📄 সূরাতুল মায়িদা
সূরাতুল মায়িদা-এর ৩. ৯. ১২. ১৩. ১৫. ১৮. ৩৩. ৩৪. ৩৯. ৪০. ৪৫. ৬৫. ৭১. ৭৪. ৯৫. ৯৮. ১০১ ও ১১৮ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৩
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ذَلِكُمْ فِسْقُ الْيَوْمَ يَبِسَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ۚ فَمَنِ اضْطُرَّ فِي مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍ لِإِثْمٍ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে জবেহ করা হয়েছে; গলা টিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু, অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে-তবে যা তোমরা জবেহ করে নিয়েছ তাছাড়া, আর যা মূর্তি পূজার বেদিতে বলি দেওয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা বন্টন করা হয়, এগুলো গুনাহ। যারা কুফরী করেছে, আজ তারা তোমাদের দীনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নি'আমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। তবে যে তীব্র ক্ষুধায় বাধ্য হবে, কোন পাপের প্রতি ঝুঁকে নয় (তাকে ক্ষমা করা হবে), নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
এই আয়াতের শুরুতে হারাম বস্তুসমূহের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তবে শেষের দিকে এ অবকাশ দেওয়া হয়েছে- যে ব্যক্তি অক্ষম তথা ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে অসহায় ও নিরুপায় হয়ে গেছে। খাবারের জন্য কোন প্রকার হালাল বস্তু পাচ্ছে না। তাহলে এমতাবস্থায় যদি সে হারাম বস্তু খেয়ে বা পান করে জীবন বাঁচায়। শর্ত হল শুধুমাত্র প্রয়োজন তথা জীবনধারণ পরিমাণই ব্যবহার করবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করতে পারবে না এবং স্বাদ গ্রহণের উদ্দেশ্য হতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। অর্থাৎ ঐ বস্তু তো হারামই কিন্তু অক্ষমতার সময় তা খেয়ে ও পান করে জীবনধারণকারী আল্লাহ তা'আলার নিকট অপরাধী নয়। এটাও আল্লাহ তা'আলার মাগফিরাতের একটি শান।
আয়াত নং-৯
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ
"যারা ইমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"
অর্থাৎ শুধুমাত্র তাদের ঐ সকল অপরাধকেই ক্ষমা করবেন না যা তাদের মানবিক দুর্বলতার কারণে হয়ে থাকে। বরং তাদেরকে মহাপুরস্কার দ্বারাও পুরস্কৃত করবেন। ইমান ও নেক আমল মাগফিরাতের অন্যতম কারণ।
আয়াত নং-১২
وَلَقَدْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَى عَشَرَ نَقِيبًا وَقَالَ اللَّهُ إِنِّى مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ وَآمَنتُم بِرُسُلِى وَعَزَّرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَّأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ
“আর অবশ্যই আল্লাহ বনি ইসরাইলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম এবং আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসুলদের প্রতি ইমান আন, তাদেরকে সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে ঋণ দাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেব। আর অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। তোমাদের মধ্য থেকে এরপরও যে কুফরী করেছে, সে অবশ্যই সোজা পথ হারিয়েছে।”
সালাত কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, সকল নবি-রাসুলগণের প্রতি ইমান আনা, শত্রুর মোকাবিলায় নবি-রাসুলদেরকে জান-মাল দিয়ে সাহায্য করা এবং আল্লাহর রাস্তায় ইখলাসের সাথে নিজের হালাল মাল খরচ করা এগুলো সব মাগফিরাতের কারণ। বনি ইসরাইলের ১২ জন দলনেতা থেকে এই অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে।
আয়াত নং-১৩
فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَوَاضِعِهِ وَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ وَلَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلَى خَابِنَةٍ مِنْهُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاصْفَحْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
"সুতরাং তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে আমি তাদেরকে লা'নত দিয়েছি এবং তাদের অন্তরসমূহকে করেছি কঠোর। তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তার একটি অংশ তারা ভুলে গিয়েছে এবং তুমি তাদের থেকে খিয়ানত সম্পর্কে অবগত হতে থাকবে, তাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে যাও। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।"
ইহুদিরা আল্লাহ তা'আলার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। ফলে তাদের এই অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে তাদেরকে নিম্নের শাস্তিসমূহ প্রদান করা হয়েছে। যথা-
» লা'নত তথা আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া।
> কঠোর অন্তর তথা অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়া। কারো অন্তর শক্ত হয়ে গেলে সেই অন্তর আর তখন ভালো কথা ও কোন প্রকার নসিহত গ্রহণ করে না।
> আল্লাহ তা'আলার বাণীসমূহ বিকৃত করার রোগ।
> আল্লাহ তা'আলার বিধানসমূহ থেকে কোন কোন বিধানকে একেবারে ভুলে যাওয়া।
> খিয়ানতে অভ্যস্ত হওয়া।
তবে তাদের মধ্য থেকে যে সকল অল্প সংখ্যক লোক ইমান আনবে তারা এ সকল শাস্তি এবং রোগ থেকে নিরাপদ থাকবে। অভিশপ্ত ইহুদিদের যেহেতু অভ্যাস হল তারা সকল কাজে তর্ক করে এবং খিয়ানত করে থাকে তাই এখন তাদের প্রতিটি কথার জবাব দেওয়া ও তাদের প্রতিটি খিয়ানতের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি নয়। বরং উত্তম হল তাদের সাথে তর্কে না জড়িয়ে এড়িয়ে যাওয়ার পথ অবলম্বন করা। এই পদ্ধতির অনেক উপকারিতা রয়েছে।
**এমনিভাবে পরবর্তীতে যখন জিহাদ ও কিতালের বিধান নাযিল হয়ে গেল কিন্তু বর্তমানেও কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, উপরোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন জরুরি হয়ে পড়ে। কেননা তাদের সাথে সব বিষয়ে বিতর্ক করা স্বয়ং মুসলিমদের জন্যই ক্ষতিকর। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল তাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে তাদের সাথে ক্ষমার আচরণ করা এবং অতীতের কোন কথা বা কাজের জন্য তাদেরকে জবাবদেহি না করা এবং তিরস্কার না করা।
আয়াত নং-১৫
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُم مِّنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ
“হে কিতাবীগণ, তোমাদের নিকট আমার রাসুল এসেছে, কিতাব থেকে যা তোমরা গোপন করতে, তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট সে প্রকাশ করেছে এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।"
অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিস্টানরা আল্লাহ তা'আলার যে সকল বিধান গোপন করত আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরিফ এনে সেগুলোর মধ্য হতে অধিকাংশই প্রকাশ করে দিয়েছেন। তবে কোন কোন বিধান যা এখন আর প্রয়োজন নেই তা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছে অর্থ হল কোন কোন কথার জবাব দেওয়া জরুরি নয়। সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। দ্বিতীয় অর্থ হল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের সাথে ক্ষমা ও এড়িয়ে যাওয়ার অচরণ করবেন তোমাদেরকে খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। মোটকথা ক্ষমার বাক্যটিতে দা'ঈর দুটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। যথা-
ক. অপ্রয়োজনীয় কথা ও কাজ এড়িয়ে চলা।
খ. সাধারণত ক্ষমা ও অনুগ্রহের পথ অবলম্বন করা যতক্ষণ পর্যন্ত না কিতাল শুরু না হয়।
আয়াত নং-১৮
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ ۚ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ
"ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়জন। আপনি বলুন, তবে কেন তিনি তোমাদেরকে তোমাদের পাপের কারণে আজাব দেন? বরং তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত মানুষ, যাদেরকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা আজাব দেন। আর আসমানসমূহ ও জমিন এবং তাদের মধ্যবর্তী যা আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহর এবং তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন।"
আয়াত নং-৩৩-৩৪
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن قَبْلِ أَن تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا অَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আজাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাআজাব। তারা ছাড়া, যারা তাওবা করে তোমরা তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের পূর্বে; সুতরাং জেনে রাখ যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অর্থাৎ ঐ সকল কাফির যারা মুসলিমদের উপর আক্রমণ করে। আর ঐ সকল লোক যারা জমিনে বিশৃঙ্খলা ছড়ায়। এর ভেতরে সব ধরণের ফিতনাবাজ অন্তর্ভুক্ত। ইরতিদাদ তথা মুরতাদের ফিতনা, লুট-তরাজ, ডাকাতি, অন্যায় হত্যা ও ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ইত্যাদি। তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি। কিন্তু যদি গ্রেপ্তারের পূর্বেই কেউ সত্যিকারের তাওবা করে নেয় এবং অস্ত্র সমর্পণ করে তাহলে তার তাওবা গ্রহণীয়। তার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত।
আয়াত নং-৩৯
فَمَن تَابَ مِن بَعْدِ ظُلْمِهِ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوبُ عَلَيْهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"অতঃপর যে তার জুলুমের পর তাওবা করবে এবং নিজেকে সংশোধন করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
কোন পুরুষ কিংবা নারী যদি চুরি করে তাহলে তার শাস্তি হচ্ছে তার হাত কাটা। কিন্তু সে যদি প্রকৃত তাওবা করে নেয় অর্থাৎ নিজের এই কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, ভবিষ্যতে চুরি না করার দৃঢ় শপথ নেয় এবং চুরিকৃত মাল মালিকের নিকট ফেরত দিয়ে দেয়। আর যদি উক্ত মাল নষ্ট হয়ে যায় বা খরচ হয়ে যায় তাহলে তার ক্ষতিপূরণ দেয় অথবা মালিক থেকে মাফ করে নেয় তাহলে তার তাওবা আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণযোগ্য এবং সে আখিরাতে উক্ত অপরাধের কোন শাস্তি পাবে না।
আয়াত নং-৪০
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَيَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর জন্যই আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব, তিনি যাকে ইচ্ছা আজাব দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।"
আল্লাহ তা'আলাই প্রকৃত বাদশা এবং মালিক এবং তাঁরই এই ক্ষমতা যে, তিনি যাকে চান মাফ করে দেন এবং যাকে চান শান্তি দেন।
আয়াত নং-৪৫
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
"আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফায়সালা করবে না, তারাই জালিম।"
কিসাস তথা প্রতিশোধ নেওয়া বৈধ। কিন্তু কেউ যদি মাফ করে দেয় তাহলে স্বয়ং তার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি মাফ করে দিল সে গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে গেল। অপরকে মাফ করা, মাগফিরাত ও ক্ষমা পাওয়ার একটি কারণ।
আয়াত নং-৬৫
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْكِتَابِ آمَنُوا وَاتَّقُوا لَكَفَّরْنَا عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَأَدْخَلْنَاهُمْ جَنَّاتِ النَّعِيمِ
"আর যদি কিতাবীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমি তাদের থেকে পাপগুলো দূর করে দিতাম এবং অবশ্যই তাদেরকে আরামদায়ক জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাতাম।"
আহলে কিতাবগণ যদি নিজেদের এত অধিক পাপ সত্ত্বেও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ইমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে তাহলে তাদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত।
আয়াত নং-৭১
وَحَسِبُوا أَلَّا تَكُونَ فِتْنَةٌ فَعَمُوا وَصَمُّوا ثُمَّ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ثُمَّ عَمُوا وَصَمُّوا كَثِيرٌ مِّنْهُمْ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ
"আর তারা ভেবেছে যে, কোন বিপর্যয় হবে না। ফলে তারা অন্ধ ও বধির হয়ে গিয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেছেন। অতঃপর তাদের অনেকে অন্ধ ও বধির হয়ে গিয়েছে। আর তারা যা আমল করে আল্লাহ তার দ্রষ্টা।"
ইহুদিদের দুর্ভাগ্য যে, তাদের বড় বড় অপরাধের পরেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাওবার তাওফিক দিয়েছেন এবং তাওবা কবুল করেছেন কিন্তু তারপরও তারা অন্ধ হয়ে পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। কেননা তারা আল্লাহ তা'আলার শাস্তি সম্পর্কে উদাসীন নয়। আল্লাহ তা'আলা তাদের আমল দেখছেন এবং তাদেরকে উম্মতে মুহাম্মাদির হাতে শাস্তি দিচ্ছেন।
আয়াত নং-৭৪
أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“সুতরাং তারা কি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে না এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাইবে না? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
তিন ইলাহ মান্যকারী ত্রিত্ববাদের অনুসারী খ্রিস্টানরা পাক্কা কাফির। এরা যদি নিজেদের এই ভ্রান্ত আকিদা থেকে ফিরে না আসে তাহলে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে। তবে ইস্তিগফার এবং তাওবার দরজা তাদের জন্যও উন্মুক্ত। তাওবা ও ইস্তিগফার করো আর গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু রবের মাগফিরাত ও রহমতের উপযুক্ত হয়ে যাও।
আয়াত নং-৯৫
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُتَعَمِّدًا فَجَزَاءُ مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَوْ عَدْلُ ذَلِكَ صِيَامًا ليَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللَّهُ عَمَّا سَلَفَ وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللَّهُ مِنْهُ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتِقَامٍ
“হে মুমিনগণ, ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকারকে হত্যা করো না এবং যে তোমাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তা হত্যা করবে তার বিনিময় হল যা হত্যা করেছে, তার অনুরূপ গৃহপালিত পশু, যার ফায়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দু'জন ন্যায়পরায়ণ লোক- উক্ত গৃহপালিত পশুটি কুরবানীর জন্তু হিসেবে কা'বায় পৌঁছাতে হবে। অথবা মিসকিনকে খাবার দানের কাফফারা কিংবা সমসংখ্যক সিয়াম পালন, যাতে সে নিজ কর্মের শাস্তি আস্বাদন করে। যা গত হয়েছে তা আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। যে পুনরায় করবে আল্লাহ তার থেকে প্রতিশোধ নেবেন। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।”
ইহরাম অবস্থায় শিকার ধরা এবং মারা উভয়টিই হারাম। কেউ যদি শিকার ধরে তাহলে ছেড়ে দেবে। আর যদি কেউ শিকার মেরে ফেলে তাহলে তার শাস্তি হল সে নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞ ব্যক্তির দ্বারা উক্ত পশুর মূল্য নির্ধারণ করবে এবং উক্ত মূল্যের সমমূল্যের ছাগল, দুম্বা, গাভী, উট ইত্যাদি হারামের সীমায় নিয়ে জবাই করবে এবং নিজে উক্ত গোশত খাবে না। অথবা উক্ত মূল্যের খাদ্য-শস্য অভাবীদের মধ্যে এমনভাবে বণ্টন করবে যেন প্রত্যেক অভাবী এক সদকায়ে ফিতির পরিমাণ পায়। কিংবা অভাবীদের পরিমাণ রোজা রাখবে। এই বিধান অবতীর্ণের পূর্বে যে ব্যক্তি শিকার করেছে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা মাফ করে দিয়েছেন। আর ভবিষ্যতে যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে এমনটি করবে তাদের থেকে আল্লাহ তা'আলা প্রতিশোধ নেবেন।
আয়াত নং-৯৬
اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ وَأَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর আর নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
ভালো করে শুনে নাও, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কঠোর শাস্তি প্রদানকারী এবং নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। অর্থাৎ যদি জবরদস্তি করে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা কর তাহলে তিনি শাদিদুল ইকাব তথা কঠোর শাস্তি প্রদানকারী। আর ভুল-ভ্রান্তির কারণে ত্রুটি হয়ে যায় তাহলে তিনি গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
আয়াত নং-১০১
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَسْأَلُوا عَنْ أَشْيَاءَ إِن تُبْدَ لَكُمْ تَسُؤْكُمْ وَإِن تَسْأَلُوا عَنْهَا حِينَ يُنَزِّلُ الْقُرْآنُ تُبْدَ لَكُمْ عَفَا اللَّهُ عَنْهَا وَاللَّهُ غَفُورٌ حَلِيمٌ
“হে মুমিনগণ, তোমরা এমন বিষয়াবলী সম্পর্কে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে প্রকাশ করা হলে তা তোমাদেরকে পীড়া দেবে। আর কুরআন অবতরণ কালে যদি তোমরা সে সম্পর্কে প্রশ্ন কর তাহলে তা তোমাদের জন্য প্রকাশ করা হবে। আল্লাহ তা ক্ষমা করেছেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম সহনশীল।”
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অধিক প্রশ্ন করো না। অতীতে যা করেছো করেছো। তা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন ভবিষ্যতে যেন এমনটি আর না হয়।
আয়াত নং-১১৮
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"
আল্লাহ তা'আলা যদি কিয়ামতের দিন কোন অপরাধীকে শাস্তি দেন তাহলে এটা অবশ্যই ইনসাফ এবং হিকমত। আর যদি কাউকে মাফ করে দেন তাহলে এটা কোন দুর্বলতা কিংবা অক্ষমতার কারণে নয়।
📄 সূরাতুল আন‘আম
সূরাতুল আন'আম-এর ৫৪. ১২০. ১৪৫. ও ১৬৫ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৫৪
وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَىٰ نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“আর যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ইমান আনে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন তুমি বল, তোমাদের উপর সালাম। তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া, নিশ্চয় যে তোমাদের মধ্য থেকে না জেনে খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে এবং শুধরে নেয়, তবে তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
যে ব্যক্তি না জেনে খারাপ কাজ করে সে মূলত গুনাহের ভয়াবহ পরিণতি না জেনে না বুঝেই গুনাহ করে। গুনাহের ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে যদি পুরোপুরি ধারণা থাকত তাহলে কে আছে যে, এমন দুঃসাহস করে? মুমিনের উপর যখন একটি অস্থায়ী মূর্খতা ভর করে তখনই গুনাহ হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে ভাবে তখন সাথে সাথে তাওবা ও ইস্তিগফার করে নেয়।
আয়াত নং-১২০
وَذَرُوا ظَاهِرَ الْإِثْمِ وَبَاطِنَهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَكْسِبُونَ الْإِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوا يَقْتَرِفُونَ
"আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয় যারা পাপ অর্জন করে, তাদেরকে অচিরেই প্রতিদান দেওয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে।"
আয়াত নং-১৪৫
قُل لَّا أَজِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“বলুন, আমার নিকট যে ওহী পাঠানো হয়, তাতে আমি আহারকারীর উপর কোন হারাম পাই না, যা সে আহার করে। তবে যদি মৃত কিংবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শূকরের গোশত হয়-কারণ, নিশ্চয় তা অপবিত্র কিংবা এমন অবৈধ যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য জবেহ করা হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে তা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে, তাহলে নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
যে নিরুপায় হয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন পরিমাণ হারাম খায় তার জন্য আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
আয়াত নং-১৬৫
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَا بِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
“আর তিনি সে সত্তা, যিনি তোমাদেরকে জমিনের খলিফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের উপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা প্রদান করেছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। নিশ্চয় তোমার রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
📄 সূরাতুল আ’রাফ
সূরাতুল আ'রাফ-এর ২৩. ১৪৩. ১৪৯. ১৫১. ১৫৩. ১৫৫. ১৬১. ১৬২. ১৬৭. ১৬৯ ও ১৯৯ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-২৩
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّমْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“তারা বলল, হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদেরকে দয়া না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
এটি হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও মা হাওয়া আলাইহাস সালামের মাকবুল ইস্তিগফার। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নির্দেশিত জীবনের ওপর অত্যন্ত প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি ইস্তিগফার।
আয়াত নং-১৪৩
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكَّا وَخَرَّ مُوسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
“আর যখন আমার নির্ধারিত সময়ে মূসা এসে গেল এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন। সে বলল, হে আমার রব, আপনি আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কখনো দেখবে না। বরং তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও, অতঃপর তা যদি নিজ স্থানে স্থির থাকে তবে তুমি অচিরেই আমাকে দেখবে। অতঃপর যখন তার রব পাহাড়ের উপর নূর প্রকাশ করলেন তখন তা চূর্ণ করে দিল এবং মূসা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল। অতঃপর যখন তার হুঁশ আসল তখন সে বলল, আপনি পবিত্র মহান, আমি আপনার নিকট তাওবা করলাম এবং আমি মুমিনদের মধ্যে প্রথম।”
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করলেন যে, আমি নিজ চোখে আপনাকে দেখতে চাই। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- তুমি আমাকে দেখতে পারবে না। তবে তুমি পাহাড়ের দিকে তাকাও। যদি পাহাড় স্থির থাকে তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ের উপর তাজাল্লি দিলেন। পাহাড় তখন টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং হজরত মূসা আলাইহিস সালাম বেহুঁশ হয়ে গেলেন। যখন তার হুঁশ আসল তখন তিনি আল্লাহ তা'আলার তাসবিহাতের মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেলেন এবং শোকে বিহ্বল হয়ে সাক্ষাতের যে আবেদন করেছিলেন তার জন্য তাওবা করতে লাগলেন।
سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ
আমি আপনার নিকট তাওবা করলাম এবং আমি মুমিনদের মধ্যে প্রথম।
আয়াত নং-১৪৯
وَلَمَّا سُقِطَ فِي أَيْدِيهِمْ وَرَأَوْا أَنَّهُمْ قَدْ ضَلُّوا قَالُوا لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
"আর যখন তারা অনুতপ্ত হল এবং দেখল যে, তারা তো পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন তারা বলল, যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি রহম না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।"
বনী ইসরাইলের মধ্যে যে লোকেরা বাছুরকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল তারা যখন হজরত মূসা আলাইহিস সালাম ফিরে আসার পর অনুতপ্ত হল, তাদের অন্তর থেকে ভ্রান্তির জোশ ঠাণ্ডা হয়ে গেল এবং নিজেদের এত বড় গুনাহকে দেখে তাদের জান বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম তখন তারা এই ভাষায় ইস্তিগফার করেছিলেন-
لَئِن لَّমْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যদি আমাদের রব আমাদের প্রতি রহম না করেন এবং আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
আয়াত নং-১৫১
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
"সে বলল, হে আমার রব, ক্ষমা করুন আমাকে ও আমার ভাইকে এবং আপনার রহমতে আমাদের প্রবেশ করান। আর আপনিই রহমকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।"
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন তাওরাত নিয়ে স্বীয় কওমের নিকট ফিরে আসলেন তখন দেখতে পেলেন যে, তারা বাছুরের উপাসনায় লিপ্ত। তা দেখে হজরত মূসা আলাইহিস সালামের খুব রাগ হল। তখন তিনি তার ভাই হজরত হারুন আলাইহিস সালামের উপর রাগ করলেন। হজরত হারুন আলাইহিস সালাম নিজের আপত্তি পেশ করে বললেন যে, আমি এই কওমকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু তারাতো আমার কথা শুনেইনি। বরং উল্টো আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। এখন আপনি আমার সাথে কঠোর আচরণ করে তাদের নিকট আমাকে হাসির পাত্র বানাবেন না এবং আমাকে উক্ত জালিম ও অপরাধীদের মধ্যে গণ্য করবেন না। তার এই আপত্তি শুনে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম নিজের জন্য এবং তাদের জন্য ইস্তিগফার করলেন। এটি কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি কার্যকরী ইস্তিগফার-
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْখِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
হে আমার রব, ক্ষমা করুন আমাকে ও আমার ভাইকে এবং আপনার রহমতে আমাদের প্রবেশ করান। আর আপনিই রহমকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
আয়াত নং-১৫৩
وَالَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ ثُمَّ تَابُوا مِن بَعْدِهَا وَآمَنُوا إِنَّ رَبَّكَ مِن بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর যারা খারাপ কাজ করল, তারপর তাওবা করল এবং ইমান আনল, নিশ্চয় আপনার রব এরপরও ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
আয়াত নং-১৫৫
وَاخْتَارَ مُوسَى قَوْمَهُ سَبْعِينَ رَجُلًا لِّمِيقَاتِنَا فَلَمَّا أَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مِّن قَبْلُ وَإِيَّايَ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ السُّفَهَاءُ مِنَّا إِنْ هِيَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاءُ وَتَهْدِي مَن تَشَاءُ أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ
"আর মূসা নিজ কওম থেকে সত্তরজন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানের জন্য নির্বাচন করল। অতঃপর যখন ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল তখন সে বলল, হে আমার রব, আপনি চাইলে ইতঃপূর্বে এদের ধ্বংস করতে পারতেন এবং আমাকেও। আমাদের মধ্যে নির্বোধরা যা করেছে তার কারণে কি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? এটাতো আপনার পরীক্ষা ছাড়া কিছু না। এর মাধ্যমে যাকে চান আপনি পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল।”
বনী ইসরাইলের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের ভুলের কারণে অনেক বড় একটি পরীক্ষা এসেছে। উক্ত পরীক্ষার সময় হজরত মূসা আলাইহিস সালাম দু'আ করেছেন এবং নিজের জন্য ও নিজের কওমের জন্য ইস্তিগফার করেছেন। তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমত এসেছে।
এটিও কুরআনুল কারিমে বর্ণিত একটি কার্যকরী ইস্তিগফার-
أَنتَ وَلِيُّنَا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الْغَافِرِينَ
আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল।
কী ছিল সেই পরীক্ষা?
হজরত মূসা আলাইহিস সালাম তার নিজ কওমের সত্তরজন বিশেষ ব্যক্তিকে তুর পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা আল্লাহ তা'আলার কালাম তথা কথাবার্তা শুনলেন। কিন্তু তারা বলতে লাগলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আল্লাহ তা'আলাকে স্বচক্ষে না দেখব ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস করব না। তখন তাদের উপর প্রচণ্ড ভূমিকম্প আসলো এবং বিজলি চমকানো শুরু হল। তারা সব ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে মারা গেল। হজরত মূসা আলাইহিস সালাম অনেক পেরেশান হয়ে গেলেন। কারণ তার কওম মনে করবে তাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে আমিই মেরে ফেলেছি। এর ফলে হজরত মূসা আলাইহিস সালাম দু'আ করলেন এবং ইস্তিগফার করলেন। তখন তাদের সকলকে দ্বিতীয় বার জীবন দান করা হল। বুঝা গেল যে, সম্মিলিত সমস্যার সমাধানও আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগ এবং ইস্তিগফার।
আয়াত নং-১৬১-১৬২
وَإِذْ قِيلَ لَهُمُ اسْكُنُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ وَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ وَقُولُوا حطَّةُ وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا نَّغْفِرْ لَكُمْ خَطِيئَاتِكُمْ سَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ فَبَدَّلَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ قَوْلًا غَيْرَ الَّذِي قِيلَ لَهُمْ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِجْرًا مِّنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَظْلِمُونَ
"আর স্মরণ করুন, যখন তাদেরকে বলা হল, তোমরা এ জনপদে (বাইতুল মুকাদ্দাস অঞ্চলে) বসবাস কর এবং বল আমাদের ক্ষমা করুন। আর অবনত মস্তকে দরজায় প্রবেশ কর। আমি তোমাদের অপরাধগুলো ক্ষমা করে দেব। অবশ্যই আমি সৎকর্মশীলদের বাড়িয়ে দেব। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে যারা জুলুম করেছিল, তাদেরকে যা বলা হয়েছিল তার পরিবর্তে তারা অন্য কথা বলল। ফলে আমি আসমান থেকে তাদের উপর শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা জুলুম করত।”
বনি ইসরাইলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, বিজিত শহরে প্রবেশ করার সময় ইস্তিগফার করে প্রবেশ করতে। তাহলে এর বরকতে গুনাহ মাফ হবে এবং আরও অধিক বিজয় মিলবে। কিন্তু তারা এই নির্দেশ অমান্য করেছে। তখন আসমান থেকে তাদের উপর আজাব নাজিল হয়েছে।
আয়াত নং-১৬৭
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكَ لَيَبْعَثَنَّ عَلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَن يَسُومُهُمْ سُوءَ الْعَذَابِ إِنَّ رَبَّكَ لَسَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
"আর যখন তোমার রব ঘোষণা দিলেন, অবশ্যই তিনি তাদের উপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এমন লোকদেরকে পাঠাবেন, যারা তাদেরকে আস্বাদন করাবে নিকৃষ্ট আজাব। নিশ্চয় তোমার রব আজাব প্রদানে খুব দ্রুত এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
ইহুদিদেরকে বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ তা'আলা "সারীউল ইকাব” তথা দ্রুত শাস্তিদানকারী। তোমরা যদি অবাধ্যতায় লিপ্ত থাক তাহলে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত তোমাদের উপর এমন ব্যক্তিকে চাপিয়ে দিতে থাকবেন। যে তোমাদেরকে কঠোর শাস্তি দেবেন। আর আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তোমরা যখনই অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসবে তখনই তোমাদের মাগফিরাত এবং রহমত নসিব হবে। যে যত বড় অপরাধীই হোক না কেন যখন অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করবে তখনই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং রহমত আসতে একটুও বিলম্ব হবে না।
আয়াত নং-১৬৯
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِن يَأْتِهِمْ عَرَضُ مَّثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِم مِّيثَاقُ الْكِتَابِ أَن لَّا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
"অতঃপর তাদের পরে স্থলাভিষিক্ত হয়েছে এমন বংশধর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে, তারা এ নগণ্য (দুনিয়ার) সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, শীঘ্রই আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। বস্তুত যদি তার অনুরূপ সামগ্রী (আবারও) তাদের নিকট আসে তবে তারা তা গ্রহণ করবে। তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ব্যাপারে সত্য ছাড়া বলবে না? আর তারা এতে যা পাঠ করেছে এবং আখিরাতের আবাস তাদের জন্য উত্তম, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। তোমরা কি বুঝ না?"
এই আয়াতে ঐ সকল অপদার্থের বর্ণনা করা হয়েছে, যারা অপরাধ থেকে ফিরে আসে না। তাওবা-ইস্তিগফার করে না। কিন্তু তথাপিও বিশ্বাস করে যে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। এমন লোকদের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত মাগফিরাত নেই যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার তাওবা না করবে।
আয়াত নং-১৯৯
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
“আপনি ক্ষমা প্রদর্শন করুন এবং ভালো কাজের আদেশ দিন। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাকুন।”
অর্থাৎ ক্ষমা ও অনুগ্রহের অভ্যাস করুন। কঠোরতা এবং নিষ্ঠুরতা থেকে বেঁচে থাকুন। মানুষের জন্য সহজ করুন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
يَسِرُّوا وَلَا تُعَسَّرُوا । মানুষের উপর সহজ কর কঠিন করো না।
হজরত জিবরীল আলাইহিস সালাম ইরশাদ করেন- وَاعْفُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ । যে আপনার উপর জুলুম করেছে আপনি তাকে ক্ষমা করুন।
কোন কোন সালাফ বলেছেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে "মাকারিমে আখলাক তথা উত্তম চরিত্র" শিক্ষা দিয়েছেন এবং কুরআনুল কারিমে মাকারিমে আখলাক তথা উত্তম চরিত্রের উপর এরচেয়ে অধিক ব্যাপক আয়াত আর কোনটাই নেই। ক. ক্ষমা, অনুগ্রহ ও সহজ করার অভ্যাস করা। খ. ভালো কাজের আদেশ এবং দাওয়াত। আর ভালো কাজ হল সে সকল কাজ যেগুলোকে শরীয়াত গ্রহণ করে এবং বিবেক পছন্দ করে। গ. মূর্খ লোকদের থেকে দূরে থাকা। অর্থাৎ তাদের মূর্খতার জবাব মূর্খতা দিয়ে না দেওয়া। তাদের সাথে তর্ক না করা এবং তাদের সাথে চলাফেরায় ধৈর্য্য অবলম্বন করা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-
صِلْ مَنْ قَطَّعَكَ وَاعْطِ مَنْ حَرَمَكَ وَاعْفُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ
ঐ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন কর যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাকে দান কর যে তোমাকে বঞ্চিত করে এবং তাকে মাফ কর যে তোমার উপর জুলুম করে।
টিকাঃ
[১]. সহিহ বুখারী: হাদিস নং- ৬৯; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং- ১৭৩৪; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং-১২৩৩৩
[২]. মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং- ১৭৩৩৪
📄 সূরাতুল আনফাল
সুরাতুল আনফাল-এর ৪. ২৯. ৩৩. ৩৮. ৬৯. ৭০ ও ৭৪ নং আয়াতে তাওবা, ইস্তিগফার ও মাগফিরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
আয়াত নং-৪
أُولَبِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُمْ دَرَجَاتٌ عِندَ رَبِّهِمْ وَمَغْفিরাَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
"তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট উচ্চ মর্যাদাসমূহ এবং ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজক।"
গনিমতের মাল নিয়ে ঝগড়া করো না। আর এমন পাক্কা মুমিন হও যে সকল কর্মকাণ্ডে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করবে। পরস্পরে সৎ ও কল্যাণকামিতার সাথে চলাফেরা করবে। সামান্য বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করো না। নিজের আগ্রহ ও নিজের মতামতের উপর নয় বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের উপর চলবে। আল্লাহ তা'আলার আয়াত ও বিধান শুনে তাঁর ইমান ও ইয়াকিন মজবুত হবে। নামাজের পরিপূর্ণ পাবন্দী করবে। সকল কাজে আল্লাহ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল এবং ভরসা করবে। তাঁর নামেই ধন-সম্পদ খরচ করবে। এমন ইমানদারদের জন্য অনেক বড় মর্যাদা, মাগফিরাত ও সম্মানজনক রিজিকের ওয়াদা।
আয়াত নং-২৯
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّরْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ
“হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফায়সালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ দূর করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।"
ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততির জন্যে আল্লাহ তা'আলার বিধান লঙ্ঘন করো না। যে সম্পদ ও সন্তানের উপর আল্লাহ তা'আলার বিধানকে প্রাধান্য দিয়ে তাকওয়া অবলম্বন করবে তাকে আল্লাহ তা'আলা বিচারিক ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং ক্ষমা ও মাগফিরাত দান করবেন।
আয়াত নং-৩৩
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
"আর আল্লাহ এমন নন যে, তাদেরকে আজাব দেবেন এ অবস্থায় যে, তুমি তাদের মাঝে বিদ্যমান এবং আল্লাহ তাদেরকে আজাব দানকারী নন এমতাবস্থায় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে।"
মক্কাবাসীরা বলত যে, হে আল্লাহ! দীন ইসলাম যদি সত্যিই হয় তাহলে আমাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করুন অথবা আমাদেরকে ভয়াবহ আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দিন। এর জবাবে বলা হয়েছে যে, আজাবের জন্য দুটি বস্তু প্রতিবন্ধক। এক হল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র উপস্থিতি। আর দ্বিতীয় হল কিছু লোকের ইস্তিগফার। মক্কাবাসীরা তাওয়াফের মধ্যে গুফরানাকা গুফরানাকা তথা আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন বলত। অথবা মক্কায় যে সকল দুর্বল মুসলমান বিদ্যমান ছিল তারা ইস্তিগফার করতেন। গুনাহগার যখন যখন অনুতপ্ত হয় তখন তাদেরকে পাকড়াও করা হয় না। যদিও অনেক বড় বড় পাপই হোক না কেন।
আয়াত নং-৩৮
قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوا إِن يَنتَهُوا يُغْفَرْ لَهُم مَّا قَدْ سَلَفَ وَإِن يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّتُ الْأَوَّلِينَ
“যারা কুফরী করেছে আপনি তাদেরকে বলুন, যদি তারা বিরত হয় তাহলে অতীতে যা হয়েছে তাদেরকে তা ক্ষমা করা হবে। আর যদি তারা পুনরায় করে তাহলে পূর্ববর্তীদের (ব্যাপারে আল্লাহর) রীতি তো গত হয়েছে।”
অর্থাৎ কাফিররা যদি ইসলামের শত্রুতা ও কুফরী থেকে ফিরে আসে তাহলে তাদের পেছনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
আয়াত নং-৬৯
فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَالًا طَيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“অতএব তোমরা যে গনিমত পেয়েছ, তা থেকে হালাল পবিত্র হিসেবে খাও, আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদেরকে সতর্ক করা হয়েছে যে, গনিমতের মাল নিয়ে ঝগড়া করা উচিত নয় এবং বদরের বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে না দেওয়া উচিত নয়। এজন্য মুসলমানরা অনেক ভয় পেয়েছে যে, এখন আমরা গনিমতের মালের মধ্যে এবং মুক্তিপণের মালের মধ্যে হাত লাগাতে পারব না। তখন ইরশাদ হয়েছে যে, যা হালাল ও পবিত্র (গনিমতের মাল ও মুক্তিপণের মাল) তোমরা পেয়েছ তা খাও এবং আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর। তোমাদের নিয়ত যেহেতু ভাল ছিল তাই আল্লাহ তা'আলা গাফুরুর রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তোমাদের ঐ সকল ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
আয়াত নং-৭০
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّمَن فِي أَيْدِيكُم مِّنَ الْأَسْرَى إِن يَعْلَمُ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّا أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“হে নবি, তোমাদের হাতে যে সব যুদ্ধবন্দি আছে, তাদেরকে বলে দাও, যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহকে কোন কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দি হওয়া ব্যক্তিদের জন্য ঘোষণা- তোমাদের অন্তরে যদি বাস্তবেই ইমান এবং কোন কল্যাণ থাকে তাহলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মুক্তিপণ হিসেবে প্রদত্ত সম্পদের চেয়ে অধিক সম্পদ এবং তাঁর মাগফিরাত দান করবেন।
কোন কোন বন্দি বলেছিল যে, আমাদেরকে কুরাইশের কাফেলায় বাধ্য করে নিয়ে আসা হয়েছে। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার নিয়ত আমাদের ছিল না। অথবা আমরা তো পূর্ব থেকেই মুসলমান ছিলাম। তাদেরকে বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি বাস্তবেই মুসলমান হয়ে থাক কিংবা মুসলমান হয়ে যাবে তাহলে দুনিয়াতে সম্পদও মিলবে এবং মাগফিরাত ও রহমতও মিলবে। (মাগফিরাতের শর্ত হল ইমান)।
আয়াত নং-৭৪
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوا وَنَصَرُوا أُولئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
“আর যারা ইমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজক।”
ইমান, হিজরত, জিহাদ ও মুহাজিরদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এ সবই মাগফিরাতের কারণ।
লَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
| তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজক।