📄 ইস্তিগফারের ২০টি উপকারিতা
শয়তান বলে যে, আমি আদম সন্তানদেরকে গুনাহের দ্বারা ধ্বংস করেছি। আর তারা আমাকে ইস্তিগফার এবং لا اله الا الله مُحَمَّدُ السُول الله দ্বারা ধ্বংস করেছে।
প্রিয় পাঠক! বেশি বেশি ইস্তিগফারের মধ্যে অভিশপ্ত শয়তানের ধ্বংস। হজরত হাসান বসরী রাহি. বলেন-বেশি বেশি ইস্তিগফারের অভ্যাস কর। নিজেদের ঘরসমূহে, নিজেদের দস্তরখানসমূহে, নিজেদের পথঘাটে ও নিজেদের সভা-সমাবেশসমূহে। কি জানি কোন সময় মাগফিরাত নাজিল হয়ে যায়? ইস্তিগফারের অসংখ্য উপকারিতা। যেমন—
১. এটা আল্লাহ তা'আলার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।
২. এটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় আমল।
৩. এটা গুনাহসমূহের মাগফিরাতের মাধ্যম।
৪. এটার দ্বারা জান্নাত পাওয়া যায়।
৫. এটা অন্তরের অন্ধকার দূর করে।
৬. এর দ্বারা আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়।
৭. এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার রহমত নাযিল হয়।
৮. এটা কবরের সর্বোত্তম প্রতিবেশী।
৯. এর দ্বারা সর্বপ্রকার আধ্যাত্মিক ও শারীরিক শক্তি অর্জন হয়।
১০. এটা হালাল রিজিক বৃদ্ধি হওয়ার বিশাল মাধ্যম।
১১. এটা নফসকে দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, হতাশা, যৌনক্ষুধা, কুমন্ত্রণা ও গুনাহের ধুলাবালু থেকে পবিত্র করে।
১২. এটা নেক সন্তান লাভের মাধ্যম।
১৩. এটা সর্বরোগের চিকিৎসা।
১৪. এর দ্বারা মানুষের দুনিয়ার সর্বোত্তম জীবন লাভ হয়।
১৫. এটা মাকবুল তথা গ্রহণযোগ্য আমলের নিরাপত্তা।
১৬. এর দ্বারা বিপদাপদ দূর হয়।
১৭. এর বরকতে মানুষের নিজস্ব আসল মর্যাদা ও ফজিলত লাভ হয়।
১৮. এর দ্বারা উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ হয়।
১৯. এর দ্বারা শরহে সদর হয় তথা অন্তর চক্ষু খুলে যায়।
২০. এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হল-এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সাথে বান্দার সম্পর্ক ঠিক হয়।
اسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
প্রিয় পাঠক! আজই যে কোন সময় কোন মসজিদ কিংবা খালি জায়গার দিকে বের হয়ে যান। রাস্তায় কাঁদতে থাকুন আর বলতে থাকুন-হে আমার প্রিয় রব! আমি ক্ষমা চাইতে আসছি। তাওবা করতে আসছি। অতঃপর সেখানে পৌঁছে নিজের প্রতিটি গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ইমানের দুর্বলতা, ফরজ আমলের প্রতি অলসতা, নিফাক, গীবত, হিংসা, শত্রুতা, অশ্লীলতা, দুর্বলতা, অলসতা, দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা, লাঞ্ছনা ও অপদস্ততাসহ অসংখ্য-অগণিত গুনাহ। কাঁদতে থাকুন আর ক্ষমা চাইতে থাকুন। যতক্ষণ পর্যন্ত রহমত নাজিল হওয়া অনুভূত না হয়। তারপর অন্তরে যা উদিত হয় তা কাউকে কখনো বলবেন না। প্রিয় পাঠক! মনে রাখবেন মালিকের সামনে হাজির হতে হবে। গোটা দুনিয়ায় ইসলামকে বিজয়ী করার মেহনত করতে হবে। গুনাহ থেকে মুক্ত হলে কিছু কাজ হবে।
মানুষের ভয়ঙ্কর মুহূর্ত
বান্দার উপর আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নি'আমত। মানুষের নফসের উপর যখন পেরেশানী এবং কুমন্ত্রণার আক্রমণ হয়, তখন সে মনে করে যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার কোন নি'আমত নেই। আমি দুনিয়ার সবচেয়ে মজলুম। সবচেয়ে খারাপ এবং সবচেয়ে বেশি দুঃখী মানুষ। এই মুহূর্তটা বড় ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। অধিকাংশ মানুষ ঐ মুহূর্তেই বড় বড় ভুল করে থাকে। আর সারা জীবনভর সে ভুলের মাশুল দেয়। তাদের এ কথাও স্মরণ থাকে না যে, তাদের নিকট কালিমায়ে তায়্যিবার মত মূল্যবান। নি'আমত রয়েছে। তারা ভুলে যায়, তারা যে শাস গ্রহণ করছে তা কত বড় নি'আমত। তাদের এটাও মনে থাকে না যে, তাদের পেটে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার প্রদত্ত খাবার। তাদের এটাও অনুভব হয় না যে, তাদের মন ও মননে কুরআনুল কারিমের কি পরিমাণ আয়াত রয়েছে। তারা এটাও ভুলে বসে যে, তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার কতগুলো পর্দা রয়েছে। এমন পর্দা- যদি সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তাদের সকল রাগ ও ক্ষোভ লজ্জায় পরিণত হবে। তারা এটাও ভাবে না যে, ঐ সময় তারা যে সব দুঃখ-কষ্ট অনুভব করছে, এই অনুভূতিটুকুও আল্লাহ তা'আলার কোন শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আর না হয় এমন সময়ও আসে যখন মানুষ এমন অসহায় অবস্থায় পতিত হয় যে, তখন সে মার খায় কিন্তু রাগ হতে পারে না। তখন সে এমন দুঃখ-কষ্ট দেখে যে, তার শরীরে কিছু অনুভব করার মত অবস্থাও থাকে না। এজন্য যখনই নফসের উপর পেরেশানি ও কুমন্ত্রণার প্রচন্ড আক্রমণ হয়, তখন কোন প্রকার সিদ্ধান্ত না নেওয়া। তখন একমাত্র কাজ হল একাগ্রচিত্তে ইস্তিগফারে লেগে যাওয়া। নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করা এবং এর উপর কান্নাকাটি করা। আল্লাহ তা'আলার নিকট এর ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর নিজের মনকে বুঝানো যে, বর্তমানে যা কিছু আমার উপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, তা বাস্তব নয়। এগুলো একমাত্র শয়তানের ধোঁকা। আর শয়তান পলায়ন করে জিকির ও ইস্তিগফারের দ্বারা। সিদ্ধান্ত নেওয়া, অন্যকে অপবাদ দেওয়া এবং বেশি বেশি চিন্তা করার দ্বারা নয়।
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
টিকাঃ
[১৩] বনি ইসরাইল- ১৭: ৬৫
📄 ইস্তিগফার শয়তানের কোমর ভেঙ্গে দেয়
শয়তান এবং তার চ্যালাচামুণ্ডরা মূলত অনেক মেহনত করছে যেন মুসলমান তাওবা-ইস্তিগফার থেকে দূরে এবং বঞ্চিত থাকে। এর কারণ সুস্পষ্ট। তাওবা-ইস্তিগফারের দ্বারা অভিশপ্ত শয়তানের কোমর ভেঙ্গে যায় এবং সে এত পরিশ্রম করে যে সকল গুনাহ করায়, তা সব মাফ হয়ে যায়। বরং খাঁটি তাওবার দ্বারা ঐ সব গুনাহও নেকিতে পরিণত হয়ে যায়। মা-শা' আল্লাহ! উম্মতের মধ্যে কিছু লোক সর্বদাই শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে মুসলমানদেরকে তাওবা-ইস্তিগফারের দিকে নিয়ে আসার কাজ করে যাচ্ছেন। এমন লোকগুলো উম্মতের জন্য অনেক বড় অনুগ্রহকারী। কথিত আছে-আরবের কোন এক দেশে একজন বৃদ্ধ বুজুর্গ সর্বদা মসজিদে পড়ে থাকতেন। আর তার কাজ ছিল শুধু সমাজের সর্বস্তরের মুসলমানদেরকে তাওবা-ইস্তিগফারের দিকে নিয়ে আসা। এক ব্যক্তি ছিল যার অনেক বৎসর যাবত কোন সন্তান হচ্ছিল না। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে খুবই পেরেশান। কেউ একজন স্বামীকে বলল যে, অমুক মসজিদে যাও। সেখানে এক বুজুর্গ আছেন যিনি এই রোগের ঔষধ দেয় এবং তার সেই ঔষধে এক বছরের মধ্যেই সন্তান হয়ে যায়। সে ব্যক্তি উক্ত মসজিদে গেলেন। গিয়ে দেখেন একজন সাধারণ বুজুর্গ। যার না আছে কোন মুরিদ। না আছে কোন হাদিয়া-তোহফা। না আছে কোন কাশফ-ইলহাম। না আছে নিজের জন্য কোন দাবি-দাওয়া। উক্ত ব্যক্তি তার সমস্যা বলার পর বুজুর্গ বললেন-ছেলে! একটি ঔষধ আছে যা তোমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সেবন করতে হবে। তবে তা অনেক তিতা। খেতে পারবে তো? সে বলল, অবশ্যই খেতে পারব। অনেক পেরেশানিতে আছি। বুজর্গ বললেন, ফজরের এক ঘণ্টা পূর্বে উভয়ে ঘুম থেকে উঠে অজু করে নেবে। তারপর আধাঘণ্টা নফল সালাত পড়বে এবং আধাঘণ্টা ইস্তিগফার করবে। তারপরে ফজরের সালাত পড়বে। অনেক কার্যকরী ঔষধ এটা। স্বামী গিয়ে স্ত্রীকে বলল। তখন রাত হয়ে গিয়েছিল। স্বামী বললেন আগামী কাল থেকে কি শুরু করবে? আল্লাহর বান্দী বললেন, আগামী কাল থেকে কেন? ইন শা' আল্লাহ আজ থেকেই শুরু করব। এমন ঔষধ তো অনেক বড় নি'আমত। উভয়ে আমল শুরু করল। মা-শা' আল্লাহ এই আমল শুরু করার ছয় মাস পরেই তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে গেল। তারপর একাধারে সন্তানের ধারাবাহিকতা চলছে। তবে সন্তানের চেয়েও অধিক সে যে বস্তুটি পেয়েছে তা হল ইস্তিগফারের নি'আমত।
📄 ইস্তিগফারকারী নাম মিথ্যাবাদী ও অলসদের তালিকা থেকে বাদ
হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
مِنِ اسْتَغْفَرَ اللَّهَ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً لَمْ يُكْتَبُ مِنَ الْكَاذِبِينَ وَمَنِ اسْتَغْفَرَ اللَّهَ فِي لَيْلَةٍ سَبْعِينَ مَرَّةً لَّمْ يُكْتَبْ مِنَ الْغَافِلِينَ
"যে ব্যক্তি দৈনিক ৭০ বার ইস্তিগফার করবে, তার নাম মিথ্যাবাদীর তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি প্রতি রাতে ৭০ বার ইস্তিগফার করবে, তার নাম অলসদের তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হবে। "[১৪]
টিকাঃ
[১৪] ইবনুস সুন্নাহ; দায়লামী
📄 ইস্তিগফার হল প্রশান্তি ও নিরাপত্তা
ইস্তিগফার হল দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের ভাণ্ডার এবং চাবি। কুরআনুল কারিমের উপর চিন্তা-ভাবনা করুন। দেখবেন কালিমার পরেই রয়েছে ইস্তিগফার। বুঝা গেল ইমানের নিরাপত্তা হল ইস্তিগফার। সালাতের পরে ইস্তিগফার। জাকাতের পরে ইস্তিগফার। বুঝা গেল আমলের গ্রহণীয়তার মাধ্যম হল ইস্তিগফার। জিহাদে পরাজয়ের পরে ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুঝা গেল, আঘাতের উপশম হল ইস্তিগফার। জিহাদে বিজয় লাভের পর ইস্তিগফার। বুঝা গেল, নি'আমতের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার মাধ্যম হল ইস্তিগফার। কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন জায়গায় ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইস্তিগফারের প্রতি মুসলমানদের মনোযোগ নিবদ্ধ হয় না। বুঝা গেল ইস্তিগফারের বিরুদ্ধে শয়তানি অনেক বড় চক্রান্তের জাল সর্বদা চলমান। এই চক্রান্তের জালে ঐ সকল লোকও অন্তর্ভুক্ত যারা বলে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সকল গুনাহ না ছাড়তে পারবে, ততক্ষণ ইস্তিগফারের কোন ফায়দা নেই। তাওবা! তাওবা! এটা কেমন জুলুম ও মূর্খতার কথা। ইস্তিগফারের অর্থই হল ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর গুনাহের জন্যই তো ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং বার বার ক্ষমা প্রার্থনার দ্বারা কঠিন থেকে কঠিন গুনাহের রশিও ছিঁড়ে যায়। গুনাহ হয়ে গেছে! তো সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করে ফেলুন। তারপর যদি আবার হয়ে যায় আবার ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আবার হয়ে গেলে আবার ক্ষমা প্রার্থনা করুন। পুরোপুরি লজ্জা ও অনুতপ্তের সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।