📄 সম্পাদকীয়
রহমান রহিম আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি। "মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে তাহার দৃষ্টান্ত: উহাতে আছে নির্মল পানির নহর, আছে দুধের নহর যাহার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহর এবং সেখানে উহাদের জন্য থাকিবে বিবিধ ফলমূল আর তাহাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে ক্ষমা-মাগফিরাত।” [আল কুরআন : ৪৭/১৫] “কেহই জানেনা তাহাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কী লুক্কায়িত রাখা হইয়াছে তাহাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ।” [আল কুরআন: ৩২/১৭] "আমার সালেহিন বান্দাদের জন্য আমি তৈরি করেছি: যা কোন চোখ দেখেনি। কোন কান শুনেনি। কোন মানবহৃদয় কল্পনাও করেনি।" [হাদিসে কুদসী, হজরত আবু হোরায়রা রাদি.। বোখারী: ৪৯৭৯, মুসলিম: ২৮২৪]
জান্নাতের বর্ণনাসংক্রান্ত আয়াতের তাফসিরে লব্ধ: দুনিয়াতে বিদ্যমান বস্তুনিচয়ের প্রতীক শব্দ দ্বারা জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে কেবল মানবীয় বোধশক্তি কল্পনাকরণের স্বার্থে। প্রকৃতার্থে জান্নাতী কোন নেয়ামতই জাগতিক বস্তুর সাদৃশ্য নয়। ৩২/১৭ আয়াত ও উদ্ধৃত হাদিসে তাই ভাস্বর। বলা যায়, জান্নাতী নেয়ামতের স্থান শুধুই জান্নাত এ জগতে জান্নাতের কোন নেয়ামত লাভ করা যায় না। ৪৭/১৫ আয়াতে বর্ণিত জান্নাতী নেয়ামতপঞ্চের পঞ্চমটি মাগফিরাত। মাগফিরাত উভয় জাগতিক নেয়ামত। অন্য শব্দে মাগফিরাতই একমাত্র জান্নাতী নেয়ামত; যা দুনিয়াতেও দান করা হয়। "ইলা মাগফিরাহ” নামটিকে ব্যাখ্যা করে বললে বলতে হয়, “সর্বাগ্রেপ্রাপ্ত জান্নাতী নেয়ামতের আহ্বান"।
মাগফিরাত মারেফাতের সূচনা। মারেফাতে এলাহী-আল্লাহ তা'আলার পরিচয় সদাবর্ধনশীল (মাআজাল্লাহ, সংকোচনশীলও) একটি আত্মিক গুণ। স্পর্শকাতর। স্পর্শকাতরতার গভীরতা অনুধাবনে মানব-কল্পনা অক্ষম। এ পথে প্রধান বিপত্তি গোনাহ। অথচ ইনসান তো নিসইয়ান থেকেই [১]। যেমনটি হজরত আনাস বিন মালিক রাদি.-এর রেওয়ায়েত: "আদম সন্তান সকলেই ভুল করে। ..." [তিরমিজি: ২৪৯৯, ইবনে মাজাহ: ৪২৫১]। এই ভুল, এই গোনাহ হতে মুক্তিসনদের নাম মাগফিরাত। যে সনদ ব্যতীত মারেফাতের জগতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে সনদ ব্যতীত ওলাইয়াত-আল্লাহ তা'আলার সাথে বন্ধুত্বের জগতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। অতএব "ইলা মাগফিরাহ” নামটিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে বললে বলতে হয়, "মাওলা পাকের সাথে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে তোলার আহ্বান"।
কোন মুমিন যখন আল্লাহ তা'আলার পরিচয় পেতে শুরু করে, তার সবচেয়ে বড় চাওয়া-নিত্য তামান্না এই মাগফিরাত। মাগফিরাত চাওয়া ক্রিয়াটির নাম 'ইস্তিগফার'। ইস্তিগফার করার প্রতিদান মাগফিরাত। ইস্তিগফার করার পূর্বশর্ত মারেফাত। আল্লাহ তা'আলার মারেফাত ব্যতীত ইস্তিগফার করা অসম্ভব। যাকে যতটুকু মারেফাত দান করা হয় সে ততটুকু ইস্তিগফার করতে সক্ষম হয়। ইস্তিগফার করার প্রথম অংশ লজ্জা। কাউকে না চিনলে, কারো মারেফাত-পরিচয় না থাকলে তার নিকট লজ্জিত-অনুতপ্ত হওয়ার দাবি হাস্যকর। 'মারেফাত ও ইস্তিগফার করা' একটি অপরটি বাদে অর্জন হয় না; তাহলে উপায়? উপায় হল, 'ইস্তিগফার পড়তে' থাকা। ইস্তিগফার পড়তে পড়তে কোন এক শুভ মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা ইস্তিগফার করার তাওফিক দান করে থাকেন। ইস্তিগফার 'করা ও পড়া'র পার্থক্য জ্ঞান; বরং ধারণাও না থাকা ইস্তিগফারের পথে আজ আমাদের বড় বাধা। ইস্তিগফার 'পড়া'টি কোন আহলুল্লাহ-আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের তত্ত্বাবধানে হলে তুলনামূলক দ্রুত ও সহজে 'করা'র পথ সুগম হয়।
কিতাবটিকে মাগফিরাহ সংক্রান্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যেতে পারে; সম্পাদনা কালে অধমের নিকট বিপরীত একটি সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে। আর তা হল- তথ্য সংগ্রহের মানসিকতায় পাঠের চেয়ে 'অজিফা' জ্ঞান করে শব্দের দেয়াল টপকে মর্মজগতে উঁকি দিতে পারলেই 'সংকলন-সফলতা' অর্জিত হবে। অন্যথা নিছক ছাপার অক্ষরে কিছু কথা পাঠ করলে কোথাও কোথাও পাঠক হয়ত বিরক্ত হবেন। ২। কোন পাঠককে আঘাত করা যদি সম্পাদনা-পেশাদারিত্বে অপরাধ না হত, 'পাঠান্তে বারবার পাঠের তাগিদ অনুভব না করলে—জেনে নিন, আপনি শব্দের দেয়াল টপকাতে পারেননি'। কথাটুকু না বলার ভদ্রতা বিসর্জন দিতাম।
বন্ধুবর এনামুল হক মাসউদ দা.বা. একজন ভালো দায়ী ও মনোযোগী অনুবাদক। তা'লিমে কোরআনের খেদমতে কাটিয়েছেন জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময়। তবে তিনি বেশ বোকাও। কী কারণে যে, বারবার বিরক্ত হওয়ার পরও সেই পুরনো অলসটাকেই সম্পাদনার দায়িত্ব চাপিয়ে দেন- যুক্তিটা আমি আজও খুঁজে পাই না। ঋদ্ধ পাঠক ভাষা সংশ্লিষ্ট অসঙ্গতি যা পাবেন, পুরোটার দায় সেই অলস লোকটার। নিজ মহানুভবতায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। অতি ভব্যতায় জানানোর কষ্টটুকু বরণ করলে অধিক প্রীত হব।
আমার বিশ্বাস, কোন আহলুল্লাহর নিকট পাঠপ্রতিক্রিয়া চাইলে, তিনি সর্বপ্রথম যে বাক্যটি বলবেন-একজন সালেকের নিত্যপাঠ্য তালিকায় কিতাবটি থাকা উচিত। বিনীত মুফতি হানিফ আল হাদী hanifalhadi@gmail.com ২০ মুহার্রম ১৪৪৩ হি.
টিকাঃ
[১] 'নিসইয়ান' শব্দের অর্থ ভুল। আরবি ব্যাকরণ হিসেবে ইনসান (মানুষ) শব্দটির শব্দমূল নিসইয়ান।
[২] পড়তে পড়তে পাঠকের মনে ইস্তিগফারের আগ্রহ তৈরি এবং জীবনে কৃত গোনাহগুলোর জন্য আল্লহা তা'আলার দরবারে লজ্জা-অনুশোচনার অনুভূতি জাগ্রতকরণের স্বার্থে স্থানে স্থানে একই আলোচনার প্রশংসনীয় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। মনোজগতে প্রতিক্রিয়া-মাগফেরাতের অদম্য আগ্রহ সৃষ্টিতে পুনরাবৃত্তিগুলো আবশ্যক। এই আগ্রহকেই 'সংকলন-সফলতা' বলেছি।
📄 অনুবাদকের কথা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। দয়াময়, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। শতকোটি দুরূদ ও সালাম সমগ্র মানবতার নবি, শাফিউল মুজনিবিন রাহমাতুল লিল আলামিন, সাইয়্যিদুল মুরসালিন, নবিজি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি।
মাগফিরাত! শব্দটি শুনতেই হৃদয়ে এক অন্যরকম প্রশান্তি-প্রশান্তি শিহরণ অনুভব হয়। একজন মুমিনের গোটা জীবনের পরম চাওয়াটাই হল এই মাগফিরাত। আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা আর পরকালের চিরমুক্তি। মাগফিরাতের জন্য প্রয়োজন খাঁটি তাওবা আর ইস্তিগফার। অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম, নিজের ও উম্মতের গাফেল-হৃদয়কে সজাগ করতে এ বিষয়ে কিছু লিখব।
কিন্তু আমার জাহালত, গাফলত ও আর কমজুরির কারণে তা একদম হয়ে ওঠেনি। আলহামদুলিল্লাহ, সুম্মা আলহামদুলিল্লাহ! এবার আল্লাহ তা'আলার রহমত শামেলে হাল হয়েছে। তাই এরই মধ্যে হাতে আসে পাকিস্তানের মাজলুম কারাবন্দি মুজাহিদ আলেম মুফতি খুবাইব হাফি.-এর রচিত "ইলা-মাগফিরাহ” গ্রন্থটি। যে গ্রন্থটির প্রথম খন্ডে মুহতারাম লেখক পুরো কুরআনুল কারিমের মাগফিরাত, তাওবাহ ও ইস্তিগফার সংক্রান্ত সকল আয়াত, আয়াতের অর্থ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির সুরার বিন্যাস অনুসারে একত্রিত করেছেন। দ্বিতীয় খণ্ডে মাগফিরাত, তাওবাহ ও ইস্তিগফারের সংজ্ঞা, ফজিলত ও মাগফিরাত, তাওবাহ ও ইস্তিগফার বিষয়ের হাদিস ও আসার তথা বিভিন্ন বাণী একত্রিত করেছেন। মোটকথা মাগফিরাত, তাওবাহ ও ইস্তিগফার সম্পর্কে অসাধারণ একটি গ্রন্থ।
তাই আমিও ভাবলাম, এ গ্রন্থটির অনুবাদই হতে পারে আমার সেই দুর্বল ও অলস ভাবনাটির যথাযথ ও চমৎকার বাস্তবায়ন। মাগফিরাত শব্দটির প্রতি এক বুক মহব্বত, ভালোবাসা ও প্রত্যাশায় অনুবাদ গ্রন্থটিও মূল নামেই নামকরণ করেছি “ইলা-মাগফিরাহ বা মাগফিরাতের আহ্বান"।
অনুবাদে কতটা সফল হয়েছি তা বিচারের ভার প্রিয় পাঠকের। তবে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছি লেখকের মূলভাব অক্ষুন্ন রাখতে এবং ভুল কমাতে। তারপরও মানুষ হিসেবে ভুল থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টিতে কোন ভুল পরিলক্ষিত হলে আমাদের জানালে কৃতজ্ঞ থাকব। আর পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করে নেব ইন শা' আল্লাহ।
পরিশেষে মহান রবের দরবারে লেখক-অনুবাদক, সম্পাদক-প্রকাশক ও পাঠকসহ গ্রন্থটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের মাগফিরাত কামনা করছি। আমিন
নিবেদক মাগফিরাতের ভিখারী এনামুল হক মাসউদ psfoundation2001@gmail.com ২৬ নভেম্বর, ২০২১
📄 সূরাতুল ফাতিহা
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। বিচার দিবসের মালিক। আমরা আপনারই ইবাদাত করি এবং আমরা আপনার নিকটই সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন। যাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন। যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।”১।
টিকাঃ
[১]. ফাতিহা- ১: ১-৭
📄 দরূদ শরিফ
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
“হে আল্লাহ! আপনি রহমত বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর, যেরূপ রহমত বর্ষণ করেছেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত, সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর, যেরূপ বরকত নাযিল করেছেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত, সম্মানিত."১।
টিকাঃ
[১]. সহিহ বুখারী: হাদিস নং ৩৩৭০; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৪০৫; সুনানে আবু দাউদ: হাদিস নং ৯৭৮; সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং ৪৮৩; সুনানে নাসাঈ: হাদিস নং ১২৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ৯০৩; মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৩৯৬