📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 ইস্তিগফার প্রত্যেক নি‘আমত এবং সহজলভ্যতার চাবিকাঠি

📄 ইস্তিগফার প্রত্যেক নি‘আমত এবং সহজলভ্যতার চাবিকাঠি


আল্লাহু আকবার! আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আপনি সূর্যকে দূর থেকে দেখলে সূর্যকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হয়। এক-দুই ফুট। হ্যাঁ! আমাদের নিকট সূর্যকে নিজের থেকেও ছোট মনে হয়। কেননা আমরা সূর্যের দিকে ভ্রমণ করে যত সূর্যের নিকটবর্তী হব, তত সূর্য বড় হবে এবং আমরা ছোট হব। আর যদি আমরা সূর্যের একদম নিকটে চলে যাই, তাহলে কি হবে? তখন আমাদের নিকট নিজেদেরকে এর বিপরীতে একটি বিন্দুর পরিমাণও মনে হবে না। কেননা সূর্য জমিন থেকে অনেকগুণ বড়। আর আমরা তো শুধু জমিন নয়, বরং জমিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বস্তুর চেয়েও ছোট। ঠিক তদ্রুপ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা থেকে যত দূরে, সে আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদা কীভাবে বুঝবে। সে তো নিজেকে এবং নিজের নফসকে বড় মনে করে।
এজন্য আল্লাহ তা'আলার হুকুম ও আল্লাহ তা'আলার নামের উপর সে দাঁড়ায় না। তবে যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যশীল হয়ে যায়, তখন তার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আর তাঁর সম্মান ও মর্যাদার তো কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সূর্য তো অনেক ক্ষুদ্র। আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তা'আলা সকল বস্তুর চেয়ে বড়। এজন্য যখন প্রেম-ভালোবাসায় ডুবে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম আবেদন করলেন যে, হে আমার রব! আমাকে আপনার সাক্ষাত দান করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- لَنْ تَرَانِی হে মুসা! তুমি আমাকে দেখতে পারবে না। দুনিয়ার চক্ষু তো একটি পাহাড়কেও সম্পূর্ণভাবে দেখতে পারে না। একটি সমুদ্রের শেষ সীমা দৃষ্টিগোচর করতে পারে না। আর আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদার সামনে তো এ সকল বস্তু কিছুই না। দুনিয়ার চক্ষুর সেই শক্তি কোথায় যে, আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তো দেহ থেকে পবিত্র। দিক বা পার্শ্ব থেকে পবিত্র এবং কোন প্রকার উপমা থেকেও পবিত্র। তাঁর মত আর কেউই নেই যে, উক্ত বস্তুর কল্পনা করে অনুমান করতে পারে। তবে হ্যাঁ! পরকালে জান্নাতের বাসিন্দাদেরকে এমন চক্ষু দেওয়া হবে, যা দিয়ে তারা "আল্লাহ তা'আলাকে দেখার" মহান নি'আমত লাভ করতে পারবে। এমন মহান রবের হক কে আদায় করতে পারে? আর এজন্যই রয়েছে ইস্তিগফার। এমন মহান রবের নাফরমানী? তাওবা তাওবা। এজন্যই রয়েছে তাওবা। আর ঐ দিকে এমন সম্মান ও মর্যাদা সত্ত্বেও এত রহমত যে, প্রত্যেক গুনাহের জন্য তাওবার দরজা খোলা। বরং স্বীয় বান্দাদেরকে ডাকছেন যে, আসো! আসো! তাওবা করে নাও। আর তারপরে ক্ষমাও এত দ্রুত যা কল্পনারও বাহিরে।
আল্লাহ তা'আলার ভয়
আল্লাহ তা'আলার গোলামী ও দাসত্ব অবলম্বনকারীগণ কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্তরের গভীর থেকে ঘোষণা করুন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র আপনারই গোলামী ও দাসত্ব অবলম্বন করি এবং একমাত্র আপনার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি।
হজরত জা'ফর ইবনে মুহাম্মাদ রাহি. বলেন-
من خاف الله خاف منه كل شئ ولم يخف الله اخاف الله من كل شئ
অর্থাৎ যে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে, সকল বস্তু তাকে ভয় করে। আর যে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে সকল বস্তু দিয়ে ভীত রাখেন। অর্থাৎ তার অন্তরে সকল বস্তুর ভয় সৃষ্টি হয়ে যায়।
আল্লাহ তা'আলার ভয় সকল কল্যাণের মূল
ইস্তিগফার ও তাওবা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করার সৌভাগ্য দান করে। আল্লাহ তা'আলার ভয় লাভ করা অনেক বড় কল্যাণের বিষয়। বরং এটাই সকল কল্যাণের মূল। এমন মূল, যা সুদৃঢ় হয়ে গেলে, তা থেকে উপকার ও কল্যাণ এবং নেকির ডালপালা গজায়।
ইমাম গাজালী রাহি. লিখেন—
জনৈক ব্যক্তি হজরত আবু সাঈদ খুদুরী রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট আবেদন করল যে, আমাকে ওসিয়াত করুন। তিনি বললেন—আল্লাহ তা'আলার ভয়কে নিজের উপর অত্যাবশ্যক করে নাও। এটাই সকল কল্যাণের মূল। আর জিহাদ-কিতাল করাকে নিজের উপর অত্যাবশ্যক করে নাও। কারণ এটাকেই ইসলামের সন্যাসিতু বা দুনিয়াবিমুখতা বলা হয়। আর সর্বদা কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত কর। কেননা এটা দুনিয়াবাসীর মধ্যে তোমার জন্য নুর বা আলো হবে এবং আসমানবাসীর মধ্যে তোমার স্মরণ করা হবে। আর উত্তম কথা ব্যতীত নীরবতাকে অবলম্বন কর। এর ফলে তুমি শয়তানের উপর বিজয়ী হবে। [১৫]
কোন এক ব্যক্তি আবু হাজেম রাহি. কে বলল যে, আমাকে ওসিয়াত করুন। তিনি বললেন—যদি কোন কাজ এমন হয় যে, অবশ্যই উক্ত কাজে তোমার মৃত্যু এসে যাবে এবং এ কাজে মৃত্যুবরণ করা ভাল মনে হয়, তাহলে এমন কাজ অবশ্যই করবে। আর যদি কোন কাজ এমন হয় যে, হয়তো উক্ত কাজে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যু এসে গেলে উক্ত মৃত্যুবরণটা মুসিবাত তথা খারাপ মনে হয়, তাহলে এমন কাজ থেকে বেঁচে থাক। [১৬]
অর্থাৎ উত্তম মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করা এবং খারাপ মৃত্যুর ভয় সবসময় অন্তরে বদ্ধমূল থাকা আবশ্যক।
হজরত হাসান বসরী রাহি, হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি.-কে পত্র লিখলেন—
যে বস্তু দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ভয় প্রদর্শন করেন, তাকে ভয় করা উচিত এবং যা কিছু তোমার নিকট বিদ্যমান, তা থেকে ভবিষ্যতের জন্য নিয়ে নাও এবং মৃত্যুর পরে এ অবস্থাটা ঠিকই জানতে পারবে।
অন্য আরেকটি পত্রে লিখেন—
এ কথা স্পষ্ট যে, সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন অবস্থা হল যা তোমাদের সম্মুখে আসছে (অর্থাৎ মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরে) এবং উক্ত অবস্থাটি তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। হয়তো মুক্তির সাথে কিংবা ধ্বংসের সাথে। অর্থাৎ হয়তো উক্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে অথবা তাতে নিক্ষেপ করা হবে। যখন তোমাদের থেকে কোন ভুল-ত্রুটি কিংবা গুনাহ হয়ে যায়, তখনই তা থেকে ফিরে আসা উচিত। অর্থাৎ এই ভুল-ত্রুটি কিংবা গুনাহ দ্বিতীয় বার না করা। আর যখন লজ্জিত হও তথা তাওবা কর, তখন গুনাহের মূলোৎপাটন করে দাও। অর্থাৎ একেবারে ছেড়ে দাও। আর যদি কোন কথা স্মরণ না হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করে নাও এবং যখন তুমি রাগান্বিত হও, তখন সাথে সাথে তা নিয়ন্ত্রণ কর।
হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি. আদি ইবনে আরতাতকে লিখেন-
এই দুনিয়া তাদেরও শত্রু যারা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু এবং তাদেরও শত্রু, যারা আল্লাহ তা'আলার শত্রু। কারণ দুনিয়া আল্লাহ তা'আলার বন্ধুদেরকে কষ্ট দেয় এবং আল্লাহ তা'আলার শত্রুদেরকে ধোঁকা দেয়।
হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি, তার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের (গভর্নর ও অন্যান্য দায়িত্বশীল) লিখেন-
বর্তমানে তোমাদের মানুষের উপর জুলুম করার শক্তি ও ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যখন কারো উপর জুলুম করার ইচ্ছা কর, তখন মনে রেখ যে, তোমাদের উপরও আল্লাহ তা'আলার শক্তি ও ক্ষমতা রয়েছে। আর এ কথাটি খুব ভাল করে মনে রেখ যে, তোমরা মানুষের উপর যে জুলুম- নির্যাতন করবে, তা তাদের উপর অতিবাহিত হয়ে যাবে। কিন্তু তোমাদের উপর তা বাকি থাকবে এবং এটাও মনে রেখ, আল্লাহ তা'আলা মাজলুমের প্রতিশোধের জন্য জালেমকে অবশ্যই ধরবেন।
ইমান হল ভয় এবং আশার নাম
ভয় এবং আশার নামই তো ইমান। এমন ভয় যার শেষ ফল হতাশা নয় বরং আশা। আর এমন আশা যার শেষ ফল অলসতা নয় বরং ভয়। এ অবস্থা যার অর্জন হয়ে যাবে, সে ধন্যবাদের উপযুক্ত। জালিম শয়তান হয়তো হতাশার মধ্যে নিক্ষেপ করে, না হয় অলসতার সাগরে ঢুবিয়ে দেয়। তবে শয়তান ঐ সকল মুসলিমদের থেকে অনেক দূরে থাকে, যারা কোন অবস্থাতেই তাওবা-ইস্তিগফার করা ছাড়ে না। শয়তান তাদেরকে দিয়ে গুনাহ করায় আর এরা তাওবা করে উক্ত গুনাহকে নেকিতে পরিণত করে নেয়। শয়তান এটা বুঝায় যে, তুমি নষ্ট হয়ে গেছ। খিয়ানতকারী হয়ে গেছ। অপবিত্র হয়ে গেছ। সুতরাং এখন কিসের তাওবা! গুনাহ করতে থাক। কিন্তু আল্লাহর বান্দাগণ তারপরও স্বীয় রবের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। ক্ষমা চাই মালিক ক্ষমা চাই। তাওবা করছি মালিক, তোমার নিকট তাওবা করছি। তখন শয়তান কাঁদে। আফসোস করে বলে, হায়! আমি যদি তাকে দিয়ে গুনাহই না করাতাম সেটাই ভাল ছিল।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- আমার রব আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার ব্যক্তিকে বিনা হিসাব ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তারপর আবার প্রত্যেক হাজারের সাথে ৭০ হাজার এবং আমার রবের মুষ্ঠিতে তিন মুষ্ঠি। (১৭৷
সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক হাজারের সাথে ৭০ হাজার এবং আল্লাহ তা'আলার মুষ্ঠিতে তিন মুষ্ঠি বলা হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের হাত অনুপাতেই মুষ্ঠি ভরে থাকে। যে যত বড় তার মুষ্ঠিও তত বড়। আল্লাহ তা'আলা শরীর ও সাদৃশ্যতা থেকে পবিত্র। এখানে বুঝার বিষয় হল- দুনিয়াতে যখন কেউ কারো প্রতি খুশি হয়, তখন মুষ্ঠি ভরে ভরে সম্পদ দান করে। আল্লাহ তা'আলাও রহমতের হাতসমূহ দিয়ে ভরে ভরে এই উম্মতের অনেক ব্যক্তিকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। বিনা হিসাবে জান্নাত। এ বাক্যটি পাঠ করতেই অন্তরে প্রশান্তি চলে আসে। হে আল্লাহ! আমাদেরকেও আপনার স্বীয় রহমতে এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।
অন্তরের মোহর
উপরোক্ত হাদিসের বর্ণনাকারী হজরত মুজাহিদ রাহি, বলেন যে, অন্তরের উপমা হল হাতের তালুর মত। মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন একটি আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি (গুনাহ করতে করতে) সকল আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। আর অন্তর যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এটাই হয়ে যায় অন্তরের তালা। আর হজরত হাসান রাহি. এর অভিমত হল—বান্দা ও আল্লাহ তা'আলার মধ্যে গুনাহের একটি সীমানা রয়েছে। বান্দা যখন উক্ত সীমানায় পৌঁছে যায় (এবং তাওবা না করে) তখন আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন এবং আর কখনো তাকে কোন নেক কাজের তাওফিক দেন না।
কোন কোন আকাবির বলেন—কোন বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন জমিনের যে স্থানে গুনাহ করে, সেই জমিন আল্লাহ তা'আলার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি তাকে ধসিয়ে দেব। তার মাথার উপরের আসমান অনুমতি প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি তার উপর ফেটে পড়ব। আল্লাহ তা'আলা এদের দু'জনকেই বলেন যে, আমার বান্দার থেকে বিরত থাক। হয়তো সে তাওবা করবে এবং আমি তাকে মাফ করে দেব অথবা তার গুনাহের পরিবর্তে কোন নেক আমল করবে আর আমি এর পরিবর্তে উক্ত গুনাহকেও নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেব। [১৮]
আল্লাহ তা'আরার আজাব থেকে নির্ভীক হওয়া উচিত নয়
আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে দুনিয়া ও আখিরাতে স্বীয় আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমাদের কখনোই আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে নির্ভীক এবং “বে-পরওয়াহ” হওয়া উচিত নয়। কুরআনুল কারিম সুস্পষ্ট ঘোষণা করছে—
أَفَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُم بَأْسُنَا بَيَاتًا وَهُمْ نَابِمُونَ أَوَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُم بَأْسُنَا ضُحًى وَهُمْ يَلْعَبُونَ أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
"জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি রাতের বেলা তাদের কাছে আমার আজাব এসে যাওয়া থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে? অথবা জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি তাদের কাছে আমার আজাব এসে যাওয়া থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে যখন তারা খেলাধুলা করতে থাকবে? তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত কওম ছাড়া আল্লাহর কৌশল থেকে আর কেউ (নিজেদেরকে) নিরাপদ মনে করে না।"[১৯]
বরকতময় একটি দু'আ
আমাদের আকা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
اللَّهُمَّ لَا تُؤْمِنَّا مَكْرَكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আপনার হঠাৎ আজাব থেকে নির্ভয় করবেন না। مَكْرَكَ তথা আল্লাহ তা'আলার গোপন কার্যক্রম এবং আল্লাহ তা'আলার হঠাৎ আজাব। কোন মানুষ যখন কোন গুনাহকে নেকি মনে করে কিংবা সে এ কথার উপর নির্ভীক হয়ে যায় যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার আজাব আসতেই পারে না। কারণ আমি অমুক নেক কাজ করি। আল্লাহ! আল্লাহ! হজরত সাহাবায়ে কেরام রাদিআল্লাহু আনহুমদের দেখুন! এত উঁচু আমল করেও তারা আল্লাহ তা'আলার আজাবের ভয়ে ভীত ও কম্পমান থাকতেন। আর এ দিকে আমরা লোক দেখানো সামান্য টুটাফাটা দু-একটি নেক কাজ করেই আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে নির্ভীক হয়ে যাই।
আমাদের তো নিজেদের গুনাহগুলোও দেখা উচিত। কেউ সালাত পরিত্যাগকারী তো কেউ সালাতের প্রতি অলসতা প্রদর্শনকারী প্রাণহীন সালাত আদায়কারী। মিথ্যা তো মুখ থেকে একদমই পড়ে না। গর্ব, অহংকার, রাগ ও লোক দেখানোর মত নোংরা কাজগুলোতে আমরা সর্বদা লিপ্ত। চেহারা এবং পোশাক সুন্নাত অনুযায়ী নেই। বিবাহ-শাদিতে সর্বপ্রকার শরীয়াতবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং বিদ'আত ও বিভিন্ন কুপ্রথার ছড়াছড়ি। প্রতিটি ঘরে বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা ও অশ্লীলতা ভরপুর। আল্লাহ তা'আলা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাক এবং একে অপরের ইজ্জত বানিয়েছেন। কিন্তু আজ প্রতিটি ঘরে এই পোশাক টুকরো টুকরো এবং এই ইজ্জত লাঞ্ছিত হচ্ছে। দৃষ্টি নির্লজ্জ। কণ্ঠ নির্লজ্জ। চেহারা নির্লজ্জ এবং চিন্তা-ভাবনা পর্যন্ত নির্লজ্জ। একটু একা হলেই প্রত্যেকে এটা ভুলে যায় যে, আমার আল্লাহ তা'আলা আমাকে দেখছেন। সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও খিয়ানত, সম্মিলিত সম্পদ দ্বারা বিলাসিতা এবং অসচেতনতা। আর কারো কারো তো শুধুমাত্র দুনিয়ার ফিকির। লাইফস্টাইল তথা জীবনাচার ও ব্রাইট ফিউচার তথা উজ্জ্বল ভবিষ্যত এর বাইরে আর কিছুই যেন নেই। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ক্ষমা করুন।
হে আল্লাহ! আপনি তো আপনিই....
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, পূর্ববর্তী উম্মতের এক ব্যক্তি একটি খুপড়ি ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উক্ত খুপড়ি দেখে তার অন্তরে কিছু চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক হল। সে বলল-
اللَّهُمَّ أَنْتَ أَنْتَ؛ وَأَنَا أَنَا أَنْتَ الْعَوَّادُ بِالْمَغْفِرَةِ ۚ وَأَنَا الْعَوَّادُ بِالذُّنُوْبِ؛ فَاغْفِرْ لِي
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আপনিই। আর আমি আমিই। আমি গুনাহে অভ্যস্ত আর আপনি মাগফিরাতে অভ্যস্ত। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।
এ দু'আ পাঠ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তাকে বলা হল তোমার মাথা উঠাও। কেননা তুমি গুনাহে অভ্যস্ত আর আমি মাগফিরাতে অভ্যস্ত। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন সে মাথা উঠালো এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। [২০]
বিশাল সুসংবাদ
হাদিস শরীফে এসেছে; এক বান্দা গুনাহ করে আরজ করল-
رَبِّ أَذْنَبْتُ فَاغْفِرْ لِي فَقَالَ رَبَّهُ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللَّهُ، ثُمَّ أَصَابَ ذَنْبًا فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا آخَرَ؛ فَاغْفِرْ لِي فَقَالَ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي؛ ثُمَّ أَصَابَ ذَنْبًا فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا آخَرَ؛ فَاغْفِرْ لِي قَالَ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي فَلْيَفْعَلْ مَا شَاءَ
অর্থাৎ হে আমার রব! আমি গুনাহ করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন; আমার বান্দা জানে তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ঐ বান্দা আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছে তো আবার বলছে হে আমার রব! আমি আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আমার বান্দার জানা আছে- তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ঐ বান্দা আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছে তো আবার বলছে হে আমার রব! আমি আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আমার বান্দার জানা আছে-তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। সুতরাং সে যা ইচ্ছা করুক।[২১]

টিকাঃ
[১৫] এহইয়াউল উলুম
[১৬] প্রাগুক্ত
(১৭) সুনানে তিরমিজি; সুনানে ইবনে মাজাহ; মুসনাদে আহমাদ
[১৮] এহইয়াউল উলুম
[১৯] আ'রাফ- ৭: ৯৭-৯৯
[২০] জামেউল আহাদিস: হাদিস নং ২১০৮২; কানযুল উম্মাল: হাদিস নং ১০২৭৬
[২১] মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ৭৯৪৮; কানযুল উম্মাল: ৪/২০১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00