📄 রিয়ার ভিন্ন আরও কিছু প্রকার
রিয়া আকার-প্রকৃতি, রূপ-রঙে বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আল্লাহ সবগুলো থেকেই আমাদের রক্ষা করেন। নিচে রিয়ার কিছু রূপ দেখে নেওয়া যাক—
* সুস্পষ্টভাবেই ব্যক্তির আমলের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে গাইরুল্লাহ তথা লোক দেখানো। সে মনে প্রাণে কামনা করে, তার ইবাদত মানুষ দেখুক। জানুক তার ইবাদতের বিশাল ফিরিস্তি। এটা স্পষ্ট রিয়া এবং তা নেফাকের একটা প্রকার।
* প্রথমে তার কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই উদ্দেশ্য থাকে; কিন্তু যখন তার এই ইবাদতের কথা মানুষ জেনে ফেলে, তখন সে আগের অবস্থান থেকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ভেতরে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব তৈরি হয়, এর প্রভাবে ইবাদতকে সে আরও সুন্দর করতে আগ্রহী হয়, যেই ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টির মানসিকতা হারিয়ে যায় এবং তার চেষ্টা থাকে মানুষকে আকর্ষণ করার। এটা হল ‘অন্তরের শিরক’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা অন্তরের শিরক বা গোপন শিরক থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন—ইয়া রাসুলাল্লাহ, অন্তরের শিরক কী? তিনি বললেন, ব্যক্তি সালাত শুরু করার পর মানুষের দৃষ্টি কাড়তে প্রাণপণে সালাত সুন্দর করার চেষ্টা করে। এটাই হচ্ছে গোপন বা অন্তরের শিরক।
ব্যক্তি ইবাদত খালেস নিয়তে শুরু করে এবং এভাবে সে ইবাদত শেষও করে; কিন্তু ইবাদত শেষে যখন তার প্রশংসা করা হয়, তখন তার অন্তর সেই প্রশংসাকে সাদরে গ্রহণ করে। এরপর তার অন্তর মানুষের প্রশংসা, নাম-যশ-খ্যাতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, দুনিয়ার স্বার্থের প্রতি তার মন আকৃষ্ট হয়। এই যে তার খুশি হওয়া, মানুষের প্রশংসার প্রতি দুর্বল হওয়া, দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়া ইত্যাদি এসবই তার গোপন শিরকের জানান দেয়।
রিয়া কখনো বাহ্যিক শরীর-সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। যেমন—
* কেউ কৃত্রিমভাবে চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে তোলে; স্বাস্থ্য, বাহ্যিক আকার-আকৃতিকে ইচ্ছে করেই দুর্বল করে রাখে। এর দ্বারা সে লোকেদের বোঝাতে চায়, সে আখেরাত নিয়ে খুব টেনশন করে, তাই তার চেহারা-ফিগার, স্বাস্থ্যের এই দুরাবস্থা। অথবা মনে করেন—রোজাদার কেউ কোনো কথা বলছে না, ঠোঁট শুকিয়ে রেখেছে, উদ্দেশ্য সে রোজাদার এ কথা বোঝানো।
রিয়া কখনো বাহ্যিক বেশভূষা ধারণেও হতে পারে। যেমন কেউ একজন নিজেকে ‘জাহিদ’ (দুনিয়াবিমুখ) প্রকাশ করার জন্য জোড়াতালির কাপড় পরে, অথবা নিজেকে আলেম বোঝাতে আলেমরদের জন্য নির্ধারিত এবং সমাজে যা তাদের একান্ত পরিচায়ক এরূপ পোশাক পরে।
আবার রিয়া কখনো মানুষের মুখকেন্দ্রিক হতে পারে। এটা অবশ্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে থাকে। তারা প্রচুর নুসুস, দলিল-আদিল্লাহ, তত্ত্ব ও তথ্যের ঝুলি নিয়ে আসেন, যাতে বাহাস-মুবাহাসায় তার জয় নিশ্চিত হয় এবং তার গভীর জ্ঞানের ঝলক দেখে মানুষ।
রিয়া কখনো আমলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে এবং এটা বোঝা খুব সহজ। যেমন—একজন কেবল মানুষকে দেখানোর জন্যই দীর্ঘ সালাত আদায় করে, রুকু-সিজদায় প্রচুর সময় কাটাচ্ছে, আবার খুশুখুজুও প্রকাশ করছে। অনুরূপ সিয়াম, হজ, সদকা ইত্যাদিতে সে কেবল মানুষ দেখানোর জন্যই আমল করে থাকে।
ভক্ত, মুরিদ, ফলোয়ার ইত্যাদির উচ্চাভিলাষের মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। যেমন কেউ দ্বীনের কোনো খেদমত করছে সবার কেন্দ্রবিন্দু হবার জন্য। মানুষ যেন একথা বলে, দ্বীনি বিষয়ে অমুক ব্যক্তির নিকট মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অথবা বড়দের সান্নিধ্য লাভ প্রকাশের মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। যেমন কেউ বড়ো কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে যায়, তার কাছে সময় কাটায়। তার উদ্দেশ্য—মানুষ যেন একথা বলে—অমুক তো অমুকের সান্নিধ্যে থেকেছে। সময় কাটিয়েছে তার কাছে।
কখনো কৃত্রিম বিনয় প্রকাশ, নিজেকে ছোট জাহির করার মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। বিষয়টা খুব সূক্ষ্ম। যেমন কেউ একজন জনসম্মুখে নিজেকে অযোগ্য, ছোট ইত্যাদি বলে প্রকাশ করল, কিন্তু এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে তার মর্যাদা বাড়বে, মানুষ তার প্রশংসা করবে।
অথবা মনে করেন—কেউ গোপনে আমল করে, সে চায় না, তা অন্যের সামনে তা প্রকাশ হোক, এবং প্রকাশ পেলে সে খুশিও হতে চায় না; কিন্তু মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে তার মনে মনে কামনা থাকে—মানুষ আগে তাকে সালাম করুক, সম্মান প্রদর্শন করুক, মানুষ তার প্রয়োজনাদি সেরে দিক, বিকিকিনির সময় তার সাথে মানুষের লেনদেন একটু সদয় হোক। এর বিপরীত হলে মনে সে কষ্ট পায়। যেন সে তার গোপনীয় সৎকাজের মাধ্যমেই এসব অধিকার কামনা করছে। মনে রাখবেন, এটাও সূক্ষ্ম এক প্রকার রিয়া।
ইখলাসকে কাঙ্ক্ষিত বস্তুর জন্য উসিলা বানানো এটাও সূক্ষ্ম এক ধরনের রিয়া। ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে একটি ঘটনা এনেছেন। ইমাম গাজালি কারও থেকে জানতে পারলেন—যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর জন্যই চল্লিশদিন সময় কাটায় (ইবাদত-বন্দেগিতে ডুবে থাকে), তার প্রচুর ‘হিকমাত’ (প্রজ্ঞা) অর্জন হয়। তিনি বলেন, আমি চল্লিশদিন কাটালেও কোনো ফলাফল আসে নি। বিষয়টা তাই আমি কোনো বুজুর্গকে জানালাম। তিনি বললেন, তুমি তো হিকমাত লাভের জন্য সময় কাটিয়েছ, আল্লাহর জন্য সময় দাও নি।
হিকমাত-প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতার ইত্যাদি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য, মানুষের প্রশংসা, বাহবা-লাভের জন্য মানুষ লালায়িত থাকে। আঁকুপাঁকু করে মানুষের মন; কিন্তু ইখলাস অর্জন করতে হলে ভেতর থেকে এসব ঝেড়ে ফেলতে হবে। এসব পাওয়া ও লাভের কামনা যদি আপনার মনে থাকে, তাহলে আপনার মনে ইখলাস থাকতে পারে না। আর ইখলাসই যদি থেকে থাকার দাবি করেন, তাহলে আপনার ভেতর এসব বিষয়ের কামনা থাকতে পারে না। দুটোই দুটোর জন্য প্রতিবন্ধক।
**রিয়ার বিভিন্ন প্রকার ও তার দুর্মর প্রভাব**
রিয়ার অনেক প্রকার রয়েছে। ভয়ঙ্কর রিয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য এসব জানার বিকল্প নেই এবং প্রত্যেক মুসলিমের তা জানা থাকা জরুরি। এখানে আমরা রিয়ার কিছু প্রকার উল্লেখ করছি—
• এক. নিতান্তই তা রিয়া; এখানে রিয়া ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য সক্রিয় থাকে না। নবীযুগের মুনাফিকদের মতো তাদের অবস্থা—
وإذا قاموا إلي الصلاة إلي الصلاة قاموا كسا لي يراءون الناس ولا يذكرون الله إلا قليلا.
আর যখন তারা (মুনাফিক) সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়—কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।
এ প্রকারের রিয়া শুধু সালাত-সিয়ামে সীমাবদ্ধ না; জাকাত-হজসহ অন্যান্য প্রকাশ্য শারীরিক ও আর্থিক আমলেও এর প্রকাশ ঘটতে পারে। নিঃসন্দেহে এটা ভ্রান্তি এবং এর শাস্তি কঠিনতর। এটা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে।
• দুই. আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়ে থাকলেও যার আগাগোড়া রিয়ার বিষবাষ্প থেকে মুক্ত না। বিশুদ্ধ প্রমাণাদি এটাকেও বাতিল বলে আখ্যায়িত করে।
• তিন. শুরুতে ইখলাসের সাথেই সে আমল করে যাচ্ছিল; কিন্তু মাঝখানে এসে রিয়া ঢুকে পড়েছে। এই ব্যক্তির আমলের দুটি অবস্থা হতে পারে—
ক. ইবাদতের প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশের সাথে মিলবে না। ফলে প্রথম অংশের ইবাদত বিশুদ্ধ হবে, দ্বিতীয় অংশের ইবাদত শুদ্ধ হবে না। ধরে নিই, আপনি বিশ টাকা সদকা করছেন। প্রথম দশটাকায় আপনার নিয়ত ভালো ছিল, ইখলাসের সাথেই সেই দশ টাকা সদকা করছেন, অন্যদিকে বাকি দশটাকা সদকার সময় আপনার ভেতরে লৌকিকতা এসে পড়ল, তাহলে প্রথম দশটাকা নিঃসন্দেহে ইখলাস থাকার কারণে কুবল হচ্ছে, শেষের দশটাকা রিয়া এসে যাবার কারণে কবুল হবে না।
খ. যদি ইবাদতের প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশের সাথে মিলে তাহলে এখানেও দুটি অবস্থা হবে—
+ এক. রিয়ার ভাব আসার পর আপনি তা দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, আপনি তা থেকে বিমুখ থাকতে চেয়েছেন, এটাকে আপনি ঘৃণার চোখে দেখেছেন, তাহলে তা অবশ্যই মাফ। এর জন্য আল্লাহ তাআলা পাকড়াও করবেন না। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মনে যদি কোনো অন্যায়ের চিন্তা আসে, তাহলে কার্যে পরিণত করা পর্যন্ত (বা মুখে প্রকাশ করা পর্যন্ত) আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন।
+ দুই. রিয়ার ভাব ভেতরে আসার পর আপনার মাঝে যদি তা স্থায়িত্ব লাভ করে, আপনি তা দূর করার কোনো চেষ্টা না করেন, তাহলে আপনার এই রিয়া ধ্বংসাত্মক; যা আপনার সব আমলকে ধ্বংস করে ছাড়বে। কারণ এখানে ভালো অংশাটাও খারাপের সাথে মিশে পুরোটাই খারাপে পর্যবসিত হয়েছে। ধরেন, আপনি দুই রাকাত সালাত আদায় করছেন। প্রথম রাকাতে কোনো রিয়া আসে নি; কিন্তু দ্বিতীয় রাকাত শুরু করার পর রিয়া এসে আপনার কাঁধে ভর করেছে, আপনি তা দূর করার কোনো চেষ্টাও করছেন না, তাহলে ভালো অংশের সাথে খারাপের যোগসূত্র থাকার কারণে আপনার পুরো সালাতই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
১৪) ইবাদত সমাপ্ত হওয়ার পর রিয়া এসে ঢোকে। তবে এখানে একটি জিনিস মনে রাখবেন, মুসলিম বান্দা পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আমল করার পর যদি আল্লাহ তাআলা বান্দাদের মাঝে তার সুনাম ছড়িয়ে দেন, এরপর আমলকারী ব্যক্তি আল্লাহর মহান এই অনুগ্রহের কারণে খুশি হয় এবং সুসংবাদ গ্রহণ করে, তাহলে এতে কোনো ক্ষতি নেই।
মুমিন বান্দা কোনো আমল করার পর মানুষ যদি তার প্রশংসা শুরু করে দেয়—এ ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রতিউত্তরে তিনি বলেন—এটা তো মুমিনের আগাম সুসংবাদ।
টিকাঃ
৬১. সহিহ ইবনু খুজাইমা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৬৭; সুনানু বাইহাকি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৯১; আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখেন—তারগিব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭
৬২. বিস্তারিত জানতে দেখেন নিচের বইগুলো— درء تعارض العقل والنقل لإبن تيمية ٦/٦٦ ، منهاج القاصدين ٢١٤-٤٢١, الإخلاص للعوايشه ٢٤, الإخلاص والشرك الأصغر للدكتور عبد العزيز بن عبد اللطيف ص 9، الرياء لسليم الهلالي ص ۱۷
৬৩. সূরা নিসা, আয়াত: ১৪২
৬৪. সহিহ মুসলিম : ১২৭
৬৫. বিস্তারিত দেখেন জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ইবনু রজব, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭৯-৮৪; ফাতহুল মাজিদ: ৪৩৮; ফাতওয়া ইবনু উসাইমিন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৯
৬৬. ফাতওয়া ইবনু উসাইমিন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩০
৬৭. সহিহ মুসলিম: ২৬৪২
রিয়া আকার-প্রকৃতি, রূপ-রঙে বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আল্লাহ সবগুলো থেকেই আমাদের রক্ষা করেন। নিচে রিয়ার কিছু রূপ দেখে নেওয়া যাক—
* সুস্পষ্টভাবেই ব্যক্তির আমলের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে গাইরুল্লাহ তথা লোক দেখানো। সে মনে প্রাণে কামনা করে, তার ইবাদত মানুষ দেখুক। জানুক তার ইবাদতের বিশাল ফিরিস্তি। এটা স্পষ্ট রিয়া এবং তা নেফাকের একটা প্রকার।
* প্রথমে তার কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই উদ্দেশ্য থাকে; কিন্তু যখন তার এই ইবাদতের কথা মানুষ জেনে ফেলে, তখন সে আগের অবস্থান থেকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ভেতরে এক ধরনের উৎফুল্ল ভাব তৈরি হয়, এর প্রভাবে ইবাদতকে সে আরও সুন্দর করতে আগ্রহী হয়, যেই ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টির মানসিকতা হারিয়ে যায় এবং তার চেষ্টা থাকে মানুষকে আকর্ষণ করার। এটা হল ‘অন্তরের শিরক’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা অন্তরের শিরক বা গোপন শিরক থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন—ইয়া রাসুলাল্লাহ, অন্তরের শিরক কী? তিনি বললেন, ব্যক্তি সালাত শুরু করার পর মানুষের দৃষ্টি কাড়তে প্রাণপণে সালাত সুন্দর করার চেষ্টা করে। এটাই হচ্ছে গোপন বা অন্তরের শিরক।
ব্যক্তি ইবাদত খালেস নিয়তে শুরু করে এবং এভাবে সে ইবাদত শেষও করে; কিন্তু ইবাদত শেষে যখন তার প্রশংসা করা হয়, তখন তার অন্তর সেই প্রশংসাকে সাদরে গ্রহণ করে। এরপর তার অন্তর মানুষের প্রশংসা, নাম-যশ-খ্যাতির দিকে ঝুঁকে পড়ে, দুনিয়ার স্বার্থের প্রতি তার মন আকৃষ্ট হয়। এই যে তার খুশি হওয়া, মানুষের প্রশংসার প্রতি দুর্বল হওয়া, দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়া ইত্যাদি এসবই তার গোপন শিরকের জানান দেয়।
রিয়া কখনো বাহ্যিক শরীর-সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। যেমন—
* কেউ কৃত্রিমভাবে চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে তোলে; স্বাস্থ্য, বাহ্যিক আকার-আকৃতিকে ইচ্ছে করেই দুর্বল করে রাখে। এর দ্বারা সে লোকেদের বোঝাতে চায়, সে আখেরাত নিয়ে খুব টেনশন করে, তাই তার চেহারা-ফিগার, স্বাস্থ্যের এই দুরাবস্থা। অথবা মনে করেন—রোজাদার কেউ কোনো কথা বলছে না, ঠোঁট শুকিয়ে রেখেছে, উদ্দেশ্য সে রোজাদার এ কথা বোঝানো।
রিয়া কখনো বাহ্যিক বেশভূষা ধারণেও হতে পারে। যেমন কেউ একজন নিজেকে ‘জাহিদ’ (দুনিয়াবিমুখ) প্রকাশ করার জন্য জোড়াতালির কাপড় পরে, অথবা নিজেকে আলেম বোঝাতে আলেমরদের জন্য নির্ধারিত এবং সমাজে যা তাদের একান্ত পরিচায়ক এরূপ পোশাক পরে।
আবার রিয়া কখনো মানুষের মুখকেন্দ্রিক হতে পারে। এটা অবশ্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে থাকে। তারা প্রচুর নুসুস, দলিল-আদিল্লাহ, তত্ত্ব ও তথ্যের ঝুলি নিয়ে আসেন, যাতে বাহাস-মুবাহাসায় তার জয় নিশ্চিত হয় এবং তার গভীর জ্ঞানের ঝলক দেখে মানুষ।
রিয়া কখনো আমলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে এবং এটা বোঝা খুব সহজ। যেমন—একজন কেবল মানুষকে দেখানোর জন্যই দীর্ঘ সালাত আদায় করে, রুকু-সিজদায় প্রচুর সময় কাটাচ্ছে, আবার খুশুখুজুও প্রকাশ করছে। অনুরূপ সিয়াম, হজ, সদকা ইত্যাদিতে সে কেবল মানুষ দেখানোর জন্যই আমল করে থাকে।
ভক্ত, মুরিদ, ফলোয়ার ইত্যাদির উচ্চাভিলাষের মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। যেমন কেউ দ্বীনের কোনো খেদমত করছে সবার কেন্দ্রবিন্দু হবার জন্য। মানুষ যেন একথা বলে, দ্বীনি বিষয়ে অমুক ব্যক্তির নিকট মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অথবা বড়দের সান্নিধ্য লাভ প্রকাশের মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। যেমন কেউ বড়ো কোনো ব্যক্তির সান্নিধ্যে যায়, তার কাছে সময় কাটায়। তার উদ্দেশ্য—মানুষ যেন একথা বলে—অমুক তো অমুকের সান্নিধ্যে থেকেছে। সময় কাটিয়েছে তার কাছে।
কখনো কৃত্রিম বিনয় প্রকাশ, নিজেকে ছোট জাহির করার মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে। বিষয়টা খুব সূক্ষ্ম। যেমন কেউ একজন জনসম্মুখে নিজেকে অযোগ্য, ছোট ইত্যাদি বলে প্রকাশ করল, কিন্তু এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে বিনয় প্রকাশের মাধ্যমে তার মর্যাদা বাড়বে, মানুষ তার প্রশংসা করবে।
অথবা মনে করেন—কেউ গোপনে আমল করে, সে চায় না, তা অন্যের সামনে তা প্রকাশ হোক, এবং প্রকাশ পেলে সে খুশিও হতে চায় না; কিন্তু মানুষের সাথে সাক্ষাৎকালে তার মনে মনে কামনা থাকে—মানুষ আগে তাকে সালাম করুক, সম্মান প্রদর্শন করুক, মানুষ তার প্রয়োজনাদি সেরে দিক, বিকিকিনির সময় তার সাথে মানুষের লেনদেন একটু সদয় হোক। এর বিপরীত হলে মনে সে কষ্ট পায়। যেন সে তার গোপনীয় সৎকাজের মাধ্যমেই এসব অধিকার কামনা করছে। মনে রাখবেন, এটাও সূক্ষ্ম এক প্রকার রিয়া।
ইখলাসকে কাঙ্ক্ষিত বস্তুর জন্য উসিলা বানানো এটাও সূক্ষ্ম এক ধরনের রিয়া। ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে একটি ঘটনা এনেছেন। ইমাম গাজালি কারও থেকে জানতে পারলেন—যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর জন্যই চল্লিশদিন সময় কাটায় (ইবাদত-বন্দেগিতে ডুবে থাকে), তার প্রচুর ‘হিকমাত’ (প্রজ্ঞা) অর্জন হয়। তিনি বলেন, আমি চল্লিশদিন কাটালেও কোনো ফলাফল আসে নি। বিষয়টা তাই আমি কোনো বুজুর্গকে জানালাম। তিনি বললেন, তুমি তো হিকমাত লাভের জন্য সময় কাটিয়েছ, আল্লাহর জন্য সময় দাও নি।
হিকমাত-প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতার ইত্যাদি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য, মানুষের প্রশংসা, বাহবা-লাভের জন্য মানুষ লালায়িত থাকে। আঁকুপাঁকু করে মানুষের মন; কিন্তু ইখলাস অর্জন করতে হলে ভেতর থেকে এসব ঝেড়ে ফেলতে হবে। এসব পাওয়া ও লাভের কামনা যদি আপনার মনে থাকে, তাহলে আপনার মনে ইখলাস থাকতে পারে না। আর ইখলাসই যদি থেকে থাকার দাবি করেন, তাহলে আপনার ভেতর এসব বিষয়ের কামনা থাকতে পারে না। দুটোই দুটোর জন্য প্রতিবন্ধক।
**রিয়ার বিভিন্ন প্রকার ও তার দুর্মর প্রভাব**
রিয়ার অনেক প্রকার রয়েছে। ভয়ঙ্কর রিয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য এসব জানার বিকল্প নেই এবং প্রত্যেক মুসলিমের তা জানা থাকা জরুরি। এখানে আমরা রিয়ার কিছু প্রকার উল্লেখ করছি—
• এক. নিতান্তই তা রিয়া; এখানে রিয়া ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য সক্রিয় থাকে না। নবীযুগের মুনাফিকদের মতো তাদের অবস্থা—
وإذا قاموا إلي الصلاة إلي الصلاة قاموا كسا لي يراءون الناس ولا يذكرون الله إلا قليلا.
আর যখন তারা (মুনাফিক) সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায়—কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।
এ প্রকারের রিয়া শুধু সালাত-সিয়ামে সীমাবদ্ধ না; জাকাত-হজসহ অন্যান্য প্রকাশ্য শারীরিক ও আর্থিক আমলেও এর প্রকাশ ঘটতে পারে। নিঃসন্দেহে এটা ভ্রান্তি এবং এর শাস্তি কঠিনতর। এটা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে।
• দুই. আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়ে থাকলেও যার আগাগোড়া রিয়ার বিষবাষ্প থেকে মুক্ত না। বিশুদ্ধ প্রমাণাদি এটাকেও বাতিল বলে আখ্যায়িত করে।
• তিন. শুরুতে ইখলাসের সাথেই সে আমল করে যাচ্ছিল; কিন্তু মাঝখানে এসে রিয়া ঢুকে পড়েছে। এই ব্যক্তির আমলের দুটি অবস্থা হতে পারে—
ক. ইবাদতের প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশের সাথে মিলবে না। ফলে প্রথম অংশের ইবাদত বিশুদ্ধ হবে, দ্বিতীয় অংশের ইবাদত শুদ্ধ হবে না। ধরে নিই, আপনি বিশ টাকা সদকা করছেন। প্রথম দশটাকায় আপনার নিয়ত ভালো ছিল, ইখলাসের সাথেই সেই দশ টাকা সদকা করছেন, অন্যদিকে বাকি দশটাকা সদকার সময় আপনার ভেতরে লৌকিকতা এসে পড়ল, তাহলে প্রথম দশটাকা নিঃসন্দেহে ইখলাস থাকার কারণে কুবল হচ্ছে, শেষের দশটাকা রিয়া এসে যাবার কারণে কবুল হবে না।
খ. যদি ইবাদতের প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশের সাথে মিলে তাহলে এখানেও দুটি অবস্থা হবে—
+ এক. রিয়ার ভাব আসার পর আপনি তা দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, আপনি তা থেকে বিমুখ থাকতে চেয়েছেন, এটাকে আপনি ঘৃণার চোখে দেখেছেন, তাহলে তা অবশ্যই মাফ। এর জন্য আল্লাহ তাআলা পাকড়াও করবেন না। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মনে যদি কোনো অন্যায়ের চিন্তা আসে, তাহলে কার্যে পরিণত করা পর্যন্ত (বা মুখে প্রকাশ করা পর্যন্ত) আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন।
+ দুই. রিয়ার ভাব ভেতরে আসার পর আপনার মাঝে যদি তা স্থায়িত্ব লাভ করে, আপনি তা দূর করার কোনো চেষ্টা না করেন, তাহলে আপনার এই রিয়া ধ্বংসাত্মক; যা আপনার সব আমলকে ধ্বংস করে ছাড়বে। কারণ এখানে ভালো অংশাটাও খারাপের সাথে মিশে পুরোটাই খারাপে পর্যবসিত হয়েছে। ধরেন, আপনি দুই রাকাত সালাত আদায় করছেন। প্রথম রাকাতে কোনো রিয়া আসে নি; কিন্তু দ্বিতীয় রাকাত শুরু করার পর রিয়া এসে আপনার কাঁধে ভর করেছে, আপনি তা দূর করার কোনো চেষ্টাও করছেন না, তাহলে ভালো অংশের সাথে খারাপের যোগসূত্র থাকার কারণে আপনার পুরো সালাতই বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
১৪) ইবাদত সমাপ্ত হওয়ার পর রিয়া এসে ঢোকে। তবে এখানে একটি জিনিস মনে রাখবেন, মুসলিম বান্দা পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আমল করার পর যদি আল্লাহ তাআলা বান্দাদের মাঝে তার সুনাম ছড়িয়ে দেন, এরপর আমলকারী ব্যক্তি আল্লাহর মহান এই অনুগ্রহের কারণে খুশি হয় এবং সুসংবাদ গ্রহণ করে, তাহলে এতে কোনো ক্ষতি নেই।
মুমিন বান্দা কোনো আমল করার পর মানুষ যদি তার প্রশংসা শুরু করে দেয়—এ ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রতিউত্তরে তিনি বলেন—এটা তো মুমিনের আগাম সুসংবাদ।
টিকাঃ
৬১. সহিহ ইবনু খুজাইমা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৬৭; সুনানু বাইহাকি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৯১; আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখেন—তারগিব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭
৬২. বিস্তারিত জানতে দেখেন নিচের বইগুলো— درء تعارض العقل والنقل لإبن تيمية ٦/٦٦ ، منهاج القاصدين ٢١٤-٤٢١, الإخلاص للعوايشه ٢٤, الإخلاص والشرك الأصغر للدكتور عبد العزيز بن عبد اللطيف ص 9، الرياء لسليم الهلالي ص ۱۷
৬৩. সূরা নিসা, আয়াত: ১৪২
৬৪. সহিহ মুসলিম : ১২৭
৬৫. বিস্তারিত দেখেন জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, ইবনু রজব, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭৯-৮৪; ফাতহুল মাজিদ: ৪৩৮; ফাতওয়া ইবনু উসাইমিন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৯
৬৬. ফাতওয়া ইবনু উসাইমিন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩০
৬৭. সহিহ মুসলিম: ২৬৪২