📄 ইস্তিগফারের বরকতের আশ্চর্য একটি ঘটনা
হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, একবার সফরে ছিলেন। ইরাকের দূরবর্তী কোন এক গ্রামে রাত হয়ে যায়। সেখানে না ছিল কোন পরিচয় এবং না ছিল কোন ঠিকানা। তাই ইচ্ছে করলেন যে, মসজিদে গিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবেন। মসজিদে গেলে মসজিদের দারোয়ান মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। তাকে অনেক বুঝালেন কিন্তু সে কোনভাবেই মানল শাস্ত্র। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি. বলেন-আমি মসজিদের বারান্দায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু এখানেও সেই দারোয়ান আমার পিছু ছাড়ল না। সে আমার পায়ে ধরে ধাক্কা দিয়ে মসজিদের বারান্দা থেকেও বের করে দিল। তখন একজন রুটিওয়ালা এই দৃশ্যটি দেখে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-কে অনুরোধ করে নিজের ঘরে রাত কাটানোর জন্য নিয়ে গেলেন এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-কে অনেক সম্মান করলেন। অতঃপর সে আটা পেষার জন্য বাইরে বের হল। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, দেখলেন এবং শুনতে পেলেন যে, সে চলতে-ফিরতে ও আটা পেষতে পেষতে সর্বদা ইস্তিগফার করছে। সকালে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি. তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, এটা তার নিয়মিত আমল। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, তখন জিজ্ঞেস করলেন যে, এই আমলের বাহ্যিক কোন উপকার ও ফলাফল সে দেখেছে কিনা? সে বলল, হ্যাঁ! আমি যে দু'আ ই করি কবুল হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি দু'আ কবুল হয়নি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কী দু'আ? সে বলল, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-এর সাক্ষাত লাভের দু'আ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, বললেন, আমিই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.। তোমার এই দু'আও কবুল হয়েছে এবং আমাকে ধাক্কা দিয়ে তোমার নিকট আনা হয়েছে।
📄 ইস্তিগফারের মত মহৌষধ কেন ব্যবহার করি না?
ইস্তিগফারের ফাজায়েল, উপকারিতা ও কার্যকারিতা অনেক আশ্চর্যজনক। কিন্তু সাধারণত মানুষের এর প্রতি কোন প্রকার মনোযোগ আকর্ষণ হয় না। এটাও গুনাহের একটি মন্দ প্রভাব যে, ইস্তিগফারের এত বড় বড় উপকারিতা কুরআন-সুন্নাহতে পাঠ করেও মানুষ ইস্তিগফারকে অবলম্বন করে না। পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাওবা ও ইস্তিগফারের যে ফাজায়েল ও উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে যে, এর উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা যাবে। কয়েকদিন পূর্বে আরবের এক আলেমার একটি লেখা দৃষ্টিগোচর হয়। তাকে আল্লাহ তা'আলা ইস্তিগফারের বড় বড় অনেক বারাকাহ ও উপকারিতা নসিব করেছেন। সে লিখে-হে দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানিতে পতিত মুসলিম বোনেরা! হে কেঁদে কেঁদে নিজেকে ধ্বংসকারী বোন আমার! হে পরীক্ষা, অবমূল্যায়ন ও বেদনায় নিপতিত বোন আমার! তোমরা ইস্তিগফারের মহৌষধ কেন ব্যবহার করছ না। এটা সকল আঘাতের মলম এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট, পেরেশানি, দুশ্চিন্তা ও বিপদের চিকিৎসা। অবশ্যই এ সকল কথা সম্পূর্ণ সত্য এবং ইস্তিগফারের উপকারিতার একটি ঝলক মাত্র। আর না হয় যে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বীয় রবকে সন্তুষ্ট করে নেয়, তার দুনিয়া ও আখিরাতের কোন বস্তু আছে যা সে পায়নি।
📄 ইস্তিগফারের উপকারিত সর্বস্তরের লোকের জন্য
একটি কথা খুব ভালোভাবে মন-মস্তিষ্কে বসিয়ে নিন যে, তাওবা-ইস্তিগফার অনেক বড় এবং অনেক মহান নি'আমত। কিন্তু আফসোস আমরা এই নি'আমত থেকে উদাসীন এবং তার ফলাফল থেকে বঞ্চিত। বিশ্বাস করুন, কোন মুজাহিদের যদি অধিক পরিমাণে তাওবা-ইস্তিগফারের আমলের প্রতি অভ্যাস হয়ে যায়, তাহলে সকল রণাঙ্গনে তাদের শক্তি সীমাহীন বৃদ্ধি পাবে এবং দুশমন পলায়নের পথ পাবে না। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন, উলামায়ে কেরাম যদি অধিক পরিমাণে তাওবা-ইস্তিগফারের আমলের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তাদের ইলমে সীমাহীন বরকত হয়ে যাবে এবং তাদের কলম এবং কণ্ঠের মধ্যে ঐ নুসরাত অবতীর্ণ হবে, যা আসলাফ তথা পূর্বসূরিদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তো তিনিই আছেন, যিনি পূর্বে ছিলেন। তিনি আওয়ালও আখেরও। জাহেরও বাতেনও। আসলাফের আল্লাহও তিনি এবং বর্তমানে আমাদের আল্লাহও তিনিই。
আপনি বিশ্বাস করুন যে, যদি মুসলিম উম্মাহর নারীদের মধ্যে অধিক পরিমাণে তাওবা ও ইস্তিগফারের অভ্যাস হয়ে যায়, তাহলে জমিনে ইসলামের বিজয়ের পথ তৈরি হয়ে যাবে। নারীরা যখন অধিক পরিমাণে সাদাকাহ ও ইস্তিগফারের আমল করে, তখন জাহান্নামের পথ এবং কাজসমূহ থেকে সরে জান্নাতের পথ ও কাজের মধ্যে এসে যায়। তখন তারা দীনে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আনসার তথা সাহায্যকারী সৃষ্টি করে। আমার আকা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদেরকে অধিক পরিমাণে সাদাকা ও ইস্তিগফারের নির্দেশ দিয়েছেন।
আপনি বিশ্বাস করুন যে, যদি মুসলিমদের মধ্যে অধিক পরিমাণে বিপদ-মুসিবত, রোগ-ব্যাধি, অস্থির অবস্থা, ঋণ ও খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, তখন যদি তারা অধিক পরিমাণে তাওবা ও ইস্তিগফারের আমলের প্রতি ধাবিত হয়, তাহলে খুব দ্রুত তাদের এই অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে এবং তারা এমন পরিবর্তন দেখতে পাবে যে, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারবে না। আপনি বিশ্বাস করুন! এ কথাগুলোর মধ্যে কোন বাড়াবাড়ি কিংবা অতিরঞ্জন নেই। বরং পবিত্র কুরআনুল কারিমের আয়াত এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহে এরচেয়েও অধিক তাওবা-ইস্তিগফারের উপকারীতা, বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা বর্ণিত হয়েছে। এজন্য এ সংক্রান্ত যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে, তা অতিরঞ্জন তো নয়-ই বরং শুধুমাত্র সামান্য অনুবাদ মাত্র।
আপনি শুধুমাত্র চল্লিশ দিন পূর্ণ মনোযোগ, ইখলাস ও অধিক পরিমাণে তাওবা-ইস্তিগফার নিয়মিত দৈনিক হাজার বার আমল করুন। দেখবেন তখন আপনার চিৎকার করে কান্না আসবে যে, জানা নেই অতীতে এই নি'আমত থেকে বঞ্চিত হয়ে কত কিছুই না হারিয়েছি।
ঈদুল আজহার পরে নিয়মিত ইস্তিগফারের আমলের কথা লিখেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! বর্তমানে হাজারো-লাখো মানুষ দৈনিক হাজার বার ইস্তিগফার করছে এবং বাহ্যিক ফলাফল আলহামদুলিল্লাহ অনেক আশ্চর্যজনক। আর মূলত যা পাওয়ার তাতো আখিরাতে পাবো।
📄 রিজিকের প্রশস্ততার পদ্ধতি
আমাদের অনেক মুসলিম ভাই-বোন রিজিকের প্রশস্ততার অজিফা জিজ্ঞেস করেন। অনেক লোক ঋণগ্রস্ত এবং অনেকেই অভাব-অনটনের কারণে পেরেশান। অধম এমন চিঠির জবাবে প্রত্যেকের অবস্থার প্রেক্ষিতে যে অজিফা কিংবা আমল ভাল মনে হয় তা লিখে দেই। আলহামদুলিল্লাহ অনেক ব্যক্তিকেই আল্লাহ তা'আলা উপকৃতও করেছেন। আর কারো কারো ক্ষেত্রে এই ক্ষতিও হয়েছে যে, তারা অধিক সম্পদশালী হওয়ার পর বদলে গেছে। আম্বিয়া আলাইহিস সালামদের মধ্যে হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম নিজে বাদশাহ এবং শাসকও ছিলেন। কিন্তু তিনি এমন সম্পদশালী হওয়া থেকে সর্বদা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় কামনা করতেন, যা তাকে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য করে দেয়। তাঁর দু'আসমূহের মধ্যে নিম্নের তিনটি দু'আও প্রসিদ্ধ-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنْ كُلِّ فَقْرٍ يُنْسِيْنِي
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় কামনা করছি এমন দরিদ্রতা ও অভাব-অনটন থেকে, যা আমাকে আপনার কথা ভুলিয়ে দেয়।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنْ كُلِّ عَنِّي تُطْعِيْنِي
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় কামনা করছি এমন সম্পদশালী হওয়া থেকে, যা আমাকে আপনার অবাধ্য করে দেয়।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُبِكَ مِنْ كُلِّ عَمَلٍ تُخْزِينِي
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় কামনা করছি প্রত্যেক এমন কাজ থেকে, যা আমাকে অপমানিত করে দেয়।
আল্লাহ তা'আলা আমার এবং আপনাদের সকলের ভাগ্য সৌভাগ্যে রূপান্তর করে দিন। আজ এমন একটি অজিফা বর্ণনা করছি, যা যে কেউ ইখলাস এবং মনোযোগের সাথে আদায় করে, তাহলে ইন শা' আল্লাহ অন্যান্য অনেক উপকারিতার সাথে সাথে এই উপকারও হবে যে, আর্থিক অনটন দূর হয়ে যাবে এবং ইন শা' আল্লাহ রিযিকের সমৃদ্ধি চলে আসবে। এটা এমন একটি আমল যার ফাজায়েল পবিত্র কুরআনুল কারিমের এসেছে এবং হাদিস শরিফেও। এই আমলের বরকতে রিযিকের অভাব দূর হওয়ার পাক্কা ওয়াদা রয়েছে এবং বড় কথা হল এই অজিফা স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন।
হাফেজ ইসমাইল বিন ফজল আল-আসবাহানী রাহি. তার তাফসীরে লিখেছেন যে, এক গ্রাম্য লোক খলিফা মানসূর আব্বাসীর নিকট আসল এবং তার সাহায্য কামনা করল। খলিফা মানসূর বললেন, আমি তোমাকে কোন সম্পদ দিতে পারব না, তবে একটি হাদিস শুনাচ্ছি। আমাকে এই হাদিসটি আমার পিতা তার পিতা থেকে এবং তার পিতা তার দাদা হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি দৈনিক এক হাজার বার আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করবে, সে বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই ধনী হয়ে যাবে। সেই গ্রাম্য লোকটি এই আমল শুরু করে দিল। যখন বছর প্রায় শেষের দিকে, তখন একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হল। যা শীলাও বর্ষণ হচ্ছিল। তখন সেই গ্রাম্য লোকটি আশ্রয়ের জন্য একটি গীর্জায় গিয়ে প্রবেশ করল। হঠাৎ করে তার সামনের জমিন ফেটে গেল। আর উক্ত ফাটার ভেতরে একটি কলসী ছিল, যার মধ্যে ছত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। এই বিষয়টি খলিফা মানসুর জানতে পারলেন। তিনি দাফনকৃত সম্পদ থেকে এক পঞ্চমাংশ আদায় করতেন। কিন্তু তিনি গ্রাম্য লোকটিকে তাও মাফ করে দিলেন।
এটা হল ঐ অজিফা, যার বর্ণনা পবিত্র কুরআনুল কারিমের বেশ কয়েকটি আয়াত ও বেশ কয়েকটি হাদিসেও এসেছে। উক্ত সকল আয়াত ও হাদিসসমূহ লিখতে গেলে অনেক বৃহৎ একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থের রূপ লাভ করবে। এজন্য আজকে শুধুমাত্র একটি হাদিসের উপর ক্ষ্যান্ত হচ্ছি
আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ এর বর্ণনা, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-
مَنْ لَزِمَ الْاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَةَ مِنْ كُلِّ هَمْ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَ رَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“অর্থাৎ যে ব্যক্তি সর্বদা অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সকল পেরেশানী থেকে মুক্তি ও সকল মুসিবত থেকে পরিত্রাণ এবং কল্পনাতীত রিজিক দান করবেন।”[৩২]
এই হাদিসটিতে তিনটি নি'আমতের কথা উল্লেখ রয়েছে। যার মধ্যে এটাও একটি যে, এমন পদ্ধতিতে রিজিক দান করবেন, যা তার চিন্তা-ভাবনা ও কল্পনার অতীত। ইস্তিগফার বলা হয়-কৃত গুনাহের উপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। এখন আপনারা জিজ্ঞেস করবেন যে, কোন ইস্তিগফার পড়ব? আসলে কথা হল শুধুমাত্র পড়া নয় বরং ইস্তিগফার করা তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেগুলো আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়ে গেছেন। সেগুলো থেকে যে কোন একটা পড়লেই হবে।
টিকাঃ
[৩২] সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ১৫১৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩৮১৯