📄 বাগদাদে দ্বীনী মাদরাসার সন্ধান
আমার বাগদাদে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বাগদাদ ঐ শহর, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইসলামের মজবুত ভিত স্থায়ী ছিল। খেলাফতে আব্বাসিয়ার শৌর্যবীর্য দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। দেখেছে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির জয়-জয়কার।
আমি সেখানে পৌঁছে একজনের নিকট জানতে চাইলাম, 'এখানে কোনো মাদরাসা আছে কি? ইলমে দ্বীনের কোনো মারকায বা কেন্দ্র আছে যেখানে দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়? আমি সেখানে যেতে চাই।'
আমাকে জানানো হলো, এখানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম-নিশানা নেই। এখানকার সকল মাদরাসা স্কুল-কলেজ দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন ধর্মীয় শিক্ষার জন্য রয়েছে ইউনিভার্সিটির বিশেষ বিভাগ। সেখানে দ্বীনীয়াত শিক্ষা দেওয়া হয়। ইউনিভার্সিটিতে দ্বীনীয়াতের শিক্ষকদের দেখে এটা নির্ধারণ করা মুশকিল যে, তিনি আলেম কি না। উপরন্তু মুসলমান কি না তা-ই বোঝা দায়।
সেখানে সহশিক্ষার রীতি প্রচলিত। নারী-পুরুষ একসাথে শিক্ষা নিচ্ছে। ইসলাম সেখানে নেহাত একটি দর্শন হিসেবে টিকে আছে। যাকে ঐতিহাসিক দর্শনের ন্যায় পড়ানো হয়। জীবন চলার পথে এর প্রতিক্রিয়া বা ভূমিকা নেই। যেভাবে পাশ্চাত্যবাসী ইসলামকে পড়ে থাকে। আজকে আমেরিকায়, কানাডায় এবং ইউরোপের ইউনিভার্সিটিগুলোতে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সেখানেও হাদীস, ফিকহ ও তাফসীর শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের সিলেবাস দেখলে এমন এমন কিতাবের নাম আপনার চোখে পড়বে, যার সম্পর্কে খবরই নেই আমাদের সাদাসিধে মৌলভীদের। বাহ্যত অত্যন্ত গবেষণার সাথে কাজ চলছে। কিন্তু এটা দ্বীনের কেমন শিক্ষা, যা মানুষকে ঈমানের দৌলত প্রদান করতে সক্ষম হয়নি! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞানের সমুদ্রে সাঁতার কাটার পরও বিফল হয়ে ফিরছে তারা। যার একটি ফোঁটাও তাদের গলা আর্দ্র করতে সক্ষম হয়নি। পাশ্চাত্যের এ সকল শিক্ষালয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় বিভাগও রয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব তাদের ব্যক্তিগত জীবনে পড়ে না। কারণ সেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের রূহকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
অতঃপর আমি বললাম, 'যদি কোনো দ্বীনী মাদরাসা না-ই থাকে, তাহলে অন্তত পুরোনো তরীকার কোনো আলেম থাকলে আমাকে তার সন্ধান দাও, আমি তার সাথে সাক্ষাত করব।'
তখন সে বলল, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ.-এর মাজারের নিকট একটি মসজিদে মক্তব রয়েছে। সেই মক্তবে পুরোনো যুগের একজন আলেম থাকেন। তিনি পুরোনো তরীকায় পড়িয়ে থাকেন।
আমি সন্ধান করতে করতে তার নিকট পৌঁছে গেলাম। দেখে বুঝতে পারলাম, বাস্তবেই তিনি পুরোনো দিনের বুযুর্গ। অনুভব করলাম, কোনো আল্লাহওয়ালা মুত্তাকী ব্যক্তির সাক্ষাত পেয়েছি। তিনিও চাটাইয়ের উপর বসে পড়েছেন। অল্পস্বল্প খেয়ে, মোটা কাপড় পড়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাঁর চেহারায় আল্লাহর ফযলে ইলমে শরীয়তের নূর প্রত্যক্ষ করলাম। তাঁর দরবারে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মনে হলো যেন আমি বেহেশতী পরিবেশে পৌঁছে গেছি।
📄 মাদরাসার ক্ষতি কখনও মেনে নেবে না
সালাম কালামের পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কোত্থেকে এসেছেন?'
বললাম, 'আমি পাকিস্তান থেকে এসেছি।'
অতঃপর তিনি দারুল উলূম সম্পর্কে কতিপয় প্রশ্ন করলেন, 'আপনি যে পড়েছেন এবং পড়াচ্ছেন, সেটা কেমন মাদরাসা?'
আমি তাঁকে বিস্তারিত বললাম। জিজ্ঞেস করলেন, 'সেখানে কী পড়ানো হয়? কোন ধরনের কিতাবাদি পড়ানো হয়?'
আমি সে সকল কিতাবের নাম বললাম, যেগুলো আমাদের এখানে পড়ানো হয়। সাথে সাথে তার মুখ থেকে এক চিৎকার বেরিয়ে এলো এবং তিনি কেঁদে ফেললেন। চোখ দিয়ে তার অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো। বললেন, 'এখন পর্যন্ত তোমাদের ওখানে এসব কিতাব পড়ানো হয়?'
আমি বললাম, 'জি আলহামদুলিল্লাহ পড়ানো হয়।'
বললেন, 'এখন তো আমি এ সকল কিতাবের নাম শোনা থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত হয়ে গেছি। তাই কিতাবের নাম শুনে আমার কান্না এসে গেছে। এই কিতাবগুলো আল্লাহওয়ালা তৈরি করত। সঠিক মুসলমান জন্ম দিত। আমাদের দেশ থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমি আপনাকে নসীহত করছি। আমার এই পয়গাম আপনি আপনার দেশের সকল আহলে ইলম এবং জনসাধারণের নিকট পৌঁছে দেবেন যে, আল্লাহর জন্য তারা সকল কিছু বরদাশত করে নেবে, কিন্তু এ সকল মাদরাসার ধ্বংস যেন তারা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত না করে। কারণ, ইসলামের দুশমনরা এ কথা খুব ভালো করেই জানে, যতদিন পর্যন্ত এই সাদাসিধে মৌলভীর দল সমাজের বুকে জীবিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মানুষের মন থেকে ঈমানকে বিদূরীত করা যাবে না। এজন্যই ইসলামের শত্রুরা এ সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার পেছনে সর্বশক্তি ব্যয় করছে।'
📄 ধর্মীয় মর্যাদাবোধ ধ্বংসের একটিই উপায়
প্রাচ্যের কবি ইকবাল মরহুমের ব্যাপারে একথা প্রসিদ্ধ রয়েছে, তিনি মোল্লা-মৌলভীদের উপর একটু ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও কখনও এমন উক্তিও করেছেন, যা মানুষের একেবারে মর্মমূল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এক জায়গায় তিনি ইংরেজ এবং ইসলামের শত্রুদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আফগানদের সম্পর্কে এক কবিতা বলেছেন,
افغانیوں کی غیرت دین کا ہے یہ علاج ملاکو ان کے کوہ و دمن سے نکال دو
'আফগানীদের ধর্মীয় মর্যাদাবোধ যদি নিঃশেষ করতে চাও এবং তাদেরকে ধ্বংস করতে চাও, তাহলে তার একমাত্র পথ হচ্ছে মোল্লাদেরকে এই সমাজ থেকে বের করে দাও। যতক্ষণ পর্যন্ত মোল্লারা এই সমাজে অবস্থান করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মন থেকে ধর্মীয় মর্যাদাবোধ ধ্বংস করা যাবে না।'
📄 মাদরাসার উপর অভিযোগ
মোটকথা, মাদরাসার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। এরা চৌদ্দশো বছরের পুরোনো লোক। এরা পশ্চাদপদ। দুনিয়ার পরিস্থিতির কোনো খবর এদের নিকট নেই। দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকার কোনো যোগ্যতাই এরা রাখে না। দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। এরা মুসলিম জাতিকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ব্যাপৃত। এ ধরনের শ্লোগান প্রায় সময়ই বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যায়। আর এখন বিশেষ করে পূর্ণোদ্যমে এই প্রোপাগান্ডা আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে।
এ ধরনের শ্লোগানও শোনা যাচ্ছে যে, দ্বীনী মাদরাসাসমূহ সন্ত্রাস পালনের কেন্দ্র। এরা উন্নতি প্রগতির প্রতিবন্ধক। সন্ত্রাসের দোষে এরা দোষী। মৌলবাদের অপরাধে এরা অপরাধী। পশ্চাদপ্রিয়তার অপরাধেও এরা অপরাধী। সংকীর্ণতার অপরাধে এরা অপরাধী। সমগ্র দুনিয়াব্যাপী তিরস্কারের বন্যা এসব মৌলভীদের উপর। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও এই মৌলভীরা তাদের কার্যক্রমে অত্যন্ত মজবুত।