📄 সূরাতুল জাসিয়া
সূরাতুল জাসিয়া-এর ১৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-১৪
قُل لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ لِيَجْزِيَ قَوْمًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“যারা ইমান এনেছে তাদেরকে বলুন, যারা আল্লাহর দিবসসমূহ প্রত্যাশা করে না, এরা যেন তাদের ক্ষমা করে দেয়, যাতে আল্লাহ প্রত্যেক কওমকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।"
অর্থাৎ ঐ বদ-দীন লোক যে “আইয়্যামুল্লাহ” তথা আল্লাহ তা'আলার দিনসমূহ সম্পর্কে উদাসীন, আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে নৈরাশ এবং তাঁর আজাব থেকে নির্ভয়, এমন লোক যদি মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়, তাহলে মুসলমান যেন তার থেকে প্রতিশোধের চিন্তা না করে। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার উপর ছেড়ে দেয়। তিনিই তার ক্ষতিসমূহের জন্য তাকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিনদেরকে এই ধৈর্য-সহ্য এবং ক্ষমা ও অনুগ্রহের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।
অনেক মুফাসসিরীনের মতে এটা 'জিহাদের বিধান' অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের হুকুম। আবার অনেকের মতে এটা যেখানে জিহাদের সুযোগ নেই সেখানে এই কর্মপন্থা অবলম্বন করা হবে। যেন মুসলিমদের শক্তি সামান্য ছোটখাট বিষয়ে লিপ্ত হয়ে নষ্ট না হয়। এর দ্বারা জিহাদের অস্বীকার করা হয় না। কেননা এখানে ঐ প্রতিশোধকে বাধা দেওয়া হয়েছে যার দ্বারা মূল উদ্দেশ্য “ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ” তথা আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করা নয় বরং শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্রোধের প্রতিশোধ।
📄 সূরাতুল আহকাফ
সূরাতুল আহকাফ-এর ৮. ১৫. ১৬ ও ৩১ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৮
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَلَا تَمْلِكُونَ لِي مِنَ اللَّهِ شَيْئًا هُوَ أَعْلَمُ بِمَا تُفِيضُونَ فِيهِ كَفَى بِهِ شَهِيدًا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“তবে কি তারা বলে যে, সে এটা নিজে উদ্ভাবন করেছে? বলুন, যদি আমি এটা উদ্ভাবন করে থাকি, তবে তোমরা আমাকে আল্লাহর (আজাব) থেকে বাঁচাতে সামান্য কিছুরও মালিক নও। তোমরা যে বিষয়ে আলোচনায় মত্ত আছ, তিনি সে বিষয়ে সম্যক অবগত। আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। আর তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ এই কাফিররা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন কঠোর কথা বলে যে, নাউযুবিল্লাহ! এই কুরআন আল্লাহ তা'আলার বাণী নয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বানিয়েছেন। তাদেরকে বলে দিন যে, ধরে নিলাম আমি যদি এমনটি করেও থাকি যে, নিজের বানানো কথাকে আল্লাহ তা'আলার কালাম আখ্যা দিয়েছি, তাহলে আমাকে আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে কে বাঁচাবে? তোমরা যা বলছ এবং অপবাদ দিচ্ছ, এগুলো সব আল্লাহ তা'আলার জানা আছে। সুতরাং তোমরা নিজেদের পরিণতির ফিকির কর। আল্লাহ তা'আলা গাফুর তথা অতি ক্ষমাশীল। তাঁর তাওবার দরজা উন্মুক্ত। এ সকল কথা ছেড়ে তাওবা করে নাও। ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তোমাদের এত কঠোর কথা সত্ত্বেও যে তোমাদেরকে এখনো ধ্বংস করা হয়নি এর কারণ হল-আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা পরম দয়ালু। তিনি সাথে সাথে কাউকে ধরেন না।
■ আয়াত নং-১৫
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
"আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নি'আমত দান করেছ, তোমার সে নি'আমতের যেন আমি শোকর আদায় করত পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।”
অর্থাৎ সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এমন হয়ে থাকে যে, আল্লাহ তা'আলার যে সকল দয়া ও অনুগ্রহ তার উপর এবং তার মাতা-পিতার উপর রয়েছে, সেগুলোর শোকর আদায় করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট নেক আমলের তাওফিক কামনা করে এবং স্বীয় সন্তানদের জন্যও নেকির দু'আ করে এবং স্বীয় গুনাহসমূহের জন্য তাওবা করে এবং একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই নিজের সকল ইবাদাত, আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করে থাকে।
আয়াত নং-১৬
أُولَبِكَ الَّذِينَ نَتَقَبَّلُ عَنْهُمْ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَنَتَجَاوَزُ عَن سَيِّئَاتِهِمْ فِي أَصْحَابِ الْجَنَّةِ وَعْدَ الصِّدْقِ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ
“এরাই, যাদের উৎকৃষ্ট আমলগুলো আমি কবুল করি এবং তাদের মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করে দেই। তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে যে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তা সত্য ওয়াদা।"
পূর্বের আয়াতে যে লোকদের বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের নেক আমলসমূহ কবুল করা হবে এবং ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ নেক আমলের তাওফিক কামনা করা, নেক সন্তানের জন্য দু'আ করা, তাওবা করা ও একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই নিজের সকল ইবাদাত, আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করা অনেক পছন্দনীয় আমল। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে-এই আয়াতটি হজরত আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এর হুকুম এবং ফজিলত সকলের জন্য প্রযোজ্য।
আয়াত নং-৩১
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّن عَذَابٍ أَلِيمٍ
“হে আমাদের কওম, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি ইমান আন, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"
জিনদের একটি জামাত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পবিত্র কুরআন শ্রবণ করে ইমান গ্রহণ করল এবং স্বীয় কওমের নিকট ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইমানের দাওয়াত দিল এবং বলল—ইমান গ্রহণ করলে মাগফিরাত তথা চিরস্থায়ী ক্ষমা পাওয়া যাবে।
📄 সূরা মুহাম্মাদ
সূরা মুহাম্মাদ-এর ৬. ১৫. ১৯ ও ৩৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের পরে আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণীয় দীন একমাত্র দীনে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা ইসলাম। যে এই দীনকে গ্রহণ করবে তার সকল নেক কাজ গ্রহণীয় এবং গুনাহ মাফ। যে এই দীনকে গ্রহণ করবে না তার কোন নেক কাজই গ্রহণীয় নয় এবং না তার গুনাহসমূহ ক্ষমার কোন পথ আছে।
আয়াত নং-২
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ
“আর যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে আর তা তাদের রবের পক্ষ হতে (প্রেরিত) সত্য, তিনি তাদের থেকে তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন।"
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাদের অতীতের মন্দ অভ্যাসগুলো দূর করে তাদের বর্তমান জীবনকে সুন্দর করে দেন এবং তাদেরকে নেক কাজের তাওফিক দান করেন এবং পরকালেও তাদের ভুল-ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে তাদেরকে ভাল অবস্থায় রাখবেন।
পূর্বযুগে সকল মাখলুক একই শরীয়াতের অনুসারী ছিল না। আর বর্তমানে গোটা পৃথিবীর জন্য একই শরীয়াতের অনুসরণ করার নির্দেশ। বর্তমানে সত্য দীন এটাই এবং ভাল কাজ মুসলমানরাও করে এবং কাফিররাও করে কিন্তু সত্য দীনের অনুসারীদের গ্রহণীয়তা হল-নেকি কবুল ও গুনাহ মাফ। আর কাফিরদের শাস্তি হল ভাল কাজ বরবাদ ও গুনাহের শাস্তি অত্যাবশ্যক। ইসলাম তথা দীনে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইমান আনা মাগফিরাতের কারণ।
আয়াত নং-১৫
مَّثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارُ مِّن مَّاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارُ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارُ مِنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارُ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ
"মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্ণাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্ণধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?"
পরকালের মহান নি'আমতসমূহের মধ্যে মাগফিরাতও একটি নি'আমত। অর্থাৎ সকল ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। সেখানে পৌঁছে কখনো গুনাহসমূহের আলোচনাও হবে না। যার দ্বারা তারা কষ্ট পাবে কিংবা শাস্তির আশঙ্কা থাকবে।
আয়াত নং-১৯
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ
“অতএব জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।"
“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর উপর সুদৃঢ় থাক এবং ইস্তিগফারে লিপ্ত থাক। মৃত্যুর পরে না ইমান কোন কাজে আসবে, না তাওবা কোন কাজে আসবে। দুনিয়াতেই "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর উপর ইমান আন এবং ইস্তিগফারকে গ্রহণ কর। তাহলে পরকালে সফলতা। সর্বোত্তম জিকির হল-“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং সর্বোত্তম দু'আ হল-ইস্তিগফার। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হল সফলতার জন্য শর্ত আর ইস্তিগফারের মাধ্যমে "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর দৃঢ়তা। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নিজেও পাঠ কর এবং অন্যকেও দাওয়াত দাও এবং ইস্তিগফার নিজের জন্যও কর এবং অন্যান্য মুসলমানদের জন্যও। অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে উম্মতকে ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করতেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহিদের উপর সুদৃঢ় ছিলেন এবং নিজের জন্য ও নিজের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করতেন।
আয়াত নং-৩৪
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
“নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে। তারপর কাফির অবস্থায়ই মারা গেছে, আল্লাহ কখনই তাদের ক্ষমা করবেন না।”
কুফরীর উপর মৃত্যুবরণ করা মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। কুফর তো নিজেই একটি মন্দ কিন্তু যে কাফির অন্যদেরকেও দীন থেকে বাধা দেয় তাদের শাস্তি আরও কঠিন।
📄 সূরাতুল ফাতহ
সূরাতুল ফাতহ-এর ১. ২. ৫. ১১. ১৪ ও ২৯ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-১-২
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا لِّيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُّسْتَقِيمًا
"নিশ্চয় আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি; যেন আল্লাহ আপনার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন, আপনার উপর তাঁর নি'আমত পূর্ণ করেন আর আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।"
গাজওয়ায়ে হোদাইবিয়াতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে বিজয় অর্জন হয়েছে, উক্ত বিজয়ের পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চারটি মহান নি'আমত দান করেছেন।
উক্ত চারটি মহান নিআমতের প্রথম নি'আমত হচ্ছে-মাগফিরাত। অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সদা-সর্বদার জন্য মাগফিরাত দান করা হয়েছে তথা ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রকার গুনাহ ও ভুল-ভ্রান্তি থেকে পবিত্র। কিন্তু তারপরও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এ নি'আমতটিকে 'ফাতহে মুবীন' তথা সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে পুরস্কারস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উচ্চ মর্যাদা অনুযায়ী যে বিষয়সমূহ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদার পরিপন্থী মনে হতে পারে, সেগুলো সদা-সর্বদার জন্য পরিপূর্ণভাবে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুসংবাদের ফলে ইরশাদ করেন— আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সুরানাযিল হয়েছে, যা আমার নিকট ঐ সকল বস্তু থেকে উত্তম যার উপর সূর্য উদিত হয়।
কিয়ামতের দিন যখন সকল নবি-রাসুল শাফাআত করতে অপারগ হবেন তখন হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম মাখলুকদেরকে বলবেন যে, তোমরা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যাও। যিনি খাতামুন নাবিয়্যীন তথা সর্বশেষ নবি এবং যার পূর্বের-পরের সকল গুনাহ আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এটা তাকে ছাড়া আর কারও কাজ নয়। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট দরখাস্ত করা হবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন শাফাআত করবেন। এই আয়াতটিতে মাগফিরাত তথা আল্লাহ তা'আলার নিকট মাগফিরাত কামনা করার এবং ইস্তিগফার করার গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝানো হয়েছে।
আয়াত নং-৫
لِيُدْخِلَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَيُكَفِّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَكَانَ ذُلِكَ عِندَ اللَّهِ فَوْزًا عَظِيمًا
"যেন তিনি মুমিন নারী ও পুরুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে; আর তিনি তাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন; আর এটি ছিল আল্লাহর নিকট এক মহাসাফল্য।"
এই মহান বিজয়ের সুবাদে আল্লাহ তা'আলা হোদাইবিয়া ও বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদের জন্যও বড় বড় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি পুরস্কার হল- গুনাহসমূহ ক্ষমা করা। আর এই পুরস্কারকে আল্লাহ তা'আলা فَوْزًا عَظِيمًا তথা মহা সফলতা আখ্যা দিয়েছেন। বুঝা গেল যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রকৃত সফলতা হল- কোন মুমিনের মাগফিরাত এবং জান্নাত পাওয়া।
আয়াত নং-১১
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
“পিছনে পড়ে থাকা বেদুঈনরা আপনাকে অচিরেই বলবে, আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবর-পরিজন আমাদেরকে ব্যস্ত রেখেছিল; অতএব আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তারা মুখে তা বলে যা তাদের অন্তরে নেই। আপনি বলুন, আল্লাহ যদি তোমাদের কোন ক্ষতি করতে চান কিংবা কোন উপকার করতে চান, তবে কে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমাদের জন্য কোন কিছুর মালিক হবে? বরং তোমরা যে আমল কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।"
ইস্তিগফারের মিথ্যা দরখাস্ত করলে ক্ষমা পাওয়া যাবে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় রওয়ানা করলেন তখন কিছু গ্রাম্য লোক মুশরিকদের ভয়ে বাড়িতে থেকে গেলেন। তারা মনে করল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এই সফর থেকে জীবিত ফিরে আসবে না। এই আয়াতে তাদের নিফাকের পর্দা উন্মোচন করা হয়েছে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তিনি যখন মদিনায় ফিরে আসবেন তখন এ সকল ব্যক্তি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে সাথে না যাওয়ার জন্য মিথ্যা উজর পেশ করবে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট দরখাস্ত করবে- فَاسْتَغْفِرْ لَنَا তথা আপনি আমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তাদের এ কথা তাদের অন্তরের কথা নয়, শুধুমাত্র মুখের কথা।
আয়াত নং-১৪
وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
“আসমানসমূহ ও জমিনের সার্বভৌমত্ব আল্লাহর; তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, আর যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
কাউকে ক্ষমা করা কিংবা শাস্তি দেওয়া এটা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন ও ক্ষমতাধীন। তবে আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত ও রহমত তাঁর গজব তথা শাস্তির অগ্রগামী। সুতরাং যে অন্তর থেকে মাগফিরাত কামনা করে, তার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা "গাফুরুর রাহিম" তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
আয়াত নং-২৯
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنَ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হল একটি চারাগাছের মত, যে তার কচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।"
এই আয়াতের শুরুতে হজরত সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমদের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। আর আয়াতের শেষাংশে তাদের জন্য অনেক বড় মহা পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। আর তা হল—আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলের জন্য মাগফিরাত এবং মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন। এজন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ঐকমত্য হল—সকল সাহাবায়ে কেরام উদ্ল তথা সত্যের মাপকাঠি এবং সকল সাহাবায়ে কেরাম মাগফুর তথা ক্ষমাপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলের মাগফিরাতের ঘোষণা দিয়েছেন। এজন্য তারা সকলে সফল ও জান্নাতি।
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرًا عَظِيمًا