📘 ইখলাস ২ > 📄 যেভাবে ইখলাস হাসিল করবেন

📄 যেভাবে ইখলাস হাসিল করবেন


আমরা এতক্ষণের আলোচনা দ্বারা জানতে পারলাম, রিয়া সব আমলকে বিনষ্ট করে ফেলে, রিয়া আল্লাহর ক্রোধের কারণ সর্বোপরি রিয়া ধ্বংসাত্মক এক ব্যাধি এবং যা দাজ্জালের ফেতনার চেয়েও ভয়ঙ্কর।
সুতরাং আমাদের যার ভেতরে এই ভয়ানক ব্যধিটি রয়েছে, এর চিকিৎসার অতীব প্রয়োজন। মুক্তি পেতে হলে ভেতর থেকে ওই বিষবৃক্ষটি উপড়ে ফেলতে হবে। নিচে আমরা কিছু টিপস দিচ্ছি, যা এর চিকিৎসার কাজ দেবে, আমাদের ভেতর জগৎ ইখলাসে সমৃদ্ধ করবে।
• এক. দুনিয়ার জন্য আমল ও রিয়ার প্রকারভেদ জানতে হবে (যেমন পূর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে)। সেই সঙ্গে এসবের কারণ ও উৎস খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি এর মূলোৎপাটন ও প্রতিকার, প্রতিকারের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে। আমরা পূর্বে এ নিয়ে সামান্য আলোচনা করেছি।
• দুই. আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব জানতে হবে, ভালো করে বুঝতেও হবে। এ জন্য আপনাকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শের ভিত্তিতে আল্লাহর নাম, তার সিফাত, জগত পরিচালনায় তার অপরিসীম শক্তি ইত্যাদি ভালো করে জানতে হবে।
বান্দা যখন জানবে আল্লাহ এক, তিনিই কেবল উপকার-ক্ষতির মালিক, তিনি মানুষকে সম্মানিত করেন, তিনিই তাদের লাঞ্চিত করেন, তিনিই মানুষের মর্যদা বাড়ান এবং কমান, তিনি মানুষকে দান করেন, তিনিই তাদের বঞ্চিত করেন, তার হাতেই জীবন-মৃত্যু, তিনি অন্তরের গহীনে থাকা সবকিছুও জানেন। বান্দা যখন ভালো করে একথা বুঝবে যে, আল্লাহই একমাত্র আরাধনার উপযুক্ত, তখন তার এই বিশ্বাস ও বোধ তাকে ইখলাস হাসিলে সহায়তা করবে। সুতরাং আমাদেরকে তাওহিদ, তাওহিদের যাবতীয় প্রকারভেদ ভালো করে ঠিকভাবে জানতে হবে, ভালো করে বুঝতে হবে। তবে সেই জানা ও বুঝা হতে হবে নিরাপদ।
• তিন. মৃত্যুর বিভীষিকা, পরকাল, পরকালের পুরস্কার, শান্তি, কবরের আজাব ইত্যাদি ভালো করে জানতে হবে। এগুলো আপনার ইখলাস হাসিলে অন্যতম সহায়ক হতে পারে। পরকালের এসব বাস্তবতাবোধ নিজের মাঝে জাগ্রত হলে বুদ্ধিমান যে কোন ব্যক্তি রিয়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে।
• চার. রিয়া, দুনিয়ার জন্য আমলের ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা স্মরণ করতে হবে, ভয় করতে হবে। ভয় মানুষকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে, এবং সে মুক্তি পায়।

**রিয়া এসে গেলে আপনি কী করবেন**
আপনি যখন অনুভব করবেন, আপনার মন মানুষের প্রশংসা কুড়াতে লালায়িত হচ্ছে, মানুষের চোখে বড় হওয়ার তৃষ্ণা জেগেছে, আপনার ভেতরে রিয়া সংক্রমিত হচ্ছে, তখন আপনি এর ভয়ানক ক্ষতিগুলো চোখের সামনে তুলে আনবেন, ভাববেন আল্লাহর ক্রোধের কথা, দেখবেন, তা আপনাকে কাজ দিচ্ছে, রিয়া সংক্রমণ রোধে সাহায্য করছে। আর এটা করার জন্যই করতে হবে এমন নয়; বরং তা আবশ্যক আপনার, আমার, সবার জন্য।
যখন মানুষের বাহবা ও স্বীকৃতি পেতে চায় আপনার মন, তখন আপনি মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতার কথা ভাবেন।
ব্যক্তি যখন মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতার কথা ভাববে, তখন রিয়ার ব্যাধি থেকে সে অনেকটাই নিস্তার পাবে। এই জন্যই হয়তোবা কোনো সালাফের থেকে এ ধরনের উক্তি আছে, ‘তুমি নিজে নিজেই রিয়া দূর করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করো, আশপাশের মানুষদের মনে করো তারা শিশু বা তারা অবলা প্রাণী, যাদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে তোমার কিছু যায় আসে না, তোমার কাজের ব্যাপারে যাদের জানা বা না জানার আলাদা কোনো প্রভাব নেই। তুমি আল্লাহর জানা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো।’
রিয়ার ভয়ঙ্কর প্রভাব সম্পর্কে ভাবেন। রিয়ার কারণে বান্দার আমল নষ্ট হয়ে যায় এ কথা চিন্তা করেন। পরকালে রিয়ার ক্ষতির কথা মনে করেন। মুহাম্মাদ ইবনু লাবিদ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন—আমি তোমাদের ব্যাপারে ‘শিরকে আসগারে’র (ছোট শিরক) বেশি ভয় করি। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ‘শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন, তা হচ্ছে রিয়া। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন সবাইকে প্রতিদান দেবেন, তখন রিয়াকারীদের বলবেন, দুনিয়াতে তোমরা যাদের দেখানোর জন্য আমল করতে, আজ তোমরা তাদের কাছে গিয়ে দেখো কোনো প্রতিদান পাও কি না?
তারা যখন ভয় করছেন আমরা কী? আমাদের মর্যাদার পরিধি কতটুকু? সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনে ইজাম, সালাফে সালেহিন পর্যন্ত রিয়ার এই প্রাদুর্ভাবকে খুব ভয় করে চলতেন। তাদের মতো মহৎ মানুষদেরও আশঙ্কা হতো। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত প্রচুর। এখানে কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো—
ক. কুরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে—
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَّقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ يَرْجِعُونَ.
এবং যারা তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে।
এই আয়াতে বর্ণিত ভয়কারী সম্পর্কে উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন—
ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে (ভয়কারী) কি ওই ব্যক্তি, যে জিনা করে, চুরি করে, মদ পান করে?
তিনি বললেন—
শোনো আবু বকরের কন্যা, (অথবা বলেছেন, সিদ্দিকের কন্যা) তা না। ব্যক্তি রোজা রাখে, সদকা করে, সালাত আদায় করে এর সাথে কবুল না হওয়ারও আশঙ্কা করে।
খ. ইবনু আবি মুলাইকা রাহিমাহুল্লাহ বলেন—তিরিশজন সাহাবির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে নেফাকের (কপটতা) ভয় করেতন, কেউই এ কথা বলতেন না, তার ঈমান জিবরাইল মিকাইলের ঈমানের সমমর্যাদার হয়ে গেছে।
গ. ইবারাহিম আত-তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমি যখনই আমার কথাকে আমার আমলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে যাই, তখন আমার মিথ্যাবাদী হয়ে যাবার ভয় হয়।
ঘ. হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত—মুমিন ব্যক্তি নেফাকের ভয় করে থাকে, এ থেকে আশংকা মুক্ত থাকে কেবল মুনাফিকই।
ঙ. উমর রাজিয়াল্লাহু হুজাইফা রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন—আমি তোমাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আমার নাম তাদের (মুনাফিকদের) তালিকাভুক্ত করেছেন? তিনি বললেন, না। আপনার (ঈমানের) চেয়ে আর কাউকে (অন্য কারও ঈমান) তো বেশি নির্মল ভাবা যায় না।
চ. আবুদ্দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন—
হে আল্লাহ, আমি ‘খুশু-সংশ্লিষ্ট নেফাক’ থেকে পানাহ চাচ্ছি।
তাকে জিজ্ঞেস করা হলো—
‘খুশু-সংশ্লিষ্ট নেফাক’ আবার কী?
তিনি বলেন—
বাহ্যিক অবস্থায় মনে হবে তার খুশু আছে, কিন্তু অন্তর খুশুশূন্য।
ছ. আবুদ্দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলতেন—
আমি যদি আমার এক ওয়াক্তের সালাত কবুল হবার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি, তাহলে তা আমার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু থেকেও অধিক প্রিয়।
কুরআনে কারিমে এসেছে—
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ.
আল্লাহ তো একমাত্র মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন।
জ. আব্দুর রহমান ইবনি আবি লাইলা বলেন—
আমি ১২০ জন আনসারি সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি, তাদের কাউকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হলে তাদের প্রত্যেকেই পছন্দ করতেন তার ভাই এ ব্যাপারে যথেষ্ট।
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে লৌকিকতার কোনো ধারণাই ছিল না, নিজেকে প্রকাশের কোনো অভিলাষ তাদের ছিল না। এমনকি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে নিজেকে বাদ দিয়ে অন্যকেই তারা ভালো মনে করতেন।

টিকাঃ
৭০. আল-ইখলাস ওয়াস শিরকুল আসগার: ১৫
৭১. মুসনাদে আহমদ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪২৮; মান: আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখেন- সহিহুল জামে, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫
৭২. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৬০
৭০. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪১৯৮; জামি তিরমিজি : ৩১৭৫; মান: আলবানি সহিহ বলেছেন, দেখেন- সিলসিলাতুল আহাদিসিল মাওযূআ : ১৬২; সহিহ সুনানু ইবনি মাজাহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪০৯
৭৪. ইমাম বুখারি সহিহ বুখারি কিতাবের ‘তা’লিকান’ (মূল কিতাবের বাইরে; যা প্রাসঙ্গিক) এনেছেন।
৭৫. এটাকে ইমাম বুখারি তা’লিকান-এ এনেছেন।
৭৬. এটি ইমাম বুখারি তা’লিকান-এ এনেছেন।
৭৭. ইবনে কাসিরও এরকমই এনেছেন। দেখেন-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯; সিফাতুল মুনাফিকিন, ইবনুল কায়্যিম: ৩৬
৭৮. সিফাতুল মুনাফিকিন: ৩৬
৭৯. ইবনু আবি হাতেমের বরাত দিয়ে ইবনে কাসির তার তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪১; সূরা মায়িদা, আয়াত: ২৭
৮০. সূরা মায়েদা, আয়াত: ২৭
৮১. সুনানুদ দারিমি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৩; আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক, খন্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪০-৪৯

আমরা এতক্ষণের আলোচনা দ্বারা জানতে পারলাম, রিয়া সব আমলকে বিনষ্ট করে ফেলে, রিয়া আল্লাহর ক্রোধের কারণ সর্বোপরি রিয়া ধ্বংসাত্মক এক ব্যাধি এবং যা দাজ্জালের ফেতনার চেয়েও ভয়ঙ্কর।
সুতরাং আমাদের যার ভেতরে এই ভয়ানক ব্যধিটি রয়েছে, এর চিকিৎসার অতীব প্রয়োজন। মুক্তি পেতে হলে ভেতর থেকে ওই বিষবৃক্ষটি উপড়ে ফেলতে হবে। নিচে আমরা কিছু টিপস দিচ্ছি, যা এর চিকিৎসার কাজ দেবে, আমাদের ভেতর জগৎ ইখলাসে সমৃদ্ধ করবে।
• এক. দুনিয়ার জন্য আমল ও রিয়ার প্রকারভেদ জানতে হবে (যেমন পূর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে)। সেই সঙ্গে এসবের কারণ ও উৎস খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি এর মূলোৎপাটন ও প্রতিকার, প্রতিকারের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে। আমরা পূর্বে এ নিয়ে সামান্য আলোচনা করেছি।
• দুই. আল্লাহর মহত্ব ও বড়ত্ব জানতে হবে, ভালো করে বুঝতেও হবে। এ জন্য আপনাকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শের ভিত্তিতে আল্লাহর নাম, তার সিফাত, জগত পরিচালনায় তার অপরিসীম শক্তি ইত্যাদি ভালো করে জানতে হবে।
বান্দা যখন জানবে আল্লাহ এক, তিনিই কেবল উপকার-ক্ষতির মালিক, তিনি মানুষকে সম্মানিত করেন, তিনিই তাদের লাঞ্চিত করেন, তিনিই মানুষের মর্যদা বাড়ান এবং কমান, তিনি মানুষকে দান করেন, তিনিই তাদের বঞ্চিত করেন, তার হাতেই জীবন-মৃত্যু, তিনি অন্তরের গহীনে থাকা সবকিছুও জানেন। বান্দা যখন ভালো করে একথা বুঝবে যে, আল্লাহই একমাত্র আরাধনার উপযুক্ত, তখন তার এই বিশ্বাস ও বোধ তাকে ইখলাস হাসিলে সহায়তা করবে। সুতরাং আমাদেরকে তাওহিদ, তাওহিদের যাবতীয় প্রকারভেদ ভালো করে ঠিকভাবে জানতে হবে, ভালো করে বুঝতে হবে। তবে সেই জানা ও বুঝা হতে হবে নিরাপদ।
• তিন. মৃত্যুর বিভীষিকা, পরকাল, পরকালের পুরস্কার, শান্তি, কবরের আজাব ইত্যাদি ভালো করে জানতে হবে। এগুলো আপনার ইখলাস হাসিলে অন্যতম সহায়ক হতে পারে। পরকালের এসব বাস্তবতাবোধ নিজের মাঝে জাগ্রত হলে বুদ্ধিমান যে কোন ব্যক্তি রিয়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে।
• চার. রিয়া, দুনিয়ার জন্য আমলের ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা স্মরণ করতে হবে, ভয় করতে হবে। ভয় মানুষকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে, এবং সে মুক্তি পায়।

**রিয়া এসে গেলে আপনি কী করবেন**
আপনি যখন অনুভব করবেন, আপনার মন মানুষের প্রশংসা কুড়াতে লালায়িত হচ্ছে, মানুষের চোখে বড় হওয়ার তৃষ্ণা জেগেছে, আপনার ভেতরে রিয়া সংক্রমিত হচ্ছে, তখন আপনি এর ভয়ানক ক্ষতিগুলো চোখের সামনে তুলে আনবেন, ভাববেন আল্লাহর ক্রোধের কথা, দেখবেন, তা আপনাকে কাজ দিচ্ছে, রিয়া সংক্রমণ রোধে সাহায্য করছে। আর এটা করার জন্যই করতে হবে এমন নয়; বরং তা আবশ্যক আপনার, আমার, সবার জন্য।
যখন মানুষের বাহবা ও স্বীকৃতি পেতে চায় আপনার মন, তখন আপনি মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতার কথা ভাবেন।
ব্যক্তি যখন মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বলতার কথা ভাববে, তখন রিয়ার ব্যাধি থেকে সে অনেকটাই নিস্তার পাবে। এই জন্যই হয়তোবা কোনো সালাফের থেকে এ ধরনের উক্তি আছে, ‘তুমি নিজে নিজেই রিয়া দূর করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করো, আশপাশের মানুষদের মনে করো তারা শিশু বা তারা অবলা প্রাণী, যাদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে তোমার কিছু যায় আসে না, তোমার কাজের ব্যাপারে যাদের জানা বা না জানার আলাদা কোনো প্রভাব নেই। তুমি আল্লাহর জানা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো।’
রিয়ার ভয়ঙ্কর প্রভাব সম্পর্কে ভাবেন। রিয়ার কারণে বান্দার আমল নষ্ট হয়ে যায় এ কথা চিন্তা করেন। পরকালে রিয়ার ক্ষতির কথা মনে করেন। মুহাম্মাদ ইবনু লাবিদ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন—আমি তোমাদের ব্যাপারে ‘শিরকে আসগারে’র (ছোট শিরক) বেশি ভয় করি। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ‘শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন, তা হচ্ছে রিয়া। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন সবাইকে প্রতিদান দেবেন, তখন রিয়াকারীদের বলবেন, দুনিয়াতে তোমরা যাদের দেখানোর জন্য আমল করতে, আজ তোমরা তাদের কাছে গিয়ে দেখো কোনো প্রতিদান পাও কি না?
তারা যখন ভয় করছেন আমরা কী? আমাদের মর্যাদার পরিধি কতটুকু? সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িনে ইজাম, সালাফে সালেহিন পর্যন্ত রিয়ার এই প্রাদুর্ভাবকে খুব ভয় করে চলতেন। তাদের মতো মহৎ মানুষদেরও আশঙ্কা হতো। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত প্রচুর। এখানে কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো—
ক. কুরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে—
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَّقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ يَرْجِعُونَ.
এবং যারা তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে এই বিশ্বাসে তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে।
এই আয়াতে বর্ণিত ভয়কারী সম্পর্কে উম্মুল মুমিনিন আয়িশা রাজিয়াল্লাহু আনহা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন—
ইয়া রাসূলাল্লাহ, সে (ভয়কারী) কি ওই ব্যক্তি, যে জিনা করে, চুরি করে, মদ পান করে?
তিনি বললেন—
শোনো আবু বকরের কন্যা, (অথবা বলেছেন, সিদ্দিকের কন্যা) তা না। ব্যক্তি রোজা রাখে, সদকা করে, সালাত আদায় করে এর সাথে কবুল না হওয়ারও আশঙ্কা করে।
খ. ইবনু আবি মুলাইকা রাহিমাহুল্লাহ বলেন—তিরিশজন সাহাবির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে নেফাকের (কপটতা) ভয় করেতন, কেউই এ কথা বলতেন না, তার ঈমান জিবরাইল মিকাইলের ঈমানের সমমর্যাদার হয়ে গেছে।
গ. ইবারাহিম আত-তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—আমি যখনই আমার কথাকে আমার আমলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে যাই, তখন আমার মিথ্যাবাদী হয়ে যাবার ভয় হয়।
ঘ. হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত—মুমিন ব্যক্তি নেফাকের ভয় করে থাকে, এ থেকে আশংকা মুক্ত থাকে কেবল মুনাফিকই।
ঙ. উমর রাজিয়াল্লাহু হুজাইফা রাজিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন—আমি তোমাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আমার নাম তাদের (মুনাফিকদের) তালিকাভুক্ত করেছেন? তিনি বললেন, না। আপনার (ঈমানের) চেয়ে আর কাউকে (অন্য কারও ঈমান) তো বেশি নির্মল ভাবা যায় না।
চ. আবুদ্দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন—
হে আল্লাহ, আমি ‘খুশু-সংশ্লিষ্ট নেফাক’ থেকে পানাহ চাচ্ছি।
তাকে জিজ্ঞেস করা হলো—
‘খুশু-সংশ্লিষ্ট নেফাক’ আবার কী?
তিনি বলেন—
বাহ্যিক অবস্থায় মনে হবে তার খুশু আছে, কিন্তু অন্তর খুশুশূন্য।
ছ. আবুদ্দারদা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলতেন—
আমি যদি আমার এক ওয়াক্তের সালাত কবুল হবার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি, তাহলে তা আমার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু থেকেও অধিক প্রিয়।
কুরআনে কারিমে এসেছে—
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ.
আল্লাহ তো একমাত্র মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন।
জ. আব্দুর রহমান ইবনি আবি লাইলা বলেন—
আমি ১২০ জন আনসারি সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি, তাদের কাউকে কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হলে তাদের প্রত্যেকেই পছন্দ করতেন তার ভাই এ ব্যাপারে যথেষ্ট।
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে লৌকিকতার কোনো ধারণাই ছিল না, নিজেকে প্রকাশের কোনো অভিলাষ তাদের ছিল না। এমনকি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে নিজেকে বাদ দিয়ে অন্যকেই তারা ভালো মনে করতেন।

টিকাঃ
৭০. আল-ইখলাস ওয়াস শিরকুল আসগার: ১৫
৭১. মুসনাদে আহমদ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪২৮; মান: আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখেন- সহিহুল জামে, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫
৭২. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৬০
৭০. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪১৯৮; জামি তিরমিজি : ৩১৭৫; মান: আলবানি সহিহ বলেছেন, দেখেন- সিলসিলাতুল আহাদিসিল মাওযূআ : ১৬২; সহিহ সুনানু ইবনি মাজাহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪০৯
৭৪. ইমাম বুখারি সহিহ বুখারি কিতাবের ‘তা’লিকান’ (মূল কিতাবের বাইরে; যা প্রাসঙ্গিক) এনেছেন।
৭৫. এটাকে ইমাম বুখারি তা’লিকান-এ এনেছেন।
৭৬. এটি ইমাম বুখারি তা’লিকান-এ এনেছেন।
৭৭. ইবনে কাসিরও এরকমই এনেছেন। দেখেন-আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৯; সিফাতুল মুনাফিকিন, ইবনুল কায়্যিম: ৩৬
৭৮. সিফাতুল মুনাফিকিন: ৩৬
৭৯. ইবনু আবি হাতেমের বরাত দিয়ে ইবনে কাসির তার তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪১; সূরা মায়িদা, আয়াত: ২৭
৮০. সূরা মায়েদা, আয়াত: ২৭
৮১. সুনানুদ দারিমি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৩; আজ-জুহদ, ইবনুল মুবারক, খন্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪০-৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00