📄 সূরাতুশ-শুরা
সূরাতুশ-শুরা-এর ৫. ১০. ১৩. ২৩. ২৫. ৩০. ৩৪. ৩৭. ৪০ ও ৪৩ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৫
تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِن فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ أَلَا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“উপর থেকে আসমান ফেটে পড়ার উপক্রম হয়; আর ফেরেশতারা তাদের রবের প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করে এবং পৃথিবীতে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে; জেনে রেখ, আল্লাহ, তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ আসমান, আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও ক্রোধে ফেটে পড়বে। অথবা ফেরেশতারা এর বোঝা বহন করতে অক্ষম হওয়ার কারণে পড়ে যাবে। যার অর্থ হল মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার সাথে শরিক সাব্যস্ত করে এবং তাঁর জন্য সন্তানসন্ততি সাব্যস্ত করে থাকে। এটা এত বড় অপরাধ এবং এমন মারাত্মক গুনাহ যে, এর কারণে আসমান পর্যন্ত ফেটে পড়ে যায় কিন্তু আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত ও রহমতের শান এবং ফেরেশতাদের তাসবিহ ও ইস্তিগফারের বরকতে এই ব্যবস্থাপনা চলছে। ফেরেশতারা জমিনের অধিবাসীদের জন্য মাগফিরাত এবং অবকাশ কামনা করে। আর আল্লাহ তা'আলা "গাফুরুর রাহিম" তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তিনি ফেরেশতাদের দু'আ কবুল করে ইমানদারদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং কাফিরদেরকে কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিয়ে থাকেন।
■ আয়াত নং-১০
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
"আর যে কোন বিষয়ে তোমরা মতবিরোধ কর, তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।”
অর্থাৎ সকল মতবিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদের ফায়সালা আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত। আমার তো ঘোষণা হল- আমার রব আল্লাহ তা'আলা। তাঁর উপরই আমার তাওয়াক্কুল তথা ভরসা এবং সর্ব বিষয়ে তাঁর দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন।
■ আয়াত নং-১৩
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ
"তিনি তোমাদের জন্য দীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দীন কায়েম করবে এবং এতে বিচ্ছিন্ন হবে না। তুমি মুশরিকদেরকে যেদিকে আহ্বান করছ তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়; আল্লাহ যাকে চান তার দিকে নিয়ে আসেন। আর যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি হিদায়াত দান করেন।"
দু'টি শ্রেণি সৌভাগ্যবান: যথা- ক. ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজের জন্য নির্বাচন করেন। খ. ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা করে এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করে। সকল বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাকেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পথ প্রদর্শন করেন।
■ আয়াত নং-২৩
ذلِكَ الَّذِي يُبَشِّرُ اللَّهُ عِبَادَهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى وَمَن يَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَزِدْ لَهُ فِيهَا حُسْنًا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَكُورٌ
"এটা তাই, যার সুসংবাদ আল্লাহ তার বান্দাদেরকে দেন- যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে। বল, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে আত্মীয়তার সৌহার্দ ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না। যে উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই গুণগ্রাহী।"
অর্থাৎ মানুষ যখন কল্যাণ ও নেকির পথ অবলম্বন করে তখন আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণকে বৃদ্ধি করে দেন। আখিরাতে সাওয়াব ও প্রতিদান হিসেবে এবং দুনিয়াতে বিভিন্নভাবে। আর এমন ব্যক্তিদের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেন। আয়াতের শুরুতে ইরশাদ ছিল-হে নবি মক্কাবাসীকে বলে দিন যে, আমি তোমাদের নিকট আমার এই দাওয়াত ও মেহনতের জন্য কোন প্রতিদান ও বিনিময় চাই না। শুধুমাত্র একটি বস্তু চাই, আর তা হল তোমাদের সাথে আমার যে বংশীয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, অন্ততপক্ষে তার মূল্যায়ন কর। আর কিছু না হোক কমপক্ষে আত্মীয়তার সম্মান রক্ষার্থে হলেও জুলুম-নির্যাতন থেকে বিরত থাক। সুতরাং তোমাদের নিকট শুধু এতটুকুই চাওয়া। আর যদি তোমরা এরচেয়ে অগ্রসর হয়ে নেক কাজ কর তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নেকিসমূহের মূল্যায়ন করবেন। তা বৃদ্ধি করে দেবেন এবং মাগফিরাত দ্বারা সম্মানিত করবেন।
■ আয়াত নং-২৫
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তা তিনি জানেন।"
অর্থাৎ বান্দাদের উপর দুনিয়াতে যে সকল বিপদ আসে তা তাদের কর্মের ফল। আর অনেক গুনাহ তো আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমতে মাফ করে দেন। সব গুনাহের জন্য যদি ধরতেন তাহলে জমিনের উপর কেউ বাঁচত না। মুমিন বান্দা যে সকল গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতে পেয়ে যাবে তার জন্য ইন শা' আল্লাহ পরকালে কোন প্রকার জবাবদিহি করতে হবে না।
■ আয়াত নং-৩৪
أَوْ يُوبِقْهُنَّ بِمَا كَسَبُوا وَيَعْفُ عَن كَثِيرٍ
“অথবা তাদের কৃতকর্মের জন্য সেগুলোকে তিনি ধ্বংস করে দিতে পারেন, আবার অনেককে তিনি ক্ষমাও করেন।"
অর্থাৎ সমুদ্র এবং সাগরে চলমান বড় বড় জাহাজ যা দেখতে পাহাড়ের মত মনে হয়, তাও আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা চাইলে বাতাসকে থামিয়ে দেন তাহলে এই পালতোলা জাহাজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকবে। পানি এবং বাতাস সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুমের অনুগত এবং আল্লাহ তা'আলা চাইলে মুসাফিরদের মন্দ আমলের কারণে এ সকল জাহাজসমূহকে ঢুবিয়ে দিতে পারেন এবং এমন মুহূর্তেও আল্লাহ তা'আলা অনেক ব্যক্তির গুনাহ মাফ করে তাদেরকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।
■ আয়াত নং-৩৭
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَابِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ
"আর যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।"
গোস্বার সময় মাফ করে দেওয়া আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয় গুণ। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী নি'আমতের উপযুক্ত হল ঐ মুমিন যে আল্লাহ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখে এবং বড় বড় গুনাহসমূহ ও সর্বপ্রকার বেহায়াপনা থেকে বেঁচে থাকে এবং রাগের সময় রাগকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমা করে দেয়।
■ আয়াত নং-৪০
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপোস নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।"
জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়া জায়েজ আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অনেক উত্তমও বটে। তবে যিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয় তার জন্য রয়েছে অনেক বড় প্রতিদান। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী নি'আমতের উপযুক্ত মুমিনদের একটি গুণ হল—তাদের উপর যখন জুলুম করা হয় তখন তারা এর প্রতিশোধ নেয় এবং মন্দ আচরণের প্রতিশোধে মন্দ আচরণই করে থাকে। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ক্ষমা করে দেয় তাহলে এর জন্য সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান ও সাওয়াব পাবে। তবে শর্ত হল-ক্ষমা করাটা যদি ক্ষতিকর না হয়। কিন্তু ক্ষমা করার দ্বারা যদি দীন ও মুসলিমদের কোন ক্ষতি হয়, তাহলে প্রতিশোধ নেওয়াই উত্তম।
আয়াত নং-৪৩
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذُلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
“আর যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।"
অর্থাৎ রাগকে হজম করা এবং কষ্ট সহ্য করে জুলুমকে ক্ষমা করে দেওয়া অনেক হিম্মত ও সাহসের কাজ। হাদিস শরিফে এসেছে-যে বান্দার উপর জুলুম করা হয় আর সে শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য তাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তার ইজ্জত-সম্মান বৃদ্ধি করবেন এবং তাকে সাহায্য করবেন।
📄 সূরাতুল জাসিয়া
সূরাতুল জাসিয়া-এর ১৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-১৪
قُل لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ لِيَجْزِيَ قَوْمًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“যারা ইমান এনেছে তাদেরকে বলুন, যারা আল্লাহর দিবসসমূহ প্রত্যাশা করে না, এরা যেন তাদের ক্ষমা করে দেয়, যাতে আল্লাহ প্রত্যেক কওমকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।"
অর্থাৎ ঐ বদ-দীন লোক যে “আইয়্যামুল্লাহ” তথা আল্লাহ তা'আলার দিনসমূহ সম্পর্কে উদাসীন, আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে নৈরাশ এবং তাঁর আজাব থেকে নির্ভয়, এমন লোক যদি মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়, তাহলে মুসলমান যেন তার থেকে প্রতিশোধের চিন্তা না করে। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার উপর ছেড়ে দেয়। তিনিই তার ক্ষতিসমূহের জন্য তাকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিনদেরকে এই ধৈর্য-সহ্য এবং ক্ষমা ও অনুগ্রহের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।
অনেক মুফাসসিরীনের মতে এটা 'জিহাদের বিধান' অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের হুকুম। আবার অনেকের মতে এটা যেখানে জিহাদের সুযোগ নেই সেখানে এই কর্মপন্থা অবলম্বন করা হবে। যেন মুসলিমদের শক্তি সামান্য ছোটখাট বিষয়ে লিপ্ত হয়ে নষ্ট না হয়। এর দ্বারা জিহাদের অস্বীকার করা হয় না। কেননা এখানে ঐ প্রতিশোধকে বাধা দেওয়া হয়েছে যার দ্বারা মূল উদ্দেশ্য “ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ” তথা আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করা নয় বরং শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্রোধের প্রতিশোধ।
📄 সূরাতুল আহকাফ
সূরাতুল আহকাফ-এর ৮. ১৫. ১৬ ও ৩১ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৮
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ إِنِ افْتَرَيْتُهُ فَلَا تَمْلِكُونَ لِي مِنَ اللَّهِ شَيْئًا هُوَ أَعْلَمُ بِمَا تُفِيضُونَ فِيهِ كَفَى بِهِ شَهِيدًا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“তবে কি তারা বলে যে, সে এটা নিজে উদ্ভাবন করেছে? বলুন, যদি আমি এটা উদ্ভাবন করে থাকি, তবে তোমরা আমাকে আল্লাহর (আজাব) থেকে বাঁচাতে সামান্য কিছুরও মালিক নও। তোমরা যে বিষয়ে আলোচনায় মত্ত আছ, তিনি সে বিষয়ে সম্যক অবগত। আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। আর তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ এই কাফিররা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এমন কঠোর কথা বলে যে, নাউযুবিল্লাহ! এই কুরআন আল্লাহ তা'আলার বাণী নয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বানিয়েছেন। তাদেরকে বলে দিন যে, ধরে নিলাম আমি যদি এমনটি করেও থাকি যে, নিজের বানানো কথাকে আল্লাহ তা'আলার কালাম আখ্যা দিয়েছি, তাহলে আমাকে আল্লাহ তা'আলার আজাব থেকে কে বাঁচাবে? তোমরা যা বলছ এবং অপবাদ দিচ্ছ, এগুলো সব আল্লাহ তা'আলার জানা আছে। সুতরাং তোমরা নিজেদের পরিণতির ফিকির কর। আল্লাহ তা'আলা গাফুর তথা অতি ক্ষমাশীল। তাঁর তাওবার দরজা উন্মুক্ত। এ সকল কথা ছেড়ে তাওবা করে নাও। ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং তোমাদের এত কঠোর কথা সত্ত্বেও যে তোমাদেরকে এখনো ধ্বংস করা হয়নি এর কারণ হল-আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা পরম দয়ালু। তিনি সাথে সাথে কাউকে ধরেন না।
■ আয়াত নং-১৫
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا حَتَّى إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
"আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নি'আমত দান করেছ, তোমার সে নি'আমতের যেন আমি শোকর আদায় করত পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।”
অর্থাৎ সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এমন হয়ে থাকে যে, আল্লাহ তা'আলার যে সকল দয়া ও অনুগ্রহ তার উপর এবং তার মাতা-পিতার উপর রয়েছে, সেগুলোর শোকর আদায় করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট নেক আমলের তাওফিক কামনা করে এবং স্বীয় সন্তানদের জন্যও নেকির দু'আ করে এবং স্বীয় গুনাহসমূহের জন্য তাওবা করে এবং একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই নিজের সকল ইবাদাত, আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করে থাকে।
আয়াত নং-১৬
أُولَبِكَ الَّذِينَ نَتَقَبَّلُ عَنْهُمْ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا وَنَتَجَاوَزُ عَن سَيِّئَاتِهِمْ فِي أَصْحَابِ الْجَنَّةِ وَعْدَ الصِّدْقِ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ
“এরাই, যাদের উৎকৃষ্ট আমলগুলো আমি কবুল করি এবং তাদের মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করে দেই। তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে যে ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তা সত্য ওয়াদা।"
পূর্বের আয়াতে যে লোকদের বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের নেক আমলসমূহ কবুল করা হবে এবং ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ নেক আমলের তাওফিক কামনা করা, নেক সন্তানের জন্য দু'আ করা, তাওবা করা ও একমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যই নিজের সকল ইবাদাত, আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করা অনেক পছন্দনীয় আমল। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে-এই আয়াতটি হজরত আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এর হুকুম এবং ফজিলত সকলের জন্য প্রযোজ্য।
আয়াত নং-৩১
يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّن عَذَابٍ أَلِيمٍ
“হে আমাদের কওম, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি ইমান আন, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবেন।"
জিনদের একটি জামাত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পবিত্র কুরআন শ্রবণ করে ইমান গ্রহণ করল এবং স্বীয় কওমের নিকট ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইমানের দাওয়াত দিল এবং বলল—ইমান গ্রহণ করলে মাগফিরাত তথা চিরস্থায়ী ক্ষমা পাওয়া যাবে।
📄 সূরা মুহাম্মাদ
সূরা মুহাম্মাদ-এর ৬. ১৫. ১৯ ও ৩৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের পরে আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণীয় দীন একমাত্র দীনে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা ইসলাম। যে এই দীনকে গ্রহণ করবে তার সকল নেক কাজ গ্রহণীয় এবং গুনাহ মাফ। যে এই দীনকে গ্রহণ করবে না তার কোন নেক কাজই গ্রহণীয় নয় এবং না তার গুনাহসমূহ ক্ষমার কোন পথ আছে।
আয়াত নং-২
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ وَهُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَأَصْلَحَ بَالَهُمْ
“আর যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে আর তা তাদের রবের পক্ষ হতে (প্রেরিত) সত্য, তিনি তাদের থেকে তাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দেবেন এবং তিনি তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেবেন।"
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাদের অতীতের মন্দ অভ্যাসগুলো দূর করে তাদের বর্তমান জীবনকে সুন্দর করে দেন এবং তাদেরকে নেক কাজের তাওফিক দান করেন এবং পরকালেও তাদের ভুল-ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে তাদেরকে ভাল অবস্থায় রাখবেন।
পূর্বযুগে সকল মাখলুক একই শরীয়াতের অনুসারী ছিল না। আর বর্তমানে গোটা পৃথিবীর জন্য একই শরীয়াতের অনুসরণ করার নির্দেশ। বর্তমানে সত্য দীন এটাই এবং ভাল কাজ মুসলমানরাও করে এবং কাফিররাও করে কিন্তু সত্য দীনের অনুসারীদের গ্রহণীয়তা হল-নেকি কবুল ও গুনাহ মাফ। আর কাফিরদের শাস্তি হল ভাল কাজ বরবাদ ও গুনাহের শাস্তি অত্যাবশ্যক। ইসলাম তথা দীনে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইমান আনা মাগফিরাতের কারণ।
আয়াত নং-১৫
مَّثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارُ مِّن مَّاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارُ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارُ مِنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارُ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ
"মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্ণাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্ণধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে?"
পরকালের মহান নি'আমতসমূহের মধ্যে মাগফিরাতও একটি নি'আমত। অর্থাৎ সকল ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহ ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। সেখানে পৌঁছে কখনো গুনাহসমূহের আলোচনাও হবে না। যার দ্বারা তারা কষ্ট পাবে কিংবা শাস্তির আশঙ্কা থাকবে।
আয়াত নং-১৯
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ
“অতএব জেনে রাখ, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং নিবাস সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।"
“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর উপর সুদৃঢ় থাক এবং ইস্তিগফারে লিপ্ত থাক। মৃত্যুর পরে না ইমান কোন কাজে আসবে, না তাওবা কোন কাজে আসবে। দুনিয়াতেই "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর উপর ইমান আন এবং ইস্তিগফারকে গ্রহণ কর। তাহলে পরকালে সফলতা। সর্বোত্তম জিকির হল-“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং সর্বোত্তম দু'আ হল-ইস্তিগফার। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হল সফলতার জন্য শর্ত আর ইস্তিগফারের মাধ্যমে "লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর দৃঢ়তা। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নিজেও পাঠ কর এবং অন্যকেও দাওয়াত দাও এবং ইস্তিগফার নিজের জন্যও কর এবং অন্যান্য মুসলমানদের জন্যও। অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে উম্মতকে ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করতেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে-নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহিদের উপর সুদৃঢ় ছিলেন এবং নিজের জন্য ও নিজের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করতেন।
আয়াত নং-৩৪
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ مَاتُوا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
“নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথে বাধা দিয়েছে। তারপর কাফির অবস্থায়ই মারা গেছে, আল্লাহ কখনই তাদের ক্ষমা করবেন না।”
কুফরীর উপর মৃত্যুবরণ করা মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। কুফর তো নিজেই একটি মন্দ কিন্তু যে কাফির অন্যদেরকেও দীন থেকে বাধা দেয় তাদের শাস্তি আরও কঠিন।