📘 ইলা মাগফিরাহ 📄 সূরাতুত-তাওবাহ

📄 সূরাতুত-তাওবাহ


সুরাতুত-তাওবাহ-এর ৩. ৫. ১১. ১৫. ২৭. ৪৩. ৬৬. ৭৪. ৮০. ৯১. ১০২. ১০৩. ১০৪. ১০৬. ১১২. ১১৩. ১১৪. ১১৭. ১১৮ ও ১২৬ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত নং-৩
وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ ۚ فَإِن تُبْتُمْ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ وَبَشِّرِ الَّذِينَ كَفَرُوا بِعَذَابٍ أَلِيم
“আর মহান হজের দিন (জিলহজের ১০ তারিখ কুরবানীর দিন) মানুষের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা, নিশ্চয় আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্ত এবং তাঁর রাসুলও। অতএব, যদি তোমরা তাওবা কর, তাহলে তা তোমাদের জন্য উত্তম। আর যদি তোমরা ফিরে যাও, তাহলে জেনে রাখ, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না। আর যারা কুফরী করেছে, তাদের তুমি যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দাও।”

আয়াত নং-৫
فَإِذَا انسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা করো এবং তাদেরকে পাকড়াও করো, তাদেরকে অবরোধ করো এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাকো। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর জাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

যখন নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হয়ে যায়, তখন চুক্তি ভঙ্গকারী মুশরিকদেরকে যেখানে পাও সেখানে হত্যা করো, গ্রেপ্তার করো ও ঘেরাও করো এবং তাদেরকে কঠিনভাবে আঘাত কর যেন তাদের কেউ বেঁচে না থাকে। কিন্তু তারা যদি তাওবা করে নেয় এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে যার বড় নিদর্শন হল সালাত আদায় করা এবং জাকাত প্রদান করা। তখন মুসলমানদের জন্য তাদের সাথে লড়াই করার এবং তাদেরকে হত্যা করার ও গ্রেপ্তার করার কোন অধিকার নেই।

আয়াত নং-১১
فَإِن تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
"অতএব যদি তারা তাওবা করে, সালাত আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে, তবে দীনের মধ্যে তারা তোমাদের ভাই। আর আমি আয়াতসমূহ যথাযথভাবে বর্ণনা করি এমন কওমের জন্য যারা জানে না।"

এমন প্রচণ্ড শত্রুতা, জুলুম ও অপরাধ করা সত্ত্বেও যদি এই মুশরিকরা তাদের কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে নেয়। আর সত্যিকার তাওবার নিদর্শন প্রকাশ করে তথা সালাত এবং জাকাতের যথাযথ গুরুত্বারোপ করে তাহলে তারা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্মানজনক অংশে পরিণত হবে। তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে ঐ সকল অধিকারও পাবে যা একজন পুরাতন মুসলমান পেয়ে থাকে।

আয়াত নং-১৫
وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
"আর তাদের অন্তরসমূহের ক্রোধ দূর করবেন এবং আল্লাহ যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।"

মুসলমান যখন আল্লাহর রাস্তায় কিতাল করে তখন এই বরকতময় আমলের অসংখ্য উপকারীতা প্রকাশ পায়। এই আয়াত ও তার পূর্বের আয়াতে ছয়টি উপকারিতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যার মধ্যে ষষ্ঠ উপকারিতা হল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর বরকতে অনেক কাফির এবং অপরাধী তাওবা অভিমুখী হয়ে থাকে এবং ইসলাম গ্রহণ করে চিরস্থায়ী ব্যর্থতা থেকে বেঁচে যায়। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে চান তার তাওবা কবুল করেন। অর্থাৎ মুসলমানদের জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর বরকতে অনেক কাফিরের সত্যিকারের তাওবার সুযোগ হয়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এমনটাই হয়েছে। অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে গোটা আরব খাঁটি অন্তরে ইসলামে প্রবেশ করেছে। জিহাদ কুফরের অহংকারকে চূর্ণ করে। তখন তাওবার পথ খোলে।

আয়াত নং-২৭
ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“এরপর আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা তাদের তাওবা কবুল করবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর বরকতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুসলমানদের উপর নুসরাত অবতীর্ণ হয়। সাকিনা নাজিল হয়। কাফিরদের শাস্তি হয়। এর দ্বারা কাফিররা তাওবা অভিমুখী হয় এবং তাদের মধ্য থেকে অনেকেরই সত্যিকারের তাওবা নসিব হয়।

আয়াত নং- ৪৩
عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنتَ لَهُمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
“আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন। তুমি তাদেরকে কেন অনুমতি দিলে, যতক্ষণ না তোমার কাছে স্পষ্ট হয় তারা যারা সত্য বলেছে এবং তুমি জেনে নাও মিথ্যাবাদীদেরকে।”

তাবুকের যুদ্ধের সময় মুনাফিকরা মিথ্যা উজর বর্ণনা করে মদিনায় থেকে যাওয়ার এবং জিহাদে না যাওয়ার অনুমতি চাইলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখেও না দেখে অনুমতি দিয়ে দিতেন। কেননা তারা সাথে গেলে মুসলমানদের ক্ষতিই হবে। এর উপর বলা হয়েছে যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি অনুমতি না দিতেন তাহলে ভাল ছিল। তাহলে তাদের নিফাক প্রকাশ হয়ে যেত। তারা তো কোন অবস্থাতেই যেত না। যখন ছুটি না পাওয়া সত্তেও তারা ঘরে বসে থাকত, তখন তাদের মিথ্যা প্রকাশ হয়ে যেত।

عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنتَ لَهُمْ
“আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন। তুমি তাদেরকে কেন অনুমতি দিলে।
আয়াতের এই বাক্য থেকে অনুমান করুন ক্ষমা এবং মাগফিরাত কত পছন্দনীয় এবং মহান নিয়ামত যে, তার প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধনের শুরুতেই ক্ষমার শব্দ দ্বারা অন্তরের আনন্দ দান করেছেন।

আয়াত নং-৬৬
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَن طَائِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
“তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ইমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আজাব দেব। কারণ তারা হচ্ছে অপরাধী।”

অর্থাৎ মিথ্যা বাহানায় কাজ হবে না। তোমাদের নিফাক এবং দীন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করার শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে। হ্যাঁ! তবে তোমাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে এবং নিফাক ছেড়ে সঠিক ইমানের উপর আসবে সে এখনো ক্ষমা পাবে।

আয়াত নং-৭৪
يَحْلِفُونَ بِاللهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ مِن فَضْلِهِ ۚ فَإِن يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَّهمْ وَإِن يَتَوَلَّوْا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِن وَلِي وَلَا نَصِيرٍ
“তারা আল্লাহর কসম করে যে, তারা বলেনি, অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর কুফরী করেছে। আর মনস্থ করেছে এমন কিছুর যা তারা পায়নি। আর তারা একমাত্র এ কারণেই দোষারোপ করেছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তাঁর স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এরপর যদি তারা তাওবা করে, তবে তা হবে তাদের জন্য উত্তম, আর যদি তারা বিমুখ হয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে বেদনাদায়ক আজাব দেবেন, আর তাদের জন্য জমিনে নেই কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী।"

মুনাফিকরা কুফরি কথাও বলেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শহিদ করার চেষ্টাও করেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগ্রহের কারণেই আজ এরা ভাল অবস্থায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিয়েছে। অতঃপর এ সকল অপরাধ সত্ত্বেও তারা যদি তাওবা করে নেয়, তাহলে এটাই তাদের জন্য উত্তম। আর না হয় দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছিত হবে এবং আল্লাহর আজাব থেকে তাদেরকে কেও বাঁচাতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, 'জুলাস' নামক এক ব্যক্তি এই আয়াত শুনে খাঁটি অন্তরে তাওবা করেছে এবং তার বাকি জীবন ইসলামের খিদমতে উৎসর্গ করে দিয়েছে।

আয়াত নং-৮০
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِن تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذُلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না কর। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে, আর আল্লাহ ফাসিক লোকদেরকে হিদায়াত দেন না।"

মুনাফিকদের জন্য নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতবারই ইস্তিগফার করুক, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তারা মাগফিরাত পাবে না। কেননা তারা তাদের কুফরের উপর অটল রয়েছে।

আয়াত নং-৯১
لَّيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ مَا عَلَى الْمُحْسِنِينَ مِن سَبِيلٍ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"কোন দোষ নেই দুর্বলদের উপর, অসুস্থদের উপর ও যারা দান করার মত কিছু পায় না তাদের উপর, যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হিতাকাঙ্ক্ষী হয়। সৎকর্মশীলদের উপর (অভিযোগের) কোন পথ নেই, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

যে ব্যক্তি বাস্তবেই দুর্বল, অসুস্থ, অক্ষম কিংবা দরিদ্র এবং এই বাস্তব সমস্যার কারণে জিহাদে যেতে পারছে না এবং বাড়িতে থেকে কোন প্রকার মন্দ আচরণ করে না যেমন: অপপ্রচার ও প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো কিংবা জিহাদে গমণকারীদের নিরুৎসাহিত করা। এমন লোকদের জন্য কোন গুনাহ নেই বরং ক্ষমা ও মাগফিরাত রয়েছে।

আয়াত নং-১০২
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর অন্য কিছু লোক তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে, সৎকর্মের সঙ্গে তারা অসৎকর্মের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"

একদিকে ঐ সকল মুনাফিকরা যারা তাদের অপরাধকে নিফাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এবং নিজেদের নিফাকের উপর কঠিনভাবে অটল থাকে। এমন লোকেরা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু অপর দিকে ঐ সকল মুসলমান যারা নেক আমলও করে আবার তাদের থেকে কিছু মন্দ কাজ এবং ভুল-ভ্রান্তিও হয়ে যায়। তবে তারা স্বীয় ভুল-ভ্রান্তির জন্য অনুতপ্ত হয় এবং তা স্বীকার করে। যেমন: ঐ সকল মুসলমান যারা নিফাকের কারণে নয় বরং অলসতার কারণেই তাবুকের যুদ্ধে যায়নি। পরে তাদের এই ভুলের জন্য অনুতপ্ত ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো নিজেকে মসজিদে নববীর খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেছে। তাদের অতীতে অনেক নেক আমলও ছিল। যেমন: পূর্বের সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এই আয়াতে এমন মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমার আশ্বাস দিয়েছেন।

এই আয়াতে ঐ মুসলমানদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সুসংবাদ যারা নেক আমল করে তবে তাদের থেকে কিছু গুনাহ ও ভুল-ভ্রান্তিও হয়ে যায়। কিন্তু তারা তাদের গুনাহকে বৈধ মনে করে না এবং উক্ত গুনাহের উপর অটলও থাকে না। বরং তাদের অন্তর এটা স্বীকার করে যে, আমার থেকে বাস্তবেই ভুল হয়ে গেছে। এর জন্য সে তাওবা-ইস্তিগফার করে এবং এর জন্য সদকা করে পবিত্রতা অর্জন করে।

আয়াত নং-১০৩
خُذْ مِنْ أَمْوالِهِمْ صَدَقَةً تُطهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَلٌّ لَّهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“তাদের সম্পদ থেকে সাদাকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর তাদের জন্য দু'আ কর, নিশ্চয় তোমার দু'আ তাদের জন্য প্রশান্তিকর। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"

সাদাকা মানুষকে গুনাহের ক্ষতি থেকে পাক-পবিত্র করে এবং ধন-সম্পদের মধ্যে বরকত বৃদ্ধি করে। আর ঐ যুগে তো সাদাকার সাথে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু'আও পাওয়া যেত। যার মধ্যে সাদাকা গ্রহণকারীদের জন্য অনেক সুখ ও প্রশান্তির ব্যাপার ছিল। বর্তমানেও মুসলমান নেতৃবৃন্দের উচিত সাদাকা গ্রহণকারী মুসলমানদের জন্য দু'আ করা।

তাওবার দ্বারা গুনাহ মাফ হয়ে যায়। অর্থাৎ এর উপর শাস্তি ও জবাবদিহিতা অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু সম্ভবত গুনাহের স্বভাবজাত প্রভাব ও ক্ষতি কিছুটা হলেও অবশিষ্ট থেকে যায়। যা সাধারণ নেক আমলের দ্বারা বিশেষভাবে সাদাকা করার মাধ্যমে বিদূরিত হয়।

আয়াত নং-১০৪
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
"তারা কি জানে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সাদাকা গ্রহণ করেন। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।"

ইমানদারদের জন্য সুসংবাদ, তাওবা ও সাদাকার গুরুত্বারোপ। কোন কোন লোকের তাওবা এবং সাদাকা কবুল না হওয়ার কারণ।

কত বড় অনুগ্রহ যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সাদাকাও কবুল করেন। পাক-পবিত্রতা ও আত্মশুদ্ধির এই উভয় দরজাই সর্বদা খোলা রেখেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা 'আত-তাওয়্যাব' তথা তাওবা কবুলকারী এবং 'আর-রাহিম' তথা পরম দয়ালু। দ্বিতীয় ইশারা হল তাওবা ও সাদাকা কবুল করা, এটা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন এবং তিনিই জানেন যে, কার তাওবা প্রকৃত তাওবা এবং কার সাদাকা একনিষ্ঠ। এজন্য মুনাফিকদের তাওবা ও তাদের সাদাকা গ্রহণযোগ্য নয়। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলাই তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

আয়াত নং-১০৬
وَآخَرُونَ مُرْجَوْنَ لِأَمْرِ اللَّهِ إِمَّا يُعَذِّبُهُمْ وَإِمَّا يَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
"আর আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় অপর কিছু লোকের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হল। তিনি তাদেরকে আজাব দেবেন নয়তো তাওবা কবুল করবেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"

তাবুকের যুদ্ধে না যাওয়া কিছু মুসলমান যারা তাদের অবস্থা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বর্ণনা করেছে। এরা ছিল মোট তিনজন। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের বিষয়টি আপাতত স্থগিত। যার ফলে এই ব্যক্তিদের সাথে মুসলমানগণ সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। দীর্ঘ পঞ্চাশ দিন পরে তাদের তাওবা কবুল হয়েছে।

আয়াত নং-১১২
القَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
“তারা তাওবাকারী, ইবাদাতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী, সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশদাতা, অসৎকাজের নিষেধকারী ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা হেফাজতকারী। আর মুমিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।”

ঐ সকল মুখলিস এবং মুজাহিদ ইমানদারগণ যাদের জীবন ও সম্পদ আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। আর তাদের জন্য অনেক বড় সফলতার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদের অনেক গুণের মধ্যে প্রথম গুণ হল তারা তাওবাকারী।

আয়াত নং-১১৩-১১৪
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَىٰ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَن مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ لِّلَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ
"নবি ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা তো ছিল একটি ওয়াদার কারণে, যে ওয়াদা সে তাকে দিয়েছিল। অতঃপর যখন তার নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নিশ্চয় সে আল্লাহর শত্রু, সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয় ইবরাহিম ছিল অধিক প্রার্থনাকারী ও সহনশীল।"

মুসলমানদের জন্য একদমই জায়েজ নেই যে, ঐ মুশরিকদের জন্য ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা যারা শিরকে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। চাই তারা তাদের অনেক নিকটাত্মীয়ই হোক না কেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়টি মূলত তিনি তাঁর পিতার সাথে এ বিষয়ে ওয়াদাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যায় যে, এটা আল্লাহ তা'আলার দুশমন তখন তার জন্য ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে দেন।

আয়াত নং-১১৭-১১৮
لقَد تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِن بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَن لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“অবশ্যই আল্লাহ নবি, মুহাজির ও আনসারদের তাওবা কবুল করলেন, যারা তার অনুসরণ করেছে সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে। তাদের মধ্যে এক দলের হৃদয় সত্যচ্যুত হওয়ার উপক্রম হবার পর। তারপর আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু। আর সে তিন জনের (তাওবা কবুল করলেন), যাদের বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়েছিল। এমনকি পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের নিকট তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। আর তারা নিশ্চিত বুজেছিল যে, আল্লাহর আজাব থেকে তিনি ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নেই। তারপর তিনি তাদের তাওবা কবুল করলেন, যাতে তারা তাওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।”

আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাওবার বৃষ্টি। তাওবা তথা বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ, বিশেষ তাওয়াজ্জুহ বা মনোযোগ।

তাবুকের যুদ্ধের সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ও তাঁর ঐ সকল সঙ্গী-সাথীদের উপর যারা এমন কঠিন মুহূর্তেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সঙ্গ দিয়েছেন। এটা আল্লাহ তা'আলার তাওবা তথা বিশেষ অনুগ্রহের ফসল ছিল যে, তারা এমতাবস্থায়ও দৃঢ়পদ ছিল।

অতঃপর ঐ তিন সাহাবীরও তাওবা কবুল হয়ে গেল যাদের বিষয়টি স্থগিত ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর তাওবা তথা বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। এই অনুগ্রহের ফলে তারা প্রকৃত তাওবা করেছে। আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবুলকারী। এই দুই আয়াতে তাওবা শব্দটি তার নিজস্ব জ্যোতি ও অর্থের সাথে সমুজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়ে এসেছে।

সম্মানীত পাঠকদেরকে এই দুই আয়াতে বর্ণিত তিন সাহাবীর তাওবার ঘটনাটি অন্য কোন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে পাঠ করে নেওয়ার অনুরোধ রইল।

আয়াত নং-১২৬
أَوَلَا يَرَوْনَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ
“তারা (মুনাফিকরা) কি দেখে না যে, তারা প্রতি বছর এক বার কিংবা দু'বার বিপদগ্রস্ত হয়? এরপরও তারা তাওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।"

পরীক্ষা তো এজন্য আসে যে, বান্দার অন্তর কোমল হবে এবং তাওবা ও নেক কাজের প্রতি মনোযোগী হবে। কিন্তু যাদের অন্তরে পুরোপুরিভাবে নিফাক বেঁকে বসেছে তাকে বার বার পরীক্ষা করা সত্ত্বেও তাওবার তাওফিক হয় না। এটা বড়ই দুর্ভাগ্যের কথা।

📘 ইলা মাগফিরাহ 📄 সূরা ইউনুস

📄 সূরা ইউনুস


সুরা ইউনুস-এর ৯০. ৯১. ৯৮ ও ১০৭ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৯০-৯১ وَجَاوَзْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْرًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ
“আর আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির'আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, আমি ইমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনি ইসরাইল ইমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানী করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”
ফির'আউন তার বাহিনী নিয়ে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমের পিছু ধাওয়া করল। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমকে আল্লাহ তা'আলা সমুদ্র পার করে দিলেন। কিন্তু ফির'আউন এবং তার বাহিনী যখন সমুদ্রের মাঝখানে পৌছল তখন পানি মিলে গেল এবং তারা সবাই ডুবে যেতে লাগল। ঐ সময় ফির'আউন জীবন বাঁচানোর জন্য ইমানের স্বীকারোক্তি দিল। তাকে বলা হয়েছে যে, গোটা জীবন নাফরমানী করে এখন আজাব দেখে তাওবা করে, ইমান আনছো? এমন তাওবা আর এমন ইমান গ্রহণযোগ্য নয়। রূহ বের হওয়ার সময় এবং আজাব দেখার পর যে ইমান আনা হয় সেই ইমান গ্রহণযোগ্য নয়।
আয়াত নং-৯৮ فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ
“সুতরাং কেন হল না এমন এক জনপদ, যে ইমান এনেছে এবং তার ইমান তার উপকারে এসেছে? তবে ইউনুসের কওম ছাড়া যখন তারা ইমান আনল, তখন আমি তাদের থেকে দুনিয়ার জীবনের লাঞ্ছনাকর আজাব সরিয়ে দিলাম এবং আমি তাদেরকে একটি সময় পর্যন্ত ভোগ করতে দিলাম।"
খোদায়ী আজাবের নিদর্শন প্রকাশ হওয়ার পর কোন কওমের এমন ইমান গ্রহণের অবকাশ হয়নি যা আজাবকে টলাতে পারে। তবে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের কওম আজাবের নিদর্শন দেখে খাঁটি অন্তরে ইমান গ্রহণ করে ফেলেছে। তাদের ইমানের কারণে তারা খোদায়ী আজাব থেকে বেঁচে গেছে।
আয়াত নং-১০৭ وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”
আল্লাহ তা'আলা যদি কাউকে কোন ক্ষতি করতে চান তাহলে তা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ টলাতে পারে না। আর আল্লাহ তা'আলা যার উপর তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কারও শক্তি নেই যে, তাকে বঞ্চিত করে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যার উপর ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ করেন এবং উক্ত বান্দার গুনাহসমূহও ক্ষমা করে দেন।

সুরা ইউনুস-এর ৯০. ৯১. ৯৮ ও ১০৭ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত নং-৯০-৯১
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْرًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ الْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ
“আর আমি বনি ইসরাইলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির'আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, আমি ইমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনি ইসরাইল ইমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানী করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”

ফির'আউন তার বাহিনী নিয়ে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমের পিছু ধাওয়া করল। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর কওমকে আল্লাহ তা'আলা সমুদ্র পার করে দিলেন। কিন্তু ফির'আউন এবং তার বাহিনী যখন সমুদ্রের মাঝখানে পৌছল তখন পানি মিলে গেল এবং তারা সবাই ডুবে যেতে লাগল। ঐ সময় ফির'আউন জীবন বাঁচানোর জন্য ইমানের স্বীকারোক্তি দিল। তাকে বলা হয়েছে যে, গোটা জীবন নাফরমানী করে এখন আজাব দেখে তাওবা করে, ইমান আনছো? এমন তাওবা আর এমন ইমান গ্রহণযোগ্য নয়। রূহ বের হওয়ার সময় এবং আজাব দেখার পর যে ইমান আনা হয় সেই ইমান গ্রহণযোগ্য নয়।

আয়াত নং-৯৮
فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ
“সুতরাং কেন হল না এমন এক জনপদ, যে ইমান এনেছে এবং তার ইমান তার উপকারে এসেছে? তবে ইউনুসের কওম ছাড়া যখন তারা ইমান আনল, তখন আমি তাদের থেকে দুনিয়ার জীবনের লাঞ্ছনাকর আজাব সরিয়ে দিলাম এবং আমি তাদেরকে একটি সময় পর্যন্ত ভোগ করতে দিলাম।"

খোদায়ী আজাবের নিদর্শন প্রকাশ হওয়ার পর কোন কওমের এমন ইমান গ্রহণের অবকাশ হয়নি যা আজাবকে টলাতে পারে। তবে হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামের কওম আজাবের নিদর্শন দেখে খাঁটি অন্তরে ইমান গ্রহণ করে ফেলেছে। তাদের ইমানের কারণে তারা খোদায়ী আজাব থেকে বেঁচে গেছে।

আয়াত নং-১০৭
وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عিবَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”

আল্লাহ তা'আলা যদি কাউকে কোন ক্ষতি করতে চান তাহলে তা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ টলাতে পারে না। আর আল্লাহ তা'আলা যার উপর তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ করতে চান তাহলে কারও শক্তি নেই যে, তাকে বঞ্চিত করে। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যার উপর ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহ করেন এবং উক্ত বান্দার গুনাহসমূহও ক্ষমা করে দেন।

📘 ইলা মাগফিরাহ 📄 সূরা হুদ

📄 সূরা হুদ


সুরা হুদ-এর
৩. ১১. ৪১. ৪৭. ৫২. ৬১. ৭৫. ৮৮. ৯০. ও ১১২ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৩
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلُّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ
“আর তোমরা তাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর (ক্ষমা চাও)। তারপর তার কাছে তাওবা কর (ফিরে যাও), (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের আজাবের ভয় করছি।”
এই আয়াতে ইস্তিগফারের কয়েকটি উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে। যেমন: দুনিয়াতে নিরাপত্তা ও আত্মিক প্রশান্তির জীবন। আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ থেকে উপকৃত হওয়া। নেক আমল কবুল হওয়া এবং তার উপর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভ করা। নিশ্চয় তাওবা ও ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহ তা'আলার দান করা নি'আমতসমূহ এবং মর্যাদাসমূহের হেফাজত হয়ে থাকে।
আয়াত নং-১১
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَبِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرُ كَبِيرُ
“তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।"
আল্লাহ তা'আলার যে বান্দা কষ্ট ও বিপদের সময় সবর তথা ধৈর্যধারণ করে এবং শান্তি ও নিরাপত্তার এবং খুশি ও আনন্দের সময় শুকরিয়া আদায় ও নেক আমল করে, সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমতের পুরস্কার লাভ করে থাকে। কষ্টের সময় সবর তথা ধৈর্য এবং সুখের সময় নেক আমল হল মাগফিরাতের অন্যতম কারণ।
আয়াত নং-৪১
وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর সে বলল, তোমরা এতে আরোহণ কর। এর চলা ও থামা হবে আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
হজরত নূহ আলাইহিস সালাম তার সাথীদেরকে বললেন- আল্লাহ তা'আলার নামে নৌকায় আরোহণ কর। কোন চিন্তা করো না। এর চলা এবং থামা সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তাঁর নামের বরকতে হবে। ঢুবে যাওয়ার কোন ভয় নেই। আমার রব মুমিনদের অপরাধসমূহ ক্ষমাকারী এবং তাদের উপর অত্যন্ত দয়াশীল।
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
যে কোন নৌযানে আরোহণকালে বিসমিল্লাহ কিংবা এই আয়াত পড়া উচিত।
আয়াত নং-৪৭ قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
“সে বলল, হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।”
তুফানের সময় হজরত নূহ আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নিকট দরখাস্ত করলেন যে, সেও আমার পরিবারভুক্ত। আর আপনি আমার পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর ওয়াদা করেছেন। এর উপর নির্দেশ আসল যে, হে নূহ! সে আপনার পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যাকে আমি বাঁচানোর ওয়াদা করেছি। তার আমল খারাপ। (সে কুফর-শিরকে লিপ্ত)। সুতরাং আপনি তার ব্যাপারে দরখাস্ত করা উচিত নয়। তখন হজরত নূহ আলাইহিস সালাম কেঁপে উঠলেন এবং সাথে সাথে তাওবা করলেন। এটিও কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি কার্যকরী ইস্তিগফার-
رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।
আয়াত নং-৫২ وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةٌ إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ
। “হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও
অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না।"
তাওবা-ইস্তিগফারের বরকতে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যাবে। অনাবৃষ্টিতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি হবে। আর্থিক ও শারীরিক, আত্মিক ও ইমানী শক্তি, ব্যক্তিগত ও বংশীয় শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
আয়াত নং-৬১ وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ تُجِيبُ
"আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী।"
হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম নিজ জাতিকে ইস্তিগফার এবং তাওবার দাওয়াত দিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে তাওবা ও ফিরে আসার জন্য ডাকলেন এবং সাথে সাথে এ কথাও বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত নিকটে এবং প্রতিটি কথা ভালোভাবেই শুনেন এবং সঠিক অন্তরে যে তাওবা-ইস্তিগফার করা হয় তা শুনে কবুল করেন।
আয়াত নং-৭৫
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَلِيمٌ أَوَّاهُ مُّنِيبٌ “নিশ্চয় ইবরাহিম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী।"
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তিনটি গুণ বর্ণনা করেছেন। যথা-
ক. হালিম তথা সহনশীল। অর্থাৎ মন্দ আচরণকারীদের থেকে দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণকারী নয়। কষ্টদাতাদের কষ্ট সহ্যকারী। নিজের অবাধ্যতাকারীদের প্রতি ক্ষমাকারী।
খ. আউয়্যাহ তথা আল্লাহ তা'আলার ভয়ে অধিক ভীত-সন্ত্রস্ত।
গ. মুনিব তথা তাওবাকারী। আল্লাহ তা'আলার দিকে অধিক প্রত্যাবর্তনকারী।
আয়াত নং-৮৮
قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أنيب “সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কি মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিজক দান করে থাকেন (তাহলে কি করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে বললেন যে, আমি তোমাদের সংশোধন চাই। আমার এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। আর এ কাজে আমার সফলতা মিলবে কিনা সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। আমি তাঁরই তাওফিকে দাওয়াত দেই। তাঁরই শক্তির উপর ভরসা রাখি এবং সকল বিষয়ে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। 'আনাবাত' বলা হয় আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করা ও তাওবা করাকে। দীনের দা'ঈদের জন্য এই গুণ এবং এই চিন্তা অত্যন্ত জরুরী। হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের এই বরকতময় বাক্য যা কুরআনুল কারিমে বর্ণনা করা হয়েছে। দীনদ্বার মুসলিম ও দীনের দা'ঈদের জন্য অনেক বড় দু'আ এবং তাওবার তাওফিকের ভাণ্ডার স্বরূপ।
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।
আয়াত নং-৯০
وَاسْتَغْfِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودُ
"আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমার রব পরম দয়ালু, অতীব ভালোবাসা পোষণকারী।"
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে তাওবা ও ইস্তিগফারের দাওয়াত দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা পরম দয়ালু এবং ওয়াদূদ তথা অতীব ভালোবাসা পোষণকারী। যত বড় এবং পুরাতন পাপীই হোক না কেন যখন খাঁটি অন্তরে তাঁর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি তাঁর নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন, বরং ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে নেন।
আয়াত নং-১১২ فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا ۚ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرُ
“সুতরাং যেভাবে তুমি নির্দেশিত হয়েছ সেভাবে তুমি ও তোমার সাথী যারা তাওবা করেছে, সকলে অবিচল থাক। আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা করছ নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।”
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ঐ সকল লোক যারা তাওবা করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বত অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার দীন, আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং আল্লাহ তা'আলার বিধানসমূহের উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা।

সুরা হুদ-এর ৩. ১১. ৪১. ৪৭. ৫২. ৬১. ৭৫. ৮৮. ৯০. ও ১১২ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত নং-৩
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُم مَّتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلُّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ
“আর তোমরা তাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর (ক্ষমা চাও)। তারপর তার কাছে তাওবা কর (ফিরে যাও), (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের আজাবের ভয় করছি।”

এই আয়াতে ইস্তিগফারের কয়েকটি উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে। যেমন: দুনিয়াতে নিরাপত্তা ও আত্মিক প্রশান্তির জীবন। আল্লাহ তা'আলার নি'আমতসমূহ থেকে উপকৃত হওয়া। নেক আমল কবুল হওয়া এবং তার উপর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভ করা। নিশ্চয় তাওবা ও ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহ তা'আলার দান করা নি'আমতসমূহ এবং মর্যাদাসমূহের হেফাজত হয়ে থাকে।

আয়াত নং-১১
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَبِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرُ كَبِيرُ
“তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।"

আল্লাহ তা'আলার যে বান্দা কষ্ট ও বিপদের সময় সবর তথা ধৈর্যধারণ করে এবং শান্তি ও নিরাপত্তার এবং খুশি ও আনন্দের সময় শুকরিয়া আদায় ও নেক আমল করে, সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমতের পুরস্কার লাভ করে থাকে। কষ্টের সময় সবর তথা ধৈর্য এবং সুখের সময় নেক আমল হল মাগফিরাতের অন্যতম কারণ।

আয়াত নং-৪১
وَقَالَ ارْكَبُوا فِيهَا بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর সে বলল, তোমরা এতে আরোহণ কর। এর চলা ও থামা হবে আল্লাহর নামে। নিশ্চয় আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

হজরত নূহ আলাইহিস সালাম তার সাথীদেরকে বললেন- আল্লাহ তা'আলার নামে নৌকায় আরোহণ কর। কোন চিন্তা করো না। এর চলা এবং থামা সবই আল্লাহ তা'আলার হুকুম এবং তাঁর নামের বরকতে হবে। ঢুবে যাওয়ার কোন ভয় নেই। আমার রব মুমিনদের অপরাধসমূহ ক্ষমাকারী এবং তাদের উপর অত্যন্ত দয়াশীল।
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِهَا وَمُرْسَاهَا ۚ إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
যে কোন নৌযানে আরোহণকালে বিসমিল্লাহ কিংবা এই আয়াত পড়া উচিত।

আয়াত নং-৪৭
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
“সে বলল, হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।”

তুফানের সময় হজরত নূহ আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার নিকট দরখাস্ত করলেন যে, সেও আমার পরিবারভুক্ত। আর আপনি আমার পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর ওয়াদা করেছেন। এর উপর নির্দেশ আসল যে, হে নূহ! সে আপনার পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যাকে আমি বাঁচানোর ওয়াদা করেছি। তার আমল খারাপ। (সে কুফর-শিরকে লিপ্ত)। সুতরাং আপনি তার ব্যাপারে দরখাস্ত করা উচিত নয়। তখন হজরত নূহ আলাইহিস সালাম কেঁপে উঠলেন এবং সাথে সাথে তাওবা করলেন। এটিও কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি কার্যকরী ইস্তিগফার-

رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ
হে আমার রব, যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই তা চাওয়া থেকে আমি অবশ্যই আপনার আশ্রয় চাই। আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

আয়াত নং-৫২
وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةٌ إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ
“হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না।"

তাওবা-ইস্তিগফারের বরকতে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যাবে। অনাবৃষ্টিতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি হবে। আর্থিক ও শারীরিক, আধ্যাত্মিক ও ইমানী শক্তি, ব্যক্তিগত ও বংশীয় শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

আয়াত নং-৬১
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا فَاسْتَغْفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ ۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُّجِيبٌ
"আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী।"

হজরত সালেহ আলাইহিস সালাম নিজ জাতিকে ইস্তিগফার এবং তাওবার দাওয়াত দিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে তাওবা ও ফিরে আসার জন্য ডাকলেন এবং সাথে সাথে এ কথাও বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত নিকটে এবং প্রতিটি কথা ভালোভাবেই শুনেন এবং সঠিক অন্তরে যে তাওবা-ইস্তিগফার করা হয় তা শুনে কবুল করেন।

আয়াত নং-৭৫
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُّنِيبٌ
“নিশ্চয় ইবরাহিম অত্যন্ত সহনশীল, অধিক অনুনয় বিনয়কারী, আল্লাহমুখী।"

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের তিনটি গুণ বর্ণনা করেছেন। যথা-
ক. হালিম তথা সহনশীল। অর্থাৎ মন্দ আচরণকারীদের থেকে দ্রুত প্রতিশোধ গ্রহণকারী নয়। কষ্টদাতাদের কষ্ট সহ্যকারী। নিজের অবাধ্যতাকারীদের প্রতি ক্ষমাকারী।
খ. আউয়্যাহ তথা আল্লাহ তা'আলার ভয়ে অধিক ভীত-সন্ত্রস্ত।
গ. মুনিব তথা তাওবাকারী। আল্লাহ তা'আলার দিকে অধিক প্রত্যাবর্তনকারী।

আয়াত নং-৮৮
قَالَ يَا قَوْمِ أَرَأَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِِّي وَرَزَقَنِي مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
“সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা কি মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিজক দান করে থাকেন (তাহলে কি করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।”

হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে বললেন যে, আমি তোমাদের সংশোধন চাই। আমার এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। আর এ কাজে আমার সফলতা মিলবে কিনা সবই আল্লাহ তা'আলার হাতে। আমি তাঁরই তাওফিকে দাওয়াত দেই। তাঁরই শক্তির উপর ভরসা রাখি এবং সকল বিষয়ে তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। 'আনাবাত' বলা হয় আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন করা ও তাওবা করাকে। দীনের দা'ঈদের জন্য এই গুণ এবং এই চিন্তা অত্যন্ত জরুরী। হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালামের এই বরকতময় বাক্য যা কুরআনুল কারিমে বর্ণনা করা হয়েছে। দীনদ্বার মুসলিম ও দীনের দা'ঈদের জন্য অনেক বড় দু'আ এবং তাওবার তাওফিকের ভাণ্ডার স্বরূপ।

وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তাওফিক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই।

আয়াত নং-৯০
وَاسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودٌ
"আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার কর অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমার রব পরম দয়ালু, অতীব ভালোবাসা পোষণকারী।"

হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম স্বীয় জাতিকে তাওবা ও ইস্তিগফারের দাওয়াত দিলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তা'আলা রাহিম তথা পরম দয়ালু এবং ওয়াদূদ তথা অতীব ভালোবাসা পোষণকারী। যত বড় এবং পুরাতন পাপীই হোক না কেন যখন খাঁটি অন্তরে তাঁর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি তাঁর নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন, বরং ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে নেন।

আয়াত নং-১১২
فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا ۚ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
“সুতরাং যেভাবে তুমি নির্দেশিত হয়েছ সেভাবে তুমি ও তোমার সাথী যারা তাওবা করেছে, সকলে অবিচল থাক। আর সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা করছ নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা।”

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ঐ সকল লোক যারা তাওবা করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বত অবলম্বন করেছে তারা আল্লাহ তা'আলার দীন, আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং আল্লাহ তা'আলার বিধানসমূহের উপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা।

📘 ইলা মাগফিরাহ 📄 সূরা ইউসুফ

📄 সূরা ইউসুফ


সুরা ইউসুফ-এর ২৯. ৫৩. ৯২. ৯৭ ও ৯৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-২৯ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِبِينَ
"ইউসুফ, তুমি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাও, আর (হে নারী) তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর। নিশ্চয় তুমিই পাপীদের অন্তর্ভুক্ত।”
আযীযে মিশর তথা মিশরের বাদশাহ তার স্ত্রীকে বললেন যে, তুমিই অপরাধী। সুতরাং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাও।
وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ । তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর।
ক্ষমা চাওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাওয়া অথবা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিকট ক্ষমা চাওয়া।
আয়াত নং-৫৩
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“(হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন) আমি আমার নফসকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অর্থাৎ মানুষের নফস সাধারণত মানুষকে মন্দের দিকেই প্ররোচিত করে থাকে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রহমত এবং সাহায্যই নফসকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। আমিও আমার যে পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করেছি এগুলো সবই আল্লাহ তা'আলার বিশেষ তাওফিক ও অনুগ্রহের ফলে।
إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
বাক্যটি দ্বারা ইশারা করেছেন যে, নফসে আম্মারা তথা অবাধ্য নফস যখন তাওবা করে নফসে লাওয়্যামাহ তথা আনুগত্যশীল নফসে পরিণত হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলা তখন তার পেছনের ভুল-ভ্রান্তি ও পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। বরং একটু একটু করে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে নফসে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত নফসের মর্যাদায় উন্নীত করেন।
আয়াত নং-৯২
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“সে বলল, আজ তোমাদের উপর কোন ভর্ৎসনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হল তখন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন।
■ আয়াত নং-৯৭ قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِبِينَ "তারা বলল, হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী।"
হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা তাদের সম্মানিত পিতার নিকট তাদের জন্য ইস্তিগফারের দরখাস্ত করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে আল্লাহ তা'আলার থেকে আমাদের গুনাহ ক্ষমা করান। আমাদের থেকে অনেক বড় গুনাহ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য হল- প্রথমে আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, অতঃপর পরিচ্ছন্ন মনে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আমাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করুন।
বুঝা গেল যে, নিজের থেকে বড় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা নিজের জন্য ইস্তিগফার করানো উচিত। তবে শর্ত হল-নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হতে হবে এবং নিজেও ইস্তিগফার করতে হবে।
■ আয়াত নং-৯৮ قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "সে বলল, অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার পুত্রদের সাথে ওয়াদা করলেন- আমি অচিরেই তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব। অর্থাৎ কবুলিয়াতের সময় ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- জুমার রাত অথবা তাহাজ্জুদের সময়। বুঝা গেল-এই সময়গুলোতে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য ইস্তিগফারের গুরুত্বারোপ করা উচিত।

সুরা ইউসুফ-এর ২৯. ৫৩. ৯২. ৯৭ ও ৯৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত নং-২৯
يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ
"ইউসুফ, তুমি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাও, আর (হে নারী) তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর। নিশ্চয় তুমিই পাপীদের অন্তর্ভুক্ত।”

আযীযে মিশর তথা মিশরের বাদশাহ তার স্ত্রীকে বললেন যে, তুমিই অপরাধী। সুতরাং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাও।

وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ । তুমি তোমার পাপের জন্য ইস্তিগফার কর।

ক্ষমা চাওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চাওয়া অথবা হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিকট ক্ষমা চাওয়া।

আয়াত নং-৫৩
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“(হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন) আমি আমার নফসকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"

অর্থাৎ মানুষের নফস সাধারণত মানুষকে মন্দের দিকেই প্ররোচিত করে থাকে। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার রহমত এবং সাহায্যই নফসকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। আমিও আমার যে পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করেছি এগুলো সবই আল্লাহ তা'আলার বিশেষ তাওফিক ও অনুগ্রহের ফলে।

إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

বাক্যটি দ্বারা ইশারা করেছেন যে, নফসে আম্মারা তথা অবাধ্য নফস যখন তাওবা করে নফসে লাওয়্যামাহ তথা আনুগত্যশীল নফসে পরিণত হয়ে যায়, আল্লাহ তা'আলা তখন তার পেছনের ভুল-ভ্রান্তি ও পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। বরং একটু একটু করে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে তাকে নফসে মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত নফসের মর্যাদায় উন্নীত করেন।

আয়াত নং-৯২
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
“সে বলল, আজ তোমাদের উপর কোন ভর্ৎসনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি দয়ালু।"

হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হল তখন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন।

আয়াত নং-৯৭
قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِئِينَ
"তারা বলল, হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের পাপ মোচনের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আমরা ছিলাম অপরাধী।"

হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা তাদের সম্মানিত পিতার নিকট তাদের জন্য ইস্তিগফারের দরখাস্ত করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করে আল্লাহ তা'আলার থেকে আমাদের গুনাহ ক্ষমা করান। আমাদের থেকে অনেক বড় গুনাহ হয়ে গেছে। উদ্দেশ্য হল- প্রথমে আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, অতঃপর পরিচ্ছন্ন মনে আল্লাহ তা'আলার দরবারে আমাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করুন।

বুঝা গেল যে, নিজের থেকে বড় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা নিজের জন্য ইস্তিগফার করানো উচিত। তবে শর্ত হল-নিজের গুনাহের উপর অনুতপ্ত হতে হবে এবং নিজেও ইস্তিগফার করতে হবে।

আয়াত নং-৯৮
قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"সে বলল, অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"

হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তার পুত্রদের সাথে ওয়াদা করলেন- আমি অচিরেই তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব। অর্থাৎ কবুলিয়াতের সময় ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করব। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- জুমার রাত অথবা তাহাজ্জুদের সময়। বুঝা গেল-এই সময়গুলোতে নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য ইস্তিগফারের গুরুত্বারোপ করা উচিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px