📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 মধ্যমপন্থী দল

📄 মধ্যমপন্থী দল


এখন মধ্যমপন্থা হচ্ছে, কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং রিজালুল্লাহকেও অনুসরণ করতে হবে। কিতাবুল্লাহকে রিজালুল্লাহর শিক্ষার আলোকে অধ্যয়ন করলে হেদায়েতের পথ পাওয়া যাবে। এই দুটিকে একত্রিত করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي
مَا أَنَا عَلَيْهِ দ্বারা উদ্দেশ্য কিতাব এবং أَصْحَابِی দ্বারা উদ্দেশ্য রিজাল। অর্থাৎ যে কিতাবের উপর আমি রয়েছি, একে এবং আমার সাহাবীগণকে আঁকড়ে ধরো। যে ব্যক্তি এ দুটিকে একসাথে নিয়ে চলবে, সে হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে। এ বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে নিলে আমাদের জ্ঞানগত এবং আমলগত ভ্রষ্টতার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। যারা শুধু কিতাব অধ্যয়ন করে পথপ্রদর্শক বনে গেছেন এবং শুধু কিতাব অধ্যয়ন করে বলে দিয়েছেন যে, ‘আমিও আবু হানীফা বনে গেছি’- এবং এই শ্লোগান তুলেছেন যে- هُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ ‘তারাও মানুষ এবং আমরাও মানুষ’। তারা যে কাজ করেছেন, আমরাও সে কাজ করব। তারা যেমন কুরআন হাদীসের উপর ইজতেহাদ বা গবেষণা করে মাসাইল বের করেছেন, আমরাও তা করব, তাহলে বাস্তবে এ ধরনের ব্যক্তি গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। তার দৃষ্টান্ত মক্তবের ঐ শিক্ষার্থীর ন্যায়, যে একজন ডাক্তারের ব্যাপারে বলে, সে-ও আমার ন্যায় মানুষ। সে যদি অপারেশন করতে পারে আমিও পারব। সে যেমন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটাছেঁড়া করতে পারে, আমিও পারব। আরে আহম্মক! সে তো কাটাছেঁড়া করে সুস্থতা অর্জনের জন্য, আর তুমি তো কাটবে জবাই করার জন্য। আবার শ্লোগান তুলছ ‘সে যেমন মানুষ, আমিও তেমন মানুষ।’
সুতরাং রিজালুল্লাহ তথা আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিগণকে ছেড়ে এবং উস্তাদের নিকট শিক্ষাগ্রহণ এবং অধ্যয়ন ব্যতিরেকে যারা আজকাল দ্বীন অর্জনের দাবি তুলছে, মূলত তারাও তৃতীয় ভ্রষ্টতায় নিপতিত।
যদি ধরে নেওয়া হয়, এক ব্যক্তি খুবই মেধার অধিকারী। সে মেডিকেল সাইন্সের বই-পুস্তক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। তাতে লেখা রয়েছে অমুক রোগের চিকিৎসা এই অমুক রোগের সমাধান এই। এরপর একপর্যায়ে সে চিকিৎসা কেন্দ্র খুলে বসল এবং তার চিকিৎসায় আট-দশজন আরোগ্যও লাভ করল। এখন যদি লোকেরা বলতে থাকে, ভাই অমুকের চিকিৎসা খুবই কার্যকর। সে অনেক বড় ডাক্তার বনে গেছে। ফলে তার চিকিৎসার পেছনে মানুষ লাইন ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু মানুষের কি এ কথা জানা আছে যে, আট-দশজন উপকৃত হয়েছে সত্য, কিন্তু যখন কোনো মানুষের জীবনহানি ঘটবে, তখন তার অবস্থা কী হবে? কারণ তার নির্বুদ্ধিতার কারণে সে এমন কাজও করে বসবে, যখন মানুষের জীবন নিয়ে টানাটানি শুরু হবে।
সুতরাং আট-দশজন সুস্থ হয়ে গেলেই কোনো আনাড়ি এবং অনভিজ্ঞ ডাক্তারের পেছনে পড়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা রয়েছে, যেকোনো সময় তার ভুল চিকিৎসায় মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে।
অনেকে শ্লোগান তুলে, অমুক ব্যক্তি বড় বড় কিতাব অধ্যয়ন করে দ্বীনের উপর এসে গেছে। প্রথম বেদ্বীন ছিল, এখন দ্বীনদার বনে গেছে। নামায পড়ত না, এখন নামাযী বনে গেছে। মৌলভীরা খামাখাই তার অনুসরণ করতে মানা করে। তার রচিত বই-পুস্তক পড়তে নিষেধ করে। আমরা তো দেখছি তার বই-পুস্তক পড়ে অনেক উপকার হচ্ছে। এমন মন্তব্যকারীদের জবাবে আমার সেই আনাড়ি ডাক্তারের দৃষ্টান্তই প্রযোজ্য। কারণ এমন ব্যক্তি শুধু কিতাব অধ্যয়ন করে দার্শনিক বনে লোকদেরকে যে দ্বীন শিখিয়েছে এবং বাহ্যত লোকদের কিছু ফায়দাও হচ্ছে, এই ফায়দা দেখে ধোঁকায় পড়া উচিত হবে না। কারণ ঐ অনভিজ্ঞ ডাক্তারের ন্যায় কখনও এমন কথা সে বলে ফেলবে, যার দ্বারা পূর্ণ দ্বীন ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।

📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 সাহাবিগণ দ্বীন কীভাবে শিখেছেন?

📄 সাহাবিগণ দ্বীন কীভাবে শিখেছেন?


আল্লাহ তাআলা দ্বীনের প্রকৃতিই এমন করেছেন যে, তা সীনা থেকে সীনায় স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। শুধু চোখ দিয়ে কিতাব অধ্যয়ন করে নিলেই হয় না। উস্তাদের সীনা থেকে তা শিষ্যের সীনায় স্থানান্তরিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম কি কোনো কিতাব অধ্যয়ন করেছিলেন? কোনো ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন? শিক্ষার কোনো সার্টিফিকেট লাভ করেছিলেন? কিছুই করেননি। বরং সুফফায় গিয়ে পড়ে থাকতেন। তাদের ছিল না সিলেবাস, ছিল না নির্ধারিত সময়ের কোনো গুরুত্ব।
কী করতেন তাঁরা সেখানে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মুহূর্তের কার্যকলাপ তাঁরা প্রত্যক্ষ করতেন। তিনি কী করছেন। তিনি কী বলছেন। তা প্রত্যক্ষ করতে করতে তাঁদের হৃদয়ে নববী দীক্ষার আলো প্রবেশ করেছে। অতঃপর তাবেয়ীন এবং তাবে-তাবেয়ীন থেকে নিয়ে অদ্যাবধি ইলমে দ্বীন অর্জনের এই পরম্পরা চলে আসছে। আর হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে আমরা যে বলে থাকি قال حدثنا فلان حدثنا فلان 'অমুক থেকে অমুক বর্ণনা করেছেন, অমুক থেকে বর্ণনা করেছেন'- এসব ঐ সকল পবিত্রাত্মা মনীষীগণের সনদ, যাঁদের মাধ্যমে আমাদের ঈমানের সম্পর্ক সরাসরি রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গিয়ে জুড়ে যায়।

📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 ওসীলার মাধ্যমে প্রদানকৃত

📄 ওসীলার মাধ্যমে প্রদানকৃত


যেকোনো কিতাব বা বই-পুস্তক বোঝার দুটি পদ্ধতি। এক পদ্ধতি হলো, আপনি নিজে নিজে তা অধ্যয়ন করে বুঝে নিলেন। যেখানে কোনো শব্দ বোধগম্য না হয়, সেখানে অভিধান খুলে দেখে নিলেন। আরেক পদ্ধতি হচ্ছে, উস্তাদ বা শিক্ষকের সামনে বসে তার থেকে বুঝে নেওয়া। এ দুইয়ের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। অথচ নিজে অধ্যয়ন করে যা বুঝে এসেছে, উস্তাদ তাই বলেছেন। কোনো পার্থক্য হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও উস্তাদ বা শিক্ষকের মুখ থেকে শোনার মাঝে যে নূর থাকে, যে বরকত থাকে, তা নিজে নিজে অধ্যয়নের মাধ্যমে কখনও অর্জিত হয় না। তার কারণ হচ্ছে, বাস্তবে উস্তাদ কিছুই নয়, তার কোনো বৈশিষ্ট্য নেই এখানে, বরং জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকেই প্রদানকৃত। তবে আল্লাহর রীতি হচ্ছে মাধ্যম বা ওসীলার দ্বারা কাউকে কোনো কিছু প্রদান করা। এমনকি স্বয়ং নবী-রাসূলগণকেও মাধ্যম বা ওসীলা ব্যতিরেকে কোনো কিছু দেননি। নতুবা আল্লাহ তাআলার জন্য সরাসরি নবী-রাসূলগণের নিকট ওহী বা ঐশীবাণী প্রেরণ করা কি ক্ষমতাবহির্ভূত কোনো ব্যাপার ছিল? অথচ আল্লাহ তাআলা এমনটি করেননি; বরং জিবরাঈল আ.-কে মাধ্যম বানিয়েছেন। হযরত মূসা আ.-এর সাথে কথা বলার সময়ও একটি বৃক্ষকে মাধ্যম বানিয়েছিলেন; অর্থাৎ তুর বৃক্ষকে। এতে কী হেকমত বা রহস্য লুকায়িত? আল্লাহর রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে তাঁর রীতি হচ্ছে, তিনি কাউকে কোনো কিছু প্রদান করলে ওসীলার মাধ্যমে প্রদান করে থাকেন। সেই ওসীলা চাই প্রাণহীন নির্জীব হোক। যেমন তুর বৃক্ষের কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর তাজাল্লী প্রকাশ করবেন তো সরাসরি প্রকাশ না করে তুর বৃক্ষের উপর প্রকাশ করলেন। অথচ এ ক্ষেত্রে তুর বৃক্ষের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। এমনিভাবে উস্তাদের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, কিন্তু তিনি তাকে ওসীলা বানিয়েছেন। এটা তাঁর রীতি। দানের বিধান।
উদাহরণত, জানালার দিকে তাকিয়ে দেখুন। জানালা দিয়ে সূর্যের তাপ এবং আলো ঘরে প্রবেশ করছে। জানালা কি তাপ এবং আলো সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে যে, সে তাপ এবং আলোর কারণ হবে? বরং তাপ এবং আলো তো বাহির থেকে আসছে। তবে এতটুকু যে তাপ-আলো ঘরে প্রবেশের জন্য সে ওসীলা বনেছে। উস্তাদের বিষয়টিও এমনই। যদিও তার ব্যক্তিসত্তায় জ্ঞানের আলোর কোনো দখল নেই। তবে আমাদের পর্যন্ত জ্ঞানের আলো পৌঁছার ক্ষেত্রে তার সহযোগিতা আমরা পাই। এ জন্যই উস্তাদ বা শিক্ষকের এই মূল্য।
মোটকথা, আমার কথা হচ্ছে, যদিও কিতাবুল্লাহ এক নম্বর স্থানে এবং হাদীসে নববী দুই নম্বরে। কিন্তু আমলী দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদেরকে প্রথম হাদীসের উপর দিয়ে অতিবাহিত হতে হবে, তবেই আমরা অতি সহজেই কিতাবুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবে। কেননা হাদীস ব্যতীত আমরা কিতাবুল্লাহকে বুঝতে সক্ষম হবো না। এ জন্য ইলমে হাদীস তথা আজকে আমরা যে ইলমের অধ্যয়ন শুরু করছি, তা আমাদের সকল প্রার্থিত ইলমের মূলবস্তু।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00