📄 আশ্চর্য এক অবস্থা
মোটকথা মুসিবতের সময় যদি আল্লাহ তা'আলার উপর অভিযোগ তৈরি না হয়, বরং এই বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ় হয় যে, আল্লাহ ত'আলার অনুগ্রহ তো অসংখ্য রয়েছে। স্বয়ং আমি নিজেই তো গুনাহগার, অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা ও অপরাধী। এটা হল ঐ আশ্চর্য অবস্থা, যা মাছের পেট থেকেও মানুষকে জীবিত বের করে আনে। হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আটি পাঠ করে দেখুন-
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ । হে আল্লাহ! আপনি তো পবিত্র। আপনার প্রতি কোন অভিযোগ নেই।
إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ । আমি নিজেই জালিম এবং অপরাধী।
যখন এই বাক্য অন্তরের বাক্যে পরিণত হবে, অর্থাৎ মন থেকে বিশ্বাস করবে যে, ভুল ও অপরাধ আমার নিজের এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি কোন প্রকার অভিযোগ থাকবে না, তখন নুসরাত ও সাহায্যের এমন দরজা খুলবে যে, বিবেক-বুদ্ধি সব হয়রান হয়ে যাবে। কিন্তু আফসোস! আমরা এমন অবস্থা থেকে বঞ্চিত। আর এটা কত আশ্চর্যের কথা যে, হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের ন্যায় নবি, যিনি সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ছিলেন। তার এই অবস্থা নসিব হয়েছে। হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু যার নিশ্চিত জান্নাতের সুসংবাদ ছিল। তিনিও এই অবস্থায় ঢুবে নিজেকে গুনাহগার ও অপরাধী মনে করে কেঁদেছেন। আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত গুনাহে ঢুবে আছি। তবুও এই অবস্থা থেকে বঞ্চিত রয়েছি। বস্তুত আমাদের জন্য তো নিজেকে গুনাহগার ও অপরাধী মনে করা অধিক সহজ হওয়া উচিত ছিল।
এ ধরনীর কোন গুনাহ আছে যা আমরা দীনদার দাবিদারদের মাঝে নেই? পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আত্ম অহমিকা, দুনিয়ার মহব্বত, অহংকার, খ্যাতির লোভ, ফটোসেশন এবং নির্লজ্জতা (নাউযুবিল্লাহ) কোন কোন গুনাহের কথা উল্লেখ করব। হিংসা এবং শত্রুতা আমাদেরকে ভেতর থেকে ঝাঁজরা করে দিয়েছে এবং সম্মিলিত সম্পদের ক্ষেত্রে অসতর্কতা আমাদেরকে ধোঁকার জাল বানিয়ে দিয়েছে। বাস্তবেই আমরা তাওবা ও ইস্তিগফারের সীমাহীন মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে স্বীয় গুনাহের ভয়াবহতা বুঝার তাওফিক দান করুন।
পবিত্র কুরআনকেই নিন না! আমরা এটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলি। কিন্তু আমাদের রাত-দিন কাটে এর তিলাওয়াত শূন্য অবস্থায়। আমরা এর হক সম্পর্কে উদাসীন। কত হাফেজে কুরআন দীনি কাজের ধোঁকায় হিফজের নি'আমত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর এটাই যদি হয় আমাদের দীন যে, কুরআনুল কারিম ও ভুলে যাবে, তাহলে আল্লাহ তা'আলাই আমাদেরকে হিদায়াত দান করুন।
মোটকথা আমরা অনেক গুনাহগার। কিন্তু তারপরও আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ দেখুন! তিনি আমাদেরকে ইমানের মত মহামূল্যবান সম্পদ দান করেছেন। আমাদেরকে দীন এবং জিহাদের সুদৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি দান করেছেন। এ যুগেও আমাদেরকে তাঁর নাম নেওয়ার তাওফিক দান করেছেন। আমাদের থেকে দীনের কাজ নিচ্ছেন এবং আমাদেরকে তাঁর কাজে লাগিয়েছেন। এমন নি'আমতের তালিকা অনেক দীর্ঘ। আমাদের তা গণনা করাও সম্ভব নয়। সুতরাং প্রয়োজন হল-আমাদের প্রত্যেকে নিজের গুনাহসমূহের দিকে তাকিয়ে তার জন্য অশ্রু প্রবাহিত করা। স্বীয় গুনাহসমূহ খুঁজে খুঁজে তা থেকে খাঁটি তাওবা করা এবং দীনের কাজকে আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত এবং তাঁর মহান অনুগ্রহ মনে করে তার মূল্যায়ন করা।
📄 গভীর অন্ধকারে উজ্জ্বল আলো
হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম গভীর অন্ধকারে ডেকেছেন- لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"আপনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিম। "[৮২]
ফেনাদাসি ফিজ-জুলুমাতি (فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ)-জুলুমাত তথা কয়েকটি অন্ধকার। অন্ধকার যদি একটি হয়, তাহলে তাকে বলা হয়- আর যদি অন্ধকার হয় একাধিক, তাহলে তাকে বলা হয়- জুলুমাত (ظُلُمَات)। আপনি নিজেই চিন্তা করুন যে, কত অন্ধকার হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে বেষ্টন করেছিল। রাতের অন্ধকার। সমুদ্রের অন্ধকার। মাছের পেটের অন্ধকার। কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেন-যে মাছটি তাকে গিলেছিল, সেই মাছটিকে আবার অন্য আরেকটি বড় মাছে গিলে ফেলেছিল। অর্থাৎ অন্ধকারের উপর অন্ধকার। যাকে বলে একবারে গভীর অন্ধকার। কিন্তু এমন গভীর অন্ধকারেও যে উজ্জ্বল আলোটি চমকাচ্ছিল, তা ছিল- لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّালِمِينَ
ইমাম নাসাফী রাহি. লিখেন- ফেনাদাসি ফিজ-জুলুমাতি (فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ) সুতরাং তিনি ডেকেছেন অন্ধকারের মধ্যে। অর্থাৎ মাছের পেটের অনেক গাঢ় এবং গভীর অন্ধকার। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন- ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ
“আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন এবং তাদেরকে ছেড়ে দিলেন অন্ধকারে।”[৮৩]
অর্থাৎ অন্ধকার তো একটাই ছিল। কিন্তু এ পরিমাণ নিকশ কালো এবং গভীর ও স্তরে স্তরে ছিল যে, একাধিক অন্ধকারের চেয়েও অধিক ছিল। অথবা রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকার অর্থাৎ বাস্তবেই একাধিক অন্ধকার ছিল।
হাদিস শরিফে এসেছে-যে কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি এই দু’আটির মাধ্যমে প্রার্থনা করবে, তার দু’আ অবশ্যই কবুল হবে।
হজরত হাসান বসরী রাহি. বলেন-আল্লাহ তা’আলার কসম! হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা’আলা শুধুমাত্র এজন্য মুক্তি দিয়েছেন যে, তিনি নিজের ভুলকে স্বীকার করেছিলেন।[৮৪]
টিকাঃ
[৮২] আম্বিয়া- ২১:৮৭
[৮৩] বাকারা- ২: ১৭
[৮৪] আল-মাদারিক
📄 কিবরিতে আহমার তথা দুর্লভ সম্পদ
হজরত শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলবী রাহি. বলেন- প্রত্যেক কাজ ও উদ্দেশ্য চাই তা জালালী তথা কঠোর হোক কিংবা জামালী তথা নম্র হোক। এর জন্য এই আয়াতটি ইসমে আজমস্বরূপ এবং কিবরিতে আহমার বা লাল মুক্তাসদৃশ তথা দুর্লভ সম্পদ।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
এই আয়াতটি অত্যন্ত পরীক্ষিত এবং অনেক কার্যকরী একটি দু’আ। এই দু’আটির দ্রুত কার্যকারিতার উপর বুজুর্গানে দীনের ঐকমত্য রয়েছে। এই দু’আটির আমল কয়েকটি পদ্ধতিতে করা যায়। যার মধ্যে দুটি পদ্ধতি খুবই সহজ। যথা-
ক. যে কোন প্রয়োজন পূরণের জন্য ১২ দিন দৈনিক ১২ হাজার বার পড়বে। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে দৈনিক ১২ শত বার পড়বে। শুরুতে এবং শেষে কয়েকবার দুরূদ শরীফ পড়বে।
খ. বিশেষ কোন প্রয়োজন পূরণের জন্য ১ লক্ষ ২৫ হাজার বার পড়বে।
মোটকথা এই আমলের শক্তি ও কার্যকারিতা ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। এজন্য এই আমলটি ব্যতীত অন্য কোন আমল এমন নেই, যে আমলের বিশুদ্ধতা ও প্রমাণ কুরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিস এবং বুজুর্গানে দীনের বাণীতে রয়েছে। কুরআনুল কারিমে এই আমলের ব্যাপারে এই বাক্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে—
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ
“অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।” [৮৫]
টিকাঃ
[৮৫] আম্বিয়া- ২১:৮৮
📄 ইস্তিগফার লাভের দু’টি পদ্ধতি
সুপ্রিয় পাঠক! আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে ইস্তিগফার নসিব করুন। প্রিয় পাঠক! ইস্তিগফারের উপকারিতা অসংখ্য। ইস্তিগফার হল সকল কল্যাণের ভান্ডার এবং চাবি। এটা এই উম্মাহর জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিরাপত্তাস্বরূপ। আমরা যেন ইস্তিগফারের নি’আমত লাভ করতে পারি, তাই কয়েকটি জরুরি বিষয় নিয়ে উল্লেখ করা হল—
ক. অন্যের দোষ তালাশ না করা। অন্যের দোষ দেখা এবং তালাশ করার দ্বারা মানুষ ইস্তিগফার থেকে মাহরুম হয়ে যায়। বরং (আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে হেফাজত করুন) এই অপরাধের কারণে কোন কোন সময় মানুষ ঈমান থেকেও মাহরুম হয়ে যায়। এক ব্যক্তি চল্লিশ বছর বিনা পারিশ্রমিকে দীনের খিদমত করেছে। কিন্তু তার অভ্যাস ছিল যে, সে নারীদের দোষ তালাশের পেছনে লেগে থাকত। অমুকের সাথে অমুকের অবৈধ সম্পর্ক। অমুকের সাথে অমুকের অবৈধ ভাব রয়েছে। অমুকের মধ্যে এই দোষ, এই গুনাহ ও এই দুর্বলতা রয়েছে। তার এই অভ্যাসের কারণে যখন তার মৃত্যুর সময় হল, তখন সে— ইমান থেকে মাহরুম হয়ে গেল।
প্রিয় পাঠক! আসুন আমরা সকলে আমাদের নিজেদের দোষ এবং নিজেদের গুনাহ দেখি। অন্যের দোষ দেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। তবেই পবিত্র ইস্তিগফার লাভ হবে ইন শা' আল্লাহ।
খ. নিজের গুনাহের কথা কাউকে না বলা। শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার সামনেই আবেদন করা। এমনিভাবে শুধুমাত্র মৌখিকভাবে বিনয়রূপে নিজেকে গুনাহগার ও মন্দ না বলা। মৌখিক বিনয় হল-কোন ব্যক্তি নিজেকে মানুষের সামনে গুনাহগার, অধম এবং মন্দ বলে। কিন্তু বাস্তবে তার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় নেই। আর যদি কেউ তাকে গুনাহগার কিংবা মন্দ বলে, তখন সে রেগে আগুন হয়ে যায়। প্রিয় পাঠক! এটা বড় ভয়াবহ রোগ। যা অন্তরকে অনুতপ্ত হতে দেয় না এবং অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে। গুনাহ তো কোন খেলা নয়। বরং মহান এবং ক্রোধান্বিত রবের নাফরমানী তথা অবাধ্যতাকে গুনাহ বলা হয়। তারপরও নিজেকে গুনাহগার বলার উদ্দেশ্য কি? আর তাও আবার শুধুমাত্র মৌখিকভাবে। তবে হ্যাঁ! যারা অন্তর থেকে নিজেকে গুনাহগার ও অপরাধী বলে থাকেন, তারা ভয়ে ভীত হয়ে বার বার ইস্তিগফার করে থাকেন। বুজুর্গানে দীনের মধ্যে যারা নিজেদেরকে গুনাহগার বলতেন, তাদের এই সৎসাহস ছিল যে, অন্য কেউ যদি তাদেরকে গুনাহগার কিংবা মন্দ বলত, তারা একদমই অসন্তুষ্ট হতেন না এবং কোন প্রকার রাগও করতেন না। কেননা তারা মনে করতেন যে, তারা বাস্তবেই গুনাহগার। আমাদের মধ্যে যেহেতু সেই ইখলাস এবং সৎসাহস নেই, তাহলে আমরা শুধুমাত্র মৌখিকভাবে বিনয়ের অভিনয় করে নিজেকে গুনাহগার বলে নিজের নাফরমানী তথা অবাধ্যতার উপর অন্যকে সাক্ষী বানানোর কি প্রয়োজন। আর গুনাহগার শব্দটি কোন হালকা শব্দ নয়। প্রিয় পাঠক! ইস্তিগফার তো সে-ই করে, যে নিজের মহান রবের মহব্বতে বিলীন হয়ে যায়। এটি একটি গুণ। যা মুমিনের অন্তরে এই চিন্তাভাবনা তৈরি করে দেয় যে, আমার প্রিয় রব যেন আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন এবং এই সুধারণা তৈরি করে দেন যে, আল্লাহ তা'আলা সকল গুনাহই তাওবার দ্বারা ক্ষমা করে দেন।
প্রিয় পাঠক! ইস্তিগফার! ইস্তিগফার! এবং ইস্তিগফার। আল্লাহ তা'আলা নিজেই ইরশাদ করেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنফُসِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বল, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"[৮৬]
টিকাঃ
[৮৬] যুমার- ৩৯: ৫৩