের মর্যাদা

📄 ইসলামে হাদীছের মর্যাদা


আমার প্রবল ধারণা, আজকের এই মহতী অনুষ্ঠানে বিশেষ করে যেখানে খ্যাতিমান আলেম-ওলামা ও সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ রয়েছেন, সেখানে আমি এমন কোন পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করতে সক্ষম হব না, যে বিষয়ে তাঁরা পূর্বে অবগত নন। যদি আমার ধারণা সঠিক হয় তাহলে আজকের এ বক্তব্য প্রদানের দ্বারা উপদেশ দানকারী ও আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর অনুসরণকারী হওয়াই আমার জন্য যথেষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি উপদেশ দিতে থাক। কারণ উপদেশ মুমিনদেরই উপকারে আসে’ (যারিয়াত ৫৫)।

মহিমান্বিত রামাযান মাসের এই বরকতময় রজনীতে আমার বক্তব্য এর ফযীলত ও বিধি-বিধান বর্ণনা এবং তারাবীহ ছালাতের ফযীলত বা এ জাতীয় কোন বিষয়ে হবে না, বক্তা ও দাঈগণ সাধারণত যেসব বিষয়ে এ মাসে ওয়ায করে থাকেন। আর তা ছায়েমের (রোযাদার) জন্য উপকারী বিবেচিত হয় এবং তাদের জন্য কল্যাণ ও বরকত বয়ে নিয়ে আসে। বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়কে আমার আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচন করেছি। কেননা সেটি উজ্জ্বল শরী‘আতের অন্যতম একটি উৎস। আর তা হল- ইসলামী শরী‘আতে হাদীছের গুরুত্ব বর্ণনা।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 কুরআনের সাথে হাদীছের সম্পর্ক

📄 কুরআনের সাথে হাদীছের সম্পর্ক


আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে তাঁর নবুঅত ও রিসালাতের জন্য মনোনীত করত তাঁর উপর কুরআন মজীদ অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তাতে তাঁকে অন্যান্য আদিষ্ট বিষয়ের সাথে মানুষের কাছে কুরআন ব্যাখ্যা করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল’ (নাহল ৪৪)।

আমার মতে, এই আয়াতে কারীমায় উল্লিখিত البيان বা বর্ণনা দু’ধরনের বর্ণনাকে শামিল করে :

প্রথম : কুরআনের শব্দ বর্ণনা করা (بیان اللفظ ونظمه)। আর তা হচ্ছে- কুরআন মজীদ প্রচার করা, তা গোপন না করা এবং মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হৃদয়ে যেভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন ঠিক সেভাবেই উম্মতের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য- ‘হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রচার কর’ (মায়েদা ৬৭)। আয়েশা (রাঃ) এক হাদীছে বলেছেন, ‘রাসূল (ছাঃ) কুরআনের কিছু অংশ গোপন করেছেন- কেউ যদি এমন ধারণা পোষণ করে, তাহলে সে আল্লাহর ওপর মস্তবড় অপবাদ আরোপ করল। অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রচার কর; যদি না কর তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না’ (মায়েদা ৬৭)।’২

মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার কোন কিছু যদি তিনি গোপন করতেন তাহলে এ আয়াতটি গোপন করতেন- ‘স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে (যায়েদ বিন হারেছা) অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর’। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত’ (আহযাব ৩৭)।’৩

দ্বিতীয় : কুরআন মজীদের যে শব্দ, বাক্য বা আয়াতের ব্যাখ্যার প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ অনুভব করে তা ব্যাখ্যা করা। মুজমাল (সংক্ষিপ্ত), আম (ব্যাপক) ও মুতলাক (শর্তহীন) আয়াতসমূহের ক্ষেত্রে সাধারণত এমনটা বেশি প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে হাদীছ মুজমালকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে, আমকে খাছ (নির্দিষ্ট) করে এবং মুতলাককে মুকাইয়াদ (শর্তযুক্ত) করে। এটা যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথা দ্বারা হয়ে থাকে, তেমনি তাঁর কাজ ও অনুমোদন দ্বারাও হয়ে থাকে।

টিকাঃ
২. বুখারী, হাদীছ নং ৪৮৫৫, ৪৬১২ ‘তাফসীর’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭; মুসলিম, হাদীছ নং ১৭৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৭।
৩. মুসলিম, হাদীছ নং ১৭৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৭।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 কুরআন বুঝার জন্য হাদীছের প্রয়োজনীয়তা ও তার কতিপয় উদাহরণ

📄 কুরআন বুঝার জন্য হাদীছের প্রয়োজনীয়তা ও তার কতিপয় উদাহরণ


আল্লাহর বাণী- ‘পুরুষ চোর এবং নারী, তাদের হাত কেটে দাও’ (মায়েদা ৩৮) এর যথার্থ উদাহরণ। কেননা এ আয়াতে হাতের ন্যায় চোর শব্দও মুতলাক বা সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কওলী হাদীছ চোরের ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং যে চোর এক চতুর্থাংশ দীনার চুরি করে তার সাথে মুকাইয়াদ বা শর্তযুক্ত করেছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘এক দীনারের এক চতুর্থাংশ বা তার বেশি চুরি না করলে চোরের হাত কাটা যাবে না’।৪ অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কর্ম বা তাঁর ছাহাবীগণের কর্ম ও উহার প্রতি তাঁর স্বীকৃতি প্রদানমূলক হাদীছ চোরের হাত কতটুকু কাটতে হবে তা ব্যাখ্যা করেছে। কারণ ছাহাবীগণ চোরের হাতের কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলতেন। হাদীছের গ্রন্থাবলীতে যার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে।

‘তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডলে ও হাতে মাসেহ করবে’ (মায়েদা ৬)। তায়াম্মুম সম্পর্কিত এ আয়াতে উল্লিখিত হাত সম্পর্কে কওলী হাদীছ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে যে, তা হল হাতের তালু। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তায়াম্মুম হল মুখমণ্ডল ও দুই হাতের তালুর জন্য একবার মাটিতে হাত মারা’।৫

নিম্নে আপনাদের জন্য আরো এমন কতিপয় আয়াত উল্লেখ করা হচ্ছে, হাদীছ ছাড়া যেগুলোর সঠিক মর্ম অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

১. আল্লাহর বাণী : ‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত’ (আন‘আম ৮২)। আল্লাহ তা‘আলার বাণী দ্বারা ছাহাবায়ে কেরাম সাধারণভাবে সকল প্রকার যুলুম বুঝেছিলেন। সেটা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। এজন্য এ আয়াতটির মর্ম তাদের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকলে তারা বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তার নফসের উপর যুলুম করে না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছিলেন, ‘তোমরা যে যুলুমের কথা ভাবছ সেটা উদ্দেশ্য নয়। বরং ওটা হচ্ছে শিরক। তোমরা কি লুকমান তার সন্তানকে যে কথা উপদেশ দিয়ে বলেছে তা শুননি : ‘হে বৎস! আল্লাহর সাথে শিরক কর না। নিশ্চয়ই শিরক চরম যুলুম’ (লুকমান ১৩)।৬

২. আল্লাহর বাণী : ‘তোমরা যখন যমীনে সফর করবে তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিররা তোমাদের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করবে, তবে ছালাত সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোন দোষ নেই’ (নিসা ১০১)। এই আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, সফরে ছালাত কছর বা সংক্ষিপ্ত করার শর্ত হচ্ছে শত্রুভীতি। এজন্য কতিপয় ছাহাবী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নিরাপদ অবস্থায় ছালাত কছর করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য ছাদাকা বা দান। সুতরাং তোমরা তার দান গ্রহণ কর’।৭

৩. মহান আল্লাহর বাণী : ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু ও রক্ত’ (মায়েদা ৩)। কওলী হাদীছ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে যে, মৃত ফড়িং ও মাছ এবং কলিজা ও প্লীহার রক্ত হালাল। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দু’প্রকার মৃত জন্তু এবং দু’প্রকার রক্ত আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। মৃত জন্তু দু’টি হল ফড়িং ও মাছ। আর দু’প্রকার রক্ত হল কলিজা ও প্লীহা’। ইমাম বায়হাকী ও অন্যরা মারফূ ও মাওকূফ উভয় সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। মাওকূফ হাদীছের সনদটি ছহীহ এবং এটা মারফূর হুকুমে।৮ কেননা নিজস্ব মতের আলোকে এমনটি বলা যায় না।

৪. আল্লাহর বাণী : ‘বল, আমার প্রতি যে ওহী হয়েছে তাতে, লোকে যা আহার করে তার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না, মৃত, বহমান রক্ত ও শূকরের গোশত ব্যতীত। কেননা এগুলি অবশ্যই অপবিত্র অথবা যা অবৈধ, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গের কারণে’ (আন‘আম ১৪৫)। অতঃপর এই আয়াতে উল্লেখ নেই এমন কিছু বিষয় হাদীছ হারাম সাব্যস্ত করেছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তীক্ষ্ণ দাঁতওয়ালা প্রত্যেক হিংস্র জন্তু খাওয়া হারাম’।৯
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক তীক্ষ্ণ দাঁতওয়ালা হিংস্র জন্তু এবং ধারালো নখ বিশিষ্ট পাখি খেতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিষেধ করেছেন।১০ এ জাতীয় বস্তু হারাম হওয়া সম্পর্কে আরো অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। যেমন খায়বারের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন। কেননা ওটা অপবিত্র’।১১

৫. মহান আল্লাহর বাণী : ‘বল, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তা কে হারাম করেছে’? (আ‘রাফ ৩২)। হাদীছই বর্ণনা করেছে যে, কিছু শোভার বস্তু হারাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে ছহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, একদিন তিনি তাঁর ছাহাবীদের নিকট আসলেন। তখন তার এক হাতে রেশম ও অন্য হাতে স্বর্ণ ছিল। তিনি (ছাঃ) বললেন, ‘এ দু’টো জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম, কিন্তু মহিলাদের জন্য হালাল’।১২

এ মর্মে ছহীহ বুখারী, ছহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে অনেক হাদীছ বর্ণিত রয়েছে। হাদীছ ও ফিকহে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিকট এ জাতীয় অনেক পরিচিত উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে।

ভ্রাতৃবর্গ! পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আমাদের নিকট ইসলামী শরী‘আতে হাদীছের গুরুত্ব প্রতিভাত হল। আমরা যেসব উদাহরণ উল্লেখ করিনি সেগুলো ব্যতীত শুধু উল্লিখিত উদাহরণগুলোর প্রতি যদি আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে নিশ্চিত হব যে, হাদীছ ছাড়া সঠিকভাবে কুরআন বুঝার কোন উপায় নেই।

প্রথম উদাহরণে ছাহাবায়ে কেরাম আয়াতে উল্লিখিত শব্দের প্রকাশ্য অর্থ বুঝেছিলেন। অথচ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর ভাষ্য অনুযায়ী তাঁরা ছিলেন, ‘এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, সবচেয়ে নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী, গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং কম ভানকারী’। এতদসত্ত্বেও তারা শব্দের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করেছিলেন। যদি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে তাদের ভুল থেকে নিবৃত্ত না করতেন এবং বুঝিয়ে না দিতেন যে, আয়াতে উল্লিখিত দ্বারা শিরক উদ্দেশ্য, তাহলে আমরাও তাদের ভুলের অনুসরণ করতাম। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দিকনির্দেশনা ও হাদীছ দ্বারা আমাদেরকে এথেকে রক্ষা করেছেন।

দ্বিতীয় উদাহরণে উল্লিখিত হাদীছ যদি না থাকত তাহলে আয়াতের প্রকাশ্য ভাব অনুযায়ী শত্রুভীতির শর্ত আরোপ না করলেও অন্তত নিরাপদ অবস্থায় সফরে ছালাত কছর করার ব্যাপারে আমরা সন্দিগ্ধ থেকে যেতাম, যেমনটি কিছু ছাহাবী বুঝেছিলেন। যদি ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সফর অবস্থায় ছালাত কছর করতে না দেখতেন, তাহলে তারাও কছর করতেন না। আর তারা নিরাপদ অবস্থায় সফরে তাঁর সাথে ছালাত কছর করতেন।

তৃতীয় উদাহরণে উল্লিখিত হাদীছ যদি না থাকত তাহলে আমাদের জন্য হালালকৃত কিছু পবিত্র বস্তুকে আমরা হারাম সাব্যস্ত করতাম। যেমন : ফড়িং, মাছ, কলিজা ও প্লীহা।

চতুর্থ উদাহরণে উল্লিখিত কতিপয় হাদীছ যদি না থাকত তাহলে আল্লাহ তাঁর নবী (ছাঃ)-এর যবানে আমাদের জন্য যেসব বস্তু হারাম করেছেন, সেগুলোকে আমরা হালাল গণ্য করতাম। যেমন : হিংস্র জন্তু ও ধারালো নখ বিশিষ্ট পাখি।

অনুরূপভাবে পঞ্চম উদাহরণে উল্লিখিত হাদীছগুলো যদি বিদ্যমান না থাকত তাহলে আল্লাহ তাঁর নবীর যবানে যেসব বিষয় হারাম সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলোকে আমরা হালাল মনে করতাম। যেমন : স্বর্ণ ও রেশম। এজন্য কতিপয় পূর্বসূরী বিদ্বান বলেছেন, ‘হাদীছ কুরআনের উপর ফয়ছালা করে’।

টিকাঃ
৪. ইবনু হিব্বান, হাদীছ নং ৪৪৬৫, ‘চুরির শাস্তি’ অনুচ্ছেদ; বুখারী, হাদীছ নং ৬৭৮৯, ‘দণ্ডবিধি’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৩; মুসলিম, হাদীছ নং ১৬৮৪, ‘দণ্ডবিধি’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১; মিশকাত, হাদীছ নং ৩৫৯০, ‘দণ্ডবিধি’ অধ্যায়, ‘চোরের হাত কাটার বিধান’ অনুচ্ছেদ।
৫. আহমাদ, হাদীছ নং ১৮৩৪৫; বুখারী, হাদীছ নং ৩৪৭, ‘তায়াম্মুম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮; মুসলিম, হাদীছ নং ৩৬৮, ‘হায়েয’ অধ্যায়, ‘তায়াম্মুম’ অনুচ্ছেদ; সিলসিলা ছহীহা, হাদীছ নং ৬৯৪।
৬. বুখারী, হাদীছ নং ৪৬২৯, ‘তাফসীর’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩, হাদীছ নং ৩৪২৯, ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪১; হাদীছ নং ৬৯১৮ ‘আল্লাহদ্রোহী ও ধর্ম ত্যাগীদেরকে তওবার প্রতি আহ্বান ও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১; মুসলিম, হাদীছ নং ১২৪, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫৬।
৭. মুসলিম, হাদীছ নং ৬৮৬, ‘মুসাফিরের ছালাত ও তা কছর করা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১।
৮. ইবনু মাজাহ, হাদীছ নং ৩৩১৪, ‘খাদ্য’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩১; বায়হাকী, হাদীছ নং ১১২৮, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২৬৭; মিশকাত, হাদীছ নং ৪১৩২, ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, ‘যে সকল প্রাণী খাওয়া হালাল ও যা হারাম’ অনুচ্ছেদ; সিলসিলা ছহীহা, হাদীছ নং ১১১৮।
৯. মুসলিম, হাদীছ নং ১৯৩৩, ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩; মিশকাত, হাদীছ নং ৪১০৪, ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, ‘যে সকল প্রাণী খাওয়া হালাল ও যা হারাম’ অনুচ্ছেদ।
১০. মুসলিম, হাদীছ নং ১৯৩৪, ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩; মিশকাত, হাদীছ নং ৪১০৫ ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, ‘যে সকল প্রাণী খাওয়া হালাল ও যা হারাম’ অনুচ্ছেদ।
১১. বুখারী, হাদীছ নং ৫৫২৮ ‘যবেহ ও শিকার’ অধ্যায়, ‘গৃহপালিত গাধার গোশত’ অনুচ্ছেদ; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯৪০, ‘শিকার ও যবেহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫।
১২. ইবনু মাজাহ, হাদীছ নং ৩৫৯৫, ‘পোশাক-পরিচ্ছদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৯; সিলসিলা ছহীহা, হাদীছ নং ৩৩৭, হাদীছটি ছহীহ।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 আহলে কুরআনের ভ্রষ্টতা

📄 আহলে কুরআনের ভ্রষ্টতা


দুঃখজনক যে, কতিপয় আধুনিক মুফাসসির ও লেখক শুধু কুরআনের উপর নির্ভর করে শেষ দু’টি উদাহরণে উল্লিখিত হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করা এবং স্বর্ণ ও রেশম পরিধান করা জায়েয বলে মত প্রকাশ করেছেন। এমনকি বর্তমান যুগে ‘আহলে কুরআন’ নামধারী একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্বও পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা ছহীহ হাদীছের সহযোগিতা ছাড়াই কুরআন মজীদের কপোলকল্পিত ও মস্তিষ্কপ্রসূত তাফসীর করছে। তাদের নিকট হাদীছ তাদের খেয়াল-খুশির অনুগামী। যেসব হাদীছ তাদের মতের অনুকূলে সেগুলোকে তারা আঁকড়ে ধরে এবং যেগুলো তাদের মতের বিরোধী সেগুলোকে তারা তাদের পশ্চাতে নিক্ষেপ করে। সম্ভবত এদের দিকে ইঙ্গিত করেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছহীহ হাদীছে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘আমি যেন তোমাদের কাউকে এরূপ না দেখি যে, সে তার গদীতে ঠেস দিয়ে বসে থাকবে, আর তার কাছে আমার কোন আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা আসলে সে বলবে যে, আমি এসব কিছু জানি না। যা আল্লাহর কিতাবে পাব, তারই আমরা অনুসরণ করব’।১৩ আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, ‘জেনে রাখ! আমি কুরআন ও তার মতো আরেকটি বস্তু (হাদীছ) প্রাপ্ত হয়েছি’।১৪ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমরা এতে যা হারাম পেয়েছি তাকে হারাম বলে জানি। সাবধান! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বস্তুর ন্যায়’।১৫

আরো দুঃখজনক হল, জনৈক সম্মানিত লেখক ইসলামী শরী‘আহ ও তার আকীদা বিষয়ে একটি বই লিখেছেন। তিনি এর ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন যে, এই বইটি লেখার সময় তার কাছে কুরআন ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থ ছিল না।

উল্লিখিত ছহীহ হাদীছটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, শুধু কুরআনই ইসলামী শরী‘আত নয়; বরং কুরআন ও হাদীছ উভয়ই শরী‘আত। যে ব্যক্তি এ দু’টির একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে আঁকড়ে ধরে, সে যেন এর একটিকেও আঁকড়ে ধরে না। কেননা কুরআন ও হাদীছ উভয়ই উভয়কে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ প্রদান করে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (নিসা ৮০)। ‘তোমার প্রভুর শপথ! তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদীয় বিষয় সমূহে তোমাকেই একমাত্র সমাধানকারী হিসাবে গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমার দেওয়া ফায়ছালা সম্পর্কে তারা তাদের মনে কোনরূপ দ্বিধা-সংকোচ পোষণ না করবে এবং অবনতচিত্তে তা গ্রহণ না করবে’ (নিসা ৬৫)। ‘কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেওয়া ফায়ছালার ব্যাপারে (ভিন্নমত পোষণের) কোনরূপ এখতিয়ার নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল, সে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে পতিত হল’ (আহযাব ৩৬)। ‘রাসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা গ্রহণ কর এবং যাথেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক’ (হাশর ৭)।

এই আয়াতের ব্যাপারে ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর একটি ঘটনা আমাকে বিস্মিত করে। ঘটনাটি হচ্ছে- একদা (বনু আসাদ গোত্রের উম্মে ইয়াকূব নামে) এক মহিলা তাঁর নিকট এসে বলল, আপনি নাকি সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে যেসব নারী অপরের অঙ্গে উল্কি অংকন করে এবং নিজের অঙ্গেও করায়, যারা ভ্রূ উপড়িয়ে ফেলে এবং যেসব নারী দাঁত সরু করে দাঁতের মাঝে ফাঁক করে, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে বদলে দেয় তাদের প্রতি লা‘নত করেছেন। জবাবে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাদের প্রতি লা‘নত করেছেন আমি তাদের প্রতি কেন লা‘নত করব না? এমতাবস্থায় তা কুরআনে বিদ্যমান আছে। মহিলা বলল, ‘আমি সমগ্র কুরআন পড়েছি। (কিন্তু তুমি যা বলছ তাতে) আমি তা পাইনি। তখন ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) মহিলাকে বললেন, ‘যদি আপনি কুরআন পড়তেন, তাহলে অবশ্যই তা পেতেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘রাসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা গ্রহণ কর এবং যাথেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক’। ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘সৌন্দর্যের জন্য উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারী, ভ্রূ উত্তোলনকারী নারী এবং দাঁত সরু করে মাঝে ফাঁক সৃষ্টিকারী নারী, যা আল্লাহর সৃষ্টিকে বদলে দেয়, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক’।১৬

টিকাঃ
১৩. তিরমিযী, হাদীছ নং ২৬৬৩, ‘ইলম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১০; আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬০৫, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬; ইবনু মাজাহ, হাদীছ নং ১৩, অনুচ্ছেদ-২, হাদীছটি ছহীহ।
১৪. আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৬০৪, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬; মিশকাত, হাদীছ নং ১৬৩, ‘ঈমান’ অধ্যায়, ‘কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ, হাদীছটি ছহীহ।
১৫. তিরমিযী, হাদীছ নং ২৬৬৪ ‘ইলম’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১০; ইবনু মাজাহ, হাদীছ নং ১২, অনুচ্ছেদ-২, হাদীছটি ছহীহ।
১৬. বুখারী, হাদীছ নং ৪৮৮৬, ‘তাফসীর’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪, হাদীছ নং ৫৯৩৯, ৫৯৪৩, ‘পোশাক’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৮৪ ও ৮৫; মুসলিম, হাদীছ নং ২১২৫, ‘পোশাক ও সাজসজ্জা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px