📄 হজরত লোকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ
হজরত লোকমান আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রকে বললেন-হে আমার প্রিয় পুত্র! স্বীয় জিহ্বাকে اَللَّهُمَّ اغْفِرْلِی তথা হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন। এই দু'আয় অভ্যস্ত বানাও। কেননা আল্লাহ তা'আলার নিকট অনেক মুহূর্ত এমন রয়েছে, যে মুহূর্তে তিনি কারো দু'আ ফিরিয়ে দেন না। দেখুন! মাগফিরাত কতটা জরুরি বস্তু যে, সর্বদা কামনা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
হজরত কাতাদাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-এই পবিত্র কুরআন তোমাদের রোগও বলে দেয় এবং উক্ত রোগের চিকিৎসাও বলে দেয়। সুতরাং তোমাদের রোগ হল গুনাহ। আর তোমাদের চিকিৎসা হল ইস্তিগফার। আবুল মাহবাল রাহি. বলেন-কবরে কোন বান্দার জন্য ইস্তিগফারের চেয়ে অধিক প্রিয় কোন সঙ্গি হবে না।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহি. এর নিকট কেউ একজন জিজ্ঞেস করল যে, আমরা কি অধিক পরিমাণে তাসবিহ পড়ব নাকি ইস্তিগফার? তিনি বললেন-কাপড় যদি পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাহলে সুগন্ধি ব্যবহার করাই উত্তম। আর যদি কাপড় অপবিত্র ও অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন এবং ময়লাযুক্ত দুর্গন্ধময় হয়, তাহলে সাবান ব্যবহার করাই উত্তম। আর আমরা তো অধিকাংশ লোক অপবিত্র ও অপরিষ্কার- অপরিচ্ছন্ন এবং ময়লাযুক্তই থাকি। অর্থাৎ তাসবিহ হল সুগন্ধির মত। আর ইস্তিগফার হল সাবানের মত। মূলত ইস্তিগফার হল পবিত্রতা ও পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার ঐ মুষলধার বৃষ্টি, যা মানুষকে ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকে পবিত্র করে দেয়। সবচেয়ে বড় পবিত্রতা তো হল এর দ্বারা আমলনামা পবিত্র হয়ে যায়। এই আমলনামা কাউকে ডান হাতে এবং কাউকে বাম হাতে প্রদান করা হবে। একটি ফিল্ম দেখলে আমলনামা কি পরিমাণ কালো হয়? মিথ্যা বললে আমলনামা কি পরিমাণ কালো হয়? অধিক কথাবলা ব্যক্তিরা তো একাধারে বলতেই থাকে। ফরায়েজের মধ্যে দুর্বলতা। বদ নজর বা কুদৃষ্টি, হারামখোরী ও খিয়ানত। কোন কোন গুনাহ আজ উম্মতকে বেষ্টন করে আছে, তা যদি তালিকা করা হয়, তাহলে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থের রূপ ধারণ করবে। তার বিপরীতে তাওবার পরিমাণ কত? ইস্তিগফারের পরিমাণ কত? গুনাহ মূলত ঐ চর্বির মত যা অন্তরের ধমনীতে যদি জমে যায়, তাহলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। গুনাহ ঐ জালের ন্যায়, যা মুক্তারূপে দৃষ্টিগোচর হলে চোখ খারাপ হয়ে যায়। গুনাহ হল ঐ কাদার ন্যায়, যা পানির পাইপে আটকে গেলে পানি বন্ধ হয়ে যায়। গুনাহ হল ঐ ময়লা- আবর্জনার ন্যায়, যা কোন জায়গায় জমা হয়ে গেলে সেখানে পোকা- মাকড় সৃষ্টি হয়ে যায়। গুনাহ হল ঐ মরিচার ন্যায়, যা বড় বড় কার্যকরী মেশিনারিজকেও বেকার করে দেয়। গুনাহ হল ঐ বিষের ন্যায়, যা রক্ত কিংবা অন্য কোন অঙ্গে যদি হয়ে যায়, তাহলে ক্যান্সার হয়ে যায়। আর ইস্তিগফার হল উক্ত সকল রোগের চিকিৎসা। আমাদের গুনাহসমূহ উক্ত পাইপলাইন ও পথসমূহকে বন্ধ করে রেখেছে, যা দিয়ে রহমত, প্রশান্তি, শক্তি ও হালাল রিজিক অবতীর্ণ হয় এবং যা অতিক্রম করে আমাদের দু'আসমূহ উপরে আরশ পর্যন্ত পৌছে।
📄 ইস্তিগফারের কয়েকটি ঘটনা
জনৈক মহিলা তার ঘটনা লিখে-সে ত্রিশ বছর বয়সে বিধবা হয়ে যায়। সাথে তার পাঁচটি বাচ্চা। না আছে থাকার মত জায়গা এবং না আছে খাওয়া-দাওয়ার কোন ব্যবস্থা। পাঁচটি বাচ্চা এবং একাকিনী একজন বিধবা মহিলা। দুঃখ-কষ্টের অনুমান করা কঠিন নয়। অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার উক্ত দিনগুলোতে সে রেডিওতে এই হাদিসটি শুনেছে-
مَنْ لَزِمَ الْاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمَ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَ رَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"অর্থাৎ যে ব্যক্তি সর্বদা অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সকল পেরেশানী থেকে মুক্তি ও সকল মুসিবত থেকে পরিত্রাণ এবং ধারণা বহির্ভুত রিজিক দান করবেন।"[৩১]
সে ইমানদার নারী ছিল। বলতে লাগল যে, সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। সে নিজেকে এবং তার বড় বাচ্চাকে ইস্তিগফারে লাগিয়ে দিল। রাত-দিন ইস্তিগফার। হাজার বার ইস্তিগফার। এখনো ছয় মাস অতিবাহিত হয়নি। উত্তরাধিকারের কাগজপত্র পেয়ে যায়। দেখতে দেখতে থাকার জন্য নিজস্ব ঘর পেয়ে যায়। সাথে কয়েক লাখ টাকা ও সবকিছুর ব্যবস্থা। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী ব্যক্তি অনেক প্রিয়। তাকে তিনি অন্য কারো মুখাপেক্ষী করেন না। উক্ত আল্লাহর বান্দী শুকরিয়া আদায় করলেন এবং ইস্তিগফারকে চালু রাখলেন। বাচ্চাদেরকে কুরআনুল কারিমের তা'লীম ও হিফজের মধ্যে লাগিয়ে দিলেন।
কয়েক বছর পূর্বে এক বুজুর্গের সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের ওলী ছিলেন। কোন কোন আল্লাহওয়ালাগণ তো অনেক নরম স্বভাবের হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ হয় একটু কঠোর স্বভাবের। উভয় প্রকার বুজুর্গদের থেকেই মাখলুক উপকৃত হয়ে থাকে। আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস শরিফে যে সকল বস্তুকে রোগের প্রতিশেধক বলা হয়েছে, তার মধ্যে মধু এবং হিজামা বা কাপিং থেরাপি অন্যতম। উভয়টির মাঝেই আল্লাহ তা'আলা রোগমুক্তি বা প্রতিশেধক রেখেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দাগণ ঠিক এমনই হয়ে থাকেন। কেউ মধু তথা নরমভাবে চিকিৎসা করেন আবার কেউ হিজামা তথা কঠোরভাবে চিকিৎসা করেন। উক্ত বুজুর্গ কঠোর স্বভাবের ছিলেন। বাইয়াতের জন্য আগমনকারী অধিকাংশেরই বাইয়াত গ্রহণ করতেন না। আর যদি কারো উপর সদয় হতেন, তাহলে বলতেন তিন দিন সিয়াম পালন করো এবং উক্ত তিন দিনে সোয়া লাখ বার ইস্তিগফার পূর্ণ কর। সুবহানাল্লাহ! অধিক পরিমাণে ইস্তিগফারের আশ্চর্য ফলাফল প্রকাশ পেত। কারো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাত লাভ হত। কারো সাথে আরও অন্য কোন নি'আমত লাভ হত।
কাজী আবু আলী আল-হাসান আত-তানুখী রাহি, একটি কিতাব লিখেছেন- كتاب الفرج بعد الشدة তথা কঠিন অবস্থার পরেই শান্তি ও প্রাচুর্য। এটি সংক্ষিপ্ত তবে অনেক উপকারী ও কার্যকরী একটি গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি নিজের ঘটনা লিখেন-আমাকে শত্রুরা বন্দি করে ফেললো এবং তাদের ইচ্ছা হল তারা আমাকে হত্যা করে ফেলবে। আমি বন্দিত্বের দিনগুলোর মধ্যে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের দু'আটি খুব বেশি বেশি পড়েছি। কারণ এই দু'আটিতে তাওহীদও রয়েছে, তাসবীহও রয়েছে এবং ইস্তিগফারও রয়েছে।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
তিনি বলেন, মাত্র নয় দিন লাগাতার পাঠ করার বরকতে আমি এমন কঠিন বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যাই।
আরবের এক যুবক তার নিজের ঘটনা লিখেন এবং আল্লাহ তা'আলার কসম খেয়ে বলেন যে, আমি যা লিখছি তা শতভাগ সত্য। আমি একজন অত্যন্ত দরিদ্র এবং দুঃখী ও সমস্যাগ্রস্ত মানুষ। অর্থকড়ির মুখাপেক্ষী ছিলাম। কোনভাবে সৌদি আরব গেলাম কিছু উপার্জন করার জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে গেলাম। আমার জানা ছিল যে, সৌদি আরবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি যদি নির্দোষও হয়, তবুও সে মুক্তি পেতে পেতে দু-এক বছর লেগে যাবে। আমি তখন ইস্তিগফারের আমল শুরু করে দিলাম। রাত-দিন ইস্তিগফার। দৈনিক হাজার বার ইস্তিগফার। তখন মাত্র ৮৪ দিন পরেই আমি ছাড়া পেয়ে গেলাম এবং তার পরের দিন জনৈক ব্যক্তি আমাকে ৬০ হাজার রিয়াল হাদিয়া দিলেন এবং তারপর থেকে অবস্থা পুরোপুরি উন্নতির দিকেই যেতে লাগল। এটা একেবারেই সত্য ঘটনা এবং এগুলো হল ঐ সমুদ্রের সামান্য ফোঁটা যা ইস্তিগফারের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে।
টিকাঃ
[৩১] সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ১৫১৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩৮১৯
📄 ইস্তিগফারের বরকতের আশ্চর্য একটি ঘটনা
হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, একবার সফরে ছিলেন। ইরাকের দূরবর্তী কোন এক গ্রামে রাত হয়ে যায়। সেখানে না ছিল কোন পরিচয় এবং না ছিল কোন ঠিকানা। তাই ইচ্ছে করলেন যে, মসজিদে গিয়ে রাতটা কাটিয়ে দেবেন। মসজিদে গেলে মসজিদের দারোয়ান মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। তাকে অনেক বুঝালেন কিন্তু সে কোনভাবেই মানল শাস্ত্র। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি. বলেন-আমি মসজিদের বারান্দায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু এখানেও সেই দারোয়ান আমার পিছু ছাড়ল না। সে আমার পায়ে ধরে ধাক্কা দিয়ে মসজিদের বারান্দা থেকেও বের করে দিল। তখন একজন রুটিওয়ালা এই দৃশ্যটি দেখে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-কে অনুরোধ করে নিজের ঘরে রাত কাটানোর জন্য নিয়ে গেলেন এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-কে অনেক সম্মান করলেন। অতঃপর সে আটা পেষার জন্য বাইরে বের হল। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, দেখলেন এবং শুনতে পেলেন যে, সে চলতে-ফিরতে ও আটা পেষতে পেষতে সর্বদা ইস্তিগফার করছে। সকালে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি. তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, এটা তার নিয়মিত আমল। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, তখন জিজ্ঞেস করলেন যে, এই আমলের বাহ্যিক কোন উপকার ও ফলাফল সে দেখেছে কিনা? সে বলল, হ্যাঁ! আমি যে দু'আ ই করি কবুল হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি দু'আ কবুল হয়নি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কী দু'আ? সে বলল, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.-এর সাক্ষাত লাভের দু'আ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি, বললেন, আমিই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহি.। তোমার এই দু'আও কবুল হয়েছে এবং আমাকে ধাক্কা দিয়ে তোমার নিকট আনা হয়েছে।
📄 ইস্তিগফারের মত মহৌষধ কেন ব্যবহার করি না?
ইস্তিগফারের ফাজায়েল, উপকারিতা ও কার্যকারিতা অনেক আশ্চর্যজনক। কিন্তু সাধারণত মানুষের এর প্রতি কোন প্রকার মনোযোগ আকর্ষণ হয় না। এটাও গুনাহের একটি মন্দ প্রভাব যে, ইস্তিগফারের এত বড় বড় উপকারিতা কুরআন-সুন্নাহতে পাঠ করেও মানুষ ইস্তিগফারকে অবলম্বন করে না। পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাওবা ও ইস্তিগফারের যে ফাজায়েল ও উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে যে, এর উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা যাবে। কয়েকদিন পূর্বে আরবের এক আলেমার একটি লেখা দৃষ্টিগোচর হয়। তাকে আল্লাহ তা'আলা ইস্তিগফারের বড় বড় অনেক বারাকাহ ও উপকারিতা নসিব করেছেন। সে লিখে-হে দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানিতে পতিত মুসলিম বোনেরা! হে কেঁদে কেঁদে নিজেকে ধ্বংসকারী বোন আমার! হে পরীক্ষা, অবমূল্যায়ন ও বেদনায় নিপতিত বোন আমার! তোমরা ইস্তিগফারের মহৌষধ কেন ব্যবহার করছ না। এটা সকল আঘাতের মলম এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট, পেরেশানি, দুশ্চিন্তা ও বিপদের চিকিৎসা। অবশ্যই এ সকল কথা সম্পূর্ণ সত্য এবং ইস্তিগফারের উপকারিতার একটি ঝলক মাত্র। আর না হয় যে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বীয় রবকে সন্তুষ্ট করে নেয়, তার দুনিয়া ও আখিরাতের কোন বস্তু আছে যা সে পায়নি।