📄 গুনাহগার দুই প্রকার
এক ব্যক্তির গুনাহ করার ইচ্ছে নেই। কিন্তু তার বার বার গুনাহ হয়ে যায় এবং সে বার বার তাওবা করে। তার মধ্যে এবং ঐ ব্যক্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য, যে এই চিন্তা করে গুনাহে লিপ্ত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা "গাফুরুর রাহিম” এজন্য আমি গুনাহ করি। তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। এই চিন্তাটি ভুল ও মন্দ স্বভাব এবং স্বীয় মালিকের প্রতি স্পষ্ট নির্লজ্জতা। আরে ভাই তাঁর "গাফুরুর রাহিম” হওয়ার দাবী তো হল- মানুষ আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের প্রতি এতোটা লজ্জিত হবে যে, সে গুনাহের চিন্তা করতেও ঘৃণা হবে। কিন্তু যে বান্দাকে হাদিস শরিফে মুফতিন ও তাওয়্যাব বলা হয়েছে, অর্থাৎ বার বার গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি এবং তাওবাকারী, সে গুনাহ করে না। তবে তার থেকে গুনাহ হয়ে যায়। সে নিজেকে গুনাহ করার দাবিদার মনে করে না বরং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে চায়। সে গুনাহের উপর অহংকার করে না, কিন্তু গুনাহ যখন তার উপর ভর করে তখন সে খাঁটি তাওবাকে নিজের উপর অত্যাবশ্যক করে নেয় এবং তাওয়্যাব হয়ে যায়। বার বার তাওবা করে, অনুতপ্ত হয়, কান্নাকাটি করে। কিন্তু নিরাশ হয় না, বরং তাওবা করে। হতাশ হয় না। শুধু তাওবা আর তাওবা। তখন সে ঐ ওলীদের সমতুল্য হয়ে যায়, যারা অধিকাংশ গুনাহ থেকে নিরাপদ থাকে। আর পুনরায় যখন সে "মহব্বতে এলাহী" তথা আল্লাহ তা'আলার মহব্বতের মর্যাদায় গিয়ে উপনীত হয়, তখন অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে যান। এ কথাটি আমি আমার পক্ষ থেকে বলিনি, বরং একটি হাদিসে এসেছে। যে হাদিসটির সনদ হাসান। বিস্তারিতভাবে এ সুসংবাদ বর্ণনা করা হয়েছে। আসুন উক্ত হাদিসটি পাঠ করুন-
“হজরত উকবা ইবনে আমের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন-হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্য হতে কেউ কেউ গুনাহ করে ফেলে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, উক্ত গুনাহ তার জন্য লিখা হয়। অর্থাৎ তার আমলনামায় উক্ত গুনাহ লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। ঐ ব্যক্তি বললেন, অতঃপর সে উক্ত গুনাহের উপর তাওবা ও ইস্তিগফার করে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-তখন তার উক্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তার তাওবা কবুল করে নেওয়া হবে। ঐ ব্যক্তি বললেন, তারপর সে পুনরায় গুনাহ করে বসে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-তখন তা তার জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়। ঐ ব্যক্তি বললেন, সে পুনরায় উক্ত গুনাহের উপর তাওবা ও ইস্তিগফার করে নেয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-তখন উক্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তাওবা কবুল করে নেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা ক্লান্ত হন না। যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হও।"
অন্য আরেক সাহাবী হজরত হাবীব ইবনুল হারিস রাদিআল্লাহু আনহু এ অভিযোগ উত্থাপন করলেন যে, গুনাহ হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- তাওবা কর। তিনি বললেন, তাওবা তো করি কিন্তু তারপরও হয়ে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-যখনই গুনাহ হয়ে যায় তখনই তাওবা করে নাও। তিনি বললেন, তখন তো তাহলে আমার গুনাহ অনেক অধিক হয়ে যাবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
عَفْوُ اللَّهِ أَكْبَرُ مِنْ ذُنُوْبِكَ يَا حَبِيْبَ بْنَ الْحَارِثِ
“হে হাবীব ইবনুল হারিস! আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা তোমার গুনাহসমূহ থেকে অনেক বড়।"
টিকাঃ
[৭২]. তাবরানী ফিল-কাবীর ওয়াল আওসাত
[৭৩]. প্রাগুক্ত
📄 যে তাওবা চায় না
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ وَمَنْ لَّا يَغْفِرْ لَا يُغْفَرْلَةَ وَمَنْ لَّمْ يَتُبْ لَمْ يُتَبْ عَلَيْهِ
“হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বর্ণনা করেন-যে ব্যক্তি অনুগ্রহ করে না, তার উপর অনুগ্রহ করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ক্ষমা করে না, তাকে ক্ষমা করা হবে না এবং যে ব্যক্তি তাওবা করে না, তার তাওবা কবুল করা হবে না।"
টিকাঃ
[৭৪] প্রাগুক্ত
📄 একটি ঈমানদীপ্ত ঘটনা
মদিনা মুনাওয়ারায় একজন ইবাদাতগুজার মহিলা ছিলেন। উক্ত মহিলার একটি ছেলে ছিল। অনেক গাফেল ও অনেক বড় গুনাহগার। মহিলা যখনই সময় পেতেন, তখনই তাকে বুঝাতেন। হে আমার ছেলে! তাওবা করে নাও। দেখো! অতীতে গাফলতের মধ্যে জীবন যাপনকারীদের কত ভয়ঙ্কর মৃত্যু হয়েছে এবং তাদের কত ভয়াবহ পরিণতি হবে। হে আমার ছেলে! মৃত্যুকে স্মরণ কর এবং তার প্রস্তুতি গ্রহণ কর। কিন্তু ছেলের উপর এ সকল উপদেশের কোন প্রভাব পড়ত না। সে মায়ের বয়ান শুনে গান গাইতে গাইতে বাইরে চলে যেত। আর বলত যে, আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ অনেক বড়। এভাবেই দিন-রাত অতিবাহিত করত।
একবার আরবের অনেক প্রসিদ্ধ ও দরদী এক বক্তা হজরত আবু আমের আলবানী রাহি, পবিত্র রমজানে মদিনা মুনাওয়ারা তাশরিফ আনলেন। লোকেরা তার নিকট বয়ানের আবেদন করল। তাই জুমার রাতে তারাবীর সালাতের পর তার বয়ানের সময় নির্ধারণ হল। মানুষ একত্রিত হয়ে গেল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, ঐ যুবকও এসে মজলিসে বসল। আল্লাহ তা'আলার তাওফিকে শাইখ বয়ান শুরু করলেন। কখনো উপদেশ ও কখনো ভয়। কখনো জান্নাতের প্রেরণা তো কখনো জাহান্নামের ভয়। সত্য রবের সত্য বাণী যখন সামনে আসল, তখন মৃত অন্তরও জীবিত হতে শুরু করল। ঐ যুবকেরও চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে গেল এবং শাইখের উপদেশ তার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। সে মজলিস থেকে উঠে তার মায়ের কাছে আসল এবং অঝোরে কাঁদতে লাগল। হে আমার মা! আজ তাওবা আমার শরীরের তালা খুলে দিয়েছে। হে মা! আল্লাহর রাস্তায় আহ্বানকারীর দরদী আহ্বানের সুর লহরী শয়তানী জিঞ্জিরসমূহকে ভেঙ্গে দিয়েছে। হে আমার মা! আমিও এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছি, তবে আমার মালিক কি আমার মত গুনাহগার মানুষকে কবুল করবেন? হায়! তিনি যদি আমাকে কবুল না করেন, তাহলে তো এটা আমার জন্য খুবই খারাপ হবে। অতঃপর সেই যুবক ইবাদাত-বন্দেগীতে লেগে যায়। সারা দিন সিয়াম এবং সারা রাত ইবাদাত-বন্দেগী ও আল্লাহ তা'আলার জিকির-আজকার। এমনভাবে ইবাদাত-বন্দেগী ও জিকির-আজকারে মগ্ন হয়েছে যে, না কণ্ঠ বিরত হয়, না শরীর ক্লান্ত হয়। কিছু দিন পরেই প্রচণ্ড জ্বর হল। চারদিন সেই প্রচণ্ড জ্বর ও দুর্বলতা নিয়েই দিন-রাত ইবাদাত করে চলেছে। একদিন সে দু'আর মধ্যে বলল-
হে আল্লাহ! যখন আমি শক্তিশালী ছিলাম তখন আপনার নাফরমানী করেছি। আর এখন যখন দুর্বল হয়ে গেছি তখন আপনার ইবাদাতে লেগেছি। যখন মজবুত ছিলাম, তখন আপনাকে অসন্তুষ্ট করেছি। আর যখন রোগা হয়েছি, তখন আপনার কাজে লেগেছি। হায় আফসোস! দয়া করে আপনি আমাকে কবুল করে নিন। এ কথা বলে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যায়। মা চিৎকার করে মাথ ায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনলে সে বলতে লাগল-মা! সেই সময়ের ব্যাপারে আপনি আমাকে সাবধান করতেন। হায় আফসোস ঐ দিনসমূহের উপর, যে দিনগুলো ইবাদাতবিহীন কেটেছে। আমার ভয় হচ্ছে যে, আমার গুনাহের কারণে আমাকে অনেক দীর্ঘ সময় জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। হে মা! আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি আপনার পাগুলো আমার চেহারার উপর রেখে দিন। তাহলে যেন আমার এই লাঞ্ছনা দেখে আমার রবের আমার উপর দয়া হয়। মাও এমনটিই করলেন। এরই মধ্যে তার ইন্তেকাল হয়ে যায়। জুমার রাতে তার মা তাকে স্বপ্নে দেখলেন যে, তার ছেলের চেহারা চাঁদের মত উজ্জ্বল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার ছেলে! আল্লাহ তা'আলা তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন। সে বলল, অনেক ভাল ব্যবহার করেছেন এবং আমাকে অনেক উঁচু মর্যাদা দান করেছেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, আবু আমেরের সাথে কি আচরণ করা হয়েছে? আবু আমের হল ঐ বক্তা যে বক্তার বক্তৃতা শুনে এই যুবক হিদায়াত পেয়েছিল এবং সেও ইন্তিকাল করেছিল। এই যুবক বলল, আম্মু! কোথায় আমি আর কোথায় আবু আমের! অতঃপর সে কিছু কবিতা পাঠ করল। যার সারমর্ম হল-
"আবু আমেরকে এমন চূড়ায় রাখা হয়েছে, যার সর্বনিম্ন উচ্চতাও অন্য জান্নাতিদের নিকট আরশের ন্যায় উঁচু। তিনি এমন হুরদের মাঝখানে রয়েছেন, যারা তাকে পাত্র ভরে ভরে পরিবেশন করছে এবং বিনয়ের সাথে বলছে নিন নিন। ধন্যবাদ আপনাকে হে মানুষকে নসীহতকারী।"
টিকাঃ
[৭৫] কিতাবুত-তাওয়্যাবীন
📄 তাওবার দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত
গুনাহগারদের জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ তা'আলা অধিক তাওবাকারীকে ভালোবাসেন। যেমন পবিত্র কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ
। "নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন। "
সুবহানাল্লাহ! গুনাহগারদের জন্য কত বড় সুসংবাদ যে, তাওবা করবে আর আল্লাহ তা'আলার প্রিয় হয়ে যাবে।
টিকাঃ
[৭৬] বাকারা- ২: ২২২