📄 ইস্তিগফার ও তাওবার মধ্যে পার্থক্য কী?
কয়েকটি কথা বুঝে নিন—
১. ইস্তিগফারের উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার নিকট মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। গুনাহের অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে বাঁচার আবেদন করা।
২. তাওবার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তা'আলার অভিমুখী হওয়া। স্বীয় গুনাহের উপর অনুতপ্ত হওয়া। গুনাহকে ছেড়ে ভবিষ্যতে আর কখনো না করার দৃঢ় সংকল্প করে আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা।
৩. তাওবা ইস্তিগফার ব্যতীত হয় না। অর্থাৎ তাওবার মধ্যে ইস্তিগফার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং পরিপূর্ণ ইস্তিগফার তাওবা ব্যতীত অর্জন হয় না। এ হিসেবে উভয়টির অর্থ একই। আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। স্বীয় গুনাহের উপর অনুতপ্ত হওয়া। গুনাহকে ত্যাগ করা। ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। এটাকে ইস্তিগফারও বলা হয় এবং তাওবাও বলা হয়।
৪. উভয়টির মাঝে কিছু পার্থক্যও হতে পারে। যখন তাওবা ব্যতীত ইস্তিগফার করা হয়। অর্থাৎ ইস্তিগফারের উদ্দেশ্য হল নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও মাগফিরাত কামনা করা। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে গুনাহ ত্যাগ করেনি। তখন ইস্তিগফার হল একটি দু'আ। আর দু'আ হল ইবাদাত। মাগফিরাতের এই দু'আ কখনো কবুল হয়ে যায় আবার কখনো কবুল হয় না।
৫. ইস্তিগফার ও তাওবার মধ্যে এটাও একটা পার্থক্য বর্ণনা করা হয় যে, ইস্তিগফারের উদ্দেশ্য হল অতীতে যা কিছু হয়েছে সেগুলোর ক্ষতি থেকে বাঁচার আবেদন করা আর তাওবার উদ্দেশ্য হল ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতের মন্দ আমল এবং এর ক্ষতি থেকে বাঁচার আবেদন করা। এজন্য ইস্তিগফার ও তাওবা উভয়টিই করা উচিত।
اسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
৬. আল্লাহ তা'আলা বান্দার গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে থাকেন। কখনো তাওবা তথা গুনাহ ত্যাগ করার দ্বারা এবং অনুতপ্ত হওয়ার দ্বারা। আর কখনো নেক কাজের প্রতিদানে। কখনো বিপদাপদের প্রতিদানে। আর কখনো শুধুমাত্র ইস্তিগফার তথা ক্ষমা ও মাগফিরাতের দু'আ করার দ্বারা। এ বর্ণনা থেকেও ইস্তিগফার ও তাওবার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়।
মোটকথা হল, কখনো ইস্তিগফার ও তাওবা উভয়টি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর কখনো উভয়টির অর্থের মধ্যে সামান্য পার্থক্য হয়ে থাকে। ইস্তিগফারের অর্থ হল অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর তাওবার অর্থ হল গুনাহ ত্যাগ করে নেকির দিকে ফিরে আসা।
📄 তাওবা করা থেকে বিরত হওয়া উচিত নয়
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا جَاءَ رَسُوْلَ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللَّهِ أَحَدُنَا يُذْنِبُ قَالَ: يُكْتَبُ عَلَيْهِ قَالَ: ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ مِنْهُ وَيَتُوْبُ قَالَ : يُغْفَرُ لَهُ وَيُتَابُ عَلَيْهِ قَالَ: فَيَعُودُ فَيُذْنِبُ قَالَ: فَيُكْتَبُ عَلَيْهِ قَالَ: ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ مِنْهُ وَيَتُوْبُ قَالَ: يُغْفَرُ لَهُ وَيُتَابُ عَلَيْهِ وَلَا يَمَلُّ اللَّهُ حَتَّى تَمَلُّوا
“হজরত উকবা বিন আমের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্য হতে যদি কেউ গুনাহ করে...?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: লেখা হবে।
সে জিজ্ঞেস করল: সে যদি তাওবা ও ইস্তিগফার করে তাহলে...?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—তার তাওবা কবুল করা হবে এবং তাকে মাগফিরাত দান করা হবে।
সে আবার জিজ্ঞেস করল: সে যদি পুনরায় গুনাহ করে তাহলে...?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—তাহলে এটাও তার বিরুদ্ধে লেখা হবে।
সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল: সে যদি আবার তাওবা ও ইস্তিগফার করে তাহলে...?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তার তাওবা কবুল করা হবে এবং আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে ক্লান্ত হোন না। বরং তোমরাই বার বার গুনাহ এবং তাওবা করে ক্লান্ত হয়ে যাও।"[৩৯]
উদ্দেশ্য হল প্রত্যেকবার খাঁটি অন্তরে তাওবা কর এবং শয়তানের কুমন্ত্রণাকে ছেড়ে দাও যে আমি বার বার তাওবা ভঙ্গ করছি। এখন কোন মুখে ক্ষমা চাইব। ঠিক নেই কখন আমার এই তাওবাও ভেঙ্গে যায়। কেননা এভাবে শয়তান আপনাকে হতাশা ও গুনাহের অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করে দেবে। তাওবা যদি খাঁটি হয়, তাহলে দিনে যদি সত্তর বারও গুনাহ হয়ে যায়, তাহলেও নিরাশ হয়ো না এবং ক্লান্ত হয়ে তাওবা ছেড়ে দিও না। একাত্তর বারও যদি খাঁটি অন্তরে তাওবা করে নাও, তাহলেও আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবুল করতে ক্লান্ত হোন না।
টিকাঃ
[৩৯] মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/২৪০ হাদিস নং ১৭৫৩০
📄 তাওবার আশ্চর্য ফজিলত
এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি তাওবা ও ইস্তিগফার করে—
১. আল্লাহ তা'আলার হিকমতে গুনাহ লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতা তার গুনাহ লিখতে ভুলে যায়।
২. ঐ ব্যক্তির হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও উক্ত গুনাহকে ভুলে যায়, যে অঙ্গের দ্বারা সে উক্ত গুনাহ করেছে।
৩. ঐ স্থানও উক্ত গুনাহকে ভুলে যায়, যেখানে সে উক্ত গুনাহে লিপ্ত হয়েছিল। তাহলে যেন গুনাহগার যখন (যে তাওবা করেছে) আল্লাহ তা'আলার নিকট পৌছেবে, তখন তার বিরুদ্ধে কোন সাক্ষীই বিদ্যমান না থাকে।
হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন—তাওবা কর তাওবা। আমি নিজেও প্রতিদিন একশত বার তাওবা করে থাকি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—ঐ ব্যক্তি কে, যে গুনাহগার নয়? কিন্তু এই গুনাহগারদের মধ্যে সর্বোত্তম হল সে, যে তাওবা করে নেয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন—গুনাহগার তাওবা করে নিলে এমন হয়ে যায় যে, মনে হয় যেন সে কখনো গুনাহই করেনি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন—গুনাহ থেকে তাওবা করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল— পুনরায় উক্ত গুনাহের নাম পর্যন্ত না নেওয়া। [৪০]
টিকাঃ
[৪০] কিমিয়ায়ে সা'আদাত
📄 তাওবা হজরত আদম আলাইহিস সালামের উত্তরাধিকার
হজরত হাসান বসরী রাহি. থেকে বর্ণিত আছে—
আল্লাহ তা'আলা যখন হজরত আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল করলেন, তখন তাকে ফেরেশতারা ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম ও মিকাইল আলাইহিস সালাম তার নিকট আগমন করলেন এবং বললেন—
হে আদম! আল্লাহ তা'আলা যখন আপনার তাওবা কবুল করেছেন, তখন আপনার কলিজা ঠাণ্ডা হয়েছে। হজরত আদম আলাইহিস সালাম উত্তর দিলেন—হে জিবরাইল! তাওবা কবুল হওয়ার পরেও যদি আমাকে জবাবদিহি করতে হয়, তাহলে পুনরায় আমার ঠিকানা কোথায়? ঐ সময় তার উপর ওহী আসল যে, হে আদম! আপনি আপনার সন্তানদের জন্য উত্তরাধিকার হিসেবে দুঃখ-কষ্ট রেখে যাচ্ছেন এবং তাওবাও রেখে যাচ্ছেন। তাই যে কেউ এগুলোর মধ্যে আমাকে ডাকবে আমি তা শুনব, যেমনটি আপনার ডাক শুনেছি এবং যে কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তার উপর কৃপণতা করব না। কেননা আমার নাম “কারীবুন” তথা নিকটবর্তী এবং "মুজীবুন” তথা জবাবদাতা। হে আদম! তাওবাকারীদেরকে কবর থেকে হাসি-খুশি অবস্থায় সুসংবাদপ্রাপ্ত হিসেবে উঠাব। [৪১]
টিকাঃ
[৪১] এহইয়াউল উলুম