📄 তাওবা কবুল হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত
মনে রাখবেন কবিরা গুনাহ হোক আর সগিরা গুনাহ হোক, তাওবার দরজা সর্বদাই উন্মুক্ত। সুতরাং তাওবা করতে বিলম্ব করা একদমই উচিত নয়। সাথে সাথেই খাঁটি তাওবা ও বেশি বেশি ইস্তিগফার করা উচিত। খাঁটি তাওবার জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে। যথা—
প্রথম শর্ত: الاخلاص لله تعالى তথা তাওবা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ভয়ে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য হওয়া। এ ছাড়া অন্য কারো ভয়ে কিংবা দুনিয়াবী ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য না হওয়া। সুতরাং শুধু এই চিন্তা করা যে, আমি আমার মহান রব ও মালিকের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। এখন আমি তাঁকে সন্তষ্টি করব। তাঁর আজাব থেকে বাঁচব এবং তাঁর প্রতিদান লাভ করব।
দ্বিতীয় শর্ত: الندم على فعل الذنب তথা নিজ গুনাহের উপর অনুতপ্ত হওয়া। হায় হায় আমার থেকে এই ভুল এবং গুনাহ কেন হয়ে গেল? লজ্জিত হওয়া, আফসোস করা ও অনুতপ্ত হওয়া। কেননা যদি অনুতপ্ত না হয়, তাহলে এটা হল স্বীয় গুনাহের উপর সন্তুষ্ট হওয়ার লক্ষণ।
তৃতীয় শর্ত: الاقلاع عن الذنب তথা যে গুনাহের জন্য তাওবা করা হচ্ছে, উক্ত গুনাহ পুরোপুরিভাবে ছেড়ে দেওয়া। উক্ত গুনাহের সম্পর্ক যদি কোন কাজের সাথে হয়, যেমন: চুরি করা, মাদক গ্রহণ করা, মিথ্যা কথা বলা ইত্যাদি তাহলে উক্ত কাজ পুরোপুরিভাবে ছেড়ে দেওয়া। আর যদি উক্ত গুনাহের সম্পর্ক শরীয়াতের কোন ফরজ-ওয়াজিব বিধানের প্রতি অলসতা প্রদর্শন হয়, তাহলে তা আদায়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা।
চতুর্থ শর্ত: العزم على ان لا يعود اليه তথা ভবিষ্যতে আর কখনো এই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
পঞ্চম শর্ত: ان تكون التوبة في الوقت المسموح তথা তাওবা এমন সময়ের মধ্যে হওয়া, যে সময়ে তাওবা কবুল করা হবে। আর যদি সে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে ফিরআউনের মত তার তাওবাও কবুল হবে না। তাওবার সময় হল গড়গড়া তথা মৃত্যুর বিভীষিকা শুরু হওয়া আগ পর্যন্ত। মৃত্যুর বিভীষিকা শুরু হওয়ার পর আর তাওবা কবুল হবে না। এমনিভাবে যেদিন সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে, সেদিন তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর এটা হবে কিয়ামতের পূর্বে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন— নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা পশ্চিম দিগন্তে তাওবার জন্য একটি দরজা স্থাপন করেছেন। যার প্রশ্বস্ততা সত্তর বছরের দূরত্বের সমান। আর এই দরজা খোলা থাকবে পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত।
📄 অনুতপ্ত হওয়ার অর্থ
খাঁটি তাওবা ও ইস্তিগফার হল যাতে স্বীয় গুনাহের উপর অনুতপ্ত হয়। অনুতপ্তের উদ্দেশ্য কী? অনুতপ্ততা মূলত অন্তরের ঐ ব্যথার নাম, যা অত্যন্ত প্রিয় এবং পছন্দনীয় বস্তু হাতছাড়া হয়ে গেলে কিংবা হারিয়ে গেলে হয়ে থাকে। যেমন: কেউ এ কথা জানতে পারল যে, খুব শীঘ্রই তার সন্তানদের উপর বড় ধরনের কোন বিপদাপদ আসবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ সংবাদে তার অন্তরে অনেক আঘাত লাগবে এবং সে খুব কান্নাকাটি করবে। কোন ব্যক্তিকে অভিজ্ঞ কোন ডাক্তার বলেছে যে, আপনার ছেলের এমন রোগ হয়েছে, যে রোগের কোন চিকিৎসা নেই এবং খুব শীঘ্রই সে মারা যাবে। তখন তার অন্তরে দুঃখ-কষ্টের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে।
এখন এই উপমা থেকে গুনাহের উপর অনুতপ্ত হওয়াকে বুঝুন। মানুষের নিকট মানুষের নিজের জীবন স্বীয় সন্তান থেকেও অধিক প্রিয় হয়ে থাকে। আর গুনাহ হল দুনিয়ার সকল রোগ থেকেও ভয়ঙ্কর রোগ এবং জাহান্নামের আগুন হল মৃত্যুর চেয়েও অনেক কঠিন। আর গুনাহের পরিণামে জাহান্নামে যাওয়ার সংবাদদাতা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যাদের সংবাদ একজন ডাক্তারের সংবাদের চেয়ে অনেক বেশি সত্য। সুতরাং গুনাহ হয়ে গেলে, তার জন্য এরচেয়েও অধিক অনুতপ্ত তথা দুঃখ-কষ্ট হওয়া উচিত। যা কারো সন্তানের এমন রোগের সংবাদ যে রোগের কোন চিকিৎসা নেই এবং খুব শীঘ্রই সে মারা যাওয়ার সংবাদ শুনে হয়ে থাকে। মনে রাখবেন! স্বীয় গুনাহের উপর যত বেশি দুঃখ-কষ্ট হবে, গুনাহ দূর হওয়ার সুযোগও তত অধিক পরিমাণ হবে। যেহেতু সত্যিকারের অনুতপ্ত হল—অন্তর নরম হওয়া এবং অধিক পরিমাণে অশ্রু প্রবাহিত হওয়া। আর হাদিস শরিফে এসেছে, তোমরা তাওবাকারীর সাথে বসো। কেননা তাদের অন্তর নরম হয়ে থাকে। অনুতপ্তের আরেকটি আলামত হল—গুনাহের স্বাদ ও আগ্রহ অন্তর থেকে দূর হয়ে যাওয়া এবং তার তিক্ততা ও তার প্রতি ঘৃণা অন্তরে বসে যাওয়া।[১৪]
টিকাঃ
[১৪] এহইয়াউল উলুম
📄 গুনাহের উপর পেরেশান হওয়া
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِنَّ الْعَبْدَ لَيَعْمَلُ الذَّنْبَ فَإِذَا ذَكَرَهُ أَحْزَنَهُ وَإِذَا نَظَرَ اللَّهُ إِلَيْهِ قَدْ أَحْزَنَهُ غَفَرَ لَهُ مَا صَنَعَ قَبْلَ أَنْ يَأْخُذَ فِي كَفَّارَتِهِ بِلَا صَلَاةٍ وَلَا صِيَامٍ
“হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—বান্দা যদি কখনো কোন গুনাহ করে আর যখন উক্ত গুনাহ স্মরণ হয়, তখন সে পেরেশান হয়ে যায়। আর যখন আল্লাহ তা'আলা দেখেন যে, গুনাহ তাকে পেরেশান করে ফেলেছে, তখন সালাত-সিয়াম ও কাফ্ফারায় লিপ্ত হওয়ার আগেই তার গুনাহ আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দেন। "[১৫]
হজরত ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহুমা বলেন—কোন বান্দা যখন স্বীয় গুনাহকে স্মরণ করে দুঃখিত হয় এবং তার অন্তর ভয়ে প্রকম্পিত হয়, তখন ঐ সময়েই তার গুনাহ তার আমলনামা থেকে মুছে দেওয়া হয়। [১৬] এ অবস্থাটা কোন লোকদের নসিব হয়? একমাত্র তাদেরই নসিব হয়, যারা আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা ও বড়ত্বকে মানে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিআল্লাহু আনহু বলেন যে, আমি তোমাদেরকে যে সকল কথা বলে থাকি, সেগুলো হয়তো কোন নবির বাণী অথবা কোন আসমানী গ্রন্থের বাণী। নিশ্চয় যখন কোন বান্দা গুনাহ করে এবং তারপর উক্ত গুনাহের উপর চোখের পলক পরিমাণ অনুতপ্ত হয়, তখন উক্ত গুনাহ তার ঐ চোখের পলক ফেলার পূর্বেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়। [১৭]
টিকাঃ
[১৫] হিলইয়াতুল আউলিয়া; কানযুল উম্মাল: কিতাবুত তাওবা
[১৬] মাওজিবু দারুস সালাম
[১৭] তাবরানী
📄 খাটি তাওবা
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: التَّوْبَةُ مِنَ الذَّنْبِ أَنْ يَتُوْبَ مِنْهُ ثُمَّ لَا يَعُودَ فِيْهِ
“হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন— গুনাহ থেকে খাঁটি তাওবা হল, উক্ত গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং পুনরায় উক্ত গুনাহ আর না করা। "[১৮]
অর্থাৎ উক্ত গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
টিকাঃ
[১৮] মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/২৩৯; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৭৫২৪