📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 সূরা ইউনুস

📄 সূরা ইউনুস


সুরা ইউনুস-এর ৯০. ৯১. ৯৮ ও ১০৭ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৯০-৯১ وَجَاوَзْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْرًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ
“আর আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির'আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, আমি ইমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনি ইসরাইল ইমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানী করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”
ফির'আউন তার বাহিনী নিয়ে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমের পিছু ধাওয়া করল। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমকে আল্লাহ তা'আলা সমুদ্র পার করে দিলেন। কিন্তু ফির'আউন এবং তার বাহিনী যখন সমুদ্রের মাঝখানে পৌছল তখন পানি মিলে গেল এবং তারা সবাই ডুবে যেতে লাগল। ঐ সময় ফির'আউন জীবন বাঁচানোর জন্য ইমানের স্বীকারোক্তি দিল। তাকে বলা হয়েছে যে, গোটা জীবন নাফরমানী করে এখন আজাব দেখে তাওবা করে, ইমান আনছো? এমন তাওবা আর এমন ইমান গ্রহণযোগ্য নয়। রূহ বের হওয়ার সময় এবং আজাব দেখার পর যে ইমান আনা হয় সেই ইমান গ্রহণযোগ্য নয়।
আয়াত নং-৯৮ فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ
“সুতরাং কেন হল না এমন এক জনপদ, যে ইমান এনেছে এবং তার ইমান তার উপকারে এসেছে? তবে ইউনুসের কওম ছাড়া যখন তারা ইমান আনল, তখন আমি তাদের থেকে দুনিয়ার জীবনের লাঞ্ছনাকর আজাব সরিয়ে দিলাম এবং আমি তাদেরকে একটি সময় পর্যন্ত ভোগ করতে দিলাম।"
খোদায়ী আজাবের নিদর্শন প্রকাশ হওয়ার পর কোন কওমের এমন ইমান গ্রহণের অবকাশ হয়নি যা আজাবকে টলাতে পারে। তবে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের কওম আজাবের নিদর্শন দেখে খাঁটি অন্তরে ইমান গ্রহণ করে ফেলেছে। তাদের ইমানের কারণে তারা খোদায়ী আজাব থেকে বেঁচে গেছে।
আয়াত নং-১০৭ وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”
আল্লাহ তা'আলা যদি কাউকে কোন ক্ষতি করতে চান তাহলে তা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ টলাতে পারে না। আর আল্লাহ তা'আলা যার উপর তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কারও শক্তি নেই যে, তাকে বঞ্চিত করে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যার উপর ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ করেন এবং উক্ত বান্দার গুনাহসমূহও ক্ষমা করে দেন।

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 সূরা হুদ

📄 সূরা হুদ


সুরা হুদ-এর
৩. ১১. ৪১. ৪৭. ৫২. ৬১. ৭৫. ৮৮. ৯০. ও ১১২ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৩
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلُّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ
“আর তোমরা তাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর (ক্ষমা চাও)। তারপর তার কাছে তাওবা কর (ফিরে যাও), (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের আজাবের ভয় করছি।”
এই আয়াতে ইস্তিগফারের কয়েকটি উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে। যেমন: দুনিয়াতে নিরাপত্তা ও আত্মিক প্রশান্তির জীবন। আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ থেকে উপকৃত হওয়া। নেক আমল কবুল হওয়া এবং তার উপর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভ করা। নিশ্চয় তাওবা ও ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহ তা'আলার দান করা নি'আমতসমূহ এবং মর্যাদাসমূহের হেফাজত হয়ে থাকে।
আয়াত নং-১১
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَبِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرُ كَبِيرُ
“তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।"
আল্লাহ তা'আলার যে বান্দা কষ্ট ও বিপদের সময় সবর তথা ধৈর্যধারণ করে এবং শান্তি ও নিরাপত্তার এবং খুশি ও আনন্দের সময় শুকরিয়া আদায় ও নেক আমল করে, সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমতের পুরস্কার লাভ করে থাকে। কষ্টের সময় সবর তথা ধৈর্য এবং সুখের সময় নেক আমল হল মাগফিরাতের অন্যতম কারণ।
আয়াত নং-৪১
وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর সে বলল, তোমরা এতে আরোহণ কর। এর চলা ও থামা হবে আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
হজরত নূহ আলাইহিস সালাম তার সাথীদেরকে বললেন- আল্লাহ তা'আলার নামে নৌকায় আরোহণ কর। কোন চিন্তা করো না। এর চলা এবং থামা সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তাঁর নামের বরকতে হবে। ঢুবে যাওয়ার কোন ভয় নেই। আমার রব মুমিনদের অপরাধসমূহ ক্ষমাকারী এবং তাদের উপর অত্যন্ত দয়াশীল।
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
যে কোন নৌযানে আরোহণকালে বিসমিল্লাহ কিংবা এই আয়াত পড়া উচিত।
আয়াত নং-৪৭ قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
“সে বলল, হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।”
তুফানের সময় হজরত নূহ আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নিকট দরখাস্ত করলেন যে, সেও আমার পরিবারভুক্ত। আর আপনি আমার পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর ওয়াদা করেছেন। এর উপর নির্দেশ আসল যে, হে নূহ! সে আপনার পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যাকে আমি বাঁচানোর ওয়াদা করেছি। তার আমল খারাপ। (সে কুফর-শিরকে লিপ্ত)। সুতরাং আপনি তার ব্যাপারে দরখাস্ত করা উচিত নয়। তখন হজরত নূহ আলাইহিস সালাম কেঁপে উঠলেন এবং সাথে সাথে তাওবা করলেন। এটিও কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি কার্যকরী ইস্তিগফার-
رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
আয়াত নং-৫২ وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةٌ إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ
। “হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও
অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না।"
তাওবা-ইস্তিগফারের বরকতে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যাবে। অনাবৃষ্টিতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি হবে। আর্থিক ও শারীরিক, আত্মিক ও ইমানী শক্তি, ব্যক্তিগত ও বংশীয় শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
আয়াত নং-৬১ وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ تُجِيبُ
"আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী।"
হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম নিজ জাতিকে ইস্তিগফার এবং তাওবার দাওয়াত দিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে তাওবা ও ফিরে আসার জন্য ডাকলেন এবং সাথে সাথে এ কথাও বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত নিকটে এবং প্রতিটি কথা ভালোভাবেই শুনেন এবং সঠিক অন্তরে যে তাওবা-ইস্তিগফার করা হয় তা শুনে কবুল করেন।
আয়াত নং-৭৫
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَلِيمٌ أَوَّاهُ مُّنِيبٌ “নিশ্চয় ইবরাহিম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী।"
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তিনটি গুণ বর্ণনা করেছেন। যথা-
ক. হালিম তথা সহনশীল। অর্থাৎ মন্দ আচরণকারীদের থেকে দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণকারী নয়। কষ্টদাতাদের কষ্ট সহ্যকারী। নিজের অবাধ্যতাকারীদের প্রতি ক্ষমাকারী।
খ. আউয়্যাহ তথা আল্লাহ তা'আলার ভয়ে অধিক ভীত-সন্ত্রস্ত।
গ. মুনিব তথা তাওবাকারী। আল্লাহ তা'আলার দিকে অধিক প্রত্যাবর্তনকারী।
আয়াত নং-৮৮
قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أنيب “সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কি মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিজক দান করে থাকেন (তাহলে কি করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে বললেন যে, আমি তোমাদের সংশোধন চাই। আমার এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। আর এ কাজে আমার সফলতা মিলবে কিনা সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। আমি তাঁরই তাওফিকে দাওয়াত দেই। তাঁরই শক্তির উপর ভরসা রাখি এবং সকল বিষয়ে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। 'আনাবাত' বলা হয় আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করা ও তাওবা করাকে। দীনের দা'ঈদের জন্য এই গুণ এবং এই চিন্তা অত্যন্ত জরুরী। হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের এই বরকতময় বাক্য যা কুরআনুল কারিমে বর্ণনা করা হয়েছে। দীনদ্বার মুসলিম ও দীনের দা'ঈদের জন্য অনেক বড় দু'আ এবং তাওবার তাওফিকের ভাণ্ডার স্বরূপ।
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।
আয়াত নং-৯০
وَاسْتَغْfِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودُ
"আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমার রব পরম দয়ালু, অতীব ভালোবাসা পোষণকারী।"
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে তাওবা ও ইস্তিগফারের দাওয়াত দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা পরম দয়ালু এবং ওয়াদূদ তথা অতীব ভালোবাসা পোষণকারী। যত বড় এবং পুরাতন পাপীই হোক না কেন যখন খাঁটি অন্তরে তাঁর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি তাঁর নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন, বরং ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে নেন।
আয়াত নং-১১২ فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا ۚ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرُ
“সুতরাং যেভাবে তুমি নির্দেশিত হয়েছ সেভাবে তুমি ও তোমার সাথী যারা তাওবা করেছে, সকলে অবিচল থাক। আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা করছ নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।”
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ঐ সকল লোক যারা তাওবা করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বত অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার দীন, আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং আল্লাহ তা'আলার বিধানসমূহের উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা।

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 সূরা ইউসুফ

📄 সূরা ইউসুফ


সুরা ইউসুফ-এর ২৯. ৫৩. ৯২. ৯৭ ও ৯৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-২৯ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِبِينَ
"ইউসুফ, তুমি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাও, আর (হে নারী) তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর। নিশ্চয় তুমিই পাপীদের অন্তর্ভুক্ত।”
আযীযে মিশর তথা মিশরের বাদশাহ তার স্ত্রীকে বললেন যে, তুমিই অপরাধী। সুতরাং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাও।
وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ । তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর।
ক্ষমা চাওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাওয়া অথবা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিকট ক্ষমা চাওয়া।
আয়াত নং-৫৩
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“(হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন) আমি আমার নফসকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ মানুষের নফস সাধারণত মানুষকে মন্দের দিকেই প্ররোচিত করে থাকে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রহমত এবং সাহায্যই নফসকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। আমিও আমার যে পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করেছি এগুলো সবই আল্লাহ তা'আলার বিশেষ তাওফিক ও অনুগ্রহের ফলে।
إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
বাক্যটি দ্বারা ইশারা করেছেন যে, নফসে আম্মারা তথা অবাধ্য নফস যখন তাওবা করে নফসে লাওয়্যামাহ তথা আনুগত্যশীল নফসে পরিণত হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলা তখন তার পেছনের ভুল-ভ্রান্তি ও পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। বরং একটু একটু করে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে নফসে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত নফসের মর্যাদায় উন্নীত করেন।
আয়াত নং-৯২
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“সে বলল, আজ তোমাদের উপর কোন ভর্ৎসনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হল তখন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন।
■ আয়াত নং-৯৭ قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِبِينَ "তারা বলল, হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা তাদের সম্মানিত পিতার নিকট তাদের জন্য ইস্তিগফারের দরখাস্ত করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে আল্লাহ তা'আলার থেকে আমাদের গুনাহ ক্ষমা করান। আমাদের থেকে অনেক বড় গুনাহ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য হল- প্রথমে আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, অতঃপর পরিচ্ছন্ন মনে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আমাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করুন।
বুঝা গেল যে, নিজের থেকে বড় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা নিজের জন্য ইস্তিগফার করানো উচিত। তবে শর্ত হল-নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হতে হবে এবং নিজেও ইস্তিগফার করতে হবে।
■ আয়াত নং-৯৮ قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "সে বলল, অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার পুত্রদের সাথে ওয়াদা করলেন- আমি অচিরেই তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব। অর্থাৎ কবুলিয়াতের সময় ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- জুমার রাত অথবা তাহাজ্জুদের সময়। বুঝা গেল-এই সময়গুলোতে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য ইস্তিগফারের গুরুত্বারোপ করা উচিত।

📘 ইলা মাগফিরাহ > 📄 সূরা রা‘আদ

📄 সূরা রা‘আদ


সুরা রা'আদ-এর
৬. ২৭ ও ৩০ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
■ আয়াত নং-৬ وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالسَّيِّئَةِ قَبْلَ الْحَسَنَةِ وَقَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِمُ الْمَثَلَاتُ وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ
"আর তারা আপনার নিকট মঙ্গলের পরিবর্তে মন্দের জন্য তাড়াহুড়া করে, অথচ তাদের পূর্বে অনেক (অনুরূপ লোকদের) শাস্তি গত হয়েছে। আর নিশ্চয় তোমার রব মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল তাদের জুলুম সত্ত্বেও এবং নিশ্চয় তোমার রব কঠিন শাস্তিদাতা।"
এই কাফিররা রাগ ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বলে যে, আমরা ইমান আনব না। আমাদের উপর দ্রুত শাস্তি নিয়ে আসো। অথচ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উপর শাস্তির ঘটনা তাদের সম্মুখে বিদ্যমান। তথাপিও শাস্তি অবতীর্ণ করা কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা মানুষের গুনাহ ও অপরাধ ক্ষমাকারী। আল্লাহ তা'আলার ক্ষমার এই গুণটিই আজাবকে বাধা দিয়ে রেখেছে। তবে জুলুম-অত্যাচার ও পাপের ধারাবাহিকতা যখন সীমাতিরিক্ত বেড়ে যায় তখন কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কঠোর শাস্তিদাতাও বটে।
আয়াত নং-২৯ وَيَقُولُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْهِ آيَةٌ مِّن رَّبِّهِ قُلْ إِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَنْ أَنَابَ
"আর যারা কুফরী করেছে, তারা বলে, তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন কেন নাজিল হয় না? বল, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি তাঁর দিকে পথ দেখান।"
হিদায়াত সে-ই পায় যে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করে। হিদায়াত নৈকট্যশীলদের জন্য।
আয়াত নং-৩০ كَذَلِكَ أَرْسَلْنَاكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُو عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ
“এমনিভাবে আমি আপনাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির নিকট, যার পূর্বে অনেক জাতি গত হয়েছে, যেন আমি আপনার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করেছি, তা তাদের নিকট তিলাওয়াত করেন। অথচ তারা রহমানকে অস্বীকার করে। বলুন, তিনি আমার রব, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00