📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 লেখক পরিচিতি

📄 লেখক পরিচিতি


নাম ও জন্ম : নাম- মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন, উপনাম- আবূ আব্দির রহমান, পিতার নাম- নূহ নাজাতী। বংশপরিক্রমা হল- মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন বিন নূহ নাজাতী বিন আদম আল আলবানী। তিনি ১৩৩২ হিজরী মোতাবেক ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে আলবেনিয়ার প্রাক্তন রাজধানী ‘উশকুদারাহ’ () নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব : এক দরিদ্র ধার্মিক পরিবারে আলবানীর শৈশব কাটে। তাঁর বাবা নূহ নাজাতী একজন বড় মাপের হানাফী আলেম ছিলেন। শায়খ আলবানী পিতা সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ... ‘আমার বাবা বিশেষভাবে আরনাউতীদের (আলবেনীয় ও সার্ব জনগোষ্ঠী) মধ্যে হানাফী ফিকহ সম্পর্কে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিলেন। তিনি ছিলেন তাদের নির্ভরতার প্রতীক’। তিনি তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে ফারেগ হয়ে দ্বীনের খিদমতের মানসে নিজ দেশ আলবেনিয়ায় ফিরে আসেন। তাঁর কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন শারঈ জ্ঞান অর্জনের জন্য আসত। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রখ্যাত মুহাক্কিক শায়খ শু‘আইব আরনাউত।

সিরিয়ায় হিজরত : আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট শাসক আহমাদ যুগু ( )-এর শাসনামলে সেখানে ইসলামের উপর কুঠারাঘাত নেমে আসে। তিনি তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের মতো আলবেনিয়ায় নারীদের বোরকা পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং দেশকে ইউরোপীয় ধাঁচে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপীয় টুপি (Hat) পরিধান বাধ্যতামূলক করেন। শায়খ আলবানীর বাবা ঐ সময় স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করে দ্বীন রক্ষার্থে সিরিয়ায় হিজরত করেন। তখন আলবানীর বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর।

শিক্ষা জীবন : সিরিয়ায় হিজরতের পর আলবানীকে তাঁর বাবা ‘জামীইয়াতুল ইস‘আফ আল-খায়রী’ (দাতব্য এম্বুলেন্স সংস্থা) নামে একটি বেসরকারী মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। প্রাথমিক স্তরের অন্যান্য ছাত্রদের তুলনায় আলবানীর বয়স বেশি হওয়ায় তিনি এক বছরেই ১ম ও ২য় শ্রেণী শেষ করে ৪ বছরে কৃতিত্বের সাথে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ইতিপূর্বে আরবী বর্ণমালা না চিনলেও এ মাদরাসায় তিনি আরবী ভাষা শিখেন। এরপর তাঁর নিয়মতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর এগোয়নি। এর কারণ সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ... ‘সরকারী মাদরাসাগুলোর ব্যাপারে আমার বাবার (রহঃ) ধারণা ছিল খুবই খারাপ। এমন ধারণা থাকাটাও তাঁর জন্য সংগত ছিল। কারণ ঐ মাদরাসাগুলোতে নামকাওয়াস্তে শরী‘আহ শিক্ষা দেয়া হত। সেজন্য তিনি আমাকে ‘মাদরাসাতুত তাজহীয’-এ ভর্তি করেননি, যেটি সিরিয়ায় সে সময় উচ্চ মাধ্যমিক স্তর ছিল’।

এর একটা কারণ এটাও হতে পারে যে, বাবা চাইতেন তার সন্তান হানাফী ফিকহে ব্যুৎপত্তি লাভ করুক। কিন্তু সিরিয়ায় তখন হানাফী ফিকহ পড়ার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কোন ভাল ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। সেজন্য তিনি বাড়িতেই তার সন্তানকে তাজবীদ সহ কুরআন মুখস্থ করান। পাশাপাশি নাহু, ছরফ ও হানাফী ফিকহ ‘মুখতাছারুল কুদূরী’ পড়ান। তাছাড়াও এ সময় আলবানী মুহাম্মাদ সাঈদ বুরহানী নামে এক হানাফী ছূফী শিক্ষকের নিকট হানাফী ফিকহ ‘মারাকিল ফালাহ’, আরবী ব্যাকরণের ‘শুযুরুষ যাহাব’ ও বালাঘাতের কতিপয় আধুনিক গ্রন্থ পাঠ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিরিয়ার প্রখ্যাত সালাফী বিদ্বান মুহাম্মাদ বাহজাতুল বায়তারের (১৮৯৪-১৯৭৬) দরসে উপস্থিত হতেন। তিনি আলেপ্পোর খ্যাতনামা মুহাদ্দিছ ও ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ রাগেব আত-তাব্বাখের নিকট থেকে হাদীছের ‘ইজাযাত’ বা সনদ লাভ করেন।

ইলমে হাদীছের প্রতি মনোনিবেশ : বাল্যকাল থেকেই পড়ার প্রতি আলবানীর ঝোঁক ছিল প্রবল। এ সময় তিনি আরবী কিচ্ছা-কাহিনী, ইউরোপীয় গোয়েন্দা কাহিনী ও ইতিহাসের বিভিন্ন বই পড়তেন। বাবার সাথে ঘড়ির দোকানে কাজ করার সময় সুযোগ পেলেই তিনি দামেশকের উমাইয়া মসজিদে দরসে বসতেন। এ মসজিদের পশ্চিম গেটের সন্নিকটে আলী মিসরী নামক একজন ব্যক্তির পুরাতন বই ও পত্রিকা বিক্রির দোকান ছিল। তিনি সেখানে প্রায়ই যেতেন এবং পছন্দনীয় বই পড়ার জন্য ধার নিয়ে আসতেন। একদিন খ্যাতনামা মিসরীয় বিদ্বান সাইয়িদ রশীদ রিযা (১৮৬৫-১৯৩৫) সম্পাদিত ‘আল-মানার’ পত্রিকাটি তাঁর গোচরীভূত হয়। সেখানে তিনি ইমাম গাযালীর ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থের উপর একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ দেখতে পান। তিনি পত্রিকাটি নিয়ে গিয়ে গোটা প্রবন্ধটি পড়েন। উক্ত প্রবন্ধে হাফেয যায়নুদ্দীন ইরাকী লিখিত ‘আল-মুগনী আন হামলিল আসফার ফিল আসফার ফী তাখরীজে মা ফিল ইহইয়া মিনাল আখবার’-এর উল্লেখ দেখতে পেয়ে সেটি সংগ্রহের জন্য বাজারের বইয়ের দোকানগুলোতে তাঁর ভাষায় ‘দিশেহারা প্রেমিকের ন্যায়’ ( ) ঘুরতে থাকেন। অবশেষে এক দোকানে ৪ খণ্ডে মুদ্রিত পরম কাঙ্ক্ষিত গ্রন্থটি পেয়ে যান। কিন্তু কিনতে অপারগ হওয়ায় তিনি বইটি পড়ার জন্য ধার নেন। তিনি গ্রন্থটিকে নকল করে ৩ খণ্ডে দুই হাজার ১২ পৃষ্ঠায় সুবিন্যস্ত করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭/১৮ বছর। এভাবে সাইয়িদ রশীদ রিযার ঐ প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে তাঁর অন্তরে ছহীহ-যঈফ হাদীছ যাচাই-বাছাইয়ের এক ইলাহী অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। হাদীছের প্রতি সন্তানের অনিঃশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করে পিতা টিপ্পনী কেটে প্রায়শই বলতেন, ‘ইলমে হাদীছ দরিদ্রদের পেশা’।

ক্রমেই হাদীছের প্রতি শায়খ আলবানীর আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি তাঁর জীবিকার জন্য মঙ্গলবার ও শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহের বাকী দিনগুলোতে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘড়ি মেরামতে ব্যয় করতেন। বাকী সময় ব্যয় হত জ্ঞান অর্জন ও গ্রন্থ প্রণয়নে। তিনি হাদীছের মুদ্রিত গ্রন্থাবলী ও দুর্লভ পাণ্ডুলিপি অধ্যয়নের জন্য দামেশকের সুপ্রাচীন যাহেরিয়া লাইব্রেরীতে প্রত্যেক দিন ৬/৮ ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশুনা করতেন। কখনো কখনো ১২ ঘণ্টা অবধি চলত নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা। অনেক সময় লাইব্রেরীর সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অধ্যয়নে কেটে যেত। কর্তৃপক্ষ তাঁর পড়ার জন্য লাইব্রেরীর একটি কক্ষ বরাদ্দ করেন এবং সার্বক্ষণিক উপকৃত হওয়ার জন্য লাইব্রেরীর একটি চাবি তাঁকে প্রদান করেন। তিনি ইবনু আবিদ দুনয়ার ‘যাম্মুল মালাহী’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির বিনষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পৃষ্ঠা উদ্ধারের জন্য উক্ত লাইব্রেরীর প্রায় ১০ হাযার পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করেন।

দাওয়াত ও সমাজ সংস্কার : শায়খ আলবানী হাদীছ শাস্ত্রে গবেষণায় নিরত হয়ে সমাজে প্রচলিত বোধ-বিশ্বাস ও রসম-রেওয়াজের সাথে ইসলামের অবিমিশ্র ধারার ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করেন। তিনি সমাজের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা শিরক-বিদ‘আত ও তাকলীদ উৎখাতের জন্য দাওয়াতী ময়দানে আবির্ভূত হন। তিনি তার পিতা, ভাই, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব ও অন্যদেরকে আকীদা সংশোধন করা, মাযহাবী গোঁড়ামি পরিহার, যঈফ ও জাল হাদীছ বর্জন ও মৃত সুন্নাত পুনরুজ্জীবিতকরণের দাওয়াত দিতে থাকেন। তিনি প্রত্যেক মাসে এক সপ্তাহ (পরবর্তীতে মাসে ৩ দিন) দাওয়াতী সফরে সিরিয়ার হিমছ, হামাহ, ইদলিব, রাক্কা, সিলমিয়্যাহ, লাযেকিয়াহ প্রভৃতি শহরে-নগরে বেরিয়ে পড়তেন। এসব সফরের কারণে মানুষের মাঝে সাড়া পড়ে যায়। তারা শিরক-বিদ‘আত পরিহার করে কুরআন ও ছহীহ হাদীছকে আঁকড়ে ধরতে থাকে। এতে বিদ‘আতী, কবরপূজারী, ছূফী ও মুকাল্লিদদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়। তারা তাকে ‘ওয়াহাবী’ বলে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এসব অপপ্রচার সত্ত্বেও দাওয়াতের ময়দান থেকে তিনি কখনো নিবৃত্ত হননি।
তিনি বেশ কিছু পরিত্যক্ত সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তাঁর মধ্যে অন্যতম হল- খুতবাতুল হাজাহ-এর প্রচলন, ময়দানে ঈদের ছালাত আদায়, আকীকা ও নবজাতকের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুন্নাত, বিতর সহ ১১ রাক‘আত তারাবীহ ছালাত, পায়ে পা ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার সোজা করে ছালাতে দাঁড়ানো, সুতরা দেয়া প্রভৃতি।

দরস-তাদরীস : ১৯৪৫ সালের পূর্বেই তিনি দামেশকে সপ্তাহে দু’টি দরস প্রদান করা শুরু করেন। হাফেয ইবনুল কাইয়িমের ‘যাদুল মা‘আদ’-এর মাধ্যমে এ দরসের শুভ সূচনা হয়। আকীদা, ফিকহ, উছূলে ফিকহ, হাদীছ প্রভৃতি বিষয়ের বিভিন্ন গ্রন্থের উপর এখানে দরস চলত। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে হিজরত করার পর সেখানেও প্রত্যেক বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব একটি করে দরস প্রদান করতেন। এসব দরসে ছাত্র, শিক্ষক ও ওলামায়ে কেরাম উপস্থিত হতেন। কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দাওয়াত প্রচার-প্রসারে এর প্রভাব ছিল অনির্বচনীয়।

মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা : ইলমে হাদীছে শায়খ আলবানীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর ও সউদী গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শায়খ তাঁকে সেখানে শিক্ষকতার আহ্বান জানান। তিনি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৩৮১-১৩৮৩ হিজরী পর্যন্ত ‘শায়খুল হাদীছ’ হিসাবে সেখানে কর্মরত থাকেন। তাছাড়া ১৩৯৫-৯৮ হিজরীতে তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পরিচালনা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন।

জেল-যুলুম : শায়খ আলবানী দু’বার কারাগারে অন্তরীণ থাকেন। একবার ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাঈল যুদ্ধের সময়। আর দ্বিতীয়বার ১৯৬৯ সালে ৬ মাস, দামেশকের যে কারাগারে ইমাম ইবনু তায়মিয়াকে (৬৬১-৭২৮হিঃ) বন্দী রাখা হয়েছিল সেখানে। এ সময় তিন মাসে তিনি মুনযিরীকৃত সংক্ষিপ্ত ছহীহ মুসলিম তাহকীক করেন এবং টীকা-টিপ্পনী সংযোজন করেন। ইমাম ইবনু তায়মিয়ার পর তিনিই প্রথম সেখানে জুম‘আ কায়েম করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

বাদশাহ ফয়ছাল পুরস্কার লাভ : হাদীছ শাস্ত্রে অসামান্য অবদানের জন্য শায়খ আলবানী ১৪১৯ হিঃ/১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বাদশাহ ফয়ছাল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন।

মৃত্যু ও দাফন : ১৪০০ হিজরীর ১লা রামাযানে তিনি স্বপরিবারে দামেশক থেকে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে হিজরত করেন। সেখানে নিজ বাসগৃহে তিনি ১৪২০ হিজরীর ২২ জুমাদিউছ ছানী মোতাবেক ১৯৯৯ সালের ২রা অক্টোবর শনিবার মাগরিবের কিছুক্ষণ পূর্বে ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ঐদিনই বাদ এশা স্থানীয় একটি পুরাতন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মনীষীদের চোখে আলবানী :
১. সউদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (১৯১৩-১৯৯৯) বলেন, ... ‘আসমানের নিচে এই যুগে শায়খ নাছিরের চেয়ে ইলমে হাদীছে অধিক পণ্ডিত কাউকে আমি জানি না’।
২. শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (১৯২৭-২০০১) বলেন, ... ‘হাদীছের রেওয়ায়াত ও দিরায়য়াতে তিনি ছিলেন বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী’।
৩. সুনানে নাসায়ীর ব্যাখ্যাতা শায়খ মুহাম্মাদ আলী আদম (ইথিওপিয়া) বলেন, ... ‘হাদীছের ছহীহ-যঈফের অবগতির ব্যাপারে তাঁর গভীর মনীষা রয়েছে’।
৪. শায়খ যায়েদ বিন আব্দুল আযীয আল-ফাইযায বলেন, He had great concern for the Hadith- its paths of transmission, its reporters and its levels of authenticity or weakness.

রচনাবলী : তাঁর রচিত ও তাহকীককৃত গ্রন্থের সংখ্যা সোয়া দুইশ’র বেশি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হ’ল- ১. সিলসিলাতুল আহাদীছ আছ-ছহীহা (৭ খণ্ড) ২. সিলসিলাতুল আহাদীছ আয-যঈফা ওয়াল মাওযূ‘আহ (১৪ খণ্ড) ৩. ইরওয়াউল গালীল (৮ খণ্ড) ৪. ছিফাতু ছালাতিননবী (ছাঃ) ৫. ছহীহ ও যঈফ তারগীব ওয়াত তারহীব (৩+২=৫ খণ্ড) ৬. ছহীহ ও যঈফুল জামে আছ-ছাগীর ৭. ছহীহ সুনানে আরবা‘আ ও যঈফ সুনানে আরবা‘আ ৮. তাহকীক মিশকাত (৩ খণ্ড) ৯. আহকামুল জানায়িয ১০. ছালাতুত তারাবীহ ১১. মু‘জামুল হাদীছ আন-নববী (অপ্রকাশিত। ৪০ খণ্ড) ১২. ছহীহ সুনানে আবূ দাউদ (৯ খণ্ডে বিস্তারিত তাখরীজ সহ)।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


এটি ১৩৯২ হিজরীর বরকতময় রামাযান মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় প্রদান করা আমার একটি বক্তৃতা। এর বিরাট উপকারিতা এবং এ রকম বিষয়ে মুসলমানদের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে কতিপয় ভাই আমাকে এটি প্রকাশের প্রস্তাব প্রদান করেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এর উপকারিতাকে সার্বজনীন করা এবং উপদেশ ও সময়ের প্রতি খেয়াল করত আমি এটি প্রকাশ করছি। এর মূল আবেদন অনুধাবনে সম্মানিত পাঠকের সহায়ক হিসাবে এতে আমরা কতিপয় বিস্তারিত শিরোনাম সংযোজন করেছি। আল্লাহর কাছে কামনা করছি, তিনি যেন তাঁর দ্বীনের রক্ষক ও তাঁর শরী‘আতের সাহায্যকারীদের মধ্যে আমার নাম লিপিবদ্ধ করেন এবং এ গ্রন্থের জন্য আমাকে প্রতিদান প্রদান করেন। তিনিই তো উত্তম দায়িত্বশীল।

দামেশক
২২শে মুহাররম
১৩৯৪ হিজরী।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 ইসলামে হাদীছের মর্যাদা

📄 ইসলামে হাদীছের মর্যাদা


আমার প্রবল ধারণা, আজকের এই মহতী অনুষ্ঠানে বিশেষ করে যেখানে খ্যাতিমান আলেম-ওলামা ও সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ রয়েছেন, সেখানে আমি এমন কোন পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করতে সক্ষম হব না, যে বিষয়ে তাঁরা পূর্বে অবগত নন। যদি আমার ধারণা সঠিক হয় তাহলে আজকের এ বক্তব্য প্রদানের দ্বারা উপদেশ দানকারী ও আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীর অনুসরণকারী হওয়াই আমার জন্য যথেষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি উপদেশ দিতে থাক। কারণ উপদেশ মুমিনদেরই উপকারে আসে’ (যারিয়াত ৫৫)।

মহিমান্বিত রামাযান মাসের এই বরকতময় রজনীতে আমার বক্তব্য এর ফযীলত ও বিধি-বিধান বর্ণনা এবং তারাবীহ ছালাতের ফযীলত বা এ জাতীয় কোন বিষয়ে হবে না, বক্তা ও দাঈগণ সাধারণত যেসব বিষয়ে এ মাসে ওয়ায করে থাকেন। আর তা ছায়েমের (রোযাদার) জন্য উপকারী বিবেচিত হয় এবং তাদের জন্য কল্যাণ ও বরকত বয়ে নিয়ে আসে। বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়কে আমার আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচন করেছি। কেননা সেটি উজ্জ্বল শরী‘আতের অন্যতম একটি উৎস। আর তা হল- ইসলামী শরী‘আতে হাদীছের গুরুত্ব বর্ণনা।

📘 ইলমে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা 📄 কুরআনের সাথে হাদীছের সম্পর্ক

📄 কুরআনের সাথে হাদীছের সম্পর্ক


আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে তাঁর নবুঅত ও রিসালাতের জন্য মনোনীত করত তাঁর উপর কুরআন মজীদ অবতীর্ণ করেছিলেন এবং তাতে তাঁকে অন্যান্য আদিষ্ট বিষয়ের সাথে মানুষের কাছে কুরআন ব্যাখ্যা করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল’ (নাহল ৪৪)।

আমার মতে, এই আয়াতে কারীমায় উল্লিখিত البيان বা বর্ণনা দু’ধরনের বর্ণনাকে শামিল করে :

প্রথম : কুরআনের শব্দ বর্ণনা করা (بیان اللفظ ونظمه)। আর তা হচ্ছে- কুরআন মজীদ প্রচার করা, তা গোপন না করা এবং মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হৃদয়ে যেভাবে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন ঠিক সেভাবেই উম্মতের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য- ‘হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রচার কর’ (মায়েদা ৬৭)। আয়েশা (রাঃ) এক হাদীছে বলেছেন, ‘রাসূল (ছাঃ) কুরআনের কিছু অংশ গোপন করেছেন- কেউ যদি এমন ধারণা পোষণ করে, তাহলে সে আল্লাহর ওপর মস্তবড় অপবাদ আরোপ করল। অথচ আল্লাহ বলছেন, ‘হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রচার কর; যদি না কর তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না’ (মায়েদা ৬৭)।’২

মুসলিমের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার কোন কিছু যদি তিনি গোপন করতেন তাহলে এ আয়াতটি গোপন করতেন- ‘স্মরণ কর, আল্লাহ যাকে (যায়েদ বিন হারেছা) অনুগ্রহ করেছেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তুমি তাকে বলছিলে, ‘তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর’। তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন; তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহকেই ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত’ (আহযাব ৩৭)।’৩

দ্বিতীয় : কুরআন মজীদের যে শব্দ, বাক্য বা আয়াতের ব্যাখ্যার প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ অনুভব করে তা ব্যাখ্যা করা। মুজমাল (সংক্ষিপ্ত), আম (ব্যাপক) ও মুতলাক (শর্তহীন) আয়াতসমূহের ক্ষেত্রে সাধারণত এমনটা বেশি প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে হাদীছ মুজমালকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে, আমকে খাছ (নির্দিষ্ট) করে এবং মুতলাককে মুকাইয়াদ (শর্তযুক্ত) করে। এটা যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথা দ্বারা হয়ে থাকে, তেমনি তাঁর কাজ ও অনুমোদন দ্বারাও হয়ে থাকে।

টিকাঃ
২. বুখারী, হাদীছ নং ৪৮৫৫, ৪৬১২ ‘তাফসীর’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭; মুসলিম, হাদীছ নং ১৭৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৭।
৩. মুসলিম, হাদীছ নং ১৭৭, ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px