📄 শয়তান তো মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কসম খেয়েছে
আল্লাহ তা'আলা আসমান-জমিন বানানোর সময়ই পশ্চিম দিকে তাওবার অনেক বড় দরজা বানিয়ে রেখেছেন। যেন তাঁর বান্দারা উক্ত দরজা দিয়ে অতিক্রম করে তাঁর নিকট পৌঁছতে পারে। অভিশপ্ত শয়তান আমাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিক্ষেপ করছে। আমাদের নফস শয়তানের সহযোগিতা করছে। শয়তান সামান্য একটি মুহূর্তও স্বস্তিতে বসে থাকে না। সে কসম খেয়েছে যে, আমি লোকদের সামনে-পেছনে, ডানে-বামে চতুর্দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ করব। সে কসম খেয়েছে যে, আমি লোকদেরকে পথ ভ্রষ্ট করব। সে কসম খেয়েছে যে, আমি মানুষকে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জোরদার মেহনত করব। শয়তান তার সৈন্যসামন্তসহ আমাদের উপর আক্রমণরত। সে ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ পরিবর্তন করে। সে আমাদেরকে পরকাল থেকে উদাসীন করে দেয়। সে আমাদের সময়কে ধ্বংস করে। সে আমাদেরকে নষ্ট বন্ধুত্বে ফাঁসিয়ে দেয়। সে আমাদেরকে জিহাদ-কিতাল থেকে দূরে রাখে। সে আমাদেরকে দুনিয়ার চাকচিক্যের মাঝে ফাঁসিয়ে দেয়। আর আমরা দুর্বল মানুষ ঝড়ে আক্রান্ত নৌকার মত ঘুরপাক খাচ্ছি। আমাদের নিচে জাহান্নামের অতল গহ্বর এবং জান্নাত অনেক উপরে এবং অনেক দূরে। আশ্চর্য রকম কষ্ট ও পেরেশানির এক পরিবেশ। এক গুনাহের পর আরেক গুনাহ। এক ভুলের পর আরেক ভুল এবং এক ব্যর্থতার পর আরেক ব্যর্থতা। শয়তান ডেকে ডেকে বলছে— তোমরা জান্নাতের ধারে-কাছেও যেতে পারবে না। সুতরাং মেহনত করা ছেড়ে দাও এবং দুনিয়ায় কিছু দিন আনন্দ-ফুর্তি করে নাও। আর আমাদের নফসও আমাদেরকে বার বার শয়তানের সাথে মিলিত করছে। আর বুঝাচ্ছে যে, নেকির রাস্তা অনেক কঠিন এবং তোমরা দুর্বল। নিরাশার এই অমানিশায় কুরআনুল কারিমের একেকটি বাক্য আলো হয়ে ঝরে। আমার আল্লাহ শয়তানকে বলেন—
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ
“(হে শয়তান! তুমি যতই চেষ্টা কর) নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই।”
আল্লাহ তা'আলার বান্দা, আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত গোলাম। তাদের বড় গুণ হল-"ইখলাস"। আর ইখলাস হল সকল আমল একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই করে এবং তাওবার দরজার দিকে দৌড়ে চলে যায়। অর্থাৎ দ্রুত তাওবা করে। শয়তান তাকে ফেলে দেয় সে আবার উঠে দৌড় দেয়। নফস তাকে বসিয়ে দেয়, সে দাঁড়িয়ে পুনরায় দৌড় দেয়। আল্লাহ তা'আলার দিকে এবং তাওবার দরজার দিকে দৌড়ায়। সে জানে যে, তার গুনাহ আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে বেশি নয়। সে জানে যে, আল্লাহ তা'আলার ব্যবস্থাপনা দুনিয়ার ব্যবস্থাপনার থেকে ভিন্ন। এক দিনে যদি সত্তরটি গুনাহও হয়ে যায়, তাহলেও তাওবার দরজা খোলা। তাওবার এক ফোঁটা অশ্রু জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনকে নিভিয়ে দেয়। সে জানে যে, আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত এমন কেউ নেই, যার নিকট আমাদের আশ্রয় মিলবে এবং আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের উপর অনেক অনুগ্রহশীল।
টিকাঃ
১৩. বনি ইসরাইল- ১৭: ৬৫
📄 দৈনিক ৭০ বার ইস্তিগফার
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ فِي مَسِيْرِهِ فَقَالَ اسْتَغْفِرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرْنَا فَقَالَ: أَتِمُوْهَا سَبْعِينَ مَرَّةً؛ فَأَتْمَمْنَاهَا فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَا مِنْ عَبْدٍ وَلَا أَمَةٍ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي يَوْمِهِ سَبْعِينَ مَرَّةً إِلَّا غَفَرَ اللهُ لَهُ سَبْعَمِائَةِ ذَنْبٍ وَقَدْ خَابَ عَبْدُ أَوْ امَةٌ عَمِلَ فِي يَوْমٍ وَلَيْلَةٍ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِمِائَةِ ذَنْبٍ
“হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে যাওয়ার সময় ইরশাদ করেন-তোমরা ইস্তিগফার কর, আমরা ইস্তিগফার করলাম। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় ইরশাদ করেন- দৈনিক ৭০ বার পূর্ণ কর। আমরা ৭০ বার পূর্ণ করলাম। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-যে বান্দা-বান্দি দৈনিক ৭০ বার আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করবে তথা ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তা'আলা তার সাতশত গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর ধ্বংস হোক ঐ বান্দা-বান্দি যে দৈনিক সাতশতেরও অধিক পরিমাণ গুনাহ করে। অর্থাৎ সাধারণত এমনটি হয় না। কোন মানুষের গুনাহ যদি সাতশতের অধিক হয়েও যায়, তাহলেও ইস্তিগফার করলে তার সকল গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়।"
টিকাঃ
১৯. সুনানে বায়হাকী
📄 তাসবিহ ও ইস্তিগফারের শক্তি
তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে—
যখন লটারীতে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের নাম এলো, তিনি তখন সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। আল্লাহ তা'আলা সমুদ্রের (যেমনি হযরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহুর বক্তব্য) একটি বড় মাছকে প্রেরণ করলেন। আর সেই মাছ এসে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে গিলে ফেলল। আল্লাহ তা'আলা তখন মাছকে নির্দেশ দিলেন যেন ইউনুস আলাইহিস সালামের গোশত-হাড়ির কোন কিছুর ক্ষতি না হয়। কেননা ইউনুস আলাইহিস সালাম তোমার রিযিক নয়, বরং তোমার পেট তাঁর জন্য বন্দিশালা।
মাছটি যখন হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে পেটে নিয়ে সমুদ্রের কিনারায় পৌঁছল, তখন তিনি সেখানে তাঁর বিশ্রামস্থলে পাথরের তাসবিহ শুনতে পেয়ে তিনিও তাসবিহ পাঠ করলেন—
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
আউফ আল-আরাবী রাহি. বলেন—
হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম যখন মাছের পেটে পৌঁছলেন, তখন তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যু হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি তাঁর পা নাড়ালেন। তখন তিনি সেখানে সিজদা করলেন এবং আরজ করলেন- হে আমার রব! আমি আপনার জন্য এমন জায়গাকে সিজদার জায়গা বানিয়েছি, যেখানে মানুষের মধ্যে কেউই পৌঁছেনি।
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তা'আলা যখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেটে বন্দি করার ইচ্ছা করলেন, তখন উক্ত মাছকে নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে তোমার পেটে নিয়ে নাও। এমনভাবে পেটে নেবে যেন না তাঁর শরীরের গোশতের কোন ক্ষতি হয় এবং না তাঁর কোন হাড্ডি ভেঙ্গে যায়। মাছটি যখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে পেটে নিয়ে সমুদ্রের কিনারায় পৌঁছল, তখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম সেখানে ক্ষীণ একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি তখন নিজের মনে মনে ভাবতে লাগলেন যে, এটা কী? আল্লাহ তা'আলা তখন তাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করলেন যে, এটা হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীদের তাসবিহ। তখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটের ভেতরে আল্লাহ তা'আলার তাসবিহ পড়া শুরু করলেন। ফেরেশতারা যখন তাঁর তাসবিহ শুনলেন, তখন বলতে লাগলেন-হে আমাদের রব! আমরা কোন এক আশ্চর্য জায়গা থেকে ক্ষীণ একটি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, এটা আমার বান্দা ইউনুস। সে আমার অবাধ্যতা করেছে। তাই আমি তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে মাছের পেটে বন্দি করে রেখেছি। ফেরেশতারা আরজ করলেন-ঐ বান্দা যার নেক আমল প্রতিদিন প্রতিরাত আপনার নিকট পৌঁছত? আল্লাহ তা'আলা বললেন, হ্যাঁ! ফেরেশতারা তখন তাঁর জন্য সুপারিশ করলে আল্লাহ তা'আলা মাছকে নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে সমুদ্রের উপকূলে ছেড়ে দাও।
ক. আম্বিয়ায়ে কেরাম সকল গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে থাকেন। এখানে নাফরমানী বা অবাধ্যতার দ্বারা উদ্দেশ্য হল-খেলাফে আফজল তথা অনুত্তমকে নিজের মতে অবলম্বন করা।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
ইস্তিগফারের শক্তি ও ক্ষমতা দেখুন। মাছের পেট থেকে আরশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে এবং ফেরেশতারা শুনেছেন এবং সুপারিশ করেছেন।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আবু দাউদ: হাদিস নং ৪৪৫৭
২. তাফসীরে ইবনে কাসীর
৭. প্রাগুক্ত
📄 হজরত আদম আলাইহিস সালামকে শিক্ষা দেওয়া ইস্তিগফার
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, সুরাবাকারার ৩৭ নং আয়াত- ফَتَلَقَّى آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
এর তাফসীরে বলেন, এ আয়াতে বর্ণিত কালিমা হল-
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْلِ إِنَّكَ أَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ؛ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ؛ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَتُبْ عَلَى إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
অর্থ: হে আল্লাহ আপনি পবিত্র। আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি অপরাধ করেছি এবং নিজের উপর জুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি সকল ক্ষমাকারীর মধ্যে সর্বোত্তম। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আপনি প্রশংসার যোগ্য। আমি অপরাধ করেছি, নিজেই নিজের উপর জুলুম করেছি। আমার উপর অনুগ্রহ করুন। কেননা আপনি সকল অনুগ্রহকারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহকারী। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র প্রশংসার যোগ্য। আমি অপরাধ করেছি, নিজেই নিজের উপর জুলুম করেছি। আমার তাওবা কবুল করুন। বাস্তবতা হল-আপনি বার বার তাওবা কবুলকারী ও অতি দয়ালু।
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু এটা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মুহাদ্দিসিনে এতে সন্দেহ পোষণ করেছেন।
টিকাঃ
১১. বায়হাকী; তারগীব ওয়াত তারহীব