📘 ইখলাস > 📄 ইখলাসের স্তরসমূহ:

📄 ইখলাসের স্তরসমূহ:


প্রথম স্তর: আমলের মধ্যে লৌকিকতা বর্জন করা ও তা আল্লাহর দয়ায় ও তাওফিকে হয়েছে বলে মনে করা, প্রতিদান না চাওয়া এবং আমলের কারণে আত্মসন্তুষ্ট না হওয়া; বরং নিজের অক্ষমতা ও স্বল্পতার জন্য সর্বদা লজ্জিত থাকা।
প্রথমত আমলটি আল্লাহর রহমত ও তাওফিকে হয়েছে তার দলিল হলো আল্লাহর বাণী,
وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ ﴾ [النور : ٢١]
“আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না থাকত, তাহলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারত না; কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন”। [সূরা আন্-নূর: ২১]
দ্বিতীয়ত: আমলকারীর মনে রাখা উচিত যে সে আল্লাহর একজন দাস। আর দাস যা করে তার বিনিময়ে মনিবের কাছে কিছু প্রত্যাশা করতে পারে না।
তৃতীয়ত: নিজের আমলের মধ্যে দোষত্রুটি ও কমতি সর্বদা তালাশ করা।
দ্বিতীয় স্তর: নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করার পরেও আমলের ক্ষেত্রে লজ্জাবোধ করা, নিজেকে মনে করা যে আল্লাহর জন্য যথাযথভাবে কাজটি করা হয় নি। আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا ءَاتَوا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ ﴾ [المؤمنون : ٦٠]
“আর যারা যা দান করে তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে করে থাকে এজন্য যে, তারা তাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তনশীল”। [সূরা আল-মুমিনূন: ৬০]
সুতরাং মু'মিন সর্বদা আল্লাহর দয়া কামনা করবে এবং নিজের কমতির জন্য নিজেকে দোষারোপ করবে।
তৃতীয় স্তর: আমলটি ইলম অনুযায়ী বিশুদ্ধ হওয়া, যাতে তা বিদ'আত হতে মুক্ত হয়।¹

টিকাঃ
১. তাহযীবু মাদারিজিস সালেকীন।

📘 ইখলাস > 📄 ইখলাসের ফায়েদা:

📄 ইখলাসের ফায়েদা:


প্রতিটি আমল কবুল হওয়ার জন্য দু'টি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূর্ণ হতে হবে।
১- ব্যক্তি কাজটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করবে।
২- কাজটি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া।
উপরিউক্ত দু'টি শর্তের কোনো একটি পাওয়া না গেলে কাজটি বিশুদ্ধ ও কবুল হবে না। এ ব্যাপারে কুরআনের দলিল হলো,
فَمَن كَانَ يَرْجُواْ لِقَاءَ رَبِّهِ، فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا [الكهف: ١١٠]
“সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে”। [সূরা আল-কাহফ: ১১০]
হাফিয ইবন কাসির রহ. বলেন, “এ দু'টি আমল কবুল হওয়ার শর্ত। তাই আমলটি একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই হতে হবে এবং তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরি'আত অনুযায়ী হতে হবে”।
তাই ইখলাসের ফায়েদা হচ্ছে:
১- অহংকার মুক্ত হওয়া। (কুরআনে বর্ণিত তিন ব্যক্তির ঘটনা, 'ইকরামার ঘটনা ও আসহাবে কাহাফের ঘটনা)।
২- আল্লাহর সাহায্য লাভ। আল্লাহ বলেন,
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ * وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُواْ وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ خَرَجُوا مِن دِيَارِهِم بَطَرًا وَرِئَاءَ النَّاسِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَاللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ ) [ الانفال: ٤٥، ٤٧]
“হে মুমিনগণ, যখন তোমরা কোন দলের মুখোমুখি হও, তখন অবিচল থাক, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হও। আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের ঘর থেকে অহঙ্কার ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বের হয়েছে এবং আল্লাহর রাস্তায় বাধা প্রদান করে, আর তারা যা করে, আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন”। [সূরা আল- আনফাল: ৪৫-৪৭]
৩- শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ، وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّمَا بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ ﴾ [يوسف: ٢٤]
“আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা: ইউসুফ: ২৪]
আল্লাহ আরো বলেন,
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيَّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ﴾ [الحجر: ٣٩، ٤٠]
“সে বলল, 'হে আমার রব, যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাই যমীনে আমি তাদের জন্য (পাপকে) শোভিত করব এবং নিশ্চয় তাদের সকলকে পথভ্রষ্ট করব'। তাদের মধ্য থেকে আপনার একান্ত বান্দাগণ ছাড়া”। [সূরা: আল-হিজর: ৩৯-৪০]
৪- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা'য়াত লাভ করা।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، أَنَّهُ قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ القِيَامَةِ؟ فَقَالَ : " لَقَدْ ظَنَنْتُ، يَا أَبَا هُرَيْرَةَ، أَنْ لَا يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ، لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الحَدِيثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ القِيَامَةِ مَنْ قَالَ: لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، خَالِصًا مِنْ قِبَلِ نَفْسِهِ "
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ থেকে বেশি সৌভাগ্যবান হবে আপনার শাফায়াত দ্বারা কোন লোকটি? তখন তিনি বললেন, হে আবু হুরায়রা! আমি ধারণা করেছিলাম যে তোমার আগে কেউ এ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ হাদীসের ব্যাপারে তোমার চেয়ে অধিক আগ্রহী আর কাউকে আমি দেখিনি। কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত দ্বারা সর্বাধিক সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি হবে যে খালেস অন্তর থেকে বলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”।¹
৫– গুনাহ মাফ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যেমন উল্লিখিত হাদীসে বেতাকা, ব্যাভিচারিণী মহিলার কুকুরকে পানি পান করানো ও রাস্তা থেকে এক ব্যক্তির কাঁটা সরিয়ে ফেলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

📘 ইখলাস > 📄 সালাফে সালেহীন ও তাদের ইখলাস:

📄 সালাফে সালেহীন ও তাদের ইখলাস:


ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা: কুরআনে এসেছে,
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ، وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّمَا بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ ﴾ [يوسف: ٢٤]
“আর সে মহিলা তার প্রতি আসক্ত হল, আর সেও তার প্রতি আসক্ত হত, যদি না তার রবের স্পষ্ট প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। এভাবেই, যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট ও অশ্লীলতা দূর করে দেই। নিশ্চয় সে আমার খালেস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা: ইউসুফ: ২৪]
মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনা:
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخْلَصًا وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا ﴾ [مريم : ٥١]
“আর স্মরণ কর এই কিতাবে মূসাকে। অবশ্যই সে ছিল মনোনীত এবং সে ছিল রাসূল, নবী”। [সূরা মারইয়াম: ৫১]
আবূ সুলাইমান আদদারানী রহ. বলেন, “যার একটিমাত্র কদম (আমল) সহীহ হয়েছে এবং তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করেছে তার জন্য সুসংবাদ”।
একজন সৎপূর্বসূরী বলেছেন, "যার জীবনে একটিমাত্র মুহূর্ত (আমল) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেটেছে সে ব্যক্তি নাজাত পাবে”।
আলী ইবন হাসান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন মারা গেলেন তখন মদীনার শতশত ঘরের লোকজন তার জন্য কেঁদেছেন।
হামদুল ইবন আহমদ রহ. কে বলা হলো সালাফদের কথা আমাদের কথার চেয়ে কল্যাণকর ছিল কেন? তিনি বলেন, “তারা ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি, নিজের নাজাত লাভ ও রহমানের সন্তুষ্টি লাভের জন্য কথা বলতেন, আর আমরা নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি, দুনিয়া লাভ ও সৃষ্ট মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কথা বলি”।
এক ব্যক্তি তামীম আদ-দারী রহ. কে তার রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। তিনি বললেন, “গভীর রাতে গোপনে এক রাক'আত সালাত আদায় করা সারারাত সালাতের চেয়েও আমার কাছে উত্তম। অতঃপর তিনি একথা মানুষকে বলতেন”।
আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি নিজে বিখ্যাত হতে চায় সে কখনও প্রকৃত বান্দাহ হতে পারবে না”।
কোনো এক সালাফ বলেন, “আমি সব কাজে নিয়‍্যাত করতে পছন্দ করি। এমনকি আমার খাওয়া দাওয়া, পান করা, ঘুমানো ও বাথরুমে যাওয়া ইত্যাদি কাজে”।
হাসান রহ. বলেন, “লোকদের কাছে মেহমান থাকত, সে ব্যক্তি রাতে সালাত আদায় করলে তার মেহমান তা জানত না। তারা বেশি বেশি দু'আ করতেন কিন্তু তাদের আওয়াজ কেউ শুনতনা। এক ব্যক্তি একই বিছানায় তার স্ত্রীর সাথে রাতে ঘুমাতো, সারারাত সে আল্লাহর কাছে কাঁদত কিন্তু তার স্ত্রী তা বুঝতে পারত না”।
ফুদাইল ইবন 'ইয়াদ রহ. বলেন, “মানুষের কারণে আমল বাদ দেওয়া রিয়া (লৌকিকতা), আর মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করা শির্ক, এ দুটি থেকে আল্লাহ মুক্ত করলে তা হলো ইখলাস"।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, “আমার আশা যে, লোকেরা আমার কিতাবসমূহ পড়ে ইলম অর্জন করুন তবে তা আমার দিকে নিসবত না করুক”।
সুফইয়ান রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে মারিয়া রবি' ইবন খুসাইম বলেছেন, “রবি' এর সব আমল গোপনীয় ছিল। কুরআন তিলাওয়াতের সময় কেউ আসলে তিনি কাপড় দিয়ে তা ঢেকে রাখতেন”।
জুবাইর ইবন নুফাইর রহ. বলেন, “আমি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে তার শেষ সালাত আদায়ের সময় শুনেছি যে, তিনি তাশাহহুদ শেষে নিফাক থেকে আল্লাহর কাছে বারবার পানাহ চাচ্ছেন। আমি বললাম হে আবু দারদা আপনি ও নিফাক থেকে পানাহ চাচ্ছেন? তিনি বললেন, তোমার কথা বাদ দাও। আল্লাহর কসম মানুষ শেষ মুহুর্তেও দীন থেকে ঘুরে যেতে পারে ফলে সে দীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে”।
বিশর আল-হাফী রহ. বলেন, “দীনের বিনিময়ে দুনিয়ার কিছু চাওয়ার চেয়ে বাঁশি বাজিয়ে দুনিয়ার কিছু চাওয়া আমার কাছে উত্তম"।
ইয়াহইয়া ইবন আবু কাসীর রহ. বলেন, “তোমরা নিয়‍্যাত শিক্ষা কর। কেননা তা আমলের চেয়েও অধিক জরুরী”।
ইবন কাইয়্যেম রহ. বলেছেন, সৎকাজে ধৈর্য ধারণ তিন ধরণের:
১- সৎকাজের পূর্বে ধৈর্য ধারণ।
২- সৎকাজে ধৈর্য ধারণ।
৩- সৎকাজের পরে ধৈর্য ধারণ। অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহ চাওয়া, অহমিকা ত্যাগ করা ও লৌকিকতা ছেড়ে দেওয়া।
ইবন 'আকীল রহ. বলেন, “আবু ইসহাক ফাইরুযবাদী গরিবকে কিছু দান করার আগে নিয়‍্যাত করতেন। কোন মাসয়ালা সম্পর্কে কিছু বলার আগে আল্লাহর সাহায্য চাইতেন ও মানুষের কাছে সাজিয়ে ও রঙ্গিয়ে কিছু বলা ছাড়াই সঠিক রায়ের জন্য ইখলাস কামনা করতেন। দু'রাক'আত সালাত আদায় করা ব্যতীত তিনি কোন মাসয়ালা লেখেন নি। ফলে তার ইখলাসের বদৌলতে সারা দুনিয়ায় তার গ্রন্থাদি প্রসিদ্ধ লাভ করেছে”।¹
আল্লামা মুহাম্মদ আমীন আশ-শানকীতি রহ. এর নিয়্যাতের বিশুদ্ধতার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। আরবদের বংশতালিকা তন্মধ্যে অন্যতম। এ বইটি তিনি অপ্রাপ্ত বয়সে লিখেছিলেন। বইয়ের শুরুতে তিনি লিখেছেন: বনী 'আদনানের বংশ, একে আমি “খালিসুজ জুমান” নামকরণ করেছি। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক হলে তিনি এ কবিতাকে মাটিতে পুঁতে ফেলেন। কারণ তিনি এটিকে আত্মীয়দের উপরে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য রচনা করেছিলেন। তার কতিপয় উস্তাদ তাঁকে এ কাজের জন্য ভৎর্সনা করেন, তারা বলেছিলেন, তোমার নিয়‍্যাত পরিবর্তন ও বিশুদ্ধ করলেই হত”।
আবূ বকর যায়েদ তার (মুহাম্মদ আমীন আশ-শানকীতি রহ.) সম্পর্কে বলেছিলেন, “এ যুগে যদি কাউকে শাইখ বলা হয় তবে তিনিই হবেন তা”।
নিয়‍্যাতের বিশুদ্ধতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইয়ুব আসসাখতিয়ানী রহ. বলেছেন, “সব কাজের মধ্যে নিয়‍্যাতের বিশুদ্ধতা সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার”।
'উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি আবূ মূসা আশ'য়ারী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে লিখেছেন, “যে ব্যক্তি নিয়‍্যাতকে বিশুদ্ধ করবে তার ও মানুষের মাঝে আল্লাহই যথেষ্ট হবেন"।
কবির ভাষায়:
“যে মু'মিনের প্রকাশ্য ও গোপনীয় উভয়টাই সমান হবে, সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই সফলকাম হবে, আর তখন তার প্রশংসা করা হবে। আর যার প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড গোপনীয়তার বিপরীত হবে, সে সৌভাগ্যবান হবে না; যদিও সে কঠোর পরিশ্রম করে”।
ইমাম শাফে'য়ী রহ. বলেছেন, “আমার ইচ্ছা হয় যে, মানুষ আমার লিখিত কিতাবসমূহ পড়ে ইলম অর্জন করুক তবে তারা যেন এগুলো আমার দিকে নিসতব না করে অর্থাৎ আমার নাম উল্লেখ না করে"।
তিনি আরো বলেন, “আমি কখনও কারো উপর জয়লাভ করতে বিতর্ক করিনি, একমাত্র সত্যকে প্রকাশ করার জন্যই তর্ক বিতর্ক করেছি”।
তিনি আরো বলেন, “আমি যখন কারো সাথে কথা বলেছি তখন তাকে সংশোধন ও সত্যের ব্যাপারে সাহায্য করতে চেয়েছি, আর আশা করেছি যে, তার উপর আল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ ও হেফাযত থাকুক”।
ইমাম শাফেয়ী রহ. এর এসব কথা মুখলিসীনদের ইখলাসের কথাই প্রমাণ করে। আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাহদের আলামত হলো তারা নিজেদের জন্য কোনো আমল করতেন না, বরং তাদের একমাত্র লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আর তারা সর্বদা সত্য শিক্ষা দেওয়া ও প্রকাশ করতে ব্রত ছিলেন। কারো সাথে সংলাপ করলে তাতে বিজয়ের মানসিকতা ছিল না, বরং সত্য প্রকাশই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা সর্বদা আশা করতেন যে, আল্লাহ যেন আলোচনার মাধ্যমে হককে প্রকাশ করে দেন।
আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক স্থাপন করতে মানুষের অন্তর থেকে সব সম্মান ও মর্যাদাও যদি শেষ হয়ে যায় তাতে মুখলিস ব্যক্তি কোনো পরোয়া করেন না। আর তারা তাদের সামান্য আমলও মানুষের কাছে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন না।¹

টিকাঃ
১. বাদায়ে 'উল ফাওয়ায়েদ ৩/১৪৯।
১. মাকাসিদুল মুকাল্লিফীন, আশকার, পৃষ্ঠা ৪৭৩-৪৭৪।

📘 ইখলাস > 📄 ইখলাস সম্পর্কে কিছু সতর্কতা:

📄 ইখলাস সম্পর্কে কিছু সতর্কতা:


১- আখেরাতের প্রতিদানের আশা করা: কিছু লোক ইবাদত বন্দেগীতে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের ব্যাপারে এতই বাড়াবাড়ি করেন যে, তারা মনে করেন আল্লাহ সালেহীন বান্দাহদেরকে পরোকালের যে সব প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন সে জন্য ইবাদত করা ইখলাসের পরিপন্থী ও ঘাটতি। যদিও তারা সওয়াবের নিয়‍্যাতে ইবাদত করাকে ইবাদত বাতিল হয়ে যায় একথা বলেন না, তবে এভাবে আমল করাকে মাকরূহ বলেছেন। তারা আখেরাতের প্রতিদানের আশায় ইবাদত করাকে 'মন্দ কর্মচারী' (আমলকারী) মনে করেন।
একজন বিখ্যাত সূফী বলেছেন, “ইখলাস হলো, আমলের দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতে প্রতিদানের আশা না করা ও কারো কাছে কিছু না চাওয়া”।
রাবি'আহ আল-'আদাবীয়াহ (রাবেয়া বসরী) বলেছেন –যদি বর্ণনা সঠিক হয়- “আমি জাহান্নামের ভয়ে বা জান্নাতের আশায় কখনও ইবাদত করিনি। এতে আমি মন্দ আমলকারী হয়ে যেতাম। বরং আমি আল্লাহর ভালোবাসা তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ইবাদত করেছি”।
সুফীদের এসব মত কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী। কেননা আল্লাহ তা'আলা মু'মিনের গুণ বর্ণনা করতে বলেছেন যে, তারা আল্লাহর ভয়ে ও আশায় ইবাদত করেন।
إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ *
[الانبياء: ٩٠]
“তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী”। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৯০]
আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের গুণ বর্ণনায় বলেন,
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا ) [الفرقان: ٦٥]
“আর যারা বলে, 'হে আমাদের রব, তুমি আমাদের থেকে জাহান্নামের আযাব ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয় এর আযাব হল অবিচ্ছিন্ন”। [সূরা আল-ফুরকান: ৬৫]
আল্লাহর খলিল ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সম্পর্কে বলেন,
وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ [الشعراء : ٨٥، ٨٩]
“আর আপনি আমাকে সুখময় জান্নাতের ওয়ারিসদের অন্তর্ভুক্ত করুন'। আর আমার পিতাকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিল'। আর যেদিন পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না'। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না'। তবে যে আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ অন্তরে”। [সূরা আশ-শু'আরা: ৮৫-৮৯]
আল্লাহ সূরা আল-মুতাফফিফীনে জান্নাতের নাজ নিয়ামতের বর্ণনা দেয়ার পরে মানুষকে তা অর্জনে প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত করেছেন,
وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ ﴾ [المطففين: ٢٦]
“আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা”। [সূরা আল্-মুতাফফিফীন: ২৬]
তাহলে সাওয়াবের আশা করা যাবে না একথা কিভাবে বলা যায়, অথচ আল্লাহর সমস্ত দীন বান্দাহকে জান্নাত কামনা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির দাওয়াত দিয়েছে। সব নবী রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ, সকলেই জান্নাত কামনা করেছেন এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ চেয়েছেন। অতএব, যারা জান্নাতের আশায় ও জাহান্নামের ভয়ে ইবাদত করে তাকে মন্দ কর্মচারীর সাথে তুলনা করা বা দুর্বল মুরিদ বলা সঠিক নয়।¹

টিকাঃ
১. মাকাসিদুল মুকাল্লিফীন, আশকার, সংকলিত। পৃষ্ঠা ৪০৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00