📄 সূরাতুল মু‘মিন
সূরাতুল মু'মিন-এর ৩. ৭. ৮. ৯. ১৩. ২৪ ও ৫৫ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৩
غَافِرِ الذَّنبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ ذِي القَوْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
"তিনি পাপ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর আজাবদাতা, অনুগ্রহ বর্ষণকারী। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন।"
আল্লাহ তা'আলা গুনাহসমূহ ক্ষমাকারী ও তাওবা কবুলকারী। অর্থাৎ তাওবা কবুল করে গুনাহসমূহকে এমন পাক-পবিত্র করে দেন, যেন কখনো কোন গুনাহই ছিল না এবং সর্বোপরি তাওবাকে একটি ইবাদাত আখ্যা দিয়ে তার উপর প্রতিদান দেন। তবে হ্যাঁ! যে মানবে না তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।
আরশ বহনকারী এবং নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের তাওবাকারী ইমানদারদের জন্য ইস্তিগফার করা
আয়াত নং-৭-৯
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَّهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَابِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
"যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবিহপাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ইমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আজাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব, আর আপনি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন। আর তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নি ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাদেরকেও। নিশ্চয় আপনি মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়। আর আপনি তাদের অপরাধের আজাব হতে রক্ষা করুন এবং সেদিন আপনি যাকে অপরাধের আজাব থেকে রক্ষা করবেন, অবশ্যই তাকে অনুগ্রহ করবেন। আর এটিই মহাসাফল্য।"
যে ইমানদার আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা করতে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তার মর্যাদা এত উঁচু যে, আল্লাহ তা'লার নৈকট্যশীল ফেরেশতারাও তার জন্য ইস্তিগফার করে। সেই নৈকট্যশীল ফেরেশতা যে আরশকে কাঁধে নিয়ে রাখছেন এবং যে ফেরেশতা আরশের তাওয়াফ তথা প্রদক্ষিণ করে থাকে। তাওবাকারী ইমানদারের জন্য এটা কত বড় সৌভাগ্যের কথা যে, জমিনের উপর যদি তার থেকে কোন ভুল- ত্রুটি হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তা'আলার বিশেষ ফেরেশতারা তার জন্য গায়েবানা ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর ফেরেশতারা কোন কাজকে আল্লাহ তা'আলার বিধান হিসেবে করে না। তাহলে বুঝা গেল উক্ত কাজের জন্যও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আদিষ্ট।
কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি দু'আ যার মধ্যে তাওবাকারী ইমানদারদের জন্য ইস্তিগফারও রয়েছে। দু'আটি হল-
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدتَّهُمْ وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَن تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
আয়াত নং-১৩
هُوَ الَّذِي يُرِيكُمْ آيَاتِهِ وَيُنَزِّلُ لَكُم مِّنَ السَّمَاءِ رِزْقًا ۚ وَمَا يَتَذَكَّرُ إِلَّا مَن يُنِيبُ
"তিনিই তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখান এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য রিজক পাঠান। আর যে আল্লাহ অভিমুখী সে-ই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।"
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরতের অনেক নিদর্শন তোমাদেরকে দেখান। বস্তুত যাদের অন্তরে ইনাবাত ইলাল্লাহ তথা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য রয়েছে, তারা সাথে সাথেই মেনে নেয় এবং আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন দেখে আল্লাহ তা'আলাকে পেয়ে যায়।
আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহ থেকে ঐ লোকেরাই শিক্ষা গ্রহণ করে যারা শিরক থেকে তাওবা করে এবং আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে।
আয়াত নং-৪২
تَدْعُونَنِي لِأَكْفُرَ بِاللَّهِ وَأُشْرِكَ بِهِ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى الْعَزِيزِ الْغَفَّارِ
“তোমরা আমাকে ডাকছ আমি যেন আল্লাহর সাথে কুফরী করি, তাঁর সাথে শরিক করি যে ব্যাপারে আমার কোন জ্ঞান নেই; আর আমি তোমাদেরকে ডাকছি মহাপরাক্রমশালী ও পরম ক্ষমাশীলের দিকে।"
ফিরআউনের বংশধরদের মধ্য থেকে ইমানদার এক ব্যক্তি স্বীয় কওমকে বললেন- তোমরা আমাকে কুফর ও শিরকের দিকে ডাকো। অথচ আমি তোমাদেরকে ঐ আল্লাহ তা'আলার দিকে ডাকি যিনি আজিজ তথা মহাপরাক্রমশালী ও গাফ্ফার তথা পরম ক্ষমাশীল। সুতরাং যার মধ্যে এই দুই গুণ থাকবে সে-ই উপযুক্ত যে, তাকে উপাস্য বানানোর এবং তাঁকে ভয় করার এবং তাঁর প্রতি আশা-ভরসা করার।
বুঝা গেল যে, দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় ও আশা উভয় দিকই সামনে রাখতে হবে। আর আশার দিক হল-আল্লাহ তা'আলা মাফকারী, ক্ষমাকারী ও অনুগ্রহকারী।
আয়াত নং-৫৫
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
"অতএব, আপনি সবর করুন নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আপনি আপনার গুনাহের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং সকাল- সন্ধ্যায় আপনার পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করুন।"
হজরত রাসুলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে শত শত বার ইস্তিগফার করতেন। প্রত্যেক বান্দার ভুল-ত্রুটির জন্য তার ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী ইস্তিগফার করা জরুরি।
এই আয়াতে ব্যাপক একটি রুটিন বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সান্ত্বনা রেখেছেন-যে ওয়াদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে রয়েছে তা অবশ্যই পূর্ণ হবে। আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখিরাতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এবং তাঁর উসিলায় তাঁর অনুসারীগণকে বিজয়ী রাখবেন।
প্রয়োজন শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বপ্রকার দুঃখে-কষ্টে এবং সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করা এবং যার থেকে যে পরিমাণ ভুল-ত্রুটি ও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাইতে থাকা এবং রাত-দিন, সকাল-সন্ধ্যা সর্বদা পালনকর্তার তাসবিহ তথা পবিত্রতা ও “তাহমীদ” তথা প্রশংসা জারি রাখা। প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন না হওয়া। তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার সাহায্য আসবে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইস্তিগফারের নির্দেশ দিয়ে মূলত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতকেই ইস্তিগফারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নুসরাত তথা সাহায্য লাভের এই রুটিনে তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত। যথা-
ক. সবর তথা ধৈর্য।
খ. ইস্তিগফার।
গ. সকাল-বিকাল তাসবিহতথা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা ও “তাহমীদ” তথা আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করা। অর্থাৎ সালাত কায়েম করা।
📄 সূরা হা-মিম আস-সিজদা
সূরা হা-মিম আস-সিজদা-এর ৬. ২৪. ৩৬ ও ৪৩ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৬
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ
"বলুন, আমিও তোমাদের মতই মানুষ, আমার প্রতি ওহী আসে যে, তোমাদের ইলাহ কেবলমাত্র এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।”
ইস্তিগফারের নির্দেশ তাওহিদের নির্দেশের সাথেই ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, তোমাদের সকলের ইলাহ ও প্রকৃত বিচারক শুধুমাত্র এক আল্লাহ তা'আলা। যাকে ব্যতীত অন্য আর কারও উপাসনা নেই। এজন্য তোমাদের সকলের উপর কর্তব্য হল তোমাদের সর্ববিষয়ে সোজা এক ইলাহের দিকে প্রত্যাবর্তন করে চলা এবং তাঁর পথ থেকে একটুও এদিক-সেদিক পা না বাড়ানো। আর অতীতে যত ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে যত ভুল-ত্রুটি ও গুনাহ তোমাদের থেকে সংঘটিত হবে তার উপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করে মাফ চাওয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
■ আয়াত নং-২৪
فَإِن يَصْبِرُوا فَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ وَإِن يَسْتَعْتِبُوا فَمَا هُم مِّنَ الْمُعْتَبِينَ
"অতঃপর তারা যদি ধৈর্যধারণ করে তবে জাহান্নামই হবে তাদের আবাস এবং যদি তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চায়, তবুও তারা আল্লাহর সন্তোষপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।"
কেউ যদি তাওবা, ইস্তিগফার এবং সবর বা ধৈর্যধারণ করে তাহলে তা উপকারী। মৃত্যুর পরে আখিরাতে না ধৈর্যধারণের কোন ফল পাওয়া যাবে, না ক্ষমা প্রার্থনার দ্বারা কোন ফায়দা হবে।
অর্থাৎ দুনিয়াতে ধৈর্যধারণ করলে কোন কোন বিপদাপদ দূর হয়ে থাকে। আর আখিরাতে ধৈর্যধারণ করুক আর না করুক জাহান্নামই তার আবাস হবে। আর দুনিয়াতে কোন কোন বিপদাপদ মান্নতের দ্বারা দূর হয়ে থাকে। কিন্তু আখিরাতে কোন মান্নতও কাজে আসবে না।
■ আয়াত নং-৩৬
نُزُلًا مِنْ غَفُوْرٍ رَّحِيمٍ
"(পূর্বের আয়াতে বর্ণিত সকল নি'আমত) পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়নস্বরূপ।"
অর্থাৎ ঐ সকল লোক যারা দুনিয়তে বলত যে, আমাদের রব আল্লাহ তা'আলা, অতঃপর এ কথার উপর অটল ছিল তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। যেখানে তারা সবকিছু পাবে। যা কিছু তাদের মনে চাইবে কিংবা যা কিছু তারা মুখে বলবে, সবকিছু তাদের "গাফুরুর রাহিম” তথা পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আপ্যায়ন করা হবে। সেই ক্ষমাশীল যিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং সেই অসীম দয়ালু যিনি তাদের উপর এমন মহা অনুগ্রহ করেছেন।
আয়াত নং-৪৩
مَا يُقَالُ لَكَ إِلَّا مَا قَدْ قِيلَ لِلرُّسُلِ مِن قَبْلِكَ إِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ وَذُو عِقَابٍ أَلِيمٍ
“আপনাকে তো তাই বলা হয়, যা বলা হত পূর্ববর্তী রাসুলগণকে। নিশ্চয় আপনার রব একান্তই ক্ষমাশীল এবং যন্ত্রণাদায়ক আজাবদাতা।"
অর্থাৎ যারা আপনাকে অস্বীকার করে, আপনাকে কষ্ট দেয়, এটা সবযুগের নবিদের সাথেই সে যুগের অস্বীকারকারীই এমনটি করেছে। আপনিও পূর্বের পয়গাম্বরদের ন্যায় ধৈর্যধারণ করুন। যার ফলাফল হবে- কিছু লোক তাওবা করে সঠিক পথে চলে আসবে। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত। আর কিছু স্বীয় অস্বীকার ও জেদের উপর অটল থাকবে। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ তা'আলার নিকট যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
📄 সূরাতুশ-শুরা
সূরাতুশ-শুরা-এর ৫. ১০. ১৩. ২৩. ২৫. ৩০. ৩৪. ৩৭. ৪০ ও ৪৩ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৫
تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِن فَوْقِهِنَّ وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ أَلَا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“উপর থেকে আসমান ফেটে পড়ার উপক্রম হয়; আর ফেরেশতারা তাদের রবের প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ করে এবং পৃথিবীতে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে; জেনে রেখ, আল্লাহ, তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ আসমান, আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও ক্রোধে ফেটে পড়বে। অথবা ফেরেশতারা এর বোঝা বহন করতে অক্ষম হওয়ার কারণে পড়ে যাবে। যার অর্থ হল মুশরিকরা আল্লাহ তা'আলার সাথে শরিক সাব্যস্ত করে এবং তাঁর জন্য সন্তানসন্ততি সাব্যস্ত করে থাকে। এটা এত বড় অপরাধ এবং এমন মারাত্মক গুনাহ যে, এর কারণে আসমান পর্যন্ত ফেটে পড়ে যায় কিন্তু আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত ও রহমতের শান এবং ফেরেশতাদের তাসবিহ ও ইস্তিগফারের বরকতে এই ব্যবস্থাপনা চলছে। ফেরেশতারা জমিনের অধিবাসীদের জন্য মাগফিরাত এবং অবকাশ কামনা করে। আর আল্লাহ তা'আলা "গাফুরুর রাহিম" তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তিনি ফেরেশতাদের দু'আ কবুল করে ইমানদারদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং কাফিরদেরকে কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিয়ে থাকেন।
■ আয়াত নং-১০
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبِّي عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
"আর যে কোন বিষয়ে তোমরা মতবিরোধ কর, তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।”
অর্থাৎ সকল মতবিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদের ফায়সালা আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত। আমার তো ঘোষণা হল- আমার রব আল্লাহ তা'আলা। তাঁর উপরই আমার তাওয়াক্কুল তথা ভরসা এবং সর্ব বিষয়ে তাঁর দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন।
■ আয়াত নং-১৩
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ
"তিনি তোমাদের জন্য দীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দীন কায়েম করবে এবং এতে বিচ্ছিন্ন হবে না। তুমি মুশরিকদেরকে যেদিকে আহ্বান করছ তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়; আল্লাহ যাকে চান তার দিকে নিয়ে আসেন। আর যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি হিদায়াত দান করেন।"
দু'টি শ্রেণি সৌভাগ্যবান: যথা- ক. ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং নিজের জন্য নির্বাচন করেন। খ. ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবা করে এবং আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করে। সকল বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাকেও আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পথ প্রদর্শন করেন।
■ আয়াত নং-২৩
ذلِكَ الَّذِي يُبَشِّرُ اللَّهُ عِبَادَهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى وَمَن يَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَزِدْ لَهُ فِيهَا حُسْنًا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَكُورٌ
"এটা তাই, যার সুসংবাদ আল্লাহ তার বান্দাদেরকে দেন- যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে। বল, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে আত্মীয়তার সৌহার্দ ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না। যে উত্তম কাজ করে, আমি তার জন্য তাতে কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই গুণগ্রাহী।"
অর্থাৎ মানুষ যখন কল্যাণ ও নেকির পথ অবলম্বন করে তখন আল্লাহ তা'আলা তার কল্যাণকে বৃদ্ধি করে দেন। আখিরাতে সাওয়াব ও প্রতিদান হিসেবে এবং দুনিয়াতে বিভিন্নভাবে। আর এমন ব্যক্তিদের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেন। আয়াতের শুরুতে ইরশাদ ছিল-হে নবি মক্কাবাসীকে বলে দিন যে, আমি তোমাদের নিকট আমার এই দাওয়াত ও মেহনতের জন্য কোন প্রতিদান ও বিনিময় চাই না। শুধুমাত্র একটি বস্তু চাই, আর তা হল তোমাদের সাথে আমার যে বংশীয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, অন্ততপক্ষে তার মূল্যায়ন কর। আর কিছু না হোক কমপক্ষে আত্মীয়তার সম্মান রক্ষার্থে হলেও জুলুম-নির্যাতন থেকে বিরত থাক। সুতরাং তোমাদের নিকট শুধু এতটুকুই চাওয়া। আর যদি তোমরা এরচেয়ে অগ্রসর হয়ে নেক কাজ কর তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নেকিসমূহের মূল্যায়ন করবেন। তা বৃদ্ধি করে দেবেন এবং মাগফিরাত দ্বারা সম্মানিত করবেন।
■ আয়াত নং-২৫
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
"আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তা তিনি জানেন।"
অর্থাৎ বান্দাদের উপর দুনিয়াতে যে সকল বিপদ আসে তা তাদের কর্মের ফল। আর অনেক গুনাহ তো আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রহমতে মাফ করে দেন। সব গুনাহের জন্য যদি ধরতেন তাহলে জমিনের উপর কেউ বাঁচত না। মুমিন বান্দা যে সকল গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতে পেয়ে যাবে তার জন্য ইন শা' আল্লাহ পরকালে কোন প্রকার জবাবদিহি করতে হবে না।
■ আয়াত নং-৩৪
أَوْ يُوبِقْهُنَّ بِمَا كَسَبُوا وَيَعْفُ عَن كَثِيرٍ
“অথবা তাদের কৃতকর্মের জন্য সেগুলোকে তিনি ধ্বংস করে দিতে পারেন, আবার অনেককে তিনি ক্ষমাও করেন।"
অর্থাৎ সমুদ্র এবং সাগরে চলমান বড় বড় জাহাজ যা দেখতে পাহাড়ের মত মনে হয়, তাও আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা চাইলে বাতাসকে থামিয়ে দেন তাহলে এই পালতোলা জাহাজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকবে। পানি এবং বাতাস সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুমের অনুগত এবং আল্লাহ তা'আলা চাইলে মুসাফিরদের মন্দ আমলের কারণে এ সকল জাহাজসমূহকে ঢুবিয়ে দিতে পারেন এবং এমন মুহূর্তেও আল্লাহ তা'আলা অনেক ব্যক্তির গুনাহ মাফ করে তাদেরকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।
■ আয়াত নং-৩৭
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَابِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ
"আর যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।"
গোস্বার সময় মাফ করে দেওয়া আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয় গুণ। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী নি'আমতের উপযুক্ত হল ঐ মুমিন যে আল্লাহ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখে এবং বড় বড় গুনাহসমূহ ও সর্বপ্রকার বেহায়াপনা থেকে বেঁচে থাকে এবং রাগের সময় রাগকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমা করে দেয়।
■ আয়াত নং-৪০
وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপোস নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।"
জুলুমের প্রতিশোধ নেওয়া জায়েজ আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অনেক উত্তমও বটে। তবে যিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয় তার জন্য রয়েছে অনেক বড় প্রতিদান। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী নি'আমতের উপযুক্ত মুমিনদের একটি গুণ হল—তাদের উপর যখন জুলুম করা হয় তখন তারা এর প্রতিশোধ নেয় এবং মন্দ আচরণের প্রতিশোধে মন্দ আচরণই করে থাকে। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ক্ষমা করে দেয় তাহলে এর জন্য সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রতিদান ও সাওয়াব পাবে। তবে শর্ত হল-ক্ষমা করাটা যদি ক্ষতিকর না হয়। কিন্তু ক্ষমা করার দ্বারা যদি দীন ও মুসলিমদের কোন ক্ষতি হয়, তাহলে প্রতিশোধ নেওয়াই উত্তম।
আয়াত নং-৪৩
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذُلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
“আর যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে, তা নিশ্চয় দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।"
অর্থাৎ রাগকে হজম করা এবং কষ্ট সহ্য করে জুলুমকে ক্ষমা করে দেওয়া অনেক হিম্মত ও সাহসের কাজ। হাদিস শরিফে এসেছে-যে বান্দার উপর জুলুম করা হয় আর সে শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য তাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা তার ইজ্জত-সম্মান বৃদ্ধি করবেন এবং তাকে সাহায্য করবেন।
📄 সূরাতুল জাসিয়া
সূরাতুল জাসিয়া-এর ১৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-১৪
قُل لِلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ لِيَجْزِيَ قَوْمًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“যারা ইমান এনেছে তাদেরকে বলুন, যারা আল্লাহর দিবসসমূহ প্রত্যাশা করে না, এরা যেন তাদের ক্ষমা করে দেয়, যাতে আল্লাহ প্রত্যেক কওমকে তাদের কৃতকর্মের জন্য প্রতিদান দিতে পারেন।"
অর্থাৎ ঐ বদ-দীন লোক যে “আইয়্যামুল্লাহ” তথা আল্লাহ তা'আলার দিনসমূহ সম্পর্কে উদাসীন, আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে নৈরাশ এবং তাঁর আজাব থেকে নির্ভয়, এমন লোক যদি মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়, তাহলে মুসলমান যেন তার থেকে প্রতিশোধের চিন্তা না করে। বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার উপর ছেড়ে দেয়। তিনিই তার ক্ষতিসমূহের জন্য তাকে শাস্তি দেবেন এবং মুমিনদেরকে এই ধৈর্য-সহ্য এবং ক্ষমা ও অনুগ্রহের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।
অনেক মুফাসসিরীনের মতে এটা 'জিহাদের বিধান' অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের হুকুম। আবার অনেকের মতে এটা যেখানে জিহাদের সুযোগ নেই সেখানে এই কর্মপন্থা অবলম্বন করা হবে। যেন মুসলিমদের শক্তি সামান্য ছোটখাট বিষয়ে লিপ্ত হয়ে নষ্ট না হয়। এর দ্বারা জিহাদের অস্বীকার করা হয় না। কেননা এখানে ঐ প্রতিশোধকে বাধা দেওয়া হয়েছে যার দ্বারা মূল উদ্দেশ্য “ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ” তথা আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করা নয় বরং শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্রোধের প্রতিশোধ।