📄 রিয়ার কিছু সূক্ষ্ম ও অপ্রকাশ্য দিক:
ইখলাসের অভাবে মানুষের অনেক ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়। এটা হয়ত রিয়া, সুনাম সুখ্যাতি, অহমিকা ইত্যাদির কারণে হতে পারে। রিয়া হলো লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করা, যাতে লোক তার প্রশংসা করে এবং সে এর দ্বারা নিজের বড়ত্ব, প্রশংসা, আকাঙ্ক্ষা ও ভীতি প্রকাশ করেন।
সুম'আ বলতে বুঝায় মানুষের সুনাম সুখ্যাতি শোনার জন্য ইবাদত করা। অতএব রিয়া মানুষের চোখের সাথে সম্পৃক্ত আর সুম'আ শ্রবণের সাথে সম্পৃক্ত।
আর 'উজব তথা অহমিকা বিষয়টি রিয়ার কাছাকাছি। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যে বলেছেন, রিয়া হলো সৃষ্টি জগতের সাথে শির্ক করা আর 'উজব হলো নিজের নফসের সাথে শির্ক করা।
📄 রিয়ার তিনটি সূক্ষ্ম দিক:
প্রথমত: আবু হামেদ গাযালী রহ. খফি রিয়া সম্পর্কে আলোচনায় বলেছেন, এর চেয়েও খফি কিছু রিয়া আছে যা ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত প্রকাশ করতে চান না এমনকি তার আনুগত্য প্রকাশেও খুশি হন না, তবে মানুষ তার সাথে মিলিত হলে তিনি চান যে, তারা প্রথমে সালাম করুক বা মানুষ তার সাথে হাসি খুশি ও সম্মানের সাথে সাক্ষাৎ করুক, তার প্রশংসা করুক বা তারা তার প্রয়োজন দূর করুক অর্থাৎ তার অবস্থা এমন যে, তিনি সুপ্তভাবে তাদের আনুগত্যে ও সম্মান কামনা করেন। অথচ সে এরূপ না করলেও মানুষ তাকে যথাযথ সম্মান করত।²
দ্বিতীয়ত: ইখলাসকে দুনিয়াবী উদ্দেশ্য যথা প্রজ্ঞা, সম্মান, পার্থিব ধন সম্পদ ইত্যাদি হাসিলের মাধ্যম বানানো।
তৃতীয়ত: ইবন রজব রহ. বলেছেন, মানুষের মাঝে কেউ নিজেকে দোষারোপ করে; যাতে মানুষ তার বিনয় নম্রতা দেখে তাকে আরো সম্মান ও প্রশংসা করে। এটা খুব সূক্ষ্ম রিয়া। আমাদের সৎপূর্বসূরীরা এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। মুতাররিফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন শিখখির রহ. বলেছেন, “মানুষের নিজের প্রশংসার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে লোকের সামনে নিজের দোষারোপ করবে যেন সে এ নিন্দার দ্বারা নিজের সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করল, আর এটা আল্লাহর কাছে খুবই বোকামী কাজ”।¹ বস্তুত আল্লাহর আনুগত্যের উপর ধৈর্যধারণ করা তিন প্রকারের। আনুগত্য করার পূর্বে, আনুগত্য করার সময় ও আনুগত্য করার পরে ধৈর্যধারণ করা।
চতুর্থত: কখনও কেউ নিজে রিয়া করাকে অপছন্দ করে তবে অন্য কেউ তার আমলের কথা উল্লেখ করে প্রশংসা করে তখন তার অপছন্দতা লক্ষ্য করা যায় না বরং আনন্দ অনুভব করে এবং এতে ইবাদতের কিছু কষ্ট লাঘব হয় বলে তার মনে হয়। এটাও সুক্ষ্ণ রিয়া²
টিকাঃ
২. আল-ইহইয়া, ৩/৩০৫-৩০৬।
১. কিতাবুল ইখলাস ওয়াশশির্ক, ডঃ আব্দুল আযীয আব্দুল লতিফ, পৃষ্ঠা ৪৬।
২. আল-ইখলাস, আল-'আওয়ায়িশাহ, পৃষ্ঠা ৭১।
📄 ইখলাস কিভাবে অর্জিত হয়?
১- বান্দাহ মনে প্রাণে ইয়াকিনের সাথে বিশ্বাস করবে যে সে শুধু আল্লাহর দাস, আর দাস খিদমতের বিনিময়ে মনিবের কাছে কিছু প্রত্যাশা করতে পারে না। যেহেতু সে দাসত্বের কারণে মনিবের খিদমত করবে। অতএব মনিবের কাছে যে প্রতিদান ও সাওয়াব পায় তা শুধু তার অনুগ্রহ, দয়া ও ইহসান। কোন কিছুর বিনিময় বা প্রতিদান নয়।
২- বান্দাহর উপর আল্লাহর অনুগ্রহ, দয়া ও তাওফিক সর্বদা লক্ষ্য করা, একথা ভাবা যে এ সব কিছু মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, তার নিজের থেকে কিছুই হয় নি। আল্লাহর ইচ্ছায়ই তার আমল করতে হবে, নিজের ইচ্ছায় নয়। সব কল্যাণ একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায়।
৩- ব্যক্তি নিজের দোষত্রুটি, কমতি, নফসের ও শয়তানের অংশিদারিত্ব সর্বদা স্মরণ করা। কেননা অনেক আমলেই কম বেশি নফসের ও শয়তানের অংশ থাকে।
عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ، رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْتِفَاتِ الرَّجُلِ فِي الصَّلَاةِ؟ فَقَالَ: «إِنَّمَا هُوَ اخْتِلَاسُ يَخْتَلِسُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ صَلَاةِ الْعَبْدِ»
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাতের মধ্যে (ঘাড় ফিরিয়ে) এদিক ওদিক তাকানোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। জবাবে তিনি বলেন, “এটা শয়তানের ছোঁ মারা, সে মানুষের সালাত হতে কিছু অংশ ছো মেরে নিয়ে যায়”।¹
সামান্য এদিক ওদিক তাকালে যদি এমন সতর্ক করা হয় তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য দিকে অন্তর ফিরালে কি অবস্থা হবে?²
৩- অন্তরের সংশোধন ও ইখলাসের জন্য আল্লাহ যেসব আদেশ দিয়েছেন সেগুলো স্মরণ করা। লোক দেখানো ব্যক্তিরা আল্লাহর তাওফিক থেকে বঞ্চিত হয়।
৪- আল্লাহর ক্রোধ ও আযাবের ভয় যখন বান্দাহর অন্তরে থাকবে তখন সে রিয়া থেকে বিরত থাকবে।
৫- গোপনে বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করা, যেমন: তাহাজ্জুদের সালাত, গোপনে দান সদকা করা ও আল্লাহর ভয়ে নির্জনে কাঁদা।
৬- আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ব মনে বাস্তবায়ন করা। আসমাউল হুসনা (আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ) ও আল্লাহর সিফাত যেমন: 'আলীউল 'আযীম, 'আলীম, রাযযাক, খালিক ইত্যাদি নামসমূহের দ্বারা আল্লাহর তাওহীদ ও 'উবুদিয়াত বাস্তবায়ন করা।
৭- সর্বদা একথা মনে রাখা যে, সে মহান আল্লাহর একমাত্র গোলাম।
৮- আল্লাহর সুন্দর জাতী ও গুণবাচক নামসমূহ জানা ও আল্লাহকে যথাযথ সম্মান করা।
৯- মৃত্যু ও এর ভয়াবহতা স্মরণ করা।
১০- রিয়ামুক্ত ভাল মানুষের অনুসরণের মাধ্যমে রিয়াকে ত্যাগ করা।
১১- রিয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা।
১২- দু'আর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কাকুতি মিনতি পেশ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দু'আ ও কাকুতি মিনতি পেশ করতেন।
১৩- গভীর চিন্তা ও গবেষণাসহ কুরআন পড়া।
১৪- নফসের ধোঁকা থেকে মুক্ত থাকা। কেননা ইখলাস ও মানুষের প্রশংসা, লোভ লালসা ইত্যাদি অন্তরে একত্রিত হতে পারে না, যেমনিভাবে পানি ও আগুন একত্রিত হতে পারে না। তাই ইখলাস চাইলে লোভ লালসাকে দমন কর, মানুষের প্রশংসা ও সুনাম সুখ্যাতির কামনা বাসনা ত্যাগ কর এবং দুনিয়ার মায়া মমতা ত্যাগ করে আখিরাতের ভালবাসা মনে লালন কর, তাহলে ইখলাস অর্জন সহজ হবে। আর লোভ লালসা ধ্বংসের জন্য এটা জানাই যথেষ্ট যে, দুনিয়াতে লোভনীয় যা কিছুই আছে তা আল্লাহর হাতেই রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করেন।
১৫- অধ্যবসায়ী ও আত্মসংযমী হওয়া। আল্লাহ বলেছেন,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ *
[العنكبوت: ٦٩]
“আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন”। [সূরা আল্-আনকাবূত: ৬৯]
অতএব রিয়ার ভয়াবহতা ত্যাগ করতে হলে আপনাকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ধাপে ধাপে রিয়া ত্যাগ করে যখন নিম্নোক্ত স্তরে পৌঁছবে তখন আল্লাহর আনুগত্য করতে নফস প্রশান্তি পাবে।
إِنَّ عِبَادِى لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانُ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ )
[الحجر: ٤٢]
“নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই, তবে পথভ্রষ্টরা ছাড়া যারা তোমাকে অনুসরণ করেছে”। [সূরা আল-হিজর: ৪২]
১৬- ইবাদত প্রকাশ না করা।
১৭- মানুষ কে কি বলে সে ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব না দেওয়া।
১৮- সব ধরণের শির্ক থেকে বেঁচে থাকা ও সতর্ক থাকা।
১৯- রিয়ার কাফফারা থেকে বেঁচে থাকার জন্য দু'আ করা। হাদীসে এসেছে,
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا هَذَا الشَّرْكَ، فَإِنَّهُ أَخْفَى مِنْ دَبِيبِ النَّمْلِ " . فَقَالَ لَهُ: مَنْ شَاءَ اللهُ أَنْ يَقُولَ وَكَيْفَ نَتَّقِيهِ، وَهُوَ أَخْفَى مِنْ دَبِيبِ النَّمْلِ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: قُولُوا : " اللهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ نُشْرِكَ بِكَ شَيْئًا نَعْلَمُهُ، وَنَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا نَعْلَمُ
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হে লোকসকল, তোমরা এ খফি শির্ক (রিয়া) থেকে বেঁচে থাকো, কেননা এটা পিপীলিকা চলার চেয়েও সূক্ষ্ম। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এর থেকে কিভাবে বেঁচে থাকব? তিনি বললেন, তোমরা বল, হে আল্লাহ আমরা জানা শির্ক থেকে পানাহ চাই এবং অজানা শির্ক থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি”।¹
২০- ওয়াজ নসিহত, জিকিরের মসলিস ও মুখলিস ব্যক্তিদের সাথে উঠা বসা ও চলা ফেরা করা।
২১- ব্যক্তির উপর আল্লাহর অপরিসীম নি'আমতের কথা স্মরণ করা ও সেগুলোর শুকরিয়া আদায় করা। প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সবসময়ই তা স্বীকার করা।
২২- ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত ইবাদত বন্দেগী করা এবং একে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।²
টিকাঃ
১. বুখারী, হাদীস নং ৩২৯১, আবূ দাউদ, ৯১০।
২. মাদারিজুস সালিকীন।
১. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৯৬০৬। আল্লামা শু'য়াইব আরনাউত বলেছেন, হাদীসের সনদটি দ'য়ীফ।
২. লেখাটি সউদী লেখিকা ক্বাযলা বিনতে মুহাম্মদ আল-কাহতানীর লেখা থেকে