📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 মৌলভীদের রুটি-রুজির চিন্তা বাদ দাও

📄 মৌলভীদের রুটি-রুজির চিন্তা বাদ দাও


আজকে আমাদের সমাজে বারবার এই দাবি উঠছে যে, এ সকল মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হোক। অনেকে অবশ্য বিরোধিতার জন্য নয়, বরং সহানুভূতির খাতিরে এই দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আবার অনেকে নিজের অভিজ্ঞতানুযায়ী এর সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
আবার অনেকে এমন বলে থাকেন যে, মৌলভীদের আয়-উপার্জনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সুতরাং তাদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। সেলাইকাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। কিংবা এমন কোনো কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক, যার দ্বারা সে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারে।

📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 দুনিয়াকে পেছনে ফেলো

📄 দুনিয়াকে পেছনে ফেলো


লোকেরা অনেক সময় বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে আসে, মাদরাসায় কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলে দিন, যাতে তাদের আয়-উপার্জনের একটা ব্যবস্থা হয়।
আমার আব্বাজান রহ. বলতেন, 'এই মৌলভীদের রুটি-রুজির চিন্তা বাদ দাও। তারা তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা নিজেরাই করে নেবে। এমন কোনো মৌলভীদের সন্ধান আমাকে দাও তো, যে অনাহারের কারণে আত্মহত্যা করেছে। অনেক পি.এইচ.ডি এবং মাস্টার্স ডিগ্রিধারী লোকের দৃষ্টান্ত আমি তোমাদের দিতে পারব, যারা আত্মহত্যা করেছে এবং নিজের জীবনের উপর বিতৃষ্ণ হয়ে জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক এমন দৃষ্টান্ত আমার সম্মুখে রয়েছে, যারা ডিগ্রি বহন করে চাকুরির জন্য অফিস আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জুতার তলা ক্ষয় করেছেন, কিন্তু চাকুরি তাদের ভাগ্যে জুটেনি। কিন্তু এমন একজন মৌলভীর সন্ধানও আশা করি কেউ দিতে পারবে না, যিনি দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা করেছেন, কিংবা অমুক মৌলভী বেকারত্বের দুর্বিসহ জীবনযাপন করেছেন। আল্লাহ তাআলা মৌলভীদের জন্য কোনো না কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দেন এবং আলহামদুলিল্লাহ ভালো ব্যবস্থাই করে থাকেন।'
আমার ইলমপিপাসু ভাইয়েরা! খুব ভালো করে বুঝে নাও! এই দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যারা এই দুনিয়ার পেছনে ছুটে, দুনিয়া তাদের থেকে পলায়ন করে। আর যারা দুনিয়াকে পেছনে ফেলে, দুনিয়া তাদের পেছনে আসতে থাকে। কেউ কেউ এই দুনিয়ার উদাহরণ দিয়েছেন ছায়ার সাথে। যদি কেউ ছায়ার পেছনে দৌড়াতে থাকে, তাহলে ছায়া তার আগে ছুটতে থাকবে এবং সে ছায়ার নাগাল কখনও পাবে না। আর যদি কেউ পেছন ফিরে ছুটতে থাকে, তাহলে ছায়া তার পেছনে পেছনে এমনিতেই আসতে থাকবে।
এমনিভাবে মানুষ যত বেশি এই দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে, তত বেশি দুনিয়া তার থেকে দূরে সরে যাবে। আর যত বেশি দুনিয়াকে পেছনে ফেলে দিবে এবং সত্যিকার অর্থে দুনিয়াবিমুখ হবে, তাহলে দুনিয়া তত বেশি অপদস্ত হয়ে তার সম্মুখে ধরা দেবে। দুনিয়াকে আঘাত করলে দুনিয়া তার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়বে।
স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করুন, আল্লাহর যে সকল বান্দা আল্লাহর উপর ভরসা করে তাঁর দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর মহব্বতের খাতিরে দুনিয়াকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে তাদের পদতলে এমনভাবে এনে দিয়েছেন যে, অন্যরা তা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। আল্লাহওয়ালাদের মান-মর্যাদা কেমন, তা তিনি নিজ ব্যবস্থাপনায় খোলাখুলি লোকদেরকে দেখিয়ে দেন। মহান প্রভু আমাদেরকেও ইখলাস দান করুন এবং আমাদেরকে তিনি নিজের বানিয়ে নিন। আমাদের অন্তরেও তিনি এমন স্পৃহা বা জযবা সৃষ্টি করে দিন, যাতে আমরাও স্বীয় দ্বীনের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে পারি। আমীন।
অতঃপর ইনশাআল্লাহ দুনিয়া আখেরাতে আমাদের কোনো চিন্তাই থাকবে না। সুতরাং মৌলভীদের রুটি-রুজির চিন্তা তোমরা বাদ দাও। আল্লাহ তাআলাই তাদের সর্বোত্তম অভিভাবক।
হযরত আব্বাজান রহ. বলতেন, এ বিশ্বের মহান অধিপতি কুকুরকে রিযিক প্রদান করছেন। গাধাকে রিযিক প্রদান করছেন। শূকরকে রিযিক প্রদান করছেন। তিনি কি তাঁর দ্বীনের পতাকাবাহী মৌলভীদেরকে রিযিক প্রদান করবেন না? সুতরাং মৌলভীদের রুটি-রুজির ভাবনা তোমাদের করতে হবে না।

📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 মৌলভীদের লৌহ ব্যবসায়ী আর কাষ্ঠ ব্যবসায়ী বানাবেন না

📄 মৌলভীদের লৌহ ব্যবসায়ী আর কাষ্ঠ ব্যবসায়ী বানাবেন না


দ্বীনের একজন আলেমকে দ্বীনের দাওয়াত মানুষের মাঝে যথাযথভাবে পৌঁছানোর জন্য এবং দুনিয়াব্যাপী তা প্রচার করার জন্য কতিপয় দুনিয়াবী জ্ঞানও শিক্ষা করতে হয়। আর প্রকৃত ফকীহ ঐ ব্যক্তি, যে সামসময়িক অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত। এ নিয়তে সে যা কিছু পড়বে এবং পড়াবে, সবই দ্বীনেরই অংশ। কিন্তু স্মরণ রাখুন, একবার যাকে আপনি লৌহ ব্যবসায়ী আর কাঠ ব্যবসায়ী বানিয়ে দিয়েছেন, সে লৌহ ব্যবসায়ী আর কাঠ ব্যবসায়ীই থেকে যাবে। আমার আব্বাজান রহ. বলতেন, মানতেক বা তর্কশাস্ত্রেও নিয়ম হচ্ছে, ফলাফলা সর্বদা আরজালের তাবে হয়ে থাকে। জনৈক মৌলভী লৌহব্যবসা কিংবা কাঠব্যবসা শিখে নিল এবং ভাবল, সর্বদা এই ব্যবসা করব আর আল্লাহ তাআলা কখনও সুযোগ দিলে বিনা বেতনে দ্বীনের খেদমত করব। এমন মৌলভীরা লৌহব্যবসা আর কাঠব্যবসাই করতে পারবে, দ্বীনের খেদমত তারা করতে পারবে না।

📘 ইলম ও ওলামাদের ফযীলত > 📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা


আমার আব্বাজান রহ. একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সাহুল ওসমানী সাহেব রহ. নামে এক বুযুর্গ দারুল উলূম দেওবন্দের একজন নামিদামি উস্তাদ ছিলেন। তিনি হযরত শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান সাহেব রহ.-এর বিশেষ শাগরেদ ছিলেন। দারুল উলূম দেওবন্দে পড়াতেন। পড়ানোর এক পর্যায়ে তাঁর খেয়াল হলো, আমি তো মাদরাসায় পড়িয়ে বেতন নিচ্ছি। এটা তো পারিশ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। দ্বীনের খেদমত হচ্ছে না। দ্বীনের খেদমত তো হতে হবে বিনা পারিশ্রমিকে। পারিশ্রমিক নিয়ে যে পড়াচ্ছি, জানা নেই এর প্রতিদান আমি পাব কি পাব না। এর বিপরীতে যদি জীবনচালনার জন্য এমন কোনো পন্থা খুঁজে পাই, যার দ্বারা রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়ে যায়, আর অবশিষ্ট সময়ে দ্বীনের কোনো খেদমত বিনা পারিশ্রমিকে করে নেব; যথা কোথাও ওয়াজ করে দিলাম, কোথাও দ্বীনের উপর আলোচনা করলাম কিংবা কোনো ফতোয়া লিখে দিলাম। ইতিমধ্যে সরকারি এক প্রতিষ্ঠান থেকে অফার এলো, আপনি আমাদের এখানে পড়ান। আপনাকে এ পরিমাণ বেতন দেওয়া হবে। (আপনারা ভালো করেই জানেন, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খুব অল্প দায়িত্ব থাকে। সারাদিনে এক-দুইঘণ্টা পড়াতে হয়। আর পড়ানোর ক্ষেত্রেও তেমন বেগ পেতে হয় না। নিজের তেমন পড়াশোনা করতে হয় না। অথচ দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের মৌলভীদের দিনে পাঁচঘণ্টা পড়াতে হয় এবং পাঁচঘণ্টা পড়ানোর জন্য দশঘণ্টা নিজে পড়তে হয়। কলুর বলদের মতো তাদের অবস্থা। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে এমন কলুর বলদ পাওয়া যাবে কোথায়?)
যাহোক, মাওলানা ওসমানী সাহেব ভাবলেন, দ্বীনের খেদমত করার এই তো সুবর্ণ সুযোগ। সেখানে দুইঘণ্টা পড়াবো। অবশিষ্ট সময় বিনা পারিশ্রমিকে দ্বীনের খেদমত করবো। এই জযবা বা স্পৃহা নিয়ে তিনি শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান সাহেব রহ.-এর নিকট গেলেন এবং আরয করলেন, হযরত! আমার ব্যাপারে এই অফার এসেছে এবং এই নিয়তে সেখানে যেতে চাই।
হযরত শাইখুল হিন্দু রহ. বললেন, 'ঠিক আছে ভাই, তোমার দিলে যেহেতু আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তাই গিয়ে দেখ।'
হযরত ভাবলেন, তার মনে যাওয়ার আগ্রহ যেহেতু প্রবল। তাই তাকে বাঁধা দেওয়া উচিত হবে না। এ জন্য তিনি অনুমতি দিয়ে দিলেন এবং ওসমানী সাহেবও চলে গেলেন।
ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। ছয় মাস পর এক ছুটিতে তিনি দেওবন্দ এলে হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. প্রথম সাক্ষাতেই জিজ্ঞেস করলেন, 'মাওলানা সাহুল সাহেব! আপনি তো এই নিয়তে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি নিয়েছিলেন যে, সেখানে পড়ানোর পর অবশিষ্ট সময়ে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দেবেন, বলুন তো দেখি, এই ছয় মাসে কতটুকু লিখেছেন? কয়টি ফতোয়া দিয়েছেন এবং কয়টি ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করেছেন?'
শাইখুল হিন্দ রহ.-এর কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, 'হযরত! এটা ছিল শয়তানী ধোঁকা। কারণ দারুল উলূমে অবস্থান করে যে পরিমাণ দ্বীনের খেদমত করার তাওফীক হয়েছে, সেখানে গিয়ে এর অর্ধেকও সম্ভব হয়নি। অথচ অবসর সময় ছিল দারুল উলূমের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00