📄 শক্তির রহস্য
যেখানে এমনিতেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে ইস্তিগফারের ব্যাপারে ব্যাপক অলসতা রয়েছে। সেখানে অন্যদের জন্য ইস্তিগফার করার বিষয়টি তো অনেক দূরের কথা। বস্তুত সকলেই দিন-রাত শুনে থাকে যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহুকে হজরত উয়াইস করনী রাহি. এর নিদর্শন বর্ণনা করেছেন এবং এটাও বলেছেন যে, তোমার যদি তাঁর সাথে সাক্ষাত হয়, তাহলে তাঁকে দিয়ে নিজের জন্য এবং আমার উম্মতের জন্য ইস্তিগফার করাবে। একটু ভাবুন তো! নির্দেশদাতা কে এবং যাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তিনি কে? অতঃপর হজরত উমর রাদিআল্লাহু আনহু স্বীয় খেলাফতের যামানায় দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ চেষ্টা করার পর হজরত উয়াইস করনী রাহি.-কে খুঁজে বের করেছেন এবং নিজের জন্য ও উম্মতের জন্য ইস্তিগফার করিয়েছেন। বর্তমানে আপনি কোন বুজুর্গ কিংবা কোন নেককার লোকের নিকট গিয়ে বলুন যে, আমি আপনার জন্য ইস্তিগফার করছি। তখন তার চেহারার রঙই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর বলবে আমি এমন কি গুনাহ করেছি যে, তুমি আমার জন্য ইস্তিগফার করছ? বুঝা গেল যে, বর্তমানে ব্যাপকভাবে মুসলমানদের মাঝে ইস্তিগফারের মর্যাদা নেই। এমনিভাবে আপনি কারো নিকট গিয়ে আবেদন করুন যে, আমার জন্য ইস্তিগফার করে দিন। সে ঘুরে-ফিরে দেখবে যে, এখন আপনি কোন মদ্যশালা থেকে এসেছেন কিনা? বুঝা গেল যে, ইস্তিগফার থেকে বঞ্চিত হওয়া আমাদের সাধারণ মেজাযের অংশ হয়ে গেছে। বস্তুত কুরআনুল কারিমের বেশ কয়েকটি আয়াতেই অন্যের জন্য ইস্তিগফার করা এবং অন্যের দ্বারা ইস্তিগফার করানোর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তাওবাকারী গুনাহগারের জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইস্তিগফার
عَنْ أَبِي أُمَيَّةَ الْمَخْزُومِي، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أُتِيَ بِلِصٌ قَدِ اعْتَرَفَ اعْتِرَافًا وَلَمْ يُوجَدْ مَعَهُ مَتَاعٌ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَا إِخَالُكَ سَرَقْتَ، قَالَ:
بَلَ، فَأَعَادَ عَلَيْهِ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا فَأَمَرَ بِهِ فَقُطِعَ وَجِيءَ بِهِ، فَقَالَ: اسْتَغْفِرِ اللَّهَ وَتُبْ إِلَيْهِ، فَقَالَ: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، فَقَالَ: اللَّهُمَّ تُبْ عَلَيْهِ ثَلَاثًا
“হজরত আবু উমাইয়া মাখযুমী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে একজন চোরকে আনা হল, যে চুরির স্বীকারোক্তি দিয়েছে কিন্তু তার নিকট চুরির কোন মালামাল পাওয়া যায়নি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাকে বললেন-আমার মনে হয় না যে, তুমি চুরি করেছো। সে বলল, কেন মনে হবে না। আমি অবশ্যই চুরি করেছি। এমনিভাবে সে দুই বার অথবা তিন বার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে স্বীকারোক্তি দিল। অতঃপর তার উপর দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা হল তথা তার হাত কেটে ফেলা হল। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আনা হল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাওবা কর। তখন সে বলল- أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ তথা আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন বার বললেন, হে আল্লাহ! আপনি তার তাওবা কবুল করুন। "[৪৩]
মুস্তাজাবুদ-দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুসংবাদ
অন্যের জন্য ইস্তিগফার করলে মুস্তাজাবুদ-দাওয়াত তথা দু'আ কবুল হওয়া ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুসংবাদ
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: مَنِ اسْتَغْفَرَ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً أَوْ خَمْسًا وَعِشْرِينَ مَرَّةً كَانَ مِنَ الَّذِينَ يُسْتَجَابُ لَهُمْ وَيُرْزَقُ بِهِمْ أَهْلُ الْأَرْضِ
"হজরত আবু দারদা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- যে ব্যক্তি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য দৈনিক সাতাইশ অথবা পঁচিশ বার ইস্তিগফার করবে, তাহলে তাকে ঐ সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যারা মুস্তাজাবুদ-দাওয়াত তথা যাদের দু'আ কবুল করা হয় এবং যাদের কারণে জমিনবাসী রিজক পেয়ে থাকে। "[৪৪]
অন্যের জন্য ইস্তিগফারের উপর অসংখ্য নেকি
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ صَامِتٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ يَقُولُ: مَنِ اسْتَغْفَرَ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِكُلِّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ حَسَنَةٌ
"হজরত উবাদা ইবনে সামিত রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-যে ব্যক্তি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের জন্য ইস্তিগফার করবে, তার জন্য প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর পরিবর্তে নেকি লিখে দেওয়া হয়। "[৪৫]
মৃতদের জন্য জীবিতদের হাদিয়া
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَا الْمَيِّتُ فِي الْقَبْرِ إِلَّا كَالْغَرِيْقِ الْمُتَغَوَثِ؛ يَنْتَظِرُ دَعْوَةً تَلْحَقُهُ مِنْ آب وَ أَمْرٍ أَوْ آخِ أَوْ صَدِيقٍ؛ فَإِذَا لَحِقَتْهُ كَانَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا مِنْهَا، وَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى لَيُدْخِلُ عَلَى أَهْلِ الْقُبُوْرِ مِنْ دُعَاءِ أَهْلِ الْأَرْضِ أَمْثَالَ الْجِبَالِ وَإِنَّ هَدِيَّةَ الْأَحْيَاءِ إِلَى الْأَمْوَاتِ الْاسْتِغْفَارُ لَهُمْ
“হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- কবরে মৃত ব্যক্তির উপমা হল ঐ ব্যক্তির মত, যে ঢুবে যাচ্ছে এবং সাহায্যের জন্য ডাকছে। ডুবন্ত ব্যক্তি যেভাবে সাহায্যের অপেক্ষা করে থাকে ঠিক তেমনি মৃত ব্যক্তিও অপেক্ষায় থাকে যে, ছেলে-মেয়ে কিংবা ভাই-বেরাদার কিংবা বন্ধু-বান্ধবের পক্ষ থেকে কোন দু'আর হাদিয়া পৌঁছার। যখন সে কোন দু'আ হাদিয়া পায়, তখন এটা তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছু থেকে প্রিয় হয়ে থাকে। আর বাস্তবতা হল-আল্লাহ তা'আলা কবরবাসীকে দুনিয়াবাসীর দু'আসমূহ পাহাড়ের ন্যায় বৃদ্ধি করে দিয়ে থাকেন। আর জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃতদের জন্য হাদিয়া হল তাদের জন্য ইস্তিগফার করা।”[৪৬]
টিকাঃ
[৪৩] সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ৪৩৮০; সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ৪৮৭৭; সুনানে ইবনে মাজাহঃ হাদিস নং ২৫৯৭: সুনানে দারেমী: হাদিস নং ২৩৪৯; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২২৫০৮
[৪৪] তাবরানীয় সূত্রে মাজমাউয-যাওয়ায়েদ: হাদিস নং ১৭৬০০; জামেউস-সগীর: হাদিস নং ৮৪২০
[৪৫] প্রাগুক্ত: হাদিস নং ১৭৫৯৮; প্রাগুক্ত: হাদিস নং ৪৮১৯
[৪৬] বায়হাকীর সূত্রে মিশকাতুল মাসাবিহ; কিতাবুদ দাওয়াত: ইস্তিগফার ও তাওবা অধ্যায়: হাদিস নং ২৩৫৫
📄 মাগফিরাত একটি মহান নি‘আমত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا
"আর যদি তারা-যখন নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসুলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত।"[৬৪]
আপনারা যদি এ আয়াতের পূর্ণ তাফসির পড়েন, তাহলে কয়েকটি বিধান জানতে পারবেন। আপাতত এতটুকু জেনে রাখুন যে, যখন বড় কোন গুনাহ হয়ে যাবে, তখন সাথে সাথে নিজেও ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দাদেরকে দিয়েও ইস্তিগফার করানো।
এমনিভাবে যিনি দীনের পথপ্রদর্শক, তার নিকট যদি কোন গুনাহগার লোক ইস্তিগফার করতে আসে এবং তার নিকট ইস্তিগফারের আবেদন করে, তাহলে তার জন্য ইস্তিগফার করা। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ দুটি মাসআলা তো সুস্পষ্টভাবেই জানা হয়ে গেল।
ইস্তিগফারের আবেদনকারীর জন্য নিজের গুনাহের বর্ণনা করা জরুরি নয়। বিশেষ করে বর্তমানে যেখানে ফিতনা-ফাসাদ অত্যন্ত ব্যাপক। তাই নিজের গুনাহের বর্ণনা না দিয়ে শুধুমাত্র ইস্তিগফারের আবেদন করা। কেননা উক্ত ব্যক্তি কতটুকু উদার তা তো জানা নেই। অনেক লোক এতটাই সংকীর্ণ হয়ে থাকে যে, তারা যদি কোন ব্যক্তির কোন একটি গুনাহের কথাও জানতে পারে, তাহলে গোটা জীবনভর চেষ্টা করেও নিজের অন্তর তার প্রতি পরিষ্কার করতে পারে না। সে তাওবা করে সিদ্দিকীনের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও এবং তার উক্ত গুনাহও আমলনামায় নেকিতে পরিণত হয়ে গেলেও। এমনিভাবে যদি আপনার নিকট কেউ ইস্তিগফারের আবেদন নিয়ে আসে- আমার জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করুন, তখন আপনিও তার নিকট তার গুনাহের কথা জিজ্ঞেস করবেন না এবং না এই অনুসন্ধানে যাবেন যে, সে কোন কোন গুনাহ করে। বরং এটা ভাবুন যে, সে কত উত্তম মুসলমান যে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ইস্তিগফার করাতে এসেছে এবং আমি কত অধম যে আমার নিজের গুনাহসমূহ ক্ষমার কোন ভাবনা নেই। আলহামদুলিল্লাহ! এ বিষয়ের মূল কথা সমাপ্ত হল। কুরআনুল কারিমের কোন একটি বিষয়ের সমাপ্তিও সম্ভব নয়। শুধুমাত্র সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। আল্লাহ তা'আলা কবুল করুন এবং উপকারী বানান। যদি কোন একজন মুসলিম ভাই কিংবা বোনেরও উপকার হয়, তাহলে সে যেন অধমের জন্য পরিপূর্ণ ইমান এবং উত্তম মৃত্যুর দু'আ এবং ইস্তিগফার করে দেয়। এটা অনেক বড় অনুগ্রহ হবে।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ
জীবনের শেষ বয়সে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ، يُكْثِرُ مِنْ قَوْلِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، قَالَتْ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَرَاكَ تُكْثِرُ مِنْ قَوْلِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ؟ فَقَالَ: خَبَرَنِي رَبِّي، أَنِّي سَأَرَى عَلَامَةٌ فِي أُمَّتِي، فَإِذَا رَأَيْتُهَا، أَكْثَرْتُ مِنْ قَوْلِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، فَقَدْ رَأَيْتُهَا إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ، فَتْحُ مَكَّة وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
"হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (নিজের শেষ বয়সে) এ দু'আটি বেশি বেশি পড়তেন—
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
অর্থ: আমি আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং প্রশংসা করছি। আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।
হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি (কিছু দিন যাবৎ) আপনাকে এ দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করতে দেখছি। এর কারণ কী? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-আমার রব আমাকে বলেছেন যে, আপনি খুব শীঘ্রই আপনার উম্মতের মাঝে একটি নিদর্শন দেখবেন। আর আমি যখন উক্ত নিদর্শন দেখি তখনই এ দু'আটি বেশি বেশি পড়ি। আর উক্ত নিদর্শন হল-
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ।
তথা মক্কা বিজয়। ২২
বৈঠকে ইস্তিগফার
عَنْ عَائِشَةَ، أَنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ: كَانَ إِذَا جَلَسَ مَجْلِسًا أَوْ صَلَّى تَكَلَّمَ بِكَلِمَاتٍ، فَسَأَلَتْهُ عَائِشَةُ عَنِ الْكَلِمَاتِ, فَقَالَ: إِنْ تَكَلَّمَ بِخَيْرٍ كَانَ طَابِعًا عَلَيْهِنَّ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ، وَإِنْ تَكَلَّمَ بِغَيْرِ ذَلِكَ كَانَ كَفَّارَةٌ لَهُ, سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
“হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন বৈঠকে বসতেন অথবা সালাত পড়তেন, তখন কিছু কালিমা পাঠ করতেন।
হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উক্ত কালিমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-বৈঠকের লোকেরা যদি কোন ভাল কথা বলে থাকে, তাহলে এই কালিমা সে কথার উপর কিয়ামত পর্যন্ত মোহর হয়ে যাবে। আর যদি তারা অন্য কোন কথা বলে থাকে, তাহলে এই কালিমা উক্ত কথার কাফফারা হয়ে যাবে। আর কালিমাটি হল-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার সত্ত্বা পবিত্র। আমি আপনার প্রশংসার মাধ্যমে আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি। ”[৩]
বৈঠকের কাফ্ফারা
عَنْ أَبِي بَرْزَةَ الْأَسْلَمِي، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ، يَقُولُ بِأَخَرَةٍ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَقُومَ مِنَ الْمَجْلِسِ : سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ, فَقَالَ رَجُلٌ، يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ لَتَقُولُ قَوْلًا مَا كُنْتَ تَقُولُهُ فِيمَا مَضَى، فَقَالَ: كَفَّارَةٌ لِمَا يَكُونُ فِي الْمَجْلِسِ
। “হজরত আবু বারযা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (নিজের শেষ বয়সে) যখন কোন বৈঠক থেকে উঠতেন, তখন এ দু'আটি পড়তেন-
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
হে আল্লাহ আপনি পবিত্র এবং আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন কালিমা পাঠ করছেন যা পূর্বে কখনো পাঠ করেননি। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-এই কালিমা বৈঠকের সকল অনর্থক ও বেহুদা কথাবার্তার কাফফারাস্বরূপ। ”[৪]
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে ইমান এবং শাহাদাতের উত্তম মৃত্যু নসিব করুন। চতুর্দিকে জুলুম ও গুনাহের ঘোর অমানিশা চলছে। সুতরাং এই অমানিশা থেকে সে-ই বাঁচতে পারে, যাকে আল্লাহ তা'আলা বাঁচাবেন। আল্লাহ তা'আলা তাকেই বাঁচান যার নিজের বাঁচার ফিকির আছে। আমাদের উচিত যে, প্রতিটি বৈঠকের সমাপ্তির সময় আল্লাহ তা'আলার তাসবীহ, জিকির ও ইস্তিগফার করার সুদৃঢ় অভ্যাস গড়ে তোলা। কেননা মৃত্যুও হতে পারে আমাদের এই জীবন নামক বৈঠকের সমাপ্তি ও আগত মজলিসের সূচনা।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান বাণী-
مَنْ جَلَسَ فِي مَجْلِسٍ فَكَثُرَ فِيهِ لَغَطُهُ، فَقَالَ قَبْلَ أَنْ يَقُومَ مِنْ مَجْلِسِهِ ذَلِكَ: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ إِلَّا غُفِرَ لَهُ مَا كَانَ فِي مَجْلِسِهِ ذَلِكَ
। যে ব্যক্তি কোন বৈঠকে বসে অনেক বেহুদা ও অনর্থক কথাবার্তা বলল, অতঃপর উক্ত বৈঠক থেকে উঠার পূর্বে এই কালিমা পাঠ করে নেয়, তাহলে তার উক্ত মজলিসের বেহুদা ও অনর্থক কথা মাফ করে দেওয়া হবে।
সুবহানাল্লাহ! কত বড় নি'আমত। হাদিস শরিফের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ হবে গুনাহের বৈঠকসমূহ। আজকাল তো অসংখ্য গুনাহের বৈঠক বিদ্যমান। টিভির বৈঠক। মোবাইলে গেমস ও পর্ণ ভিডিওর বৈঠক। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বৈঠক। আগে তো আমাদেরকে এ সকল বৈঠক থেকে বাঁচতে হবে। তবে যদি শয়তান ফাঁসিয়ে দেয় তাহলে আমরা যেন এ দু'আটি পড়তে না ভুলি। ইন শা' আল্লাহ গুনাহ মিটে যাবে। আর আমরা যদি এ দু'আটি পূর্ণ মনোযোগের সাথে নিয়মিত আমল করতে থাকি, তাহলে ইন শা' আল্লাহ অনেক খারাপ বৈঠক থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারব। আবু দাউদ শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে- নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন বৈঠক থেকে উঠতেন, তখন এ দু'আটি নিয়মিত পাঠ করতেন। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আমলটি তো পূর্বে কখনো ছিল না। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
ذلِكَ كَفَّارَةٌ لِمَا يَكُونُ فِي الْمَجْلِسِ
। এ কালিমা বৈঠকের গুনাহসমূহের কাফ্ফারাস্বরূপ।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুনাহ থেকে পবিত্র ছিলেন। কিন্তু উম্মতের তা'লিমের জন্য এবং নিজের মহান মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বরকতময় কালিমার আমল করতেন। বরং এক বর্ণনার দ্বারা তো এটাও জানা যায় যে, এ কালিমার দুটি উপকারীতা রয়েছে। প্রথম উপকার হল বৈঠকে যে সকল নেকি হয়েছে, এই কালিমার বরকতে এ সকল নেকির উপর মোহর লেগে যায়। এ সকল নেকি আর কখনো ধ্বংস হবে না। আর দ্বিতীয় উপকার হল-এ কালিমা বৈঠকের গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায়। সুতরাং উত্তম বৈঠক তথা তিলাওয়াতের বৈঠক, জিকির ও সালাতের বৈঠক, দাওয়াত ও বয়ানের বৈঠকের পরেও এ দু'আটি নিয়মিত পাঠ করা উচিত। সুনানে নাসাঈর বর্ণনায় একদম সুস্পষ্টভাবেই এসেছে যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন বৈঠকে বসতেন অথবা সালাত আদায় করতেন, তখন এ দু'আটি পাঠ করতেন। এজন্য হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু আনহা যখন এ দু'আটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنْ تَكَلَّمَ بِخَيْرٍ كَانَ طَابِعًا عَلَيْهِنَّ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ, وَإِنْ تَكَلَّمَ بِغَيْرِ ذَلِكَ كَانَ كَفَّارَةً لَهُ
বৈঠকের লোকেরা যদি কোন ভাল কথা বলে থাকে, তাহলে এই কালিমা সে কথার উপর কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণের মোহর হয়ে যাবে। আর যদি তারা অন্য কোন কথা বলে থাকে, তাহলে এই কালিমা উক্ত কথার কাফফারা হয়ে যাবে।
অন্য এক বর্ণনায় জিকিরের বৈঠকের ব্যাখ্যায় এসেছে-
فَقَالَ لَهَا فِي مَجْلِسِ ذِكْرٍ كَانَ كَالطَّابِعِ يَطْبَعُ عَلَيْهِ وَمَنْ قَالَ فِي مَجْلِسِ لَغْوِ كَانَ كَفَّارَةٌ لَهُ
জিকিরের বৈঠকে যদি এ দু'আ পাঠ করা হয়, তাহলে উক্ত বৈঠক তার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ হয়ে যায়।
কোন কোন বর্ণনায় এ দু'আটি তিন বার পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এজন্য তিন বার পড়াই অধিক উত্তম। মূলত এ দু'আটি অনেক বড় ভাণ্ডার। প্রত্যেক নেক কাজের পরে এবং প্রত্যেক গুনাহের পরে যদি এ দু'আটি নিয়মিত পড়া হয়, তাহলে ইন শা' আল্লাহ "হুসানে খাতিমা" তথা উত্তম মৃত্যু এর মর্যাদা সহজ হয়ে যাবে।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ: হে আল্লাহ আপনি পবিত্র এবং আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।
যে সকল মুসলিম ভাই-বোনের এ দু'আটি মুখস্থ আছে, তারা এ দু'আটি নিয়মিত পড়ুন। আজ থেকে যখন তিলাওয়াত করবেন, দীনি কোন বই পড়বেন এবং যেকোন ভাল কিংবা মন্দ বৈঠকে বসেন কিংবা উঠেন, তখনই এ দু'আটি মনোযোগসহ পড়ুন। দেখবেন অন্তরে আশ্চর্য এক প্রশান্তি অনুভব হবে। নেকিসমূহ সংরক্ষণ হওয়া এবং গুনাহ মিটে যাওয়া অনুভব হবে।
মোহর এবং কাফ্ফারা
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، أَنَّهُ قَالَ: كَلِمَاتُ لَا يَتَكَلَّمُ بِهِنَّ أَحَدٌ فِي مَجْلِسِهِ عِنْدَ قِيَامِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ إِلَّا كُفَرَ بِهِنَّ عَنْهُ، وَلَا يَقُولُهُنَّ فِي مَجْلِسِ خَيْرٍ وَمَجْلِسِ ذِكْرٍ إِلَّا خُتِمَ لَهُ بِهِنَّ عَلَيْهِ كَمَا يُخْتَمُ بِالْخَاتَمِ عَلَى الصَّحِيفَةِ: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
“হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন যে, এমন কিছু কালিমা রয়েছে, যা কোন ব্যক্তি যদি বৈঠক থেকে উঠার সময় তা তিন বার পাঠ করে, তাহলে তা উক্ত বৈঠকের কাফফারা হয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তিই কোন উত্তম বৈঠক ও জিকিরের বৈঠকে তা পাঠ করবে, তাহলে তা তার জন্য মোহরের ন্যায় হয়ে যাবে। যেমন চিঠির উপর মোহর লাগানো হয়। আর উক্ত কালিমা হল—
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
অর্থ: হে আল্লাহ আপনি পবিত্র এবং আমি আপনার প্রশংসা করছি। আপনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।"
ফায়দাঃ কোন সাহাবী যদি কোন আমল সম্পর্কে এ কথা বলেন যে, এই আমলের এই সাওয়াব কিংবা এ পরিমাণ শান্তি, তাহলে এ কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেই বলে থাকেন। এজন্য তা মারফু হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।
তাসবিহ ও ইস্তিগফারের শক্তি
তাফসীরে ইবনে কাসীরে এসেছে—
যখন লটারীতে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের নাম এলো, তিনি তখন সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন। আল্লাহ তা'আলা সমুদ্রের (যেমনি হযরত ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহুর বক্তব্য) একটি বড় মাছকে প্রেরণ করলেন। আর সেই মাছ এসে হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে গিলে ফেলল। আল্লাহ তা'আলা তখন মাছকে নির্দেশ দিলেন যেন ইউনুস আলাইহিস সালামের গোশত-হাড়ির কোন কিছুর ক্ষতি না হয়। কেননা ইউনুস আলাইহিস সালাম তোমার রিযিক নয়, বরং তোমার পেট তাঁর জন্য বন্দিশালা।
মাছটি যখন হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে পেটে নিয়ে সমুদ্রের কিনারায় পৌঁছল, তখন তিনি সেখানে তাঁর বিশ্রামস্থলে পাথরের তাসবিহ শুনতে পেয়ে তিনিও তাসবিহ পাঠ করলেন—
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
আউফ আল-আরাবী রাহি. বলেন—
হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম যখন মাছের পেটে পৌঁছলেন, তখন তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যু হয়ে গেছে। অতঃপর তিনি তাঁর পা নাড়ালেন। তখন তিনি সেখানে সিজদা করলেন এবং আরজ করলেন- হে আমার রব! আমি আপনার জন্য এমন জায়গাকে সিজদার জায়গা বানিয়েছি, যেখানে মানুষের মধ্যে কেউই পৌঁছেনি।
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তা'আলা যখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেটে বন্দি করার ইচ্ছা করলেন, তখন উক্ত মাছকে নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে তোমার পেটে নিয়ে নাও। এমনভাবে পেটে নেবে যেন না তাঁর শরীরের গোশতের কোন ক্ষতি হয় এবং না তাঁর কোন হাড্ডি ভেঙ্গে যায়। মাছটি যখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে পেটে নিয়ে সমুদ্রের কিনারায় পৌঁছল, তখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম সেখানে ক্ষীণ একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি তখন নিজের মনে মনে ভাবতে লাগলেন যে, এটা কী? আল্লাহ তা'আলা তখন তাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করলেন যে, এটা হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণীদের তাসবিহ। তখন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটের ভেতরে আল্লাহ তা'আলার তাসবিহ পড়া শুরু করলেন। ফেরেশতারা যখন তাঁর তাসবিহ শুনলেন, তখন বলতে লাগলেন-হে আমাদের রব! আমরা কোন এক আশ্চর্য জায়গা থেকে ক্ষীণ একটি আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, এটা আমার বান্দা ইউনুস। সে আমার অবাধ্যতা করেছে। তাই আমি তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে মাছের পেটে বন্দি করে রেখেছি। ফেরেশতারা আরজ করলেন-ঐ বান্দা যার নেক আমল প্রতিদিন প্রতিরাত আপনার নিকট পৌঁছত? আল্লাহ তা'আলা বললেন, হ্যাঁ! ফেরেশতারা তখন তাঁর জন্য সুপারিশ করলে আল্লাহ তা'আলা মাছকে নির্দেশ দিলেন যে, তাঁকে সমুদ্রের উপকূলে ছেড়ে দাও।[৭]
ক. আম্বিয়ায়ে কেরাম সকল গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে থাকেন। এখানে নাফরমানী বা অবাধ্যতার দ্বারা উদ্দেশ্য হল-খেলাফে আফজল তথা অনুত্তমকে নিজের মতে অবলম্বন করা।
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ *
ইস্তিগফারের শক্তি ও ক্ষমতা দেখুন। মাছের পেট থেকে আরশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে এবং ফেরেশতারা শুনেছেন এবং সুপারিশ করেছেন।
সালাতের শুরুতে ইস্তিগফার
عَنْ بُرَيْدَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ يَا بُرَيْدَةَ إِذَا كَانَ حِينَ تَفْتَحُ الصَّلَاةَ فَقُلْ سُبْحَانَكَ اللهُمَّ الخ
হজরত বারিদা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-হে বারিদা! তুমি যখন সালাত শুরু করবে, তখন এ দু'আ পাঠ করবে-
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
আরোহণের সময় ইস্তিগফার
عَنْ عَلِيِّ بْنِ رَبِيعَةَ، قَالَ: شَهِدْتُ عَلِيًّا أُتِيَ بِدَابَّةٍ لِيَرْكَبَهَا، فَلَمَّا وَضَعَ رِجْلَهُ فِي الرِّكَابِ، قَالَ: بِسْمِ اللَّهِ ثَلَاثًا، فَلَمَّا اسْتَوَى عَلَى ظَهْرِهَا قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ، ثُمَّ قَالَ: سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ ثُمَّ قَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ ثَلَاثًا، وَاللَّهُ أَكْبَرُ ثَلَاثًا، سُبْحَانَكَ إِنِّي قَدْ ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، ثُمَّ ضَحِكَ، قُلْتُ: مِنْ أَيِّ شَيْءٍ ضَحِكْتَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ صَنَعَ كَمَا صَنَعْتُ، ثُمَّ ضَحِكَ، فَقُلْتُ: مِنْ أَيِّ شَيْءٍ ضَحِكْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: إِنَّ رَبَّكَ لَيَعْجَبُ مِنْ عَبْدِهِ إِذَا قَالَ: رَبِّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ غَيْرُكَ
হজরত আলী ইবনে রাবিআহ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি একবার হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহুকে দেখলাম যে, তাঁর সামনে আরোহণের জন্য একটি পশু আনা হল। তিনি যখন রিকাব তথা পা-দানির মধ্যে পা রেখে তিন বার-بِسْمِ اللهِ পড়লেন। অতঃপর যখন ঘোড়ায় আরোহণ করলেন, তখন الْحَمْدُ لِلَّهِ বলে এ আয়াতটি পাঠ করলেন—
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
“পবিত্র মহান সেই সত্তা যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। আর আমরা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।” [৯]
অতঃপর তিন বার اَلْحَمْدُ لِلَّهِ এবং তিন বার اللهُ أَكْبَرُ পড়ে তারপর এ দু'আ পড়লেন-
سُبْحَانَكَ إِنِّي قَدْ ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا انت
অতঃপর তিনি মুচকি হাসলেন। আমি বললাম যে, হে আমিরুল মুমিনিন! হাসির কারণ কী? তিনি বললেন যে, আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমনটি করতে দেখেছি। আর যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসলেন, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার হাসির কারণ কী? উত্তরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করেন-নিঃসন্দেহে আমার রব ঐ বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান, যে এ দু'আটি পাঠ করে-
رَبِّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي إِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ غَيْرُكَ [১০]
টিকাঃ
[১] নিসা-৪: ৬৪
[২] সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪৮৪; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২৪০৬৫
[৩] সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ১৩৪৫; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ৮৮১৮
(৪) সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ৪৮৫৯; সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৪৩৩; সুনানে দারেমী: হাদিস নং ২৭০০; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৯৭৬৯
[১] মুসনাদে আবু দাউদ: হাদিস নং ৪৪৫৭
[২] তাফসীরে ইবনে কাসীর
[৭] প্রাগুক্ত
[৮] মাজমাউয-যাওয়ায়েদ
[৯] যুখরুফ-৪৩: ১৩-১৪
[১০] সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৪৪৬; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ২৬০২
📄 ইস্তিগফার সকল সমস্যার সমাধান
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, সুরাবাকারার ৩৭ নং আয়াত-
فَتَلَقَّى آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
এর তাফসীরে বলেন, এ আয়াতে বর্ণিত কালিমা হল-
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْلِ إِنَّكَ أَنْتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ؛ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ؛ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ عَمِلْتُ سُوا وَظَلَمْتُ نَفْسِي فَتُبْ عَلَى إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
অর্থ: হে আল্লাহ আপনি পবিত্র। আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি অপরাধ করেছি এবং নিজের উপর জুলুম করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি সকল ক্ষমাকারীর মধ্যে সর্বোত্তম। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আপনি প্রশংসার যোগ্য। আমি অপরাধ করেছি, নিজেই নিজের উপর জুলুম করেছি। আমার উপর অনুগ্রহ করুন। কেননা আপনি সকল অনুগ্রহকারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহকারী। আপনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র প্রশংসার যোগ্য। আমি অপরাধ করেছি, নিজেই নিজের উপর জুলুম করেছি। আমার তাওবা কবুল করুন। বাস্তবতা হল-আপনি বার বার তাওবা কবুলকারী ও অতি দয়ালু। [১১]
হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু এটা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মুহাদ্দিসিনে এতে সন্দেহ পোষণ করেছেন।
اِغْفِرْلِی তথা আমাকে ক্ষমা করুন
হজরত ইয়াহইয়া ইবনে বাকের রাহি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—আমাকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহুর সন্তান আবু উবায়দা চিঠি লিখেছেন। যাতে কিছু কথা লিখা ছিল। যার মধ্যে একটি কথা ছিল- রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন যে, আত্তাহিয়্যাতুর পরে এ দু'আটি পড়া আমার পছন্দ-
سُبْحَانَكَ لَا إِلَهَ غَيْرُكَ اِغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَأَصْلِحْ لِي عَمَلِي إِنَّكَ تَغْفِرُ الذُّنُوْبَ لِمَنْ تَشَاءُ وَأَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيمُ يَا غَفَّارُ اغْفِرْ لِي يَا تَوَّابُ تُبْ عَلَى يَا رَحْمَانُ ارْحَمْنِي يَا عَفُوٌّ اعْفُ عَنِّي يَا رَءُوْفٌ ارْءُفْ بِي يَا رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتِكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ؛ وَطَوَّقْنِي حُسْنَ عِبَادَتِكَ يَا رَبِّ أَسْتَلُكَ مِنْ خَيْرِ كُلِهِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّهِ؛ يَا رَبِّ افْتَحْ لِي بِخَيْرٍ وَاخْتُمْ لِي بِخَيْرٍ؛ آتِنِي شَوْقًا إِلَى لِقَابِكَ مِنْ غَيْرِ ضَرَّاءِ مُضِرَّةٍ وَلَا فِتْنَةٍ مُضِلَّةٍ وقِنِي السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
অর্থ: হে আল্লাহ আপনি পবিত্র। আপনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আমার গুনাহকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার আমলের সংশোধন করে দিন। আপনি যাকে চান তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আপনি "গাফুরুর রাহিম” তথা অতি দয়ালু। হে গাফ্ফার! আমাকে মাগফিরাত দান করুন। হে তাওয়াব! আমার তাওবা কবুল করুন। হে রহমান! আমার উপর রহম করুন। হে আমার রব! আমাকে ঐ কাজের অনুগামী বানিয়ে দিন যেন আমি ঐ সকল নি'আমতের শুকর আদায় করি, যা আপনি আমাকে দান করেছেন। আমাকে শক্তি দিন যেন আমি আপনার উত্তম ইবাদাত করতে পারি। হে আমার রব! আমি সকল প্রকার কল্যাণের অংশ কামনা করছি এবং ক্ষতির সকল প্রকার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আমার প্রতিপালক! আমার সূচনাও কল্যাণের সাথে করুন এবং সমাপ্তিও কল্যাণের সাথে করুন। আমাকে আপনার সাক্ষাতের আগ্রহ দান করুন। কোন ক্ষতিকর কথা এবং কোন পথভ্রষ্ট ফিতনা এবং সকল প্রকার থেকে আমাকে বাঁচান এবং সেই দিন (কিয়ামতের দিন) যাকে আপনি সকল ক্ষতি থেকে হেফাজত করবেন, তার উপর আপনার অনেক বড় অনুগ্রহ। আর এটাই মহা সফলতা। [১২]
তাসবিহ, হামদ ও ইস্তিগফার
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, যখন—
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
অবতীর্ণ হল, তখন থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এটা পড়তেন, তখন অধিকাংশ সময় রুকুর মধ্যে এ দু'আ পাঠ করতেন—
سُبْحَانَكَ اللهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْلِي إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
অর্থ: হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি পবিত্র এবং প্রশংসার উপযুক্ত। হে আল্লাহ! আমাকে মাগফিরাত দান করুন। নিশ্চয় আপনি বার বার তাওবা কবুলকারী ও পুরোপুরি অনুগ্রহকারী। [১৩]
পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক থেকে হেফাজতের দু'আ
বর্তমানে পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক একটি মারাত্মক রোগ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রোগ থেকে হেফাজতের আমল বর্ণনা করেছেন। হজরত কাবিসা ইবনুল মুখারিক রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাতে হাজির হয়ে আরজ করলেন—আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমার শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। আপনি আমাকে এমন কোন দু'আ শিখিয়ে দিন, যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা আমাকে উপকৃত করেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন—ফজরের পরে তিন বার এ দু'আটি পাঠ করলে তুমি অন্ধত্ব, কুষ্ঠ ও পক্ষাঘাত বা স্ট্রোক থেকে বেঁচে থাকবে।
سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ
আর তুমি এ বাক্য দ্বারা দু'আ করবে—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلُكَ مِمَّا عِنْدَكَ وَأَفِضْ عَلَيَّ مِنْ فَضْلِكَ وَانْشُرْ عَلَى مِنْ بَرَكَاتِكَ
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার নিকট ঐ সকল নি'আমত কামনা করছি, যা আপনার নিকট রয়েছে। আমার উপর অনুগ্রহ করুন এবং আমার উপর আপনার বরকত নাজিল করুন। [১৪]
হাদিসটির সনদ তো বুঝাই যায় যে, সনদটি তেমন মজবুত নয়। তবে আমি অনেক উলামায়ে কেরামকে এই অজিফা বলতে শুনেছি এবং আমাদের এক সম্মানিত উস্তাদ বলতেন যে, মিয়া এই দু'আটি ফজরের পর তিনবার পড়। দু'আটি হল—
سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِي الْعَظِيمِ
এই দু'আটি পড়লে ইন শা' আল্লাহ চলাফেরা অবস্থায় এ পৃথিবী থেকে বিদায় হবে। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে, তার ইন্তেকাল চলাফেরা অবস্থায়ই হয়েছে। মা'জুর হয়ে কারো উপর মুখাপেক্ষী হতে হয়নি। বাস্তবেই মানুষ কারো মুখাপেক্ষী না হওয়া অনেক বড় নি'আমত। বিশেষ করে বর্তমানে যেখানে মানুষের খিদমতের প্রেরণা ও বড়দের সম্মান ও মর্যাদা অনেক কমে গিয়েছে এবং অধিকাংশ লোকদের সন্তান-সন্তুতিই অযোগ্য ও অবাধ্য। হায়! যদি সন্তান-সন্ততিদের মাতা-পিতার হকের অনুভূতি হয়ে যেত, তাহলে তারা নিজেদের অবস্থার উপর লজ্জিত হত এবং তাওবার দিকে প্রত্যাবর্তন করত।
টিকাঃ
[১১] বায়হাকী; তারগীব ওয়াত তারহীব
[১২] মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ২/৩৩৭ পৃষ্ঠা, হাদিস নং ২৮৬২
[১৩] মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২৫৯২৮
[১৪] মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২০৫০২
📄 ইস্তিগফার প্রত্যেক নি‘আমত এবং সহজলভ্যতার চাবিকাঠি
আল্লাহু আকবার! আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আপনি সূর্যকে দূর থেকে দেখলে সূর্যকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হয়। এক-দুই ফুট। হ্যাঁ! আমাদের নিকট সূর্যকে নিজের থেকেও ছোট মনে হয়। কেননা আমরা সূর্যের দিকে ভ্রমণ করে যত সূর্যের নিকটবর্তী হব, তত সূর্য বড় হবে এবং আমরা ছোট হব। আর যদি আমরা সূর্যের একদম নিকটে চলে যাই, তাহলে কি হবে? তখন আমাদের নিকট নিজেদেরকে এর বিপরীতে একটি বিন্দুর পরিমাণও মনে হবে না। কেননা সূর্য জমিন থেকে অনেকগুণ বড়। আর আমরা তো শুধু জমিন নয়, বরং জমিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বস্তুর চেয়েও ছোট। ঠিক তদ্রুপ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা থেকে যত দূরে, সে আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদা কীভাবে বুঝবে। সে তো নিজেকে এবং নিজের নফসকে বড় মনে করে।
এজন্য আল্লাহ তা'আলার হুকুম ও আল্লাহ তা'আলার নামের উপর সে দাঁড়ায় না। তবে যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যশীল হয়ে যায়, তখন তার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আর তাঁর সম্মান ও মর্যাদার তো কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সূর্য তো অনেক ক্ষুদ্র। আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তা'আলা সকল বস্তুর চেয়ে বড়। এজন্য যখন প্রেম-ভালোবাসায় ডুবে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম আবেদন করলেন যে, হে আমার রব! আমাকে আপনার সাক্ষাত দান করুন। তখন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- لَنْ تَرَانِی হে মুসা! তুমি আমাকে দেখতে পারবে না। দুনিয়ার চক্ষু তো একটি পাহাড়কেও সম্পূর্ণভাবে দেখতে পারে না। একটি সমুদ্রের শেষ সীমা দৃষ্টিগোচর করতে পারে না। আর আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও মর্যাদার সামনে তো এ সকল বস্তু কিছুই না। দুনিয়ার চক্ষুর সেই শক্তি কোথায় যে, আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তো দেহ থেকে পবিত্র। দিক বা পার্শ্ব থেকে পবিত্র এবং কোন প্রকার উপমা থেকেও পবিত্র। তাঁর মত আর কেউই নেই যে, উক্ত বস্তুর কল্পনা করে অনুমান করতে পারে। তবে হ্যাঁ! পরকালে জান্নাতের বাসিন্দাদেরকে এমন চক্ষু দেওয়া হবে, যা দিয়ে তারা "আল্লাহ তা'আলাকে দেখার" মহান নি'আমত লাভ করতে পারবে। এমন মহান রবের হক কে আদায় করতে পারে? আর এজন্যই রয়েছে ইস্তিগফার। এমন মহান রবের নাফরমানী? তাওবা তাওবা। এজন্যই রয়েছে তাওবা। আর ঐ দিকে এমন সম্মান ও মর্যাদা সত্ত্বেও এত রহমত যে, প্রত্যেক গুনাহের জন্য তাওবার দরজা খোলা। বরং স্বীয় বান্দাদেরকে ডাকছেন যে, আসো! আসো! তাওবা করে নাও। আর তারপরে ক্ষমাও এত দ্রুত যা কল্পনারও বাহিরে।
আল্লাহ তা'আলার ভয়
আল্লাহ তা'আলার গোলামী ও দাসত্ব অবলম্বনকারীগণ কখনো ব্যর্থ হয় না। অন্তরের গভীর থেকে ঘোষণা করুন-
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র আপনারই গোলামী ও দাসত্ব অবলম্বন করি এবং একমাত্র আপনার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি।
হজরত জা'ফর ইবনে মুহাম্মাদ রাহি. বলেন-
من خاف الله خاف منه كل شئ ولم يخف الله اخاف الله من كل شئ
অর্থাৎ যে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে, সকল বস্তু তাকে ভয় করে। আর যে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে সকল বস্তু দিয়ে ভীত রাখেন। অর্থাৎ তার অন্তরে সকল বস্তুর ভয় সৃষ্টি হয়ে যায়।
আল্লাহ তা'আলার ভয় সকল কল্যাণের মূল
ইস্তিগফার ও তাওবা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করার সৌভাগ্য দান করে। আল্লাহ তা'আলার ভয় লাভ করা অনেক বড় কল্যাণের বিষয়। বরং এটাই সকল কল্যাণের মূল। এমন মূল, যা সুদৃঢ় হয়ে গেলে, তা থেকে উপকার ও কল্যাণ এবং নেকির ডালপালা গজায়।
ইমাম গাজালী রাহি. লিখেন—
জনৈক ব্যক্তি হজরত আবু সাঈদ খুদুরী রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট আবেদন করল যে, আমাকে ওসিয়াত করুন। তিনি বললেন—আল্লাহ তা'আলার ভয়কে নিজের উপর অত্যাবশ্যক করে নাও। এটাই সকল কল্যাণের মূল। আর জিহাদ-কিতাল করাকে নিজের উপর অত্যাবশ্যক করে নাও। কারণ এটাকেই ইসলামের সন্যাসিতু বা দুনিয়াবিমুখতা বলা হয়। আর সর্বদা কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত কর। কেননা এটা দুনিয়াবাসীর মধ্যে তোমার জন্য নুর বা আলো হবে এবং আসমানবাসীর মধ্যে তোমার স্মরণ করা হবে। আর উত্তম কথা ব্যতীত নীরবতাকে অবলম্বন কর। এর ফলে তুমি শয়তানের উপর বিজয়ী হবে। [১৫]
কোন এক ব্যক্তি আবু হাজেম রাহি. কে বলল যে, আমাকে ওসিয়াত করুন। তিনি বললেন—যদি কোন কাজ এমন হয় যে, অবশ্যই উক্ত কাজে তোমার মৃত্যু এসে যাবে এবং এ কাজে মৃত্যুবরণ করা ভাল মনে হয়, তাহলে এমন কাজ অবশ্যই করবে। আর যদি কোন কাজ এমন হয় যে, হয়তো উক্ত কাজে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যু এসে গেলে উক্ত মৃত্যুবরণটা মুসিবাত তথা খারাপ মনে হয়, তাহলে এমন কাজ থেকে বেঁচে থাক। [১৬]
অর্থাৎ উত্তম মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করা এবং খারাপ মৃত্যুর ভয় সবসময় অন্তরে বদ্ধমূল থাকা আবশ্যক।
হজরত হাসান বসরী রাহি, হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি.-কে পত্র লিখলেন—
যে বস্তু দ্বারা আল্লাহ তা'আলা ভয় প্রদর্শন করেন, তাকে ভয় করা উচিত এবং যা কিছু তোমার নিকট বিদ্যমান, তা থেকে ভবিষ্যতের জন্য নিয়ে নাও এবং মৃত্যুর পরে এ অবস্থাটা ঠিকই জানতে পারবে।
অন্য আরেকটি পত্রে লিখেন—
এ কথা স্পষ্ট যে, সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন অবস্থা হল যা তোমাদের সম্মুখে আসছে (অর্থাৎ মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরে) এবং উক্ত অবস্থাটি তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। হয়তো মুক্তির সাথে কিংবা ধ্বংসের সাথে। অর্থাৎ হয়তো উক্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে অথবা তাতে নিক্ষেপ করা হবে। যখন তোমাদের থেকে কোন ভুল-ত্রুটি কিংবা গুনাহ হয়ে যায়, তখনই তা থেকে ফিরে আসা উচিত। অর্থাৎ এই ভুল-ত্রুটি কিংবা গুনাহ দ্বিতীয় বার না করা। আর যখন লজ্জিত হও তথা তাওবা কর, তখন গুনাহের মূলোৎপাটন করে দাও। অর্থাৎ একেবারে ছেড়ে দাও। আর যদি কোন কথা স্মরণ না হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করে নাও এবং যখন তুমি রাগান্বিত হও, তখন সাথে সাথে তা নিয়ন্ত্রণ কর।
হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি. আদি ইবনে আরতাতকে লিখেন-
এই দুনিয়া তাদেরও শত্রু যারা আল্লাহ তা'আলার বন্ধু এবং তাদেরও শত্রু, যারা আল্লাহ তা'আলার শত্রু। কারণ দুনিয়া আল্লাহ তা'আলার বন্ধুদেরকে কষ্ট দেয় এবং আল্লাহ তা'আলার শত্রুদেরকে ধোঁকা দেয়।
হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি, তার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের (গভর্নর ও অন্যান্য দায়িত্বশীল) লিখেন-
বর্তমানে তোমাদের মানুষের উপর জুলুম করার শক্তি ও ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যখন কারো উপর জুলুম করার ইচ্ছা কর, তখন মনে রেখ যে, তোমাদের উপরও আল্লাহ তা'আলার শক্তি ও ক্ষমতা রয়েছে। আর এ কথাটি খুব ভাল করে মনে রেখ যে, তোমরা মানুষের উপর যে জুলুম- নির্যাতন করবে, তা তাদের উপর অতিবাহিত হয়ে যাবে। কিন্তু তোমাদের উপর তা বাকি থাকবে এবং এটাও মনে রেখ, আল্লাহ তা'আলা মাজলুমের প্রতিশোধের জন্য জালেমকে অবশ্যই ধরবেন।
ইমান হল ভয় এবং আশার নাম
ভয় এবং আশার নামই তো ইমান। এমন ভয় যার শেষ ফল হতাশা নয় বরং আশা। আর এমন আশা যার শেষ ফল অলসতা নয় বরং ভয়। এ অবস্থা যার অর্জন হয়ে যাবে, সে ধন্যবাদের উপযুক্ত। জালিম শয়তান হয়তো হতাশার মধ্যে নিক্ষেপ করে, না হয় অলসতার সাগরে ঢুবিয়ে দেয়। তবে শয়তান ঐ সকল মুসলিমদের থেকে অনেক দূরে থাকে, যারা কোন অবস্থাতেই তাওবা-ইস্তিগফার করা ছাড়ে না। শয়তান তাদেরকে দিয়ে গুনাহ করায় আর এরা তাওবা করে উক্ত গুনাহকে নেকিতে পরিণত করে নেয়। শয়তান এটা বুঝায় যে, তুমি নষ্ট হয়ে গেছ। খিয়ানতকারী হয়ে গেছ। অপবিত্র হয়ে গেছ। সুতরাং এখন কিসের তাওবা! গুনাহ করতে থাক। কিন্তু আল্লাহর বান্দাগণ তারপরও স্বীয় রবের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। ক্ষমা চাই মালিক ক্ষমা চাই। তাওবা করছি মালিক, তোমার নিকট তাওবা করছি। তখন শয়তান কাঁদে। আফসোস করে বলে, হায়! আমি যদি তাকে দিয়ে গুনাহই না করাতাম সেটাই ভাল ছিল।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- আমার রব আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য হতে ৭০ হাজার ব্যক্তিকে বিনা হিসাব ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তারপর আবার প্রত্যেক হাজারের সাথে ৭০ হাজার এবং আমার রবের মুষ্ঠিতে তিন মুষ্ঠি। (১৭৷
সুবহানাল্লাহ! প্রত্যেক হাজারের সাথে ৭০ হাজার এবং আল্লাহ তা'আলার মুষ্ঠিতে তিন মুষ্ঠি বলা হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের হাত অনুপাতেই মুষ্ঠি ভরে থাকে। যে যত বড় তার মুষ্ঠিও তত বড়। আল্লাহ তা'আলা শরীর ও সাদৃশ্যতা থেকে পবিত্র। এখানে বুঝার বিষয় হল- দুনিয়াতে যখন কেউ কারো প্রতি খুশি হয়, তখন মুষ্ঠি ভরে ভরে সম্পদ দান করে। আল্লাহ তা'আলাও রহমতের হাতসমূহ দিয়ে ভরে ভরে এই উম্মতের অনেক ব্যক্তিকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। বিনা হিসাবে জান্নাত। এ বাক্যটি পাঠ করতেই অন্তরে প্রশান্তি চলে আসে। হে আল্লাহ! আমাদেরকেও আপনার স্বীয় রহমতে এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।
অন্তরের মোহর
উপরোক্ত হাদিসের বর্ণনাকারী হজরত মুজাহিদ রাহি, বলেন যে, অন্তরের উপমা হল হাতের তালুর মত। মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন একটি আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি (গুনাহ করতে করতে) সকল আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। আর অন্তর যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন এটাই হয়ে যায় অন্তরের তালা। আর হজরত হাসান রাহি. এর অভিমত হল—বান্দা ও আল্লাহ তা'আলার মধ্যে গুনাহের একটি সীমানা রয়েছে। বান্দা যখন উক্ত সীমানায় পৌঁছে যায় (এবং তাওবা না করে) তখন আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেন এবং আর কখনো তাকে কোন নেক কাজের তাওফিক দেন না।
কোন কোন আকাবির বলেন—কোন বান্দা যখন গুনাহ করে, তখন জমিনের যে স্থানে গুনাহ করে, সেই জমিন আল্লাহ তা'আলার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি তাকে ধসিয়ে দেব। তার মাথার উপরের আসমান অনুমতি প্রার্থনা করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি তার উপর ফেটে পড়ব। আল্লাহ তা'আলা এদের দু'জনকেই বলেন যে, আমার বান্দার থেকে বিরত থাক। হয়তো সে তাওবা করবে এবং আমি তাকে মাফ করে দেব অথবা তার গুনাহের পরিবর্তে কোন নেক আমল করবে আর আমি এর পরিবর্তে উক্ত গুনাহকেও নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেব। [১৮]
আল্লাহ তা'আরার আজাব থেকে নির্ভীক হওয়া উচিত নয়
আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে দুনিয়া ও আখিরাতে স্বীয় আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমাদের কখনোই আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে নির্ভীক এবং “বে-পরওয়াহ” হওয়া উচিত নয়। কুরআনুল কারিম সুস্পষ্ট ঘোষণা করছে—
أَفَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُم بَأْسُنَا بَيَاتًا وَهُمْ نَابِمُونَ أَوَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَى أَن يَأْتِيَهُم بَأْسُنَا ضُحًى وَهُمْ يَلْعَبُونَ أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ
"জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি রাতের বেলা তাদের কাছে আমার আজাব এসে যাওয়া থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে? অথবা জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি তাদের কাছে আমার আজাব এসে যাওয়া থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে যখন তারা খেলাধুলা করতে থাকবে? তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত কওম ছাড়া আল্লাহর কৌশল থেকে আর কেউ (নিজেদেরকে) নিরাপদ মনে করে না।"[১৯]
বরকতময় একটি দু'আ
আমাদের আকা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
اللَّهُمَّ لَا تُؤْمِنَّا مَكْرَكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আপনার হঠাৎ আজাব থেকে নির্ভয় করবেন না। مَكْرَكَ তথা আল্লাহ তা'আলার গোপন কার্যক্রম এবং আল্লাহ তা'আলার হঠাৎ আজাব। কোন মানুষ যখন কোন গুনাহকে নেকি মনে করে কিংবা সে এ কথার উপর নির্ভীক হয়ে যায় যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার আজাব আসতেই পারে না। কারণ আমি অমুক নেক কাজ করি। আল্লাহ! আল্লাহ! হজরত সাহাবায়ে কেরام রাদিআল্লাহু আনহুমদের দেখুন! এত উঁচু আমল করেও তারা আল্লাহ তা'আলার আজাবের ভয়ে ভীত ও কম্পমান থাকতেন। আর এ দিকে আমরা লোক দেখানো সামান্য টুটাফাটা দু-একটি নেক কাজ করেই আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে নির্ভীক হয়ে যাই।
আমাদের তো নিজেদের গুনাহগুলোও দেখা উচিত। কেউ সালাত পরিত্যাগকারী তো কেউ সালাতের প্রতি অলসতা প্রদর্শনকারী প্রাণহীন সালাত আদায়কারী। মিথ্যা তো মুখ থেকে একদমই পড়ে না। গর্ব, অহংকার, রাগ ও লোক দেখানোর মত নোংরা কাজগুলোতে আমরা সর্বদা লিপ্ত। চেহারা এবং পোশাক সুন্নাত অনুযায়ী নেই। বিবাহ-শাদিতে সর্বপ্রকার শরীয়াতবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং বিদ'আত ও বিভিন্ন কুপ্রথার ছড়াছড়ি। প্রতিটি ঘরে বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা ও অশ্লীলতা ভরপুর। আল্লাহ তা'আলা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাক এবং একে অপরের ইজ্জত বানিয়েছেন। কিন্তু আজ প্রতিটি ঘরে এই পোশাক টুকরো টুকরো এবং এই ইজ্জত লাঞ্ছিত হচ্ছে। দৃষ্টি নির্লজ্জ। কণ্ঠ নির্লজ্জ। চেহারা নির্লজ্জ এবং চিন্তা-ভাবনা পর্যন্ত নির্লজ্জ। একটু একা হলেই প্রত্যেকে এটা ভুলে যায় যে, আমার আল্লাহ তা'আলা আমাকে দেখছেন। সুদ-ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও খিয়ানত, সম্মিলিত সম্পদ দ্বারা বিলাসিতা এবং অসচেতনতা। আর কারো কারো তো শুধুমাত্র দুনিয়ার ফিকির। লাইফস্টাইল তথা জীবনাচার ও ব্রাইট ফিউচার তথা উজ্জ্বল ভবিষ্যত এর বাইরে আর কিছুই যেন নেই। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ক্ষমা করুন।
হে আল্লাহ! আপনি তো আপনিই....
হজরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, পূর্ববর্তী উম্মতের এক ব্যক্তি একটি খুপড়ি ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উক্ত খুপড়ি দেখে তার অন্তরে কিছু চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক হল। সে বলল-
اللَّهُمَّ أَنْتَ أَنْتَ؛ وَأَنَا أَنَا أَنْتَ الْعَوَّادُ بِالْمَغْفِرَةِ ۚ وَأَنَا الْعَوَّادُ بِالذُّنُوْبِ؛ فَاغْفِرْ لِي
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আপনিই। আর আমি আমিই। আমি গুনাহে অভ্যস্ত আর আপনি মাগফিরাতে অভ্যস্ত। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।
এ দু'আ পাঠ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তাকে বলা হল তোমার মাথা উঠাও। কেননা তুমি গুনাহে অভ্যস্ত আর আমি মাগফিরাতে অভ্যস্ত। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন সে মাথা উঠালো এবং আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। [২০]
বিশাল সুসংবাদ
হাদিস শরীফে এসেছে; এক বান্দা গুনাহ করে আরজ করল-
رَبِّ أَذْنَبْتُ فَاغْفِرْ لِي فَقَالَ رَبَّهُ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ غَفَرْتُ لِعَبْدِي ثُمَّ مَكَثَ مَا شَاءَ اللَّهُ، ثُمَّ أَصَابَ ذَنْبًا فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا آخَرَ؛ فَاغْفِرْ لِي فَقَالَ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي؛ ثُمَّ أَصَابَ ذَنْبًا فَقَالَ: رَبِّ أَذْنَبْتُ ذَنْبًا آخَرَ؛ فَاغْفِرْ لِي قَالَ: عَلِمَ عَبْدِي أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ وَيَأْخُذُبِهِ؛ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي فَلْيَفْعَلْ مَا شَاءَ
অর্থাৎ হে আমার রব! আমি গুনাহ করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন; আমার বান্দা জানে তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ঐ বান্দা আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছে তো আবার বলছে হে আমার রব! আমি আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আমার বান্দার জানা আছে- তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ঐ বান্দা আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছে তো আবার বলছে হে আমার রব! আমি আরও একটি গুনাহ করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, আমার বান্দার জানা আছে-তার একজন রব আছেন। যিনি গুনাহের জন্য ক্ষমাও করতে পারেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দিতে পারেন। তাই আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম। সুতরাং সে যা ইচ্ছা করুক।[২১]
টিকাঃ
[১৫] এহইয়াউল উলুম
[১৬] প্রাগুক্ত
(১৭) সুনানে তিরমিজি; সুনানে ইবনে মাজাহ; মুসনাদে আহমাদ
[১৮] এহইয়াউল উলুম
[১৯] আ'রাফ- ৭: ৯৭-৯৯
[২০] জামেউল আহাদিস: হাদিস নং ২১০৮২; কানযুল উম্মাল: হাদিস নং ১০২৭৬
[২১] মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ৭৯৪৮; কানযুল উম্মাল: ৪/২০১।