📄 কবিরা গুনাহ
যে গুনাহই হোক, তাকে ছোট মনে না করা। সগিরা গুনাহও যদি নিয়মিত বার বার করা হয়, তাহলে তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়ে যায়। আর যদি কবিরা গুনাহের জন্য খাঁটি তাওবা করা হয়, তাহলে সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। সাধারণ নেক কাজের দ্বারাও সগিরা গুনাহ মাফ হয়ে থাকে। এজন্য কবিরা গুনাহের ব্যাপারে অধিক ফিকির করা উচিত। যেন তা থেকে বেঁচে থাকা যায়। আর যদি হয়েই যায়, তাহলে তা থেকে খাঁটি তাওবা করা উচিত।
কবিরা গুনাহের সংখ্যা কত এবং তা কী কী? এ ব্যাপারে অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। আবু তালেব মক্কী রাহি. তার কুওয়্যাতুল কুলুব গ্রন্থে এ সম্পর্কে সকল হাদিসসমূহ ও সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমদের বিভিন্ন অভিমত একত্রিত করেছেন। আর তার ফলাফল হল কবিরা গুনাহের প্রকৃত সংখ্যা হল সতেরো। যথা-
১. কুফর।
২. সগিরা গুনাহ নিয়মিত ও বার বার করা। অর্থাৎ কখনোই না ছাড়ার ইচ্ছা পোষণ করা এবং সর্বদা তাতে লেগে থাকা।
৩. আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে নিরাশ হওয়া।
৪. আল্লাহ তা'আলার ভয় থেকে উদাসীন হয়ে যাওয়া এবং নিজেই নিজের উপর এটা মেনে নেওয়া যে, আমার কিছুই হবে না। আমি তো ক্ষমাপ্রাপ্ত। এ চারটি কবিরা গুনাহ হল অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত।
৫. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। এমন সাক্ষ্য যার সাথে কারও হক নষ্ট হয়।
৬. কারও উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া। যার দ্বারা তার উপর শরয়ী দণ্ডবিধি কার্যকর হয়ে যায়।
৭. মিথ্যা কসম করা। যা কাউকে তার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে দেয়।
৮. জাদু-টোনা ইত্যাদি। এটাও কিছু বাক্যই হয়ে থাকে। যা জবান দিয়ে আদায় করা হয়। এ চারটি কবিরা গুনাহ হল জবানের সাথে সম্পৃক্ত।
৯. মাদক সেবন করা। অথবা এমন কোন বস্তু যা নেশা, মদ্যপ ও জ্ঞান শূন্যতার কারণ হয়।
১০. এতিমের সম্পদ গ্রাস করা।
১১. সুদ খাওয়া।
১২. যিনা-ব্যভিচার।
১৩. সমকামিতা। এই দুটি কবিরা গুনাহ লজ্জাস্থানের সাথে সম্পৃক্ত।
১৪. কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা।
১৫. চুরি করা। যার দ্বারা শরয়ী দণ্ডবিধি অত্যাবশ্যক হয়। এই দুটি কবিরা গুনাহ হাতের সাথে সম্পৃক্ত।
১৬. কাফিরদের সাথে যুদ্ধের সময় রণাঙ্গন থেকে পলায়ন করা। এই কবিরা গুনাহটি পায়ের সাথে সম্পৃক্ত। আর এটা তখন, যখন কাফিরদের সংখ্যা দ্বিগুণ বা তার কম হবে।
১৭. মাতা-পিতাকে কষ্ট দেওয়া। আর এই কবিরা গুনাহটি শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত। [১২১]
এই তালিকার একেকটি গুনাহকে পাঠ করুন এবং সাথে সাথে খাঁটি তাওবা করুন এবং এই গুনাহসমূহের ঘৃণা অন্তরে বদ্ধমূল করে নিন এবং এগুলো থেকে দূরে থাকার ইচ্ছাকে সুদৃঢ় করুন।
টিকাঃ
[১২১] কিমিয়ায়ে সা'আদাত
📄 সগিরা কখন কবিরা গুনাহে পরিণত হয়ে যায়
এমন কিছু কারণ রয়েছে, যে কারণগুলো সগিরা গুনাহকে কবিরা গুনাহে পরিণত করে দেয় এবং তখন তার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায়। আর এমন কারণ হল ছয়টি। যথা-
১. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার প্রথম কারণ- সগিরা গুনাহ এমনভাবে বার বার করতে থাকা যে, তা ছাড়ার খেয়ালই আসে না। বরং তা নিজের অভ্যাস বনে যাওয়া। এটা অনেক ভয়াবহ ব্যাপার। বিন্দু বিন্দু পানিও যদি একাধারে কোন পাথরের উপর পড়তে থাকে, তাহলে পাথরেও ছিদ্র হয়ে যায়। সুতরাং যে ব্যক্তি সগিরা গুনাহে লিপ্ত, তার ক্ষতিপূরণের জন্য সর্বদা ইস্তিগফার করা উচিত। অন্তরে লজ্জা, পেরেশানি ও অনুতপ্ত হওয়া উচিত এবং মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করা যে, ভবিষ্যতে আর এর ধারেকাছেও যাব না।
২. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ- মানুষ গুনাহকে একেবারে সাধারণ বস্তু মনে করে তাকে একদমই গুরুত্ব না দেওয়া এবং তাকে খুব হালকাভাবে দেখা। অর্থাৎ অন্তর থেকে গুনাহের অনুভূতি চলে যাওয়া। হাদিস শরিফে এসেছে- একজন মুসলমানের নিকট গুনাহ একটি পাহাড়ের চেয়ে কম নয়। সর্বদা সে এই ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে যে, কোথায় এই পাহাড় তার মাথার উপর আবার ভেঙ্গে না পড়ে। আর অপর দিকে মুনাফিকের নিকট গুনাহ হল একটি মাছির চেয়ে বেশী কিছু নয়। যা নাকের ডগায় এসে বসে এবং উড়ে যায়। মূলত যে মানুষের অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় আছে এবং তার ইমান নিরাপদ, সে তো প্রতিটি গুনাহকেই ভয়াবহ মনে করে থাকে। কারণ তাতো তার মালিকের নাফরমানি বা অবাধ্যতা।
৩. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার তৃতীয় কারণ- মানুষ গুনাহ করে আনন্দ অনুভব করা এবং গুনাহ করাকে একটি বিশাল কিছু ও বিজয় মনে করা। এমন লোকেরা অধিকাংশই খুব গর্ব করে এমনভাবে বলতে শোনা যায়, যেমন: অমুককে আমি এমন ধোঁকা দিয়েছি যে খুব মজা পেয়েছি। অথবা অমুককে আমি খুব লজ্জা দিয়েছি ইত্যাদি।
৪. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার চতুর্থ কারণ-কেউ যদি সগিরা করে আর আল্লাহ তা'আলা তা গোপন রেখেছেন। আর ঐ অবস্থায় সে ধোকা খায় এবং এটা মনে করে যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে গুনাহের অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। তাই সে গুনাহে লিপ্ত থাকে এবং তাওবা করে না। আর এভাবেই নিজের ধ্বংসের পাথেয় পূর্ণ করে।
৫. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার পঞ্চম কারণ-আল্লাহ তা'আলা যদি কারও গুনাহ গোপন রাখেন, তখন সে শুকরিয়া আদায়ের পরিবর্তে নিজ হাতে উক্ত গোপনীয়তাকে নষ্ট করে এবং নিজের গুনাহকে এমনভাবে মানুষের নিকট প্রকাশ করে যে, মানুষও উক্ত গুনাহের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অন্য লোকদের গুনাহের পরিণতিও তার নিজের উপর বর্তাবে। এজন্য পূর্ববর্তী বুজুর্গানে দীন বলেছেন যে, এরচেয়ে বড় গজব আর কি ধেয়ে আসতে পারে যে, একজন মুসলমানের দৃষ্টিতে গুনাহকে সহজ এবং কাঙ্ক্ষিত বানিয়ে দেয়।
৬. সগিরা গুনাহ কবিরা গুনাহে পরিণত হওয়ার ষষ্ঠ কারণ-কোন ব্যক্তি আলেমে দীন ও অনুসরণীয় ব্যক্তি হয়েও গুনাহে লিপ্ত থাকা এবং তা দেখে অন্যান্য লোকেরাও বিনা বাক্যে উক্ত গুনাহ করতে থাকে আর বলতে থাকে যে, এটা যদি ভুলই হবে, তাহলে অমুক আলেম ও অনুসরণীয় ব্যক্তি কেন এটাতে লিপ্ত? যেমন: কোন আলেম রেশমি পোশাক পরিধান করে কিংবা দরবারে কুর্নিশ করে বাদশাহের নিকট উপস্থিত হয় এবং এর দ্বারা সে ধন-সম্পদ অর্জন করে অথবা সম্পদ ও পদমর্যাদার লোভ করে এবং তার উপর গর্বও করে। অথবা তর্কে- বিতর্কে অনর্থক কথাবার্তা বলে কিংবা নিজের সঙ্গি-সাথীদেরকে হাসি-ঠাট্টা ও গালি-গালাজের লক্ষ্য-বস্তু বানায় ইত্যাদি। তখন তার ছাত্ররাও তা-ই শিখে যায় এবং তারাও যখন উস্তাদ হয়, তখন তাদের ছাত্রদেরকেও এ পদ্ধতিতেই চালায়। আর এভাবে এই মন্দ সিলসিলা চালু ও জারি থাকে এবং তাদের মধ্যে প্রত্যেকেই একেকটি এলাকা বিরান এবং ধ্বংস করার কারণ হয়ে থাকে। সুতরাং এ কারণেই উলামায়ে কেরামের জন্য গুনাহের ধ্বংস এবং ভয়াবহতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাদের একটি গুনাহ অন্যদের হাজার গুনাহের সমতুল্য হয়ে থাকে। ঠিক এমনিভাবে তাদের ইবাদাতের সাওয়াবও অনেক বেশি হয়ে থাকে এবং তাদের একটি ইবাদাত অন্যদের হাজার ইবাদাতের চেয়েও অনেক বেশি প্রতিদান দেওয়া হয়। কেননা যে সকল লোক তাদের অনুসরণ করে থাকে, তাদের ইবাদাতের মধ্যেও উক্ত আলেমের সাওয়াব অর্জন হয়। [১২২]
টিকাঃ
[১২২] প্রাগুক্ত
📄 শুধুমাত্র মৌখিক ইস্তিগফারও উপকার থেকে শূন্য নয়
ঐ ইস্তিগফার যা শুধুমাত্র মৌখিকভাবে পাঠ করেছে এবং অন্তরে উদাসীন ছিল। তা বিশেষ কোন উপকারী নয়। ঐ ইস্তিগফার হল সবচেয়ে উপকারী, যাতে মুখের সাথে সাথে অন্তর ও শরিক থাকে। অন্তর শরিক থাকার অর্থ হল-ইস্তিগফার করার সময় অন্তরে ভয় থাকা। ক্ষমা ও মাগফিরাতের কামনা থাকা এবং অন্তর লজ্জিত, পেরেশান ও অনুতপ্ত হওয়া। তবে মনে রাখবেন যে, শুধুমাত্র মৌখিক ইস্তিগফারও উপকার থেকে একেবারে শূন্য নয়। কেননা এর দ্বারা আর কিছু না হোক, অন্তত জবান অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তা থেকে তো নিরাপদ রইল। আর অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তা থেকে উত্তম হল চুপ থাকা। আর তা থেকেও উত্তম হল ঐ উত্তম ও বরকতময় অভ্যাস যে, যখন পাঠ করা হবে, তখন জবান অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তা বলার চেয়ে ইস্তিগফার পড়ার প্রতি অধিক ধাবিত হয়ে যায়। আর এটাও আশা করা যায় যে, মৌখিক ইস্তিগফার পড়তে পড়তে অবশেষে একদিন অন্তরও কোন এক সময় শরিক হয়ে যাবে এবং কাজ হয়ে যাবে।
আবু উসমান মাগরিবী রাহি. এর এক মুরিদ তাকে বলল, এমন সময়ও আমার আসে, যখন আমার জবানে আল্লাহ তা'আলার জিকির জারি হয় কিন্তু তখন আমি থাকি অমনোযোগী। অর্থাৎ জিকির হয় শুধুমাত্র মৌখিক। আমার অন্তর থাকে অন্যত্র। তিনি বললেন- শুকরিয়া আদায় কর যে, তোমার কোন অঙ্গকে (জবান) খিদমতের নির্দেশ তো দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অন্তত তোমার জবানকে তো আল্লাহ তা'আলার ভাল কাজে লাগিয়েছেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে। আর তা হল- কোন ব্যক্তি যখন শুধুমাত্র মৌখিকভাবে জিকির ও ইস্তিগফার করে এবং তার অন্তর হাজির থাকে না, তখন شয়তান তার উপর অনেক কঠিন আক্রমণ করে এবং বলে যে, হে বান্দা! জবানটা বন্ধই করে ফেল। তোমার অন্তরই যেহেতু অনুপস্থিত, তাহলে মৌখিক জমা-খরচ শুধুমাত্র নির্লজ্জতা ও অনেক বড় বেআদবী। শয়তানের এই আক্রমণ ও ধোঁকার জবাবদানকারী ব্যক্তি তিন প্রকার হয়ে থাকে। যথা-
ক. সাবেক: এরা হল ঐ লোক, যারা শয়তানের এই কুমন্ত্রণার জবাবে বলে- হ্যাঁ! তোর কথা ঠিক আছে। শুধুমাত্র মৌখিক জমা-খরচের কি ফায়দা! তাই এই নে আমি এখন জোরপূর্বক আমার অন্তরকে হাজির করে নিচ্ছি। এ লোকেরা শয়তানকে আঘাত করে এবং তার কাটা গায়ে লবণ ছিটায়।
খ. জালেম: এরা হল ঐ লোক, যারা শয়তানের কথায় এসে যায় এবং বলে যে, তুমি একদমই ঠিক বলেছ। বাস্তবেই অন্তরের মনযোগ ব্যতীত জবান নাড়ানো পুরাই বেকার। তারপর বাস্তবেই জিকির ও ইস্তিগফার ছেড়ে দেয় এবং মনে করে যে, তারা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। বস্তুত এসব লোক শয়তানের অনুসরণ করছে।
গ. মুকতাসিদ: এরা হল ঐ লোক, যারা শয়তানের এই কুমন্ত্রণার জবাবে বলে-এটা ঠিক যে, আমার অন্তর হাজির না। কিন্তু আমি জবানকে আল্লার জিকির থেকে কেন বাধা দেব? অন্তত চুপ থাকার চেয়ে তো জিকির করা উত্তম। কেননা নিঃসন্দেহে চৌকিদারীর পেশা বাদশাহীর পেশার চেয়ে নিম্ন মানের। কিন্তু বেকার থাকার চেয়ে তো উত্তম। এখন যদি কোন চৌকিদার বাদশাহ হতে না পারে। তার জন্য এটা কি করে মুনাসিব হয় যে, চৌকিদারী ছেড়ে বেকার হয়ে যাবে? [১২৩]
টিকাঃ
[১২৩] প্রাগুক্ত
📄 ইস্তিগফারের দ্বারা কবিরা গুনাহ মাফ
“নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আযাদকৃত গোলাম হজরত যায়েদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এই দু'আটি পাঠ করবে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও সে যুদ্ধ থেকে পলায়নকারী হোক। (যা কবিরা গুনাহ) দু'আটি হল-
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
অর্থ: আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি ঐ আল্লাহ তা'আলার নিকট, যাকে ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব। গোটা জগতের ব্যবস্থাপক। আর তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করছি।[১২৪]
টিকাঃ
[১২৪] সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ১৫১৭; সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৩৯৭; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১১০৭৪