📄 বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রয়োজন
মোটকথা, এটা সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য যে, কোনো মানুষ শুধু বই-পুস্তক পড়ে কোনো জ্ঞান বা বিদ্যা অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না কোনো মুআল্লিম বা মুরব্বীর নিকট দীক্ষা না নেবে, তার সাহচর্য গ্রহণ না করবে। জগতের সমগ্র জ্ঞান-বিদ্যার ব্যাপারে একই বিধান। যখন পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই বিধান, সেখানে কেউ যদি ধর্মীয় ব্যাপারে এমন ভাবে যে, শুধু কিতাব পড়ে দ্বীন শিখে নেবো, তাহলে স্মরণ রাখুন, গোটা জীবনেও প্রকৃত দ্বীন অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না কোনো উস্তাদ বা মুআল্লিমের নিকট দীক্ষা না নেবে, তাঁর সাহচর্য গ্রহণ না করবে।
📄 শুধু কিতাব কখনও পাঠানো হয়নি
এ রহস্যের কারণেই আল্লাহ তাআলা কখনও শুধু কিতাব পাঠাননি। এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, নবী এসেছেন, কিন্তু কোনো নতুন কিতাব নিয়ে আসেননি। কিন্তু এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে অথচ কোনো নবী আসেননি। এটা কেন? এ জন্য যে, যদি শুধু কিতাব পাঠানো হতো, তাহলে মানুষের মাঝে এমন যোগ্যতা নেই যে, তারা নিজে নিজে শুধু কিতাবের মাধ্যমে সংশোধন হয়ে যাবে। অথচ আল্লাহ তাআলার জন্য শুধু কিতাব প্রেরণ অসম্ভব ছিল না। তা ছাড়া কাফেরদের দাবিও ছিল এটা যে,
لَوْ لَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً * 'আমাদের উপর একসাথে কেন কুরআন অবতীর্ণ করা হলো না।'
আল্লাহ তাআলার জন্য কি এটা অসম্ভব ছিল যে, সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে প্রত্যেক মানুষ তার শিয়রে একটি করে উন্নত বাঁধাইয়ের কুরআন দেখতে পেত এবং আকাশ থেকে বলা হতো যে, এটা আমার প্রেরিত কিতাব। এটাকে আকড়ে ধরো। এটার উপর আমল করো। এ কাজটা কি আল্লাহ তাআলার জন্য কঠিন ছিল? মোটেও কঠিন ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এমনটি করেননি। শুধু কিতাব প্রেরণ করেননি। বরং সাথে মুআল্লিমও প্রেরণ করেছেন। প্রশিক্ষকও প্রেরণ করেছেন।
📄 কিতাব পড়ার জন্য দুটি নূর বা আলো প্রয়োজন
কিতাব পড়ার জন্য দুটি নূর প্রয়োজন। কেননা কিতাব ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝে আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পয়গাম্বরী দীক্ষার নূর সঙ্গী না হবে। আমার সম্মুখে কিতাব উপস্থিত রয়েছে। অত্যন্ত সাহিত্যপূর্ণ এবং প্রাঞ্জল ভাষার কিতাব, কিন্তু আমি অন্ধকারে বসে আছি, আমার নিকট কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। এমতাবস্থায় কি কিতাব থেকে উপকৃত হতে পারব? প্রথমত আমার চোখের আলো থাকতে হবে, দ্বিতীয়ত আমার নিকট সূর্য বা বিদ্যুতের আলো থাকতে হবে। এই দুই আলোর একটি যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে কিতাব দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। যথা বাইরে সূর্যের আলো রয়েছে, কিন্তু আমার চোখের আলো থেকে বঞ্চিত, তাহলে কি আমি কিতাব পড়তে সক্ষম হব? অথবা আমার চোখের আলো রয়েছে, কিন্তু বাইরের আলো নেই। অর্থাৎ সূর্যের আলো, বিদ্যুতের আলো বা কোনো প্রদীপের আলো নেই, তাহলেও কি আমি কিতাব পড়তে পারব? পারব না। কারণ কিতাব পড়ার জন্য দুটি আলো প্রয়োজন। এক. নিজের ভেতরগত আলো, দুই. বাইরের সূর্য বা বিদ্যুতের আলো। এই দুই আলোর সমন্বয় যখন ঘটবে, তখন কিতাব দ্বারা উপকৃত হওয়া যাবে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা দ্বীন প্রচারের জন্য দুটি মাধ্যম প্রেরণ করেছেন। এক. কিতাবুল্লাহ, দুই. রিজালুল্লাহ।
📄 ‘কিতাবই যথেষ্ট’ বলার ধৃষ্টতা
এখান থেকেই সকল ভ্রষ্টতা জন্মলাভ করে। সুতরাং এক ফেরকা বলে বেড়ায় - حَسْبُنَا كِتَابِ اللَّهِ শুধু কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
শ্লোগানটি খুবই আকর্ষণীয় যে, আমাদের জন্য শুধু আল্লাহ তাআলার কিতাবই যথেষ্ট। বাহ্যত খুবই চমৎকার শ্লোগান। কারণ আল্লাহ তাআলার কিতাব تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ প্রত্যেক বিষয়ের বর্ণনাকারী। কিন্তু এই শ্লোগান প্রদানকারীকে জিজ্ঞেস করো যে, মেডিকেল সাইন্সের বইগুলো ঘরে রাখা রয়েছে। যাতে চিকিৎসা এবং অপারেশনের সকল বিধি-বিধান লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উস্তাদ ব্যতীত তা মূল্যহীন। তদ্রুপ আল্লাহর কিতাবের ক্ষেত্রে এমন বলা যে, শুধু কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট, বাস্তব প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আমাদের নেই, আল্লাহ ক্ষমা করুন এটা গোমরাহী এবং ভ্রষ্টতা বৈ কিছু নয়।
মোটকথা, এক দল তো কিতাবকে আঁকড়ে ধরেছে আর রিজালুল্লাহ তথা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পরিত্যাগ করেছে এবং ভ্রষ্টতার গভীরে নিপতিত হয়েছে। মূলত তারা রিজালুল্লাহকে পরিত্যাগ করার দ্বারা প্রকারান্তরে কিতাবুল্লাহকেই পরিত্যাগ করেছে। কেননা স্বয়ং কিতাবেই যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, রিজালুল্লাহকে অনুসরণ করো, আমি তাদেরকে মুআল্লিম বানিয়ে প্রেরণ করেছি। তাদেরকে নবী বানিয়ে প্রেরণ করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি কিতাবুল্লাহকে আঁকড়ে ধরে রিজালুল্লাহকে পরিত্যাগ করে, সে মূলত কিতাবুল্লাহকেই পরিত্যাগ করে। মেডিকেল সাইন্সের বই-পুস্তকে লেখা রয়েছে- 'চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ঔষধ খাবেন না।' এখন যদি কেউ তা ভুলে গিয়ে শুধু মেডিকেল সাইন্সের বই পড়ে নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে শুরু করে, তাহলে ফলাফল এই হবে যে, কালকের পরিবর্তে আজকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। ঠিক একই অবস্থা ঐ সকল লোকদের, যারা 'আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট' বলে শ্লোগান তুলে রিজালুল্লাহর ব্যাপারে লোকদেরকে নিরুৎসাহিত করে।