📄 দুটি মাধ্যম
আল্লাহ তাআলা মানুষের সংশোধন এবং তাদেরকে সৎপথে আনার জন্য একসাথে দুটি মাধ্যম পৃথিবীর বুকে পাঠিয়েছেন।
এক. কিতাবুল্লাহ বা আল্লাহ্প্রদত্ত আসমানী কিতাবসমূহ। অর্থাৎ তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীল এবং সর্বশেষ কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন।
দুই. রিজালুল্লাহ বা আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিগণ। রিজালুল্লাহ দ্বারা উদ্দেশ্য নবী-রাসূলগণ। এই রিজালুল্লাহ বা নবী-রাসূলগণকে কিতাবুল্লাহসহ প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে তাঁরা কিতাবের ব্যাখ্যা করে দেন এবং বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিতাবের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে লোকদের বুঝিয়ে দেন। হযরত আম্বিয়ায়ে কেরামকে পাঠানোর উদ্দেশ্য এটাই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
'এবং আমি আপনার নিকট যিকির অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐ সব বিষয় বর্ণনা করেন, যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে।' (সূরা নাখল: ৪৪)
রিজালুল্লাহকে এজন্য পাঠানো হয়েছে, যেন তারা লোকদেরকে কিতাবের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেন এবং লোকদেরকে তা শিক্ষা দেন। এ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে:
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ *
'আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন।' (সূরা আলে-ইমরান: ১৬৪)
যেকোনো পয়গাম্বর দুনিয়াতে আসার মূল কারণ হচ্ছে কিতাবের তালীম দেওয়া। কেননা মুআল্লিম বা শিক্ষকের পথনির্দেশ ব্যতীত এবং ব্যাখ্যাতার ব্যাখ্যা ব্যতীত কিতাব থেকে উপকৃত হওয়ার যোগ্যতা আমরা রাখি না।
উস্তাদ ব্যতীত শুধু ব্যক্তিগত পড়াশোনা যথেষ্ট নয়। আর এটা শুধু আল্লাহর কিতাবের সাথেই নির্দিষ্ট নয়, দুনিয়ার সকল বিদ্যার্জনের ক্ষেত্রেও একই রীতি প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তি যদি চায়, আমি শুধুই ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনা করে কোনো বিষয়ে পারদর্শী হয়ে যাব, তা কখনও সম্ভব হবে না। যতক্ষণ না কোনো উস্তাদ বা গুরুর সামনে হাঁটুগেড়ে ছাত্র ও শাগরেদ হয়ে না বসবে। উস্তাদ ব্যতীত কোনো বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া সম্ভব নয়।
📄 শুধুই কবরস্থান আবাদ করবে
ইলমে তিব বা মেডিকেল সাইন্স এমন একটি বিদ্যা, যার অসংখ্য বই-পুস্তক বাজারে পাওয়া যায়। উর্দু, আরবী, ফার্সী, ইংরেজী, বাংলা-সকল ভাষায়ই পাওয়া যায়। এখন যদি কোনো ব্যক্তি ঘরে বসে মেডিকেল সাইন্সের বই-পুস্তক পড়তে পড়তে ডাক্তার বনে যেতে চায় এবং সে যথেষ্ট মেধারও অধিকারী হয়, অনেক বিচক্ষণ, গবেষণা শক্তিও তার তীক্ষ্ণ, যোগ্যতাও অনেক, পড়াশোনাও শুরু করে দেয় এবং চিকিৎসা ও অপারেশনের সকল নিয়মকানুনও সে বুঝে ফেলে, একপর্যায়ে সে চিকিৎসা শুরু করে দেয়, তাহলে এমন ব্যক্তির দ্বারা কি হবে বলতে পারেন? একমাত্র কবরস্থান আবাদ করা ছাড়া আর কিছুই হবে না। মেডিকেল সাইন্সের বই-পুস্তক বোঝা সত্ত্বেও কোনো উস্তাদ এবং গুরুর নিকট প্রাক্টিক্যাল শিক্ষাগ্রহণ ব্যতীত সে কখনও ডাক্তার হতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই এমন ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা করার অনুমতি প্রদান করবে না। অনুমতি দেবে না মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার। কারণ সে ঐ পথ অবলম্বন করেনি, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রে আবশ্যক। আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের স্বভাবে এ অবস্থা তৈরি করে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো শিক্ষক তাকে শিক্ষা না দেবে, কোনো উস্তাদ তাকে দীক্ষা না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কোনো জ্ঞানবিদ্যা নিজে নিজে অর্জন করতে পারবে না।
📄 মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মাঝে পার্থক্য
আল্লাহ তাআলা মানুষ এবং জানোয়ারের মাঝে সামান্য পার্থক্য রেখেছেন। তা হলো, জানোয়ারদের জন্য কোনো প্রশিক্ষক বা মুরব্বীর তেমন প্রয়োজন পড়ে না, যেমনটি প্রয়োজন পড়ে মানুষের। উদাহরণস্বরূপ মাছের পোনা পানিতেই মাছের ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে আসে এবং সাথে সাথে সাঁতার কাটতে শুরু করে। পানিতে সাঁতার কাটার ক্ষেত্রে তার জন্য কোনো প্রশিক্ষক বা মুরব্বীর প্রয়োজন পড়েনি। সৃষ্টিগতভাবেই আল্লাহ তাকে এভাবে তৈরি করেছেন যে, এর জন্য তার কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কোনো মানুষ যদি ভাবে, মাছের পোনা প্রশিক্ষণ ব্যতীত পানিতে সাঁতার কাটছে, সুতরাং আমার সন্তানকেও সাঁতার শেখানো ব্যতীত পানিতে ছেড়ে দিই। তাহলে এই ব্যক্তি কি বোকা হিসেবে সাব্যস্ত হবে না? কোথায় মাছের পোনা আর কোথায় মানবসন্তান! মাছের পোনার জন্য আল্লাহ তাআলা প্রশিক্ষণ বা তালীম-তরবিয়াতের প্রয়োজন রাখেননি। কিন্তু মানুষ- যার সাঁতার শেখার জন্য কোনো প্রশিক্ষক বা উস্তাদের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে।
অথবা ধরুন, মুরগির বাচ্চা ডিম থেকে বের হলো এবং বের হয়েই সে খাদ্য খুঁজতে লাগল। তার খাদ্য খাওয়ার জন্য কোনো শিক্ষক বা মুআল্লিমের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু যে শিশুটি আজকে জন্মগ্রহণ করেছে, সে আজকে রুটি খেতে পারবে না। কারণ সে রুটি খাওয়ার ব্যাপারে কোনো উস্তাদ বা মুআল্লিমের মুখাপেক্ষী। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তাকে রুটি খাওয়া না শেখাবে এবং বাস্তব প্রশিক্ষণ না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে খেতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টিগতভাবেই এভাবে তৈরি করেছেন যে, সে প্রশিক্ষক বা মুআল্লিম ব্যতীত কোনো জ্ঞানবিদ্যা অর্জন করতে পারে না।
📄 বই পড়ে আলমারি বানানো
রাজমিস্ত্রির কাজ বই-পুস্তকে লেখা রয়েছে। কীভাবে স্যুকেস বানাতে হয়, কীভাবে আলমারি বানাতে হয়, কীভাবে চেয়ার বানাতে হয় এবং কী কী উপকরণ এসব তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। বই সামনে রেখে যদি কেউ আলমারি বানাতে চায়, তাহলে আলমারি বানাতে পারবে কি? কখনও পারবে না। অপরদিকে একজন কখনও বই পড়েনি, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রির সাহচর্যে সে চার মাস ছিল। কীভাবে সে আলমারি তৈরি করে তা প্রত্যক্ষ করেছে, কীভাবে সে যন্ত্র ব্যবহার করে দেখে নিয়েছে, তাহলে আশা করি সহজেই সে আলমারি বানাতে সক্ষম হবে।