📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 কুরআনুল কারিম ও পছন্দনীয় ইস্তিগফার

📄 কুরআনুল কারিম ও পছন্দনীয় ইস্তিগফার


কুরআনুল কারিম আল্লাহ তা'আলার কালাম। কুরআনুল কারিম আমাদেরকে হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের ইস্তিগফার শোনায়-অমুক নবি এই শব্দে আল্লাহ তা'আলার নিকট মাগফিরাত চেয়েছেন। ফেরেশতারা এভাবে ইমানদারদের জন্য ইস্তিগফার করে থাকে। অতীতের আল্লাহ তা'আলার প্রিয় মুজাহিদগণ এই শব্দে আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করেছেন। আল্লাহ তা'আলার প্রিয় বান্দাগণ এই শব্দে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। ইস্তিগফার নিজেই অনেক মনোনীত একটি ইবাদাত ও সর্বোত্তম দু'আ। তারপর যদি এই দু'আ ও ইবাদাত হয় কুরআনুল কারিমের মজবুত ও মুবারক শব্দে তাহলে তো তা গ্রহণযোগ্যতার অধিকতর নিকটবর্তী হয়ে যায়। এ সকল দু'আ বুঝে নিন। মুখস্থ করে নিন এবং নিজের কাছে লিখে নিন। অতঃপর তাহাজ্জুদের সময়, জুমার রাতে ও জুমার দিন আসরের পরে এবং সাধারণত ফরজ সালাতসমূহের পরে এই দু'আসমূহের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করুন। অর্থাৎ মাগফিরাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আশা করা যায় যে, ইন শা' আল্লাহ অনেক ফায়দা হবে।
কুরআনুল কারিমের আলোকিত, চমৎকার ও প্রশান্ত সমুদ্র থেকে ইস্তিগফারের মুক্তা কুড়ানোর পূর্বে কয়েকটি কথা অন্তরে বদ্ধমূল করে নিতে হবে। যথা-
ক. ইস্তিগফারের অর্থ হল-আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করা। যেহেতু প্রকৃত ইস্তিগফার ঐ মুসলমানই করে থাকে, যে নিজেকে গুনাহগার এবং মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী মনে করে।
খ. ক্ষমা প্রার্থনা করা ও মাগফিরাত কামনা করা এবং নিজেকে গুনাহগার মনে করার অবস্থা যে কারো নসিব হয় না। যে লোক শয়তান ও নফসের গোলামীতে লিপ্ত সে না নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হয় এবং না সে নিজের গুনাহসমূহকে গুনাহ মনে করে। এজন্য ইস্তিগফার নসিব হওয়া অনেক বড় নি'আমত।
গ. ইস্তিগফার বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়। আর এটা আশা-ভরসার ঐ স্তর যা কোন বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার থেকে ছিন্ন হতে দেয় না। এজন্য কুরআনুল কারিম ইস্তিগফারের দাওয়াত দিয়েছে। হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণ ইস্তিগফারের দাওয়াত দিয়েছেন। আমাদের সাধারণ মুসলমানদেরও উচিত অপর মুসলমানকে ইস্তিগফারের দাওয়াত দেওয়া।
ঘ. ইস্তিগফারকারী মুসলমান কয়েকটি কথা আন্তরিকভাবে স্বীকার করেন। যথা-
প্রথম-আমার একজন রব আছেন যাকে আমার মানতে হবে।
দ্বিতীয়-একমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিকটই গুনাহ মাফ পাওয়া যাবে। অন্য কারও নিকট নয়।
তৃতীয়-আমি গুনাহগার তবে স্বীয় গুনাহের উপর সন্তুষ্ট নই। এই গুনাহের ক্ষতি থেকে মুক্তি চাই।
অনুমান করুন তো উপরোক্ত তিনটি কথা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং দামী কথা। এজন্য একবার “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা অনেক বড় ইবাদাত এবং দু'আ। যার মধ্যে একসাথে এতটুকু ইমানী কথা এসে যায়-
اسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّوْمُ وَاتُبُوبُ إِلَيْهِ
আসুন এখন বিসমিল্লাহ বলে কুরআনুল কারিমের ইস্তিগফার সংক্রান্ত দু'আসমূহ একটি একটি করে বুঝি এবং পাঠ করি।
১. বিশ্বস্ততার ঘোষণা ও ইস্তিগফার
سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
“আমরা (আল্লাহ তা'আলার নির্দেশকে গ্রহণ করার নিয়তে) শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।”'১৷
এই দু'আটিতে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর সকল বিধানসমূহের প্রতি বিশ্বস্ততার স্বীকারোক্তিও এসে গেছে এবং ইস্তিগফারও। অর্থাৎ মাগফিরাত কামনাও এসে গেছে। ঐ ব্যক্তি যার অন্তর বার বার গোমরাহী তথা পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত হয় তার জন্য এই দু'আটি অধিক গুরুত্বের সাথে পাঠ করা উচিত।
২. ক্ষমা, মাগফিরাত, নুসরাত, রহমত ও সহজ জীবন কামনার জন্য একটি ব্যাপক ইস্তিগফার
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
“হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের উপর বোঝা চাপিয়ে দিবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বহন করাবেন না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদেরকে মার্জনা করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন, আর আমাদের উপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। ”২৷
ইস্তিগফারের অন্তর্ভুক্ত এই দু'আটি একটি বিশেষ নুর। যা কোন মানুষ যেকোন শত্রুর উপর বিজয়ী হওয়ার জন্য বেশি বেশি পাঠ করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়। কয়েকজন ব্যক্তি যাদের অতিরিক্ত কামভাব ছিল; তারা এই ইস্তিগফারটি নিয়মিত পাঠ করে অতিরিক্ত কামভাবের ক্ষতি, অশান্তি ও অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মোটকথা, যেকোন বড় দুশমন, মন্দ অভ্যাস কিংবা মন্দ অবস্থা যদি মানুষকে দমিয়ে রাখে তাহলে এই বরকতময় দু'আটি মনযোগ ও বিশ্বাসের সাথে পাঠ করুন। ইন শা' আল্লাহ এই দু'আর নুর সাহায্যকারী হয়ে পৌছে যাবে। এই দু'আর জন্য হাদিস শরিফেও নুর শব্দটি এসেছে।
৩. চিরস্থায়ী নি'আমতের উপযুক্ত বান্দাদের ইস্তিগফার
رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমরা ইমান আনলাম। অতএব আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।"
মানুষ সাধারণত দুনিয়াবী বস্তুসমূহের প্রতি আসক্ত হয়ে থাকে। দুনিয়াবী বস্তুসমূহ যেমন: নারী, পুত্র সন্তান, স্বর্ণ-রূপার ভাণ্ডার, মূল্যবান ঘোড়া, গৃহপালিত পশু ও ক্ষেত-খামার ইত্যাদি। বস্তুত এগুলো হল-সাময়ীক উপকারী বস্তু। চিরস্থায়ী সফলতা নয়। যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর মুত্তাকী বান্দাদের জন্য যা কিছু প্রস্তুত করে রেখেছেন, তা অনেক উত্তম। যেমন: আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি, জান্নাত ও হুর-গিলমান ইত্যাদি। এ সকল চিরস্থায়ী নি'আমতসমূহ যে বান্দাগণ পাবে, তাদের একটি গুণ হল-তারা তাদের ইমানের ঘোষণা দেবে। স্বীয় গুনাহসমূহের উপর ইস্তিগফার করে এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। তারা বলে- رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
৪. জিহাদের মধ্যে পরীক্ষা এবং কঠিন মুহূর্তের বিশেষ উপকারী ইস্তিগফার
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
“হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও আমাদের কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং অবিচল রাখুন আমাদের পাসমূহকে, আর কাফির কওমের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন।” [১]
হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণ এবং তাদের আল্লাহওয়ালা সঙ্গী- সাথীগণ আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় কিতাল করেছে। উক্ত জিহাদে যখন তাদের উপর কষ্ট, বিপদ কিংবা বাহ্যিক পরাজয় এসেছে তখন তারা ভীত হয়নি। না তারা সাহস হারিয়েছে এবং না শত্রুদের সামনে দমে গিয়েছে। বরং এমতাবস্থায় সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে ইস্তিগফার করেছেন—
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
তারা যখন এ পদ্ধতি অবলম্বন করল, আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বোত্তম প্রতিদানে ভূষিত করলেন। ইস্তিগফারের এই দু'আটি অনেক গ্রহণযোগ্য ও উপকারী এবং প্রত্যেক যুগের মুজাহিদগণ এবং দীনের জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন ব্যক্তিগণ এটা আমল করে আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত, রহমত এবং নুসরাত লাভ করেছেন।
■ ৫. বুদ্ধিমানদের ইস্তিগফার
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
“হে আমাদের রব আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং বিদূরিত করুন আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর আমাদেরকে মৃত্যু দিন নেককারদের সাথে।” [২]
কুরআনুল কারিমে “উলুল আলবাব” তথা বুদ্ধিমান শব্দটি এসেছে। বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, চিন্তাশীল, বিচক্ষণ ও মেধাবী মানুষ কারা? কুরআনুল কারিমে তাদের নিদর্শন বর্ণনা করা হয়েছে। সুরাআলে ইমরানের শেষাংশ দেখে নিবেন।
উক্ত বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, চিন্তাশীল, বিচক্ষণ ও মেধাবীদের একটি নিদর্শন বর্ণনা করা হয়েছে-তারা স্বীয় গুনাহসমূহের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করে। নিজেদের গুনাহসমূহের ক্ষতি থেকে বাঁচতে চায় এবং তাদের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা হল-তাদের যেন হুসনে খাতিমা তথা ইমানের সাথে মৃত্যু নসিব হয়। এজন্য তারা দু'আ করে-
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
৬. হজরত আদম আলাইহিস সালামের ইস্তিগফার
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদেরকে দয়া না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
এটা হল ঐ ইস্তিগফার যা আল্লাহ তা'আলা হজরত আদম আলাইহিস সালামকে স্মরণ করিয়েছেন। এটা হল ঐ ইস্তিগফার যার মাধ্যমে হজরত আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল হয়েছে। এটা মানুষের সর্বপ্রথম ইস্তিগফার এবং এ জমিনের সর্বপ্রথম ইস্তিগফার। অনেক ব্যাপক, অনেক কার্যকরী ও অনেক গ্রহণযোগ্য ইস্তিগফার।
৭. হজরত মূসা আলাইহিস সালামের তাসবিহ এবং তাওবা
سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
“হে আল্লাহ আপনি পবিত্র মহান, আমি আপনার নিকট তাওবা করলাম এবং আমি মুমিনদের মধ্যে প্রথম।”
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম ইশক-মহব্বতে আত্মহারা হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করলেন যে, হে আল্লাহ আমি নিজ চোখে আপনাকে দেখতে চাই। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-দুনিয়াতে তুমি আমাকে দেখতে পারবে না। তবে তুমি সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও। আমি উক্ত পাহাড়ের উপর আমার তাজাল্লি দেব। যদি পাহাড় স্থির থাকে তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ের উপর তাজাল্লি দিলেন। পাহাড় তখন টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং হজরত মূসা আলাইহিস সালাম বেহুঁশ হয়ে গেলেন। যখন তার হুঁশ আসল তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার তাসবিহাতের মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেলেন এবং শোকে বিহ্বল হয়ে সাক্ষাতের যে আবেদন করেছিলেন তার জন্য তাওবা করতে লাগলেন।
হজরত আম্বিয়ায়ে কেরামগণ সর্বপ্রকার সগিরা ও কবিরা গুনাহ থেকে পবিত্র। তাদের তাওবা-ইস্তিগফার তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কোন কথা কিংবা কাজ উক্ত মর্যাদার সামান্য পরিপন্থী হয়ে গেলেই তারা সাথে সাথে তাওবা-ইস্তিগফারে লেগে যেতেন। আমরাও যখন উক্ত বাক্যসমূহ দ্বারা ইস্তিগফার করব, তখন أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ এর স্থলে من الْمُؤْمِنِينَ হবে।
سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
আমি আপনার নিকট তাওবা করলাম এবং আমি মুমিনদের মধ্য প্রথম।
৪৮. অত্যন্ত অনুতপ্ত হওয়া ইস্তিগফার
لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি রহম না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।”৮।
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন তাওরাত আনতে গেলেন, তখন বনি ইসরাইলের মধ্যে যে সকল লোকেরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে নিজেদের ইমানের জানাজা পড়ে ফেলেছিল, হজরত মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে আসার পর তাদেরকে যখন বুঝানো হল—তখন তারা তাদের অপরাধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে অত্যন্ত অনুতপ্ত হল, তাদের অন্তর থেকে ভ্রান্তির জোশ ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং নিজেদের এত বড় গুনাহকে দেখে তাদের প্রাণ নাশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল, তখন তারা এই ভাষায় ইস্তিগফার করেছিল—
لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি রহম না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
৯. সুসম্পর্ক স্থাপনকারী ইস্তিগফার
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“হে আমার রব, ক্ষমা করুন আমাকে ও আমার ভাইকে এবং আপনার রহমতে আমাদের প্রবেশ করান। আর আপনিই রহমকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”৯।
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন তাওরাত আনতে তুর পাহাড়ে গেলেন, তখন কওমের নিকট তার ভাই হজরত হারুন আলাইহিস সালামকে রেখে গিয়েছিলেন। যখন তাওরাত নিয়ে স্বীয় কওমের নিকট ফিরে আসলেন তখন দেখতে পেলেন যে, তারা বাছুরের উপাসনা করে শিরকে লিপ্ত। তা দেখে হজরত মূসা আলাইহিস সালামের খুব রাগ হল। তখন তিনি ভাই হজরত হারুন আলাইহিস সালামের উপর প্রচণ্ড রাগ করলেন। হজরত হারুন আলাইহিস সালাম নিজের আপত্তি পেশ করে বললেন যে, আমি এই কওমকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু তারাতো আমার কথা শুনেইনি। বরং উল্টো আরও আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। এখন আপনি আমার সাথে কঠোর আচরণ করে তাদের নিকট আমাকে হাসির পাত্র বানাবেন না এবং আমাকে উক্ত জালিম ও অপরাধীদের মধ্যে গণ্য করবেন না। তার এই আপত্তি শুনে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম শান্ত হলেন এবং সাথে সাথে নিজের জন্য এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন। এতে দুটি বিষয় ছিল।
একটি হল-এই দু'আ করার দ্বারা এ কথার ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আমি তোমার উপর নিশ্চিন্ত আছি। আর দ্বিতীয় হল-কঠোর ব্যবহারের কারণে ভাইয়ের যে কষ্ট হয়েছে সে কষ্ট যাতে দূর হয়ে যায়। কেননা কারও জন্য ইস্তিগফার করা তথা তার জন্য আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত কামনা করা অনেক বড় উপহার ও অনুগ্রহ। অতঃপর এতে এটাও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যদি নিজের কোন আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনের সাথে কোন প্রকার মনোমালিন্য হয়ে যায়, তখন সমাধানের পরে তার জন্য ইস্তিগফার করা উচিত। কুরআনুল কারিমে এই ইস্তিগফারের বাক্য বিদ্যমান। ভাইয়ের সাথে কোন মনোমালিন্যের বিষয় সমাধান হয় তাহলে হুবুহু এই বাক্যেই ইস্তিগফার করবে। আর যদি অন্য কেউ হয়, তাহলে আখী এর স্থলে তার নাম বলবে। যেমন: স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্যের সমাধান হলে বলবে-
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِزَوجَتِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
মাতা-পিতার সাথে তো মনোমালিন্য হবেই না। তাদের জন্যও এই বাক্যে ইস্তিগফার করা যাবে। যেমন-
রَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَبِي অথবা رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأُمِّي
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
[[১০. সম্মিলিত বিপদ ও জাতীয় সমস্যার সময়ের ইস্তিগফার
أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ
। “হে আল্লাহ আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল।”১০।
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম তার নিজ কওমের সত্তরজন বিশেষ ব্যক্তিকে তুর পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা আল্লাহ তা'আলার কালাম তথা কথাবার্তা শুনল। কিন্তু তারা বলতে লাগল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে না দেখব ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস করব না। তখন তাদের উপর প্রচন্ড ভূমিকম্প আসলো এবং বিজলি চমকানো শুরু হল। তারা সব ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে মারা গেল। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম অনেক পেরেশান হয়ে গেলেন। কারণ নিজের কওমকে গিয়ে কী জবাব দেবেন? তার কওম তো মনে করবে তাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে আমিই মেরে ফেলেছি। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগী হয়ে দু'আ করলেন এবং ইস্তিগফার করলেন। তখন তাদের সকলকে দ্বিতীয় বার জীবন দান করা হল। বুঝা গেল যে, সম্মিলিত সমস্যার সমাধান জাতীয় সমস্যার সমাধান হল আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগ এবং ইস্তিগফার। দু'আটির শুরুতে اَللَّهُمَّ শব্দটি যোগ করতে হবে।
اللَّهُمَّ أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ
হে আল্লাহ আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল।
১১. দয়াময় রবের আশ্রয়
بِسْمِ اللهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
“এর চলা ও থামা হবে আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”১১।
যখন তুফান শুরু হল তখন হজরত নূহ আলাইহিস সালাম তার ইমানদার সাথীদেরকে বললেন-আল্লাহ তা'আলার নামে নৌকায় আরোহণ কর। কোন চিন্তা করো না। কেননা এর চলা এবং থামা সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তাঁর নামের বরকতে হবে। ঢুবে যাওয়ার কোন ভয় নেই। আর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের জন্য غَفُورٌ তথা অতি ক্ষমাশীল এবং رَّحِيم তথা পরম দয়ালু। আল্লাহ তা'আলার শানে মাগফিরাত ও শানে রহমতই মুমিনদেরকে সকল তুফান এবং সকল বিপদ এবং সকল পরীক্ষা থেকে হেফাজত করে থাকে। নৌযান কিংবা যে কোন বাহনে আরোহণকালে আল্লাহ প্রদত্ত এই দু'আটি পড়া উচিত।
بِسْمِ اللهِ مَجْزِهَا وَمُرْسَاهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
১২. হজরত নূহ আলাইহিস সালামের অতি উপকারী একটি ইস্তিগফার
رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ ۖ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
“হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।"।১২।
তুফানের সময় হজরত নূহ আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নিকট দরখাস্ত করলেন যে, সেও আমার পরিবারভুক্ত। আর আপনি আমার পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর ওয়াদা করেছেন। এর উপর নির্দেশ আসল যে, হে নূহ! সে আপনার পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যাকে আমি বাঁচানোর ওয়াদা করেছি। তার আমল খারাপ। (সে কুফর- শিরকে লিপ্ত)। সুতরাং আপনি তার ব্যাপারে দরখাস্ত করা উচিত নয়। তখন হজরত নূহ আলাইহিস সালাম কেঁপে উঠলেন এবং সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তিগফারে লিপ্ত হয়ে গেলেন। কোন মুসলমানের যদি দু'আর মধ্যে কোন প্রকার ভুল-ভ্রান্তি, বে-আদবী কিংবা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, তাহলে এই বাক্যগুলো দ্বারা ইস্তিগফার করলে ইন শা' আল্লাহ অনেক উপকার হবে।
১৩. তাওফিকের ভাণ্ডার, তাওয়াক্কুল ও তাওবার ঘোষণা
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
“আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।” [১৩]
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে বললেন যে, আমি তোমাদের সংশোধন চাই। আমার এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। আর এ কাজে আমার সফলতা মিলবে কি-না সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। আমি তাঁরই তাওফিকে দাওয়াত দেই। তাঁরই শক্তির উপর ভরসা রাখি এবং সকল বিষয়ে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। 'আনাবাত' বলা হয় আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করা ও তাওবা করাকে। দীনের দা'ঈদের জন্য এই গুণ এবং এই চিন্তা অত্যন্ত জরুরি। হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের এই বরকতময় বাক্য যা কুরআনুল কারিমে বর্ণনা করা হয়েছে। দীনদ্বার মুসলিম ও দীনের দা'ঈদের জন্য অনেক বড় দু'আ এবং তাওবার তাওফীকের ভাণ্ডার স্বরূপ।
১৪. কাউকে ক্ষমা করার সময় ইস্তিগফার
يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
"আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু।” [১৪]
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হল এবং হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিকট ক্ষমা চাইল। তখন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ক্ষমা করার সময় তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করলেন। সুতরাং কাউকে ক্ষমা করার সময় তার জন্য ইস্তিগফার করা সুন্নাতে ইউসুফী তথা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সুন্নাত।
ইস্তিগফার يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
১৫. আল্লাহ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটই তাওবা
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
“হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।”১৫০।
নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতার জন্য ও সকল ইমানদারদের জন্য ইস্তিগফার করা। এই দু'আ হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম করেছেন। তবে তিনি পরবর্তীতে তাঁর পিতার জন্য ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিয়েছেন।
১৬. ইসমে আজমওয়ালা ইস্তিগফার
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"আপনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিম।”১৫১
এটা হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের তাসবিহ এবং ইস্তিগফারের বাক্য। এটাতে তাহলিলও রয়েছে। অর্থাৎ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ এবং তাসবিহও রয়েছে। অর্থাৎ سُبْحَانَكَ এবং إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
এই ইস্তিগফারের অনেক ফজিলত, হাদিস ও বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। এটা সকল বিপদাপদ ও পেরেশানির সমাধান। মুসলিম উম্মাহ সর্বদাই এই তাসবিহ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে অনেক বড় বড় উপকার সাধন করেছে। আমি অধমও ইস্তিগফারের বিষয়ে এই গ্রন্থে এই পবিত্র আয়াতের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা একত্রিত করে দিলাম।
১৭. আল্লাহ তা'আলার মাকবুল তথা প্রিয় বান্দাদের ইস্তিগফার
رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
“হে আমাদের রব, আমরা ইমান এনেছি, অতএব আমাদেরকে ক্ষমা ও দয়া করুন, আর আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”১৭।
দুনিয়াতে কাফির ও মুনাফিকরা নিজেদেরকে বুদ্ধিমান মনে করে এবং ইমানদারদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে— (নাউযুবিল্লাহ) এরা হল বোকা। এদের দুনিয়ার জ্ঞান নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ঐ কাফিরদের সামনে এ সকল ইমানদারদের সফলতার ঘোষণা দেবেন এবং উক্ত ঘোষণার সাথে এই ইস্তিগফারেরও আলোচনা করবেন যে, আমার বান্দাদের মধ্য হতে কিছু লোক বলে— رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ তোমরা কাফিররা তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে। আজ দেখ যে, আমি তাদেরকে কেমন সফলতা ও প্রতিদান এবং মর্যাদা প্রদান করি।
১৮. মাগফিরাত ও রহমত কামনা করো
رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
“আর বল, হে আমাদের রব, আপনি ক্ষমা করুন, দয়া করুন এবং আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”১৮।
এটিও পবিত্র কুরআনুল কারিমে বর্ণিত অনেক উপকারি ও মজার একটি ইস্তিগফার।
১৯. আল্লাহ তা'আলার মুকাররাব তথা নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের তাওবাকারী ইমানদারদের জন্য ইস্তিগফার
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَابِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
“হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আজাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব, আপনি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন। আর তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নি ও সন্তানসন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাদেরকেও। নিশ্চয় আপনি মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়। আর আপনি তাদের অপরাধের আজাব হতে রক্ষা করুন এবং সেদিন আপনি যাকে অপরাধের আজাব থেকে রক্ষা করবেন, অবশ্যই তাকে অনুগ্রহ করবেন। আর এটিই মহাসাফল্য।"১৯।
এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দু'আ। যার বিস্তারিত তো এখানে সম্ভব নয় তবে সংক্ষেপে কয়েকটি উল্লেখ করছি। যথা-
ক. এই দু'আটি আরশ বহনকারী ও আরশের চারদিকে তাওয়াফকারী মুকাররাব ফেরেশতাদের অজিফা।
খ. এই দু'আর মধ্যে আল্লাহ তা'আলার তাওবাকারী বান্দাদের জন্য রয়েছে ইস্তিগফার। আমরা যখন এমন বান্দাদের জন্য দু'আ ও ইস্তিগফার করব তখন তা দ্বারা স্বয়ং আমরা নিজেরাই উপকৃত হব।
গ. আমরা যখন এই দু'আটি আল্লাহ তা'আলার তাওবাকারী বান্দাদের জন্য এবং তাদের সাথে সম্পৃক্তদের জন্য করব, তখন হাদিস শরিফের ওয়াদা অনুযায়ী ফেরেশতারাও আমাদের জন্য এই দু'আই করবে।
২০. আল্লাহ তা'আলার প্রিয় এবং নেককার বান্দাদের ইস্তিগফার
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নি'আমত দান করেছ, তোমার সে নি'আমতের যেন আমি শোকর আদায় করতে পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।"।২০।
এটি আল্লাহ তা'আলার প্রিয় এবং নেককার হওয়ার জন্য একটি কুরআনী সিলেবাস।
১. আল্লাহ তা'আলার নিকট শোকরের তাওফিক কামনা করা। ঐ সকল নি'আমতের উপর যা নিজের উপর এবং নিজের মাতা-পিতার উপর রয়েছে।
২. আল্লাহ তা'আলার নিকট নেক আমল এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় আমলের তাওফিক কামনা করা।
৩. নিজ সন্তানের সংশোধন এবং নেককার হওয়ার দু'আ করা।
৪. আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা-ইস্তিগফার করা।
৫. আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের স্বীকৃতি প্রদান করা।
পূর্বের আয়াতে যে সকল ব্যক্তি এই পাঁচ কাজ করবে তাদের প্রতিদান উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের আমলসমূহ কবুল করেন। তাদের গুনাহ মাফ করেন এবং তাদের জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
কোন কোন মুফাসসিরের নিকট এই আয়াত হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহুর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এটা অনেক মূল্যবান দু'আ। অত্যন্ত মনোযোগ ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দু'আ করা উচিত।
[ ২১. উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ইস্তিগফার
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
“হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ইমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ইমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।”/২১।
এটি অনেক উপকারী, কার্যকরী ও ব্যাপক একটি ইস্তিগফার। পবিত্র কুরআনুল কারিমে বুঝানো হয়েছে যে, পরবর্তী যে সকল মুসলমান অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এই দু'আটি করবে, সে প্রতিদানের দিক থেকে তাকে স্বীয় পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হবে। এই দু'আটিতে স্বীয় পূর্ববর্তীদের জন্যও ইস্তিগফার রয়েছে। যা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। যে ব্যক্তির অন্তরে অন্য মুসলমানদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় সে যদি এই দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করে তাহলে অনেক উপকৃত হবে।
[ ২২. শত্রুর শত্রুতা থেকে হেফাজতের ইস্তিগফার
رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার ওপরই ভরসা করি, আপনারই অভিমুখী হই আর প্রত্যাবর্তন তো আপনারই কাছে। হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে কাফিরদের উৎপীড়নের পাত্র বানাবেন না। হে আমাদের রব, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [২২]
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর ইমানদার সঙ্গী-সাথীগণ ইস্তিগফার হিসেবে এ দু'আটি করতেন এবং কাফির শাসক ও কুফরী শাসন ব্যবস্থার প্রতি সুস্পষ্ট বারা'আত তথা সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন।
২৩. ইমানদারদের পরকালের ইস্তিগফার
رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ব বিষয়ে সর্বময়ক্ষমতাবান।” [২৩]
ইমানদারগণ পরকালে এ দু'আটি করবে। দুনিয়াতেও আল্লাহ তা'আলার নিকট নুর তথা আলো এবং মাগফিরাতের দু'আ অব্যাহত রাখা উচিত।
২৪. হজরত নূহ আলাইহিস সালামের বহুমুখী ইস্তিগফার
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا
"হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ইমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি জালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না।" [২৪]
২৫. দু'আ কবুলের স্থান ও সময়ের মধ্যে তাওবার দু'আ করা
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যখন কা'বা শরিফ নির্মাণ করছিলেন, তখন তারা দু'আ কবুলের এই বিশেষ স্থানে যে দু'আ করেছিলেন, তাতে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাওবার কামনাও ছিল। তাদের দু'আটি হল-
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةٌ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
"হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরের মধ্য থেকে আপনার অনুগত জাতি বানান। আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদাতের বিধি-বিধান দেখিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"১২৫
এই বরকতময় দু'আর দুটি অংশ। একটি হল কবুলিয়াতের দু'আ।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
আর অপরটি হল ক্ষমা ও তাওবার দু'আ।
وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
এটিও পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একটি তাওবার দু'আ এবং সাথে সাথে এটাও ইঙ্গিত করা হয়েছে-দু'আ কবুলের স্থানসমূহ এবং দু'আ কবুলের বিশেষ মুহূর্তে দু'আ করা চাই।

টিকাঃ
[১]. বাকারা- ২: ২৮৫
[২]. বাকারা- ২: ২৮৬
[৩]. আলে-ইমরান- ৩: ১৬
[১]. আলে-ইমরান- ৩: ১৪৭
[২]. আলে-ইমরান- ৩: ১৯৩
[৬] আ'রাফ- ৭: ২৩
[৭] আ'রাফ- ৭: ১৪৩
[৮] আ'রাফ-৭: ১৪৯
[৯] আ'রাফ-৭: ১৫১
[১০]. আ'রাফ- ৭: ১৫৫
[১১]. হুদ- ১১:৪১
[১২]. হুদ- ১১:৪৭
[১৩] হুদ- ১১:৮৮
[১৪] ইউসুফ- ১২: ৯২
[১৫০] ইবরাহিম- ১৪: ৪১
[১৫১] আম্বিয়া- ২১:৮৭
[১৭] মু'মিনুন- ২৩: ১০৯
[১৮] মু'মিনুন- ২৩: ১১৮
[১৯] মুমিন- ৪০: ৭-৯
[২০] নামাল- ২৭: ১৯
[২১] হাশর- ৫৯: ১০
[২২] মুমতাহিনা- ৬০: ৪
[২৩] তাহরিম- ৬৬: ৮
[২৪] নূহ- ৭১: ২৮
[২৫] বাকারা- ২: ১২৭-১২৮

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 তাওহিদ, দু‘আ, আশা-ভরসা ও ইস্তিগফার

📄 তাওহিদ, দু‘আ, আশা-ভরসা ও ইস্তিগফার


عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أَبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةٌ
“হজরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-হে আদম সন্তা! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার প্রতি আশা পোষণ করতে থাকবে (যে আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেব) ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ সত্ত্বেও তোমাদেরকে ক্ষমা করতে থাকব। আর এতে আমার কোন পরওয়া নেই যে কত বড় গুনাহগারকে ক্ষমা করছি।
হে আদম সন্তান! তোমাদের গুনাহ যদি সাগরের ফেনার সমানও হয়ে যায়, আর তখনও তোমরা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলেও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেব এবং (কাউকে ক্ষমা করতে) আমার কোন পরওয়া নেই।
হে আদম সন্তান! তোমরা যদি গোটা জমিনভরা গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আসো কিন্তু তোমার সাথে আমার এ অবস্থায় সাক্ষাত হয় যে, আমার সাথে কোন শিরক করোনি, তাহলে মনে রেখ আমি গোটা জমিনভরা মাগফিরাত নিয়ে উপস্থিত হব।”।১।
এই হাদিসটিতে চারটি বস্তুকে মাগফিরাতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথা-
১. দু'আ করা।
২. আল্লাহ তা'আলার প্রতি আশা-ভরসা রাখা।
৩. ইস্তিগফার করা।
৪. আকিদাতুত তাওহিদের উপর দৃঢ়ভাবে অটল থেকে সর্বপ্রকার শিরক থেকে বেঁচে থাকা।

টিকাঃ
[১] সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৫৪০; সুনানে দারেমী: হাদিস নং ২৮৩০; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ২১৪৭২

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 ইস্তিগফারের আহ্বান

📄 ইস্তিগফারের আহ্বান


আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে স্বীয় মাগফিরাত নসিব করুন। সম্মানিত পাঠক! আজ আপনাদেরকে একটি আশ্চর্য ও মহান ইবাদাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেব। এত বড় ইবাদাত-যার নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলার খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দিয়েছেন। এমনকি সকল আম্বিয়া আলাইহিস সালামকে দিয়েছেন। এমন ইবাদাত যার গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে শত শত আয়াত বিদ্যমান। এমন ইবাদাত যার উপকারিতা হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এমন ইবাদাত যার তাৎক্ষণিক উপকার দুনিয়াতে এবং চিরস্থায়ী উপকার পরকালে পাওয়া যায়। এমন ইবাদাত যা মানুষকে না হতাশ হতে দেয়, না বঞ্চিত হতে দেয়। এমন ইবাদাত যা নিজের জন্যও করার নির্দেশ রয়েছে এবং অপরের জন্যও করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এমন ইবাদাত যার কথা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত বেশি বলতেন যে, হজরত সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুম নিয়মিত করতেন। এমন ইবাদাত যা অন্তরকে অন্তরের মরিচা থেকে পবিত্র করে। এমন ইবাদাত যা ধ্বংসাত্মক আঘাতের প্রশান্তিদায়ক উপশম হিসেবে কাজ করে। এমন ইবাদাত যা দুর্বল মানুষকে শক্তিশালী বানিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা করতে দেখলে শয়তান চিৎকার করে কাঁদে এবং ছটফট করে এবং দুঃখ-বেদনায় নিজেই নিজের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। এমন ইবাদাত যা সকল আমলকে মাকবুল তথা আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণযোগ্য বানিয়ে দেয় এবং দীর্ঘ পথ দ্রুত পাড়ি দিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা কণ্টকাকীর্ণ পথকে কুসুমাস্তীর্ণ বানিয়ে দেয়। এমন ইবাদাত যা সকল রোগের প্রতিষেধক। সকল সংকীর্ণতা থেকে উত্তরণের পথ এবং সকল পেরেশানির সমাধান। প্রিয় পাঠক! এই ইবাদাতটির নাম হল-ইস্তিগফার। হ্যাঁ! ইস্তিগফার। পুনরায় শুনে নিন, এই মহান ইবাদাতটির নাম ইস্তিগফার তথা নিজের অবস্থার উপর অনুতপ্ত হওয়া। স্বীয় গুনাহের উপর লজ্জিত হওয়া। স্বীয় প্রিয়তমকে খুশি রাখার ফিকির করা এবং স্বীয় গুনাহসমূহ ত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প করা এবং স্বীয় রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। উক্ত পাঁচ কাজের নাম হল ইস্তিগফার। আর এটা আজও আমাদের প্রয়োজন এবং কালও আমাদের প্রয়োজন। শুধুমাত্র ইস্তিগফারই নয়। বরং অধিক ইস্তিগফার। বেশি বেশি ইস্তিগফার। প্রতিটি আমলের পরে ইস্তিগফার। প্রতিটি নেকির পরে ইস্তিগফার। প্রতিটি গুনাহের পরে ইস্তিগফার। প্রিয় পাঠক! দিনে-রাতে অনুতপ্তের এক ফোঁটা অশ্রু এবং স্বীয় রবের নিকট লজ্জিত হয়ে একটি আহ! হে আমার রব! আমি গুনাহগার, আমাকে মাফ করে দিন। প্রথম তো শয়তান লজ্জিত হতে দেবে না। আর যদি কেউ লজ্জিত হয় তখন তাকে নৈরাশ করে দেয়। অথচ নৈরাশ্যের কি আছে? আমার রবের রহমতের দরজা খোলা। মাগফিরাতের দরজা খোলা।
ছোট বাচ্চা যখন হোঁচট খেয়ে স্বীয় মাতা-পিতার দিকে এগিয়ে যায়, তখন তারা কত খুশি হয়। শয়তান যখন গুনাহ করিয়ে হোঁচট খাওয়ায়, তখন মুখলিস বান্দারা ইস্তিগফার করে পুনরায় স্বীয় মালিকের দিকে এগিয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা'আলার নিকটও অনেক মায়া লাগে। কেউ যদি দিনে সত্তরবারও হোঁচট খায় কিন্তু সাথে সাথে ইস্তিগফার করে স্বীয় রবের অভিমুখী হয়, তাহলে তার গুনাহগুলোকেও নেকিতে রূপান্তর করে দেওয়া হয়। প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তা'আলার মহব্বতকে অনুভব করুন। তিনি যখন কারো প্রতি মহব্বতের দৃষ্টি প্রদান করেন, তখন তাকে তাঁর নাম নেওয়ার তাওফিক দান করেন।
দেখুন! আল্লাহ তা'আলা এ বৎসর মহররম মাসে ইস্তিগফারের সৌভাগ্য দান করেছেন। কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরেছে তো ইজতেমা অনুষ্ঠিত হল। গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সম্মেলনও হয়ে গেল। লোক সংখ্যাও বেশি হল। মিডিয়াতেও প্রকাশ হল। যেখানে দুনিয়াতেই এই ফলাফল তাহলে পরকালের প্রকৃত উপকার ও পুরস্কার কত উচু হবে ইন শা' আল্লাহ। প্রিয় পাঠক! যেখানে হজরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম মা'সুম তথা গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি ইস্তিগফারের নির্দেশ রয়েছে, তাহলে ভেবে দেখুন তো আমি আর আপনি এই ইবাদাতের কতটা মুখাপেক্ষী? আমাদের তো প্রতিটি আমলই দুর্বল। সুতরাং অনুতপ্ত হওয়া ও ইস্তিগফার ছাড়া উপায় কি? আলোর বিচ্ছুরণ দৃষ্টিগোচর হয়ে গেছে। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি। দুনিয়া থেকে কুফরের বিজয় খতম করার ফিকির যদি আমাদের না থাকে, তাহলে এটা বড়ই আত্মমর্যাদাহীন কথা। গোটা পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় ও মাজলুম মুসলিম উম্মাহর মুক্তিসহ আরও অনেক কাজ। প্রিয় পাঠক! ইস্তিগফার! বেশি বেশি ইস্তিগফার। দৈনিক কমপক্ষে এক হাজার বার ইস্তিগফার। হৃদয়ের অনুতপ্ত ইস্তিগফার। রবকে খুশি করার প্রেরণাদায়ক ইস্তিগফার। নির্জনে ইস্তিগফার। জনসম্মুখে ইস্তিগফার। অশ্রু প্রবাহিত ইস্তিগফার। আশা এবং বিশ্বাসের সাথে ইস্তিগফার। গর্ব ও অহংকার চূর্ণকারী ইস্তিগফার। আফসোস ও দুঃখভারাক্রান্ত ইস্তিগফার। আর বার বার তাওবা। বিরামহীন ও নিরাশাহীন তাওবা। হে বিভিন্ন দল ও জামাতের জিম্মাদারগণ! ইস্তিগফার। হে বিভিন্ন দল ও জামাতের কর্মীগণ! ইস্তিগফার। হে আল্লাহ তা'আলার প্রিয় মুজাহিদগণ! হে আত্মঘাতী মুজাহিদগণ! ইস্তিগফার। হে আমার মা-বোনেরা! ইস্তিগফার। হে আমার প্রিয় ভাইয়েরা! ইস্তিগফার... ইস্তিগফার... ইস্তিগফার...।

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 আল্লাহ তা‘আলা তাওবাকারীকে ভালোবাসেন

📄 আল্লাহ তা‘আলা তাওবাকারীকে ভালোবাসেন


আল্লাহ তা'আলা কত বড় অনুগ্রহ করেছেন—যেদিন আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন "তাওবার দরজাও" বানিয়েছেন এবং এই দরজা ঐ সময় পর্যন্ত খোলা থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় না হবে। আল্লাহু আকবার কাবীরা! কত বড় দয়া আর কত বড় অনুগ্রহ। তাওবার এই দরজা পশ্চিম দিকে অবস্থিত এবং অনেক বড়। সত্তর বছর পর্যন্ত যদি কোন অরোহী তার বাহন নিয়ে দৌড়ায়, তাহলে তার প্রশ্বস্ততা শেষ হবে না। আমাদের সকলের উচিত যে, সত্যিকারের তাওবা করে উক্ত দরজায় প্রবেশ করা। আল্লাহ তা'আলা তাওবাকারীকে ভালোবাসেন। হ্যাঁ! ঐ সকল অপরাধী ও গুনাহগারকে, যারা খাঁটি অন্তরে তাওবা করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন। আল্লাহ তা'আলার নিকট মাগফিরাতের কোন কমতি নেই। তাঁর রহমত অনেক অনেক বড়।
সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার
হজরত শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার তথা শ্রেষ্ঠ ইস্তিগফার হল-
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَى، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আল্লাহ আপনিই আমার রব, আপনাকে ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনারই বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে করা প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গিকারের উপর রয়েছি। আমি আমার সকল কৃতকর্মের কুফল থেকে আপনার নিকট পানাহ চাই। আপনি আমার প্রতি আপনার যে নিয়ামত দান করেছেন তা স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না। ”১।
সর্বোত্তম দু'আ কোনটি?
عَنْ عَلِي رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ خَيْرُ الدُّعَاءِ الاسْتِغْفَارُ وَ خَيْرُ الْعِبَادَةِ قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
“হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শ্রেষ্ঠ দু'আ হল-ইস্তিগফার করা এবং সর্বোত্তম ইবাদাত হল—লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করা।”।২।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারী: হাদিস নং ৬৩০৩; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ৫০৭০; সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৩৩৯৩; সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ৫৫২২; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৩৮৭২; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৭১১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00