📄 মৌলভীদের সকল কাজে অভিযোগ
আমার আব্বাজান মাঝে মাঝে রসিকতা করে বলতেন, 'মৌলভীরা হচ্ছে তিরস্কৃত দল।'
অর্থাৎ কখনও কোথাও অঘটন ঘটে গেলে লোকেরা তাকে মৌলভীদের দিকে সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করে। মৌলভীরা যেকোনো কাজ করলে তাতে একটা অভিযোগ অবশ্যই খুঁজে বের করে।
মৌলভীরা যদি নীরবে নির্জনে বসে আল্লাহ আল্লাহ করে, কুরআন-হাদীসের শিক্ষা দিতে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, এই মৌলভীদের দুনিয়ার কোনো খবর নেই। দুনিয়ায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই।
মৌলভী বেচারা যদি কোনো বিশেষ কাজে বা সম্মিলিত কোনো প্রোগ্রামে বাইরে বের হয়ে আসে, তাহলে অভিযোগ হলো, মৌলভী সাহেবদের কাজ হলো- মাদরাসা মসজিদ নিয়ে থাকা, আল্লাহ আল্লাহ করা, তারা আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নাক গলাতে আসে কেন?
মৌলভী বেচারা যদি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না থাকে, বরং অসচ্ছলতা এবং দারিদ্রতার শিকার হয়, তাহলে লোকেরা অভিযোগ করে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়-উপার্জনের কোনো পদ্ধতি শিক্ষা দেয় না। মাদরাসা থেকে বের হয়ে তারা কোথায় যাবে? কোত্থেকে রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা করবে?
আর যদি মৌলভী বেচারা একটু অধিক অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যায়, তাহলে লোকেরা অভিযোগ তুলে, দেখলে মিয়া! মৌলভী সাহেবের অবস্থা? তিনি লাখপতি কোটিপতি বনে গেছেন। এত অর্থ কোথায় পেলেন তিনি?
সুতরাং মৌলভী বেচারাদের কোনো অবস্থাতেই শান্তি নেই। তাই তারা যেন তিরস্কৃত একটি দল।
📄 এই দল ইসলাম রক্ষার ঢাল
একটি দল তো নিয়মতান্ত্রিকভাবে গুরুত্বের সাথে প্রোপাগান্ডা করে আহলে ইলম মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়িয়ে যাচ্ছে। খুব ভালো করে বুঝে নিন, এটা ইসলামের সাথে শত্রুতা। কারণ ইসলামের শত্রুরা এই বাস্তবতা সম্পর্কে খুব ভালো করেই অবগত যে, এ মাটির বুকে যে জামাত আলহামদুলিল্লাহ ইসলামের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, তারা হচ্ছে এই চাটাইয়ের উপর বসবাসকারী দল। ইসলামের দুশমনরা একথা খুব ভালো করেই জানে, যতদিন পর্যন্ত জমিনের বুকে এই মৌলভীর দল জীবিত থাকবে, ততদিন এ জমিন থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। আর এটা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত, যেখানে এই মৌলভীর দল ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে ইসলামের বাস্তব রূপ বিকৃত হয়ে গেছে এবং ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত সেখানে খুব সহজেই বাস্তবায়িত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাকে পৃথিবীর অনেক দেশ দেখার তাওফীক দান করেছেন। মুসলিম বিশ্বের এমন এমন স্থানে গিয়েছি, যেখানে এ সকল দ্বীনী মাদরাসার বীজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার ফলাফল খোলাচোখে এমন মনে হয়, রাখালকে হত্যা করে দেওয়ার পর পশুপালের যেমন অবস্থা হয়। অর্থাৎ রাখালকে হত্যা করার পর পশুপালকে হিংস্র প্রাণী থেকে রক্ষা করার মতো যেমন কেউ থাকে না, ফলে যেকোনো মুহূর্তে চিতাবাঘ কিংবা হিংস্র প্রাণী এসে তাদেরকে ছিঁড়েফেড়ে খেয়ে চলে যায়- আজকে অনেক মুসলিম দেশে ধর্মীয় দিক থেকে সাধারণ মুসলমানদের অবস্থা ঠিক অনুরূপ।
📄 বাগদাদে দ্বীনী মাদরাসার সন্ধান
আমার বাগদাদে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বাগদাদ ঐ শহর, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইসলামের মজবুত ভিত স্থায়ী ছিল। খেলাফতে আব্বাসিয়ার শৌর্যবীর্য দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। দেখেছে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির জয়-জয়কার।
আমি সেখানে পৌঁছে একজনের নিকট জানতে চাইলাম, 'এখানে কোনো মাদরাসা আছে কি? ইলমে দ্বীনের কোনো মারকায বা কেন্দ্র আছে যেখানে দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়? আমি সেখানে যেতে চাই।'
আমাকে জানানো হলো, এখানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম-নিশানা নেই। এখানকার সকল মাদরাসা স্কুল-কলেজ দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন ধর্মীয় শিক্ষার জন্য রয়েছে ইউনিভার্সিটির বিশেষ বিভাগ। সেখানে দ্বীনীয়াত শিক্ষা দেওয়া হয়। ইউনিভার্সিটিতে দ্বীনীয়াতের শিক্ষকদের দেখে এটা নির্ধারণ করা মুশকিল যে, তিনি আলেম কি না। উপরন্তু মুসলমান কি না তা-ই বোঝা দায়।
সেখানে সহশিক্ষার রীতি প্রচলিত। নারী-পুরুষ একসাথে শিক্ষা নিচ্ছে। ইসলাম সেখানে নেহাত একটি দর্শন হিসেবে টিকে আছে। যাকে ঐতিহাসিক দর্শনের ন্যায় পড়ানো হয়। জীবন চলার পথে এর প্রতিক্রিয়া বা ভূমিকা নেই। যেভাবে পাশ্চাত্যবাসী ইসলামকে পড়ে থাকে। আজকে আমেরিকায়, কানাডায় এবং ইউরোপের ইউনিভার্সিটিগুলোতে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সেখানেও হাদীস, ফিকহ ও তাফসীর শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের সিলেবাস দেখলে এমন এমন কিতাবের নাম আপনার চোখে পড়বে, যার সম্পর্কে খবরই নেই আমাদের সাদাসিধে মৌলভীদের। বাহ্যত অত্যন্ত গবেষণার সাথে কাজ চলছে। কিন্তু এটা দ্বীনের কেমন শিক্ষা, যা মানুষকে ঈমানের দৌলত প্রদান করতে সক্ষম হয়নি! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞানের সমুদ্রে সাঁতার কাটার পরও বিফল হয়ে ফিরছে তারা। যার একটি ফোঁটাও তাদের গলা আর্দ্র করতে সক্ষম হয়নি। পাশ্চাত্যের এ সকল শিক্ষালয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় বিভাগও রয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব তাদের ব্যক্তিগত জীবনে পড়ে না। কারণ সেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের রূহকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
অতঃপর আমি বললাম, 'যদি কোনো দ্বীনী মাদরাসা না-ই থাকে, তাহলে অন্তত পুরোনো তরীকার কোনো আলেম থাকলে আমাকে তার সন্ধান দাও, আমি তার সাথে সাক্ষাত করব।'
তখন সে বলল, হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহ.-এর মাজারের নিকট একটি মসজিদে মক্তব রয়েছে। সেই মক্তবে পুরোনো যুগের একজন আলেম থাকেন। তিনি পুরোনো তরীকায় পড়িয়ে থাকেন।
আমি সন্ধান করতে করতে তার নিকট পৌঁছে গেলাম। দেখে বুঝতে পারলাম, বাস্তবেই তিনি পুরোনো দিনের বুযুর্গ। অনুভব করলাম, কোনো আল্লাহওয়ালা মুত্তাকী ব্যক্তির সাক্ষাত পেয়েছি। তিনিও চাটাইয়ের উপর বসে পড়েছেন। অল্পস্বল্প খেয়ে, মোটা কাপড় পড়ে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাঁর চেহারায় আল্লাহর ফযলে ইলমে শরীয়তের নূর প্রত্যক্ষ করলাম। তাঁর দরবারে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মনে হলো যেন আমি বেহেশতী পরিবেশে পৌঁছে গেছি।
📄 মাদরাসার ক্ষতি কখনও মেনে নেবে না
সালাম কালামের পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কোত্থেকে এসেছেন?'
বললাম, 'আমি পাকিস্তান থেকে এসেছি।'
অতঃপর তিনি দারুল উলূম সম্পর্কে কতিপয় প্রশ্ন করলেন, 'আপনি যে পড়েছেন এবং পড়াচ্ছেন, সেটা কেমন মাদরাসা?'
আমি তাঁকে বিস্তারিত বললাম। জিজ্ঞেস করলেন, 'সেখানে কী পড়ানো হয়? কোন ধরনের কিতাবাদি পড়ানো হয়?'
আমি সে সকল কিতাবের নাম বললাম, যেগুলো আমাদের এখানে পড়ানো হয়। সাথে সাথে তার মুখ থেকে এক চিৎকার বেরিয়ে এলো এবং তিনি কেঁদে ফেললেন। চোখ দিয়ে তার অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো। বললেন, 'এখন পর্যন্ত তোমাদের ওখানে এসব কিতাব পড়ানো হয়?'
আমি বললাম, 'জি আলহামদুলিল্লাহ পড়ানো হয়।'
বললেন, 'এখন তো আমি এ সকল কিতাবের নাম শোনা থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত হয়ে গেছি। তাই কিতাবের নাম শুনে আমার কান্না এসে গেছে। এই কিতাবগুলো আল্লাহওয়ালা তৈরি করত। সঠিক মুসলমান জন্ম দিত। আমাদের দেশ থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমি আপনাকে নসীহত করছি। আমার এই পয়গাম আপনি আপনার দেশের সকল আহলে ইলম এবং জনসাধারণের নিকট পৌঁছে দেবেন যে, আল্লাহর জন্য তারা সকল কিছু বরদাশত করে নেবে, কিন্তু এ সকল মাদরাসার ধ্বংস যেন তারা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত না করে। কারণ, ইসলামের দুশমনরা এ কথা খুব ভালো করেই জানে, যতদিন পর্যন্ত এই সাদাসিধে মৌলভীর দল সমাজের বুকে জীবিত থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মানুষের মন থেকে ঈমানকে বিদূরীত করা যাবে না। এজন্যই ইসলামের শত্রুরা এ সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার পেছনে সর্বশক্তি ব্যয় করছে।'