📄 তাওহিদ, দু‘আ, আশা-ভরসা ও ইস্তিগফার
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أَبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةٌ
“হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-হে আদম সন্তা! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার প্রতি আশা পোষণ করতে থাকবে (যে আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেব) ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ সত্ত্বেও তোমাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব। আর এতে আমার কোন পরওয়া নেই যে কত বড় গুনাহগারকে ক্ষমা করছি।
হে আদম সন্তান! তোমাদের গুনাহ যদি সাগরের ফেনার সমানও হয়ে যায়, আর তখনও তোমরা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলেও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেব এবং (কাউকে ক্ষমা করতে) আমার কোন পরওয়া নেই।
হে আদম সন্তান! তোমরা যদি গোটা জমিনভরা গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আসো কিন্তু তোমার সাথে আমার এ অবস্থায় সাক্ষাত হয় যে, আমার সাথে কোন শিরক করোনি, তাহলে মনে রেখ আমি গোটা জমিনভরা মাগফিরাত নিয়ে উপস্থিত হব।”।১।
এই হাদিসটিতে চারটি বস্তুকে মাগফিরাতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথা-
১. দু'আ করা।
২. আল্লাহ তা'আলার প্রতি আশা-ভরসা রাখা।
৩. ইস্তিগফার করা।
৪. আকিদাতুত তাওহিদের উপর দৃঢ়ভাবে অটল থেকে সর্বপ্রকার শিরক থেকে বেঁচে থাকা।
টিকাঃ
[১] সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৫৪০; সুনানে দারেমী: হাদিস নং ২৮৩০; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২১৪৭২
📄 ইস্তিগফারের আহ্বান
আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে স্বীয় মাগফিরাত নসিব করুন। সম্মানিত পাঠক! আজ আপনাদেরকে একটি আশ্চর্য ও মহান ইবাদাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেব। এত বড় ইবাদাত-যার নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলার খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দিয়েছেন। এমনকি সকল আম্বিয়া আলাইহিস সালামকে দিয়েছেন। এমন ইবাদাত যার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে শত শত আয়াত বিদ্যমান। এমন ইবাদাত যার উপকারিতা হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এমন ইবাদাত যার তাৎক্ষণিক উপকার দুনিয়াতে এবং চিরস্থায়ী উপকার পরকালে পাওয়া যায়। এমন ইবাদাত যা মানুষকে না হতাশ হতে দেয়, না বঞ্চিত হতে দেয়। এমন ইবাদাত যা নিজের জন্যও করার নির্দেশ রয়েছে এবং অপরের জন্যও করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এমন ইবাদাত যার কথা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বেশি বলতেন যে, হজরত সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম নিয়মিত করতেন। এমন ইবাদাত যা অন্তরকে অন্তরের মরিচা থেকে পবিত্র করে। এমন ইবাদাত যা ধ্বংসাত্মক আঘাতের প্রশান্তিদায়ক উপশম হিসেবে কাজ করে। এমন ইবাদাত যা দুর্বল মানুষকে শক্তিশালী বানিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা করতে দেখলে শয়তান চিৎকার করে কাঁদে এবং ছটফট করে এবং দুঃখ-বেদনায় নিজেই নিজের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। এমন ইবাদাত যা সকল আমলকে মাকবুল তথা আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণযোগ্য বানিয়ে দেয় এবং দীর্ঘ পথ দ্রুত পাড়ি দিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা কণ্টকাকীর্ণ পথকে কুসুমাস্তীর্ণ বানিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা সকল রোগের প্রতিষেধক। সকল সংকীর্ণতা থেকে উত্তরণের পথ এবং সকল পেরেশানির সমাধান। প্রিয় পাঠক! এই ইবাদাতটির নাম হল-ইস্তিগফার। হ্যাঁ! ইস্তিগফার। পুনরায় শুনে নিন, এই মহান ইবাদাতটির নাম ইস্তিগফার তথা নিজের অবস্থার উপর অনুতপ্ত হওয়া। স্বীয় গুনাহের উপর লজ্জিত হওয়া। স্বীয় প্রিয়তমকে খুশি রাখার ফিকির করা এবং স্বীয় গুনাহসমূহ ত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প করা এবং স্বীয় রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। উক্ত পাঁচ কাজের নাম হল ইস্তিগফার। আর এটা আজও আমাদের প্রয়োজন এবং কালও আমাদের প্রয়োজন। শুধুমাত্র ইস্তিগফারই নয়। বরং অধিক ইস্তিগফার। বেশি বেশি ইস্তিগফার। প্রতিটি আমলের পরে ইস্তিগফার। প্রতিটি নেকির পরে ইস্তিগফার। প্রতিটি গুনাহের পরে ইস্তিগফার। প্রিয় পাঠক! দিনে-রাতে অনুতপ্তের এক ফোঁটা অশ্রু এবং স্বীয় রবের নিকট লজ্জিত হয়ে একটি আহ! হে আমার রব! আমি গুনাহগার, আমাকে মাফ করে দিন। প্রথম তো শয়তান লজ্জিত হতে দেবে না। আর যদি কেউ লজ্জিত হয় তখন তাকে নৈরাশ করে দেয়। অথচ নৈরাশ্যের কি আছে? আমার রবের রহমতের দরজা খোলা। মাগফিরাতের দরজা খোলা।
ছোট বাচ্চা যখন হোঁচট খেয়ে স্বীয় মাতা-পিতার দিকে এগিয়ে যায়, তখন তারা কত খুশি হয়। শয়তান যখন গুনাহ করিয়ে হোঁচট খাওয়ায়, তখন মুখলিস বান্দারা ইস্তিগফার করে পুনরায় স্বীয় মালিকের দিকে এগিয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা'আলার নিকটও অনেক মায়া লাগে। কেউ যদি দিনে সত্তরবারও হোঁচট খায় কিন্তু সাথে সাথে ইস্তিগফার করে স্বীয় রবের অভিমুখী হয়, তাহলে তার গুনাহগুলোকেও নেকিতে রূপান্তর করে দেওয়া হয়। প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তা'আলার মহব্বতকে অনুভব করুন। তিনি যখন কারো প্রতি মহব্বতের দৃষ্টি প্রদান করেন, তখন তাকে তাঁর নাম নেওয়ার তাওফিক দান করেন।
দেখুন! আল্লাহ তা'আলা এ বৎসর মহররম মাসে ইস্তিগফারের সৌভাগ্য দান করেছেন। কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরেছে তো ইজতেমা অনুষ্ঠিত হল। গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সম্মেলনও হয়ে গেল। লোক সংখ্যাও বেশি হল। মিডিয়াতেও প্রকাশ হল। যেখানে দুনিয়াতেই এই ফলাফল তাহলে পরকালের প্রকৃত উপকার ও পুরস্কার কত উচু হবে ইন শা' আল্লাহ। প্রিয় পাঠক! যেখানে হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম মা'সুম তথা গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি ইস্তিগফারের নির্দেশ রয়েছে, তাহলে ভেবে দেখুন তো আমি আর আপনি এই ইবাদাতের কতটা মুখাপেক্ষী? আমাদের তো প্রতিটি আমলই দুর্বল। সুতরাং অনুতপ্ত হওয়া ও ইস্তিগফার ছাড়া উপায় কি? আলোর বিচ্ছুরণ দৃষ্টিগোচর হয়ে গেছে। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি। দুনিয়া থেকে কুফরের বিজয় খতম করার ফিকির যদি আমাদের না থাকে, তাহলে এটা বড়ই আত্মমর্যাদাহীন কথা। গোটা পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় ও মাজলুম মুসলিম উম্মাহর মুক্তিসহ আরও অনেক কাজ। প্রিয় পাঠক! ইস্তিগফার! বেশি বেশি ইস্তিগফার। দৈনিক কমপক্ষে এক হাজার বার ইস্তিগফার। হৃদয়ের অনুতপ্ত ইস্তিগফার। রবকে খুশি করার প্রেরণাদায়ক ইস্তিগফার। নির্জনে ইস্তিগফার। জনসম্মুখে ইস্তিগফার। অশ্রু প্রবাহিত ইস্তিগফার। আশা এবং বিশ্বাসের সাথে ইস্তিগফার। গর্ব ও অহংকার চূর্ণকারী ইস্তিগফার। আফসোস ও দুঃখভারাক্রান্ত ইস্তিগফার। আর বার বার তাওবা। বিরামহীন ও নিরাশাহীন তাওবা। হে বিভিন্ন দল ও জামাতের জিম্মাদারগণ! ইস্তিগফার। হে বিভিন্ন দল ও জামাতের কর্মীগণ! ইস্তিগফার। হে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় মুজাহিদগণ! হে আত্মঘাতী মুজাহিদগণ! ইস্তিগফার। হে আমার মা-বোনেরা! ইস্তিগফার। হে আমার প্রিয় ভাইয়েরা! ইস্তিগফার... ইস্তিগফার... ইস্তিগফার...।
📄 আল্লাহ তা‘আলা তাওবাকারীকে ভালোবাসেন
আল্লাহ তা'আলা কত বড় অনুগ্রহ করেছেন—যেদিন আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন "তাওবার দরজাও" বানিয়েছেন এবং এই দরজা ঐ সময় পর্যন্ত খোলা থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় না হবে। আল্লাহু আকবার কাবীরা! কত বড় দয়া আর কত বড় অনুগ্রহ। তাওবার এই দরজা পশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং অনেক বড়। সত্তর বছর পর্যন্ত যদি কোন অরোহী তার বাহন নিয়ে দৌড়ায়, তাহলে তার প্রশ্বস্ততা শেষ হবে না। আমাদের সকলের উচিত যে, সত্যিকারের তাওবা করে উক্ত দরজায় প্রবেশ করা। আল্লাহ তা'আলা তাওবাকারীকে ভালোবাসেন। হ্যাঁ! ঐ সকল অপরাধী ও গুনাহগারকে, যারা খাঁটি অন্তরে তাওবা করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। আল্লাহ তা'আলার নিকট মাগফিরাতের কোন কমতি নেই। তাঁর রহমত অনেক অনেক বড়।
সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার
হজরত শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার তথা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার হল-
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَى، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আল্লাহ আপনিই আমার রব, আপনাকে ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনারই বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে করা প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গিকারের উপর রয়েছি। আমি আমার সকল কৃতকর্মের কুফল থেকে আপনার নিকট পানাহ চাই। আপনি আমার প্রতি আপনার যে নিয়ামত দান করেছেন তা স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না। ”১।
সর্বোত্তম দু'আ কোনটি?
عَنْ عَلِي رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ خَيْرُ الدُّعَاءِ الاسْتِغْفَارُ وَ خَيْرُ الْعِبَادَةِ قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
“হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শ্রেষ্ঠ দু'আ হল-ইস্তিগফার করা এবং সর্বোত্তম ইবাদাত হল—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করা।”।২।
টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারী: হাদিস নং ৬৩০৩; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ৫০৭০; সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৩৯৩; সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ৫৫২২; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩৮৭২; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৭১১১
📄 নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইস্তিগফার করা
মানুষের দীনি ও দুনিয়াবী প্রয়োজনসমূহ অসংখ্য। ধন-সম্পদ, স্ত্রী-সন্তান, সুখ-শান্তি, সুস্থতা, মেধা, জ্ঞান-বুদ্ধি, ইবাদাতের তাওফিক ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে মানুষের যে বস্তুর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তা হল—গুনাহসমূহ ক্ষমা পাওয়া। আল্লাহ তা'আলার গজব এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচা।
হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত—তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মৃত্যুর সময় এই দু'আ পাঠ করতে দেখেছেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَأَلْحِقْنِي بِالرَّفِيقِ الْأَعْلَى
"হে আল্লাহ আমাকে মাগফিরাত দান করুন। আমার উপর দয়া করুন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ বন্ধুর (নবিগণ ও ফেরেশতাগণ) সাথে মিলিয়ে দিন।"।৩।
টিকাঃ
(২) তারীখে হাকেম।
(৩) সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৪৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ১৬১৯; মুয়াত্তা মালেক: হাদিস নং ৬৩৯; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২৪৭৭৪