📄 সূরা ইউসুফ
সুরা ইউসুফ-এর ২৯. ৫৩. ৯২. ৯৭ ও ৯৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-২৯ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِبِينَ
"ইউসুফ, তুমি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাও, আর (হে নারী) তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর। নিশ্চয় তুমিই পাপীদের অন্তর্ভুক্ত।”
আযীযে মিশর তথা মিশরের বাদশাহ তার স্ত্রীকে বললেন যে, তুমিই অপরাধী। সুতরাং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাও।
وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ । তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর।
ক্ষমা চাওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাওয়া অথবা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিকট ক্ষমা চাওয়া।
আয়াত নং-৫৩
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“(হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন) আমি আমার নফসকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ মানুষের নফস সাধারণত মানুষকে মন্দের দিকেই প্ররোচিত করে থাকে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রহমত এবং সাহায্যই নফসকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। আমিও আমার যে পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করেছি এগুলো সবই আল্লাহ তা'আলার বিশেষ তাওফিক ও অনুগ্রহের ফলে।
إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
বাক্যটি দ্বারা ইশারা করেছেন যে, নফসে আম্মারা তথা অবাধ্য নফস যখন তাওবা করে নফসে লাওয়্যামাহ তথা আনুগত্যশীল নফসে পরিণত হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলা তখন তার পেছনের ভুল-ভ্রান্তি ও পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। বরং একটু একটু করে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে নফসে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত নফসের মর্যাদায় উন্নীত করেন।
আয়াত নং-৯২
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“সে বলল, আজ তোমাদের উপর কোন ভর্ৎসনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হল তখন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন।
■ আয়াত নং-৯৭ قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِبِينَ "তারা বলল, হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা তাদের সম্মানিত পিতার নিকট তাদের জন্য ইস্তিগফারের দরখাস্ত করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে আল্লাহ তা'আলার থেকে আমাদের গুনাহ ক্ষমা করান। আমাদের থেকে অনেক বড় গুনাহ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য হল- প্রথমে আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, অতঃপর পরিচ্ছন্ন মনে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আমাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করুন।
বুঝা গেল যে, নিজের থেকে বড় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা নিজের জন্য ইস্তিগফার করানো উচিত। তবে শর্ত হল-নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হতে হবে এবং নিজেও ইস্তিগফার করতে হবে।
■ আয়াত নং-৯৮ قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "সে বলল, অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার পুত্রদের সাথে ওয়াদা করলেন- আমি অচিরেই তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব। অর্থাৎ কবুলিয়াতের সময় ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- জুমার রাত অথবা তাহাজ্জুদের সময়। বুঝা গেল-এই সময়গুলোতে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য ইস্তিগফারের গুরুত্বারোপ করা উচিত।
📄 সূরা রা‘আদ
সুরা রা'আদ-এর
৬. ২৭ ও ৩০ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৬ وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ وَقَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِمُ الْمَثَلَاتُ وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ
"আর তারা আপনার নিকট মঙ্গলের পরিবর্তে মন্দের জন্য তাড়াহুড়া করে, অথচ তাদের পূর্বে অনেক (অনুরূপ লোকদের) শাস্তি গত হয়েছে। আর নিশ্চয় তোমার রব মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল তাদের জুলুম সত্ত্বেও এবং নিশ্চয় তোমার রব কঠিন শাস্তিদাতা।"
এই কাফিররা রাগ ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বলে যে, আমরা ইমান আনব না। আমাদের উপর দ্রুত শাস্তি নিয়ে আসো। অথচ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উপর শাস্তির ঘটনা তাদের সম্মুখে বিদ্যমান। তথাপিও শাস্তি অবতীর্ণ করা কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মানুষের গুনাহ ও অপরাধ ক্ষমাকারী। আল্লাহ তা'আলার ক্ষমার এই গুণটিই আজাবকে বাধা দিয়ে রেখেছে। তবে জুলুম-অত্যাচার ও পাপের ধারাবাহিকতা যখন সীমাতিরিক্ত বেড়ে যায় তখন কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কঠোর শাস্তিদাতাও বটে।
আয়াত নং-২৯ وَيَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْهِ آيَةٌ مِّن رَّبِّهِ قُلْ إِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ أَنَابَ
"আর যারা কুফরী করেছে, তারা বলে, তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন নাজিল হয় না? বল, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর দিকে পথ দেখান।"
হিদায়াত সে-ই পায় যে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। হিদায়াত নৈকট্যশীলদের জন্য।
আয়াত নং-৩০ كَذَلِكَ أَرْسَلْنَاكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُو عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ
“এমনিভাবে আমি আপনাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির নিকট, যার পূর্বে অনেক জাতি গত হয়েছে, যেন আমি আপনার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করেছি, তা তাদের নিকট তিলাওয়াত করেন। অথচ তারা রহমানকে অস্বীকার করে। বলুন, তিনি আমার রব, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন।”
📄 সূরা ইবরাহিম
সুরা ইবরাহিম-এর ১০. ৩৬ ও ৪১ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-১০ قَالَتْ رُسُلُهُمْ أَفِي اللَّهِ شَكٍّ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَدْعُوكُمْ لِيَغْفِرَ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُؤَخِّرَكُمْ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى قَالُوا إِنْ أَنتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُنَا تُرِيدُونَ أَن تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ
"তাদের রাসুলগণ বলেছিল, আল্লাহর ব্যাপারেও কি সন্দেহ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা? তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করেন যাতে তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করেন এবং তিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেন। তারা বলল, তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ, তোমরা আমাদেরকে আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদাত করত, তা থেকে ফিরাতে চাও। অতএব তোমরা আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আস।"
আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে ডাকছেন যে, তোমাদেরকে মাগফিরাত দান করব এবং তোমাদেরকে দুনিয়ার এই আজাব থেকেও বাঁচাব যা কুফর ও পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের উপর নাজিল হয়।
আয়াত নং-৩৬ رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ “হে আমার রব, নিশ্চয় এসব মূর্তি অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দু'আ করেছেন- হে আল্লাহ! আমাকে এবং আমার সন্তানদেরকে মূর্তিসমূহ থেকে বাঁচান। এই মূর্তি ও প্রতীমাসমূহ অনেক লোকের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ। হে আল্লাহ! তাদের মধ্য হতে যে বিশুদ্ধ তাওহিদের উপর চলে এসেছে সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার কথা মানেনি, আপনি তো গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আপনি আপনার দয়া ও অনুগ্রহে তাদের তাওবার তাওফিক দিতে পারেন।
আয়াত নং-৪১ رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ “হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিবেন।"
নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতার জন্য ও সকল ইমানদারের জন্য ইস্তিগফার করা। এই দু'আ হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম করেছেন। তবে তিনি পরবর্তীতে তাঁর পিতার জন্য ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দিয়েছেন।
📄 সূরা হিজর
সূরা হিজর-এর
৪৯ ও ৫০ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৪৯-৫০ نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ
"আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন যে, আমি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার আজাবই যন্ত্রণাদায়ক আজাব।"
এটা অনেক বড় সুসংবাদ যে, গুনাহগারদেরকেও নিজের বান্দা আখ্যা দিয়ে স্বীয় মাগফিরাত ও রহমতের সুসংবাদ দিয়েছেন। যেন তারা তাওবা করে বাস্তবেও আল্লাহ তা'আলার বান্দা হয়ে যায়।