📄 জমিন বিদীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে
আরবী একটি প্রবাদ আছে যে, উত্থানের শেষ প্রান্তে ধ্বংসের সূচনা হয়ে থাকে। পৃথিবীতে একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এ যুদ্ধকে প্রতিরোধ করা তো এখন অসম্ভব মনে হচ্ছে। কুদরত এবং ফিতরাত জমিনের অধিবাসীদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি ডেকে ডেকে আজাবকে আহ্বান করছে। উপরে-নিচে, ডানে-বামে সর্বদিকে শুধু গুনাহ আর গুনাহ। কুফর, শিরক, বিদ'আত, সুদ, বেহায়াপনা, খিয়ানত, ধোঁকা, হত্যা ও লুণ্ঠন, ব্যক্তিপূজা, দুনিয়াপূজা, ক্যাবল, ইন্টারনেট, মোবাইল এবং মাদক। মানুষের অন্তর গুনাহের আকর্ষণে এমনভাবে পূর্ণ যে, কারো অন্তরই পূর্ণ হয় না। এক গুনাহের পরে অপর গুনাহ এবং তার থেকেও আরও সামনে। হে আল্লাহ রহম করুন। বর্তমানে যুদ্ধ থেকে পৃথিবীকে কে বাঁচাবে। লোভ-লালসার আগুন যুদ্ধে পরিণত হয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হোক কিংবা কমিউনিজম সবকিছুর পেছনেই রয়েছে বিভিন্ন লোভ-লালসা। জমিনের অধিবাসীরা জমিনকে গুনাহ দিয়ে ভরে ফেলেছে। তাই এখন জমিন বিদীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আগে তো কাফিরদের মধ্যে শোনা যেত, এখন মুসলমানদের মধ্যেও এ ধরনের ঘটনাবলী ব্যাপক হয়ে গেছে যে, ভাইয়ের হাতে বোনের এবং বাবার হাতে কন্যার ইজ্জত নিরাপদ নয়। হ্যাঁ! বর্তমানে জমিন গাফলত, গুনাহ ও ধ্বংসে ভরপুর হয়ে গেছে।
এমতাবস্থায় তো যুদ্ধ হয় এবং তাও অন্ধ যুদ্ধ। আর এ অন্ধ যুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত কঠিন হয়ে থাকে যে, কে হক আর কে বাতিল। যেখানেই মুসলমান পরস্পরে যুদ্ধ করছে সেখানে উভয় পক্ষের অবস্থাই অনেক শোচনীয়। কারোই শরীয়াতের কোন তোয়াক্কা নেই। শুধু রাগ, ক্রোধ ও প্রতিশোধ। এমন মনে হয় যে, পৃথিবীর অনেক বড় একটি জনপদ যুদ্ধের শিকার হয়ে মারা যাবে। বর্তমান যুগের প্রযুক্তি পরস্পরে লড়াই করে জীবন দিয়ে দেবে। এখন এমতাবস্থায় আমাদের কি করা উচিত? অবশ্যই রুজু ইলাল্লাহ তথা আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন, তাওবা ও ইস্তিগফার, ইমানের উপর অটল থাকা এবং খালেস শরয়ী জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।
📄 আত্মসমালোচনা ও ইস্তিগফার
গুনাহ যখন মানুষকে বেষ্টন করে নেয়, তখন তাওবা করা কঠিন হয়ে যায়। আর গুনাহ মানুষকে তখনই বেষ্টন করে, যখন অন্তর থেকে অনুতপ্ততা ও লজ্জা বের হয়ে যায়। আর অনুতপ্ততা ও লজ্জা অন্তর থেকে তখনই বের হয়, যখন মানুষ অন্যের প্রতি কুধারণা করে। সে চিন্তা করে যে, অমুকের মধ্যেও তো এই গুনাহটি রয়েছে। সুতরাং আমি যদি করে ফেলি তাহলে কি হবে? মূলত কারও গুনাহের কারণে নিজের জন্য উক্ত গুনাহ করা হালাল হয়ে যায় না এবং আপনার কি জানা আছে যে, অমুকে তো হয়তো তাওবাও করে নিয়েছে। অথবা তার গুনাহ থেকে নেক আমল বেশি। এজন্য গুনাহের ব্যাপারে শুধুমাত্র নিজের দিকে দেখা উচিত, অন্যের দিকে নয়। সর্বদা নিজের আত্মসমালোচনা করুন এবং যে সকল গুনাহ দৃষ্টিগোচর হয়, তার উপর তাওবা-ইস্তিগফার করুন। এই আমল কখনো ছাড়া উচিত নয়। এই আমল হল ধোলাইয়ের ন্যায়। আমরা প্রতিদিন পাত্র ধৌত করে থাকি। কাপড় ধৌত করে থাকি। ঘর পরিষ্কার করে থাকি। যদি শুধুমাত্র দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পাত্র ধৌত না করা হয়, কাপড় ধৌত না করা হয় এবং ঘর পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে আমাদের গোটা পরিবেশ দূষিত, দুর্গন্ধ ও অপবিত্রতায় ভরে যাবে। ঠিক একই অবস্থা অন্তরের পরিচ্ছন্নতার। আমরা তার ধোলাই ও পরিচ্ছন্ন করা ছেড়ে দিলে, তাতে দুর্গন্ধ এবং অপবিত্রতা তাদের ঘর বানিয়ে নেবে। আল্লাহ তা'আলা এমন অবস্থা থেকে আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমিন।
📄 তিন শত্রু
বর্তমান সময় হল পেরেশানি ও মুসিবতের সময়। এমতাবস্থায় শয়তান পথভ্রষ্টতা, ভীরুতা ও হতাশার দিকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। কানে কানে এসে বলে, নিজের জীবনকে ধ্বংস করছ? কেন এই মুসিবতে লিপ্ত রয়েছ? একটু নত হয়ে যাও। কিছুটা আরাম কর। নিজের জীবনকে কিছুটা উন্নত বানাও। ঐ অভিশপ্ত আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বেই মারতে চায়। কেননা ইমানী দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীনি কাজহীন জীবন মৃত্যু থেকেও নিকৃষ্ট। এটা তো হল শয়তান। যেখানে আরেক শত্রু হল আমাদের নফস। আমাদেরকে একে অপরের দোষচর্চায় লিপ্ত করে দেয়। অমুকের এই ভুলের জন্য এটা হয়েছে। অমুকের ঐ ভুলের জন্য ঐটা হয়েছে। বস্তুত আমরা মুসিবতের সময় তিন শত্রুর ফাঁদে ফেঁসে যাই। এক তো হল স্বয়ং উক্ত মুসিবত। দ্বিতীয়ত শয়তান। তৃতীয়ত হল নফস। এমতাবস্থায় খুলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম প্রিয় খলিফা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় জামাতা, ইলম ও বীরত্বের মূর্তপ্রতীক সাইয়্যেদুনা হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। কিছু সময়ের জন্য নির্জনে বসে যাও। নির্জনে বসলে নিজের ভেতরটা যাচাই করা সহজ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নামসমূহের মাধ্যমে তাঁকে ডাক। যখন লাইন সংযুক্ত হয়ে যাবে, তখন নিজের গুনাহসমূহ নির্বাচন করে করে এমনভাবে আঘাত কর, যেমনভাবে বিষাক্ত সাপ এবং শত্রুকে মারা হয়। এটা অনেক বড় চিকিৎসা এবং এটাই এই সমস্যার সমাধান।
📄 একটি বিস্ময়ককর ঘটনা
হজরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ রাহি. বলেন-হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি, খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে একবার আমার পিতা হজরত উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট তাশরিফ আনলেন এবং বললেন-রাতে আমি একটি আশ্চর্য বস্তু দেখেছি। আমি আমার ঘরের ছাদের উপর বিছানায় শুয়েছিলাম। তখন আমি নিচে রাস্তায় কিছু হট্টগোল শুনে উকি মেরে নিচের দিকে দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম রাতে শিকার তালাশকারী কোন জন্তুর আওয়াজ। কিন্তু তা ছিল মূলত শয়তানদের বিভিন্ন দল। অতঃপর এ সবগুলো দল আমার ঘরের পেছনের খালি জায়গায় একত্রিত হল। তারপর তাদের সর্দার ইবলিসও এসে উপস্থিত হল। এরা সকলে যখন ইবলিসের নিকট একত্রিত হল, ইবলিস তখন উচ্চ আওয়াজ দিয়ে বলল-তোমাদের মধ্যে কে আছো, যে উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের (রাদিআল্লাহু আনহু) এর জন্য যথেষ্ট হবে। (অর্থাৎ কে তার নিকট গিয়ে তাকে বিপথগামী করবে এবং ক্ষতিসাধন করবে)। শয়তানদের একটি গ্রুপ বলল, আমরা। অতঃপর সেই দলটি চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলতে লাগল, আমরা তাকে কোনভাবেই কাবু করতে পারিনি। ইবলিস এটা শুনে এত জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল যে, আমার মনে হল তার চিৎকারে যেন জমিন ফেটে গেছে। সে পুনরায় তার উক্ত ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করল। তখনও শয়তানদের একটি দল চলে গেল এবং অনেকক্ষণ পরে এসে বলতে লাগল-আমরা তার কিছুই করতে পারিনি। এটা শুনে ইবলিস রাগান্বিত অবস্থায় সেখান থেকে চলে গেল এবং সকল শয়তানরাও তার পেছনে পেছনে চলে গেল।
হজরত উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের রাদিআল্লাহু আনহু এ ঘটনা শুনে বললেন, আমার পিতা হজরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রাদিআল্লাহু আনহু আমাকে বলেছেন, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি দিনে বা রাতের শুরুতে এই দু'আটি পাঠ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ইবলিস এবং তার দল থেকে নিরাপদ রাখবেন। দু'আটি হল-
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ذِي الشَّانِ عَظِيمِ الْبُرْهَانِ شَدِيْدِ السُّلْطَانِ مَا شَاءَ اللهُ كَانَ أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَنِ
অর্থ: আল্লাহ তা'আলার নামে যিনি রহমান ও রাহিম এবং মর্যাদাসম্পন্ন। বড় প্রমাণওয়ালা। সুদৃঢ় ক্ষমতাশীল। আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হয়ে থাকে। আমি শয়তান থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে, শয়তানদের থেকে, জালিমদের থেকে এবং নফসে আম্মারার ক্ষতি থেকে হেফাজত করুন।
আমিন ইয়া রাব্বাল মুসতাদআফীন।