📄 গুনাহের দুনিয়াবী ক্ষতিসমূহ
গুনাহ বলা হয় আল্লাহ তা'আলার নাফরমানী তথা অবাধ্যতাকে। গুনাহ থেকে তাওবা ও ইস্তিগফার করতে বিলম্ব করা উচিত নয়। গুনাহের আসল আজাব তো মৃত্যুর পরে তবে গুনাহের কুপ্রভাব দুনিয়াতেও প্রকাশ হয়ে যায়। ইমাম গাজালী রাহি. লিখেন-
অধিকাংশই এমন হয় যে, ব্যক্তির উপর দুনিয়াতেই গুনাহের কুপ্রভাব শুরু হয়ে যায়। এমনকি কোন কোন সময় গুনাহের প্রভাবে রিজিক পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। কখনো গুনাহের কারণে মানুষের অন্তর থেকে সম্মান ও মর্যাদা উঠে যায় এবং শত্রু বিজয়ী হয়ে যায়। হাদিস শরিফে এসেছে যে, বান্দা গুনাহ করার কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-আমার জানামতে, গুনাহের কারণে মানুষ ইলম ভুলে যায়। আর এ অর্থেই হাদিসে এসেছে-যে ব্যক্তি গুনাহে লিপ্ত হয় তার বিবেক তার থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং পুনরায় কখনো আর তার নিকট ফিরে আসে না। কোন কোন আকাবিরের বক্তব্য হল- লা'নত বা অভিশাপ চেহারা কালো হয়ে যাওয়া ও ধন-সম্পদ কমে যাওয়ার নাম নয় বরং লা'নত বা অভিশাপ হল-ব্যক্তি একটি গুনাহ থেকে বের হয়ে একই ধরনের অপর আরেকটি গুনাহ অথবা এর চেয়েও আরও বড় কোন গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ গুনাহের একটি শাস্তি হল- একটি গুনাহের কারণে মানুষ অপর আরেকটি গুনাহে লিপ্ত হয়। হজরত ফুজাইল রাহি. বলেছেন-মানুষের উপর যে সকল বিপদ কিংবা মানুষের দুঃখ-কষ্ট আসে, তুমি জেনে রাখ যে, এগুলো সব গুনাহের কারণেই আসে। আর কোন কোন মনীষীর বক্তব্য হল- যদি আমার গাধার অভ্যাসও পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে আমি মনে করি যে, এটাও আমার কোন ভুল-ত্রুটির কারণেই হয়েছে। এক সূফী বুজুর্গের ঘটনা আছে যে, তিনি একটি সুদর্শন বালককে দেখে তাকিয়েই রয়েছেন। আরেক বুজর্গ এসে তার হাত ধরে বলল, এর (কু-নজরের) শাস্তি তুমি কিছু দিন পরে পাবে। ঠিকই এর ৩০ বছর পরে এর শাস্তি তিনি পেয়েছেন। হজরত আবু সুলাইমান দারানী রাহি. বলেন-স্বপ্নদোষ হওয়াও একটি শাস্তি। তিনি আরও বলেন যে, কোন ব্যক্তির কোন নামাজের জামাত ছুটে যাওয়াও কোন না কোন গুনাহের কারণেই হয়ে থাকে। একটি হাদিসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন—বান্দা যখন স্বীয় কামনা-বাসনাকে আমার আনুগত্যের উপর প্রাধান্য দেয়, তখন তার সর্বনিম্ন অবস্থা হয়-তাকে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় মজাদার মুনাজাত থেকে বঞ্চিত করে দেন। আল্লাহ তা'আলার অনুগত বান্দাদের উপর যে বিপদাপদ আসে, এগুলো তাদের গুনাহের কাফফারা হয়ে থাকে এবং এ বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করার ফলে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি হয়।
টিকাঃ
৯. এহইয়াউল উলূম: ইমাম গাজালী রাহি।
📄 মানুষের ভয়ঙ্কর মুহূর্ত
বান্দার উপর আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত। মানুষের নফসের উপর যখন পেরেশানী এবং কুমন্ত্রণার আক্রমণ হয়, তখন সে মনে করে যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার কোন নি'আমত নেই। আমি দুনিয়ার সবচেয়ে মজলুম। সবচেয়ে খারাপ এবং সবচেয়ে বেশি দুঃখী মানুষ। এই মুহূর্তটা বড় ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। অধিকাংশ মানুষ ঐ মুহূর্তেই বড় বড় ভুল করে থাকে। আর সারা জীবনভর সে ভুলের মাশুল দেয়। তাদের এ কথাও স্মরণ থাকে না যে, তাদের নিকট কালিমায়ে তায়্যিবার মত মূল্যবান নি'আমত রয়েছে। তারা ভুলে যায়, তারা যে শ্বাস গ্রহণ করছে তা কত বড় নি'আমত। তাদের এটাও মনে থাকে না যে, তাদের পেটে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার প্রদত্ত খাবার। তাদের এটাও অনুভব হয় না যে, তাদের মন ও মননে কুরআনুল কারিমের কি পরিমাণ আয়াত রয়েছে। তারা এটাও ভুলে বসে যে, তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার কতগুলো পর্দা রয়েছে। এমন পর্দা- যদি সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের সকল রাগ ও ক্ষোভ লজ্জায় পরিণত হবে। তারা এটাও ভাবে না যে, ঐ সময় তারা যে সব দুঃখ-কষ্ট অনুভব করছে, এই অনুভূতিটুকুও আল্লাহ তা'আলার কোন শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আর না হয় এমন সময়ও আসে যখন মানুষ এমন অসহায় অবস্থায় পতিত হয় যে, তখন সে মার খায় কিন্তু রাগ হতে পারে না। তখন সে এমন দুঃখ-কষ্ট দেখে যে, তার শরীরে কিছু অনুভব করার মত অবস্থাও থাকে না। এজন্য যখনই নফসের উপর পেরেশানি ও কুমন্ত্রণার প্রচন্ড আক্রমণ হয়, তখন কোন প্রকার সিদ্ধান্ত না নেওয়া। তখন একমাত্র কাজ হল একাগ্রচিত্তে ইস্তিগফারে লেগে যাওয়া। নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করা এবং এর উপর কান্নাকাটি করা। আল্লাহ তা'আলার নিকট এর ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর নিজের মনকে বুঝানো যে, বর্তমানে যা কিছু আমার উপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, তা বাস্তব নয়। এগুলো একমাত্র শয়তানের ধোঁকা। আর শয়তান পলায়ন করে জিকির ও ইস্তিগফারের দ্বারা। সিদ্ধান্ত নেওয়া, অন্যকে অপবাদ দেওয়া এবং বেশি বেশি চিন্তা করার দ্বারা নয়।
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
📄 গুনাহের প্রচার করো না
আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহার নিকট এক মহিলা আসলো। এসে মাসআলা জিজ্ঞেস করার মত করে নিজের গুনাহের আলোচনা করতে লাগল। সম্ভবত ইহরাম অবস্থায় কেউ তার হাতের কব্জি ধরেছে অথবা স্পর্শ করেছে। সে যখনই এ কথা বলেছে অমনি আম্মাজান হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা চেহারা ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন-
থাম! থাম! অতঃপর বললেন-
হে ইমানদার নারীগণ! তোমাদের কারো যদি কোন গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে অন্য কাউকে বলো না। বরং সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা-ইস্তিগফার করো। মনে রাখবে! বান্দা শুধু লজ্জা দেয়, কোন পরিবর্তন করতে পারে পঞ্চাশ না। অপর দিকে আল্লাহ তা'আলা পরিবর্তন করে দেন, লজ্জা দেন না। অর্থাৎ তোমরা যদি তোমাদের গুনাহসমূহ মানুষের নিকট বলে বেড়াও, মানুষ তোমাদের এ সকল গুনাহ ক্ষমা ও মুছে দিতে পারবে না। না তোমাদের অবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারবে এবং না তোমাদেরকে গুনাহের ক্ষতিসমূহ থেকে বাঁচাতে পারবে। তবে হ্যাঁ! অবশ্যই তারা তোমাদেরকে বদনাম এবং লজ্জায় ফেলতে পারবে। যখনই সুযোগ পাবে তখনই তারা উক্ত গুনাহের কারণে লজ্জা, অপমান ও বদনামে লিপ্ত করতে পারবে। যেখানে আল্লাহ তা'আলা না লজ্জিত করেন। না বদনাম করেন এবং না অপমান করেন। বরং তিনি তোমাদের দুরবস্থাকে ভাল অবস্থায় উন্নীত করে দেন। তিনি তোমাদের গুনাহের ক্ষতিসমূহ থেকে বাঁচিয়ে দেন। তিনি "আল-আফু" তথা ক্ষমাকারী। তিনি গুনাহকে মুছে দেন। তিনি "আল-গাফুর" তথা তিনি গুনাহকে গোপন করেন এবং কোন কোন সময় তো এমন রহমত এবং পরিবর্তন করে দেন যে, স্বয়ং গুনাহগার বান্দারও স্বীয় গুনাহ মনে থাকে না। মনে হয় যেন সর্বদিক থেকে গুনাহের নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে গেছে। না তা আমলনামায় অবশিষ্ট আছে, না তা গুনাহ লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতার স্মরণ আছে। না তা এ জমিনের স্বরণ আছে, যেখানে তা সংঘটিত হয়েছিল। না তা সেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্মরণ আছে যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে সেই গুনাহ করেছিল এবং না স্বয়ং গুনাহগার বান্দার স্মরণ আছে।
এমন দয়া ও মাগফিরাত আর কে করতে পারে? যতক্ষণ জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস চলমান। যতক্ষণ সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হবে, তাওবার দরজাও ততক্ষণ খোলা। প্রিয় পাঠক! বেশি বেশি ইস্তিগফার। অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার। খাঁটি ইস্তিগফার। উত্তম তাওবা। খাঁটি তাওবা। সত্য তাওবা। পাক্কা তাওবা।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ الَيْكَ نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ إِلَيْكَ؛ نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوْبُ أَلَيْكَ؛
📄 গুনাহের তদারকি
যে সকল গুনাহের সম্পর্ক আল্লাহ তা'আলার সাথে যেমন: সালাতের ক্ষেত্রে অলসতা, জাকাতের বেলায় গাফলত, গায়রে মাহরামের দিকে দৃষ্টি দেওয়া, বিনা অজুতে কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা, কোন বিদ'আতে লিপ্ত হওয়া, গান-বাজনা শোনা ও মাদকাসক্ত হওয়া ইত্যাদি। এ সকল গুনাহের জন্য ইস্তিগফার করার পরে তার তদারকির চেষ্টা করা উচিত। নিজের ছুটে যাওয়া সালাতসমূহ আদায় করা। ছুটে যাওয়া সিয়ামগুলো পূর্ণ করা। হজ ও যাকাতের ক্ষেত্রে যে সকল কমতি হয়েছে সেগুলো পূর্ণ করা। দৃষ্টির অধিক হেফাজত করা। কুরআনুল কারিমের পূর্বের চেয়ে অধিক সম্মান করা। গরিব-অসহায়দেরকে ঠাণ্ডা পানি পান করানো। যে পরিমাণ সময় গান-বাজনাতে ব্যয় করতেন সে পরিমাণ সময় তিলাওয়াত অথবা কোন দীনি মজলিস কিংবা দীনি বয়ান শোনা। কুরআনুল কারিম ক্রয় করে ওয়াকফ করা। অর্থাৎ যে প্রকারের গুনাহ হয়েছে ঠিক তার সম্পূর্ণ উল্টো এবং বিপরীত নেক কাজ করা। তাহলে যেন গুনাহের অন্ধকারসমূহ নেক কাজের নূরের দ্বারা দূর হয়ে যায়। তবে কোন কোন গুনাহ এমন রয়েছে যে, তার কাফ্ফারা শুধুমাত্র দুঃখ-কষ্টই যথেষ্ট। তাই খাঁটি তাওবার পরে যদি কিছু কঠিন পরিস্থিতি ও কিছু দুঃখ-কষ্টের অবস্থা এসে যায়, তাহলে এর জন্য পেরেশান না হওয়া। এটা তো তার গুনাহসমূহ মিটানোর মাধ্যম হয়ে থাকে। তাইতো এক বর্ণনার সারমর্ম হল-যখন বান্দার গুনাহ অধিক হয় আর তার নিকট এমন আমল না থাকে, যা উক্ত গুনাহসমূহের কাফ্ফারা হতে পারে, তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর অনেক দুঃখ-কষ্ট চাপিয়ে দেন। আর উক্ত দুঃখ-কষ্টই তার গুনাহসমূহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।[৫৭]
টিকাঃ
[৫৭] এহইয়াউল উলুম