📄 সূরাতুন নূর
সুরাতুন-নুর-এর ৫. ১০. ২২. ২৬. ৩১. ৩৩ ও ৬২ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৫ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদদাতা ফাসিক। আর কোন ফাসিকের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ সে এমন আমানতদার সম্মানিতদের জামাত থেকে বের হয়ে গেছে যাদের সাক্ষ্য ইসলামী আদালতে গ্রহণযোগ্য। তবে সে যদি তাওবা করে সংশোধন হয়ে যায় তাহলে আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তিনি তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে ফাসিক ও নাফরমানের মধ্যে গণ্য করা হবে না এবং আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা অনুগ্রহ করে তাকে তাওবার তাওফিক দেবেন। তবে ভবিষ্যতে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে কি হবে না এ ব্যাপারে আইম্মায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
আয়াত নং-১০ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ تَوَّابُ حَكِيمٌ “যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না থাকত, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা গ্রহণকারী, প্রজ্ঞাময়।”
স্বামী যদি তার স্ত্রীর উপর ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয় আর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারে, তাহলে এ ব্যাপারে সাধারণ বিধান থেকে ব্যতিক্রম একটি বিধান রয়েছে। যাকে শরীয়তের পরিভাষায় "লি'আন” [১]. বলা হয়। যার বিস্তারিত বর্ণনা এই আয়াতের পূর্বের দুই আয়াতে করা হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, লি'আনের এই বিধান আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় অনুগ্রহ এবং রহমত। আর আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা তো অনেক উঁচু এবং হিকমতের বহিঃপ্রকাশ। এই বিধান যদি না হত তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিথ্যার আবরণ উন্মোচিত হয়ে যেত এবং কোন এক পক্ষের উপর শরয়ি শাস্তিও কার্যকর হত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার রহমত উভয়কেই ঢেকে নিয়েছে। যে সত্যবাদী সে শাস্তি থেকে বেঁচে গিয়েছে। আর যে মিথ্যাবাদী তার অপরাধকে গোপন করা হয়েছে এবং সুযোগ দেওয়া হয়েছে যে, সে যদি স্বীয় জীবনে তাওবা করে নেয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবুলকারী।
আয়াত নং-২২ وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنكُمْ وَالسَّعَةِ أَن يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর তোমাদের মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে, তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
আম্মাজান হজরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহার উপর অপবাদ আরোপকারীদের মধ্যে অজ্ঞতার কারণে কিছু মুসলমানও শামিল হয়েছিলেন। তার মধ্যে হজরত মেসতাহ রাদিআল্লাহু আনহুও ছিলেন। তিনি মিসকীন ছিলেন, মুহাজির ছিলেন এবং বদরী ছিলেন। হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহুর খালাতো ভাই কিংবা ভাতিজা ছিলেন। এই ঘটনার পূর্বে হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু তকে আর্থিক সাহায্য করতেন। ইফকের ঘটনার পরে হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু কসম খেলেন যে, ভবিষ্যতে আর হজরত মেসতাহ রাদিআল্লাহু আনহুকে সাহায্য করবেন না। এমনিভাবে অন্যান্য আরও সাহাবায়ে কেরামও কসম খেলেন যে, অপবাদে অংশগ্রহণকারীদেরকে কখনও দান-সাদাকা করবেন না। এ ঘটনা উপলক্ষেই এই আয়াতটি নাজিল হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা দীনি মর্যাদা এবং আর্থিক সঙ্গতি দিয়েছেন তাদের জন্য উচিত নয় এমন কসম খাওয়া। তাদের মর্যাদা ও চরিত্র তো অনেক বড় হওয়া উচিত। বীরত্ব তো হল-মন্দের প্রতিদান উত্তম দ্বারা দেওয়া। গরিব আত্মীয়-স্বজন এবং আল্লাহর রাস্তার মুহাজিরদের জন্য খরচ না করার কসম খাওয়া বুজুর্গ, সম্মানিত ও বীরদের কাজ নয়। তোমাদের শান তো হওয়া চাই, ভুল-ত্রুটিকারীদেরকে ক্ষমা করা। যদি এমনটি কর তাহলে আল্লাহ তা'আলাও তোমাদেরকে তাঁর মাগফিরাত দান করবেন ও ক্ষমা করবেন। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ক্ষমা করুক? এর উপর হজরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন-হে আমার রব! আমি চাই যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করেন। অতঃপর নিজের কসমের কাফফারা দিলেন এবং বললেন-এখন আমি কোন খরচ বন্ধ করব না। তাই খরচ চালু করে দিলেন বরং কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, পূর্বের চেয়ে খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদেরকে ক্ষমা করা মাগফিরাতের কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। অন্যকে ক্ষমা কর, তাহলে তুমিও ক্ষমা পাবে।
আয়াত নং-২৬
الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ أُولَبِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
“দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। আর সচ্চরিত্রা নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্রা নারীদের জন্য; লোকেরা যা বলে, তারা তা থেকে মুক্ত। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজক।"
পবিত্র এবং সম্মানী লোকেরা ঐ বিষয় থেকে মুক্ত যা খারাপ লোকেরা তাদের সাথে করে থাকে এবং এই খারাপ লোকদের কথা ও অপবাদের উপর ধৈর্যধারণের কারণে পবিত্র লোকদের গুনাহ মাফ হয়। আর যারা তাদেরকে লাঞ্ছিত করতে চেষ্টা করে তার প্রতিদানে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য পরকালে সম্মানজনক রিজক বরাদ্দ করে রেখেছেন।
হজরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহা এই আয়াতের উপর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। তিনি বলেছেন-
خُلِقْتُ طَيِّبَةً وَ وُعِدَّتْ مَغْفِرَةٌ وَرِزْقًا كَرِيمًا
আল্লাহ তা'আলা এটাকে তাইয়্যেবা তথা পবিত্র বলেছেন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত ও সম্মাজনক রিজকের ওয়াদা করেছেন।
আয়াত নং-৩১
وَقُل لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَابِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطَّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হিফাজত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজেদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।"
এই আয়াতে ইমানদার নারী-পুরুষদেরকে নিজেদের দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানকে গুনাহ থেকে হেফাজত করার এবং মুসলিম নারীদের প্রতি পর্দার গুরত্বারোপ করা হয়েছে। এমনভাবে চলাচল করতেও নিষেধ করা হয়েছে যেভাবে চললে চলাচলের কিংবা অলঙ্কারের শব্দ পরপুরুষ শুনতে পায়। এ সকল বিধানসমূহ আলোচনার পর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।
আয়াত নং-৩৩
وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَالَّذِينَ يَبْتَغُونَ الْكِتَابَ مِمَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَكَاتِبُوهُمْ إِنْ عَلِمْتُمْ فِيهِمْ خَيْرًا وَآتُوهُم مِّن مَّالِ اللَّهِ الَّذِي آتَاكُمْ وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنَا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَن يُكْرِهَهُنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِن بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। আর তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য চুক্তি করতে চায় তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি কর, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দাও। তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে তোমরা দুনিয়ার জীবনের সম্পদের কামনায় তাদেরকে ব্যভিচারে বাধ্য করো না। আর যারা তাদেরকে বাধ্য করবে, নিশ্চয় তাদেরকে বাধ্য করার পর আল্লাহ তাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।"
জাহেলী যুগে কোন কোন লোক তাদের দাসীদের দ্বারা দেহ ব্যবসা করাত। মুনাফিক সর্দার ইবনে উবাইরও বেশ কয়েকজন দাসী ছিল। যাদের দ্বারা সে দেহ ব্যবসা করিয়ে অর্থ উপার্জন করত। তাদের মধ্যে কয়েকজন দাসী মুসলমান হয়ে গেলে তারা এই গুনাহের কাজ করতে অস্বীকার করে। যার ফলে উক্ত মালাউন তথা অভিশপ্ত তাদেরকে শাস্তি দিয়ে উক্ত কাজে বাধ্য করত। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়েছে যে, এই কাজ তো হারামই এবং এই কাজের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও অপবিত্র এবং হারাম। কিন্তু যখন দাসীদের অনিচ্ছায় অর্থের জন্য তাদেরকে এই কাজে বাধ্য করা হয় তখন এর গুনাহের ভয়াবহতা, শান্তি ও পরিণাম আরও বেড়ে যায়। তবে ঐ অক্ষম মুসলিম দাসী, যাকে জুলুম-নির্যাতন করে এই কাজে বাধ্য করা হয়েছে তার জন্য আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। প্রকৃত অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব মাগফিরাতের কারণসমূহের অন্যতম একটি কারণ।
আয়াত নং-৬২
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَّمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَأْذِنُوهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ أُولَيكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضِ شَأْنِهِمْ فَأْذَن لِمَن شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"মুমিন শুধু তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ইমান আনে এবং তাঁর সাথে কোন সমষ্টিগত কাজে থাকলে অনুমতি না নিয়ে চলে যায় না। নিশ্চয় আপনার কাছে যারা অনুমতি চায় তারাই কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ইমান আনে; সুতরাং কোন প্রয়োজনে তারা আপনার কাছে বাইরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে আপনার যাকে ইচ্ছা আপনি অনুমতি দিন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।"
প্রকৃত মুমিন তারা, যারা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোন সম্মিলিত কাজে অংশগ্রহণ করে। যেমন: জিহাদ, জুমার সালাত, ঈদের সালাত ও পরামর্শসভা ইত্যাদি। এ সকল কাজ থেকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুমতি ব্যতীত উঠে না যাওয়া। তাদের মধ্য হতে কোন ওজরের কারণে যারা অনুমতি প্রার্থনা করে তারা মুমিন। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষমতা রয়েছে যে, যাকে ভাল মনে করবে তাকে ছুটি এবং অনুমতি দেওয়ার। আর যাকে ছুটি এবং অনুমতি দেবে তার জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট ইস্তিগফার করার। আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
সম্মিলিত কাজ এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংশ্রব থেকে বঞ্চিত হওয়া চাই তা কোন ওজরের কারণেই হোক তা একটি ক্ষতি। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাদের জন্য ইস্তিগফার করেন তাহলে এর বরকতে উক্ত ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে। বুঝা গেল ইস্তিগফারের একটি ফায়দা হল এর বরকতে অনেক বড় ক্ষতিও পূরণ হয়ে যায়।
টিকাঃ
[১]. লি'আন শব্দের শাব্দিক অর্থ হল- অপবাদ; অভিশাপ; লা'নত; একে অপরের উপর লা'নত করা ইত্যাদি। আর শরীয়তের পরিভাষায় লি'আন বলা হয় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর উপর যেনা- ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া এবং বিচারকের সামনে নিজের সত্যতার জন্য চারবার কসম খাওয়া; পঞ্চমবার স্বামী বলবে আমি মিথ্যা বললে আল্লাহর অভিশাপ আমার উপর বর্ষিত হোক; এমনভাবে স্ত্রীরও কসম ও শপথ গ্রহণ করা। অতঃপর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটা।
📄 সূরাতুল ফুরকান
সূরাতুল ফুরকান-এর ৬. ৭০ ও ৭১ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৬
قُلْ أَنزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“বলুন, যিনি আসমান ও জমিনের রহস্য জানেন তিনি এটি নাজিল করেছেন; নিশ্চয় তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
কাফিররা বলে যে, কুরআনুল কারিম (নাউযুবিল্লাহ) অতীত হয়ে যাওয়া একটি গ্রন্থ। যার মধ্যে পুরাতন কিচ্ছা-কাহিনী ছাড়া আর কিছু নেই। এই আয়াতে তাদের এই অভিযোগের জবাব দেওয়া হয়েছে যে, এই কিতাব আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেছেন। যিনি আসমান و জমিনের সকল রহস্য এবং গোপন বিষয়াবলী সম্পর্কে অবগত। তিনি গাফুরুর রাহিম তথা অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর এটা তাঁর মাগফিরাত এবং রহমতের ধারা যে, এমন মহান পথপ্রদর্শক গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। যার মধ্যে ইলম, আমল ও সফলতার সর্বপ্রকার রহস্য বিদ্যমান। যে কেউ এই গ্রন্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে তারই বুঝে এসে যাবে যে, এই গ্রন্থ কোন মানুষের তৈরী। হতে পারে না। অতঃপর যে এমন সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ দেখেও অস্বীকার করে তাকেও অধিকাংশ সময়ই সাথে সাথেই শাস্তি দেন না। কারণ তিনি গাফুরুর রাহিম তথা অতীব ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
আয়াত নং-৭০ إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَبِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
“তবে যে তাওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
পেছনের আয়াতে তিনটি বড় গুনাহ এবং তার শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যথা- ক. আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য বানানো। খ. কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা। গ. যেনা-ব্যভিচার করা।
যে ব্যক্তি এই তিনটি পাপে লিপ্ত হবে, সে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে দ্বিগুণ শাস্তি ভোগ করবে এবং এতে সর্বদা লাঞ্ছিত হতে থাকবে। আর এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, সত্যিকারের তাওবার দ্বারা উপরোক্ত তিনটি গুনাহও মাফ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নেক কাজের তাওফিক হবে এবং ধারাবাহিক তাওবার বরকতে তার গুনাহের সমপরিমাণ তাকে নেকি দান করা হবে।
সুবহানাল্লাহ! কত বড় অনুগ্রহ এবং কত মহান ক্ষমা ও মাগফিরাত।
আয়াত নং-৭১ وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا । "আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে তবে নিশ্চয় সে "পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।"
পেছনের আয়াতে ঐ কাফিরদের তাওবার আলোচনা করা হয়েছে যারা ঈমান এনেছে। এই আয়াতে ঐ মুসলমানদের আলোচনা করা হয়েছে যাদের থেকে মুসলমান অবস্থায় কোন গুনাহ হয়ে গেলে তারাও তাওবা করে।
📄 সূরাতুশ শু‘আরা
সুরাতুশ শু'আরা-এর
৫১. ৮২ ও ৮৬ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৫১
إِنَّا نَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَن كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ
“আমরা আশা করি যে, আমাদের রব আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেবেন, কারণ আমরা মুমিনদের মধ্যে প্রথম।"
মাগফিরাত এমন বৃহৎ নি'আমত যে, এর জন্য যে কোন ত্যাগ তুচ্ছ। ফির'আউনের জাদুকরেরা যখন ইমানের ঘোষণা দিলেন ফিরআউন তখন তাদেরকে উল্টো লটকিয়ে হত্যা করার হুমকি দিল। তারা তখন বললেন, মৃত্যুসহ আরও সবকিছু কবুল, তবুও যেন আমরা আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাত পেয়ে যাই।
আয়াত নং-৮২
وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ
“আর যিনি আশা করি, বিচার দিবসে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবেন।"
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের বর্ণনা যে, আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাতের আশা রাখি। অর্থাৎ কোন বিষয়ে কোন ভুল-ত্রুটি কিংবা স্বীয় মর্যাদা অনুযায়ী কোন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তাঁর অনুগ্রহে ক্ষমা পাওয়ার আশাবাদী। তাঁকে ছাড়া তো আর কেউ ক্ষমাকারী নেই।
আয়াত নং-৮৬
وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ
"আর আমার পিতাকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।"
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্বীয় পিতার জন্য মাগফিরাত কামনা করেছেন। পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ হয়ে গেলে এই দু'আ পরিত্যাগ করেন।
📄 সূরাতুন-নামল
সুরাতুন-নামল-এর
১১. ৪৪. ও ৪৬ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-১১ إِلَّا مَن ظَلَمَ ثُمَّ بَدَّلَ حُسْنًا بَعْدَ سُوءٍ فَإِنِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ “তবে যে জুলুম করে। তারপর অসৎকাজের পরিবর্তে সৎকাজ করে, তবে অবশ্যই আমি অধিক ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
পেছনের আয়াতে বলেছেন-হে মূসা আপনি ভয় পাবেন না। কেননা কোন রাসুল আমার সামনে ভয় পেতে পারে না। অর্থাৎ আমার সামনে তো একমাত্র জালিমরা ভয় পাবে। আর আপনি তো আমার রাসুল। আপনি কেন ভয় পাবেন?
এই আয়াতে বুঝানো হয়েছে যে, জালিমও যদি তাওবা করে নেয় তাহলে তার জন্যও আমার রহমত ও মাগফিরাতের দরজা খোলা। অতঃপর তারও ভয়ের কোন কারণ নেই। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার সামনে উপস্থিত হয়ে ভয় এবং শঙ্কা কেবল তাদেরই যারা কোন বাড়াবাড়ি ও গুনাহ করে এসেছে। তবে তারাও যদি বাড়াবাড়ি ও গুনাহ করার পরে তাওবা করে ফেলে এবং নেক কাজ করে গুনাহের নিদর্শন মুছে ফেলে তাহলে আল্লাহ তা'আলা স্বীয়
রহমতে ক্ষমাকারী।
আয়াত নং-৪৪
قِيلَ لَهَا ادْخُلِي الصَّرْحَ فَلَمَّا رَأَتْهُ حَسِبَتْهُ لُجَّةٌ وَكَشَفَتْ عَن سَاقَيْهَا قَالَ إِنَّهُ صَرْحُ مُمَرَّدُ مِّن قَوَارِيرُ قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“তাকে বলা হল, প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর। অতঃপর যখন সে তা দেখল, সে তাকে এক গভীর জলাশয় ধারণা করল এবং তার পায়ের গোছাদ্বয় অনাবৃত করল। সুলাইমান বলল, এটি আসলে স্বচ্ছ কাঁচ-নির্মিত প্রাসাদ। সে বলল, হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সাথে সৃষ্টিকূলের রব আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম।"
হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম এক জায়গায় তাশরিফ নিলেন। রাস্তায় পাথরের স্থানে কাঁচের বিছানা ছিল। এই চমৎকার কাঁচ দূর থেকে পানির ঝর্ণার মত মনে হচ্ছিল এবং সম্ভবত কাঁচের নিচে বাস্তবেই পানি ছিল। রাণী বিলকিছ সেখানে পৌঁছে এটাকে পানি মনে করে পোষাক উঁচু করে পা অনাবৃত করল। হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন— এটা কাঁচের বিছানা, পানি নয়। এখানে রাণী বিলকিছের জ্ঞানের স্বল্পতা এবং হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের জ্ঞানের পূর্ণতা প্রকাশ পেল। সে জেনে গেল যে, দীনের বিষয়েও সে যেটা বুঝেছে সেটাই সঠিক হবে। হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম তাকে সতর্ক করলেন যে, সূর্য ও তারকাদের ঝলক দেখে এদেরকে রব মনে করা এমনই ধোঁকা যেমনটি মানুষ কাঁচের ঝলক দেখে পানি মনে করা।
আয়াত নং-৪৬
قَالَ يَا قَوْمِ لِمَ تَسْتَعْجِلُونَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
"সে (হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম) বলল, হে আমার কওম, তোমরা কল্যাণের পূর্বে কেন অকল্যাণকে তরান্বিত করতে চাইছ? কেন তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না, যেন তোমাদেরকে রহমত করা হয়?"
হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম যখন স্বীয় জাতিকে অনেক বুঝালেন এবং তারা মানল না তখন তিনি তাদেরকে আজাবের ভয় দেখালেন। তারা তখন রেগে গিয়ে বলতে লাগল যে, তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে দ্রুত আজাব নিয়ে এসো। প্রতিউত্তরে হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম বললেন যে, তোমরা ইমান ও তাওবার কল্যাণের পথে তো আসলেই না, উল্টো অকল্যাণ তথা দ্রুত আজাব কামনা করছ। আজাব আসলে তো তোমাদের কিছুই রক্ষা পাবে না। এখনো সময় আছে গুনাহ থেকে তাওবা করে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও হেফাজতে চলে আসো। ইস্তিগফারের ফল হল আল্লাহ তা'আলার রহমত।