📘 ইখলাস ২ > 📄 রিয়া এবং তার ভয়ার্ত চেহারা

📄 রিয়া এবং তার ভয়ার্ত চেহারা


রিয়া এমন ভয়ঙ্কর জিনিস, যা ব্যক্তি, সমাজ, জাতি—সবার জন্যই বিরাট ক্ষতিকর। রিয়ার কারণে মানুষের সবচে বড় যে ক্ষতি, তা হলো, ইবাদত বিনষ্ট হয়ে যাওয়া। এছাড়াও রিয়ার ক্ষতি সম্পর্কে নিচের কথাগুলো থেকে ধারণা নিতে পারেন:
এক. রিয়া মুসলিমদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
আমি কি তোমাদের এমন একটা বিষয়ে সংবাদ দেবো; যা আমার কাছে তোমাদের জন্য দাজ্জালের ফেতনার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়? তা হলো গোপন শিরক। ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং তা খুব সুন্দরভাবেই আদায় করছে—মানুষের দৃষ্টি কাড়ার জন্য।
দুই. বাঘ যেমন ছাগলের জন্য ধ্বংসকারী, রিয়া এর চেয়েও বেশি ধ্বংস করে ব্যক্তিকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—সম্পদের লোভ এবং দ্বীনের মাধ্যমে দুনিয়ার মর্যাদালাভের অভিলাষ ছাগলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া ক্ষুধার্ত নেকড়ের চেয়েও বেশি অনিষ্ট সাধনকারী।
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝিয়েছেন, মালের প্রতি মানুষের লোভ তা দ্বীনের জন্য বিরাট ক্ষতিকর; যা আল্লাহর আনুগত্য থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে। অনুরূপ দ্বীনি কাজের মাধ্যমে দুনিয়ার স্বার্থলাভ; যা লৌকিকতা, সুখ্যাতি অর্জনের তীব্র ইচ্ছা ইত্যাদির মাধ্যমেও হয়ে থাকে এটাও দ্বীনের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনে।
তিন. রিয়ার কারণে মানুষের আমল ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়, এর বরকত বিনষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—
‏كالذي ينفق ما له رئاء الناس ولا يؤمن بالله واليوم ‏الآخر، فمثله كمثل صفوان عليه تراب فأصابه وابل فتركه صلدا لا يقدرون علي شيئ مما كسبوا والله لا يهدي القوم الكافرين.
হে মুমিনগণ, দানের কথা বলে বেড়িয়ে এবং কষ্ট দিয়ে (তোমরা তোমাদের দানকে) ওই ব্যক্তির ন্যায় (নিষ্ফল করো না), যে নিজের ধনসম্পদ লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে না। তার উপমা একটি মসৃণ পাথর—যার ওপর কিছু মাটি থাকে; তারপর তার ওপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে পরিস্কার করে রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে সক্ষম হবে না। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
রিয়ার আমল বিনষ্টকরণ এমন এক সময় প্রকাশ পায়, যখন মানুষের সুদিন ফুরিয়ে যায়। যখন তার শক্তি-সামর্থ প্রতিরোধক্ষমতা সব বিলীন হয়ে যায়। আর তা হলো বার্ধক্যের দুর্দিন। কুরআনে কারিমের ভাষায়—
ايود أحد كم أن تكون له جنة من نخيل وأعناب تجري من تحتها الانهار له فيها من كل الثمرات وأصابه الكبر وله ذرية ضعفاء فأصابها إعصار فيه نار فاحترقت كذالك يبين الله لكم الآيات لعلكم تتفكرون.
তোমাদের কেউ কি চায় যে, তার খেজুর ও আঙুরের একটি বাগান থাকে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং যাতে সবধরনের ফলমূল আছে, যখন সে ব্যক্তি বার্ধক্যে উপনীত হয় এবং তার সন্তান-সন্ততি দুর্বল, এরপর তার ওপর এক অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝড় আপতিত হয় ফলে তা জ্বলে যায়? এভাবে আল্লাহ তার নিদর্শন তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার।
মানুষের সবগুলো সৎকাজ প্রচুর ফলসমৃদ্ধ বিশাল একটা বাগানের মতো। এখন কেউ কি চাইবে ‘রিয়ার আগুন’ দিয়ে এত সুন্দর বাগান, যার ওপর ভর করে তার বেঁচে থাকা সেটা বিনষ্ট করে ফেলতে?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি শিরকের ক্ষেত্রে আমার শরিকদের অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, তাহলে সে ও শিরকে আমার কিছু আসে যায় না। (বরং এটা তার নিজের জন্যই ক্ষতি।)
আল্লাহ তাআলা অবশ্যম্ভাবী কিয়ামতের দিন যখন পূর্ববর্তী-পরবর্তী সকল মানুষতে জমা করবেন তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকবে, যে আল্লাহর জন্য কোনো ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক করছে সে যেন তার ইবাদতের সওয়াব আল্লাহ ছাড়া সেই ‘অন্য’ থেকেই কামনা করে। কারণ, আল্লাহ তাআলা শিরকের ক্ষেত্রে তার শরিকদের অমুখাপেক্ষী।
চার. রিয়া জাহান্নামের শাস্তির বিশেষ কারণ। কিয়ামতের দিন রিয়া করেছে এমন কুরআন তিলাওয়াতকারী, মুজাহিদ, দানশীল ব্যক্তিদের নিক্ষেপের মাধ্যমেই জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে। তারা সৎকাজ করলেও উদ্দেশ্য তাদের সৎ ছিল না। তিলাওয়াত করেছে মানুষ তাকে কারি বলবে, জিহাদ করছে মানুষ তাকে মুজাহিদ বলবে, দান করেছে মানুষ তাকে দানবীর বলবে এই কারণে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও নৈকট্যলাভ তার উদ্দেশ্য ছিল না।
পাঁচ. রিয়া মানুষের জন্য লাঞ্চনা, জিল্লতি ও দূর্গতি নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন—যে ব্যক্তি (তার আমলের কথা) মানুষকে শোনাতে চায়, আল্লাহ তাআলা মানুষকে তা শোনাবেন। যে ব্যক্তি (তার ইবাদত) মানুষকে দেখাতে চায়, আল্লাহ তা দেখাবেন। (অর্থাৎ মানুষের মাঝে তার সুখ্যাতি ছড়াবেন সাথে সাথে নানানভাবে আল্লাহ তাকে লাঞ্চিতও করবেন। দুনিয়াতেই সে তার অংশ পেয়ে যাবে, আখেরাতে কিছুই পাবে না, সেখানেও সে লাঞ্ছিত হবে।)
ছয়. রিয়া আখেরাতের প্রাপ্তি নষ্ট করে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—এই উম্মতের সুসংবাদের ব্যাপার হলো আল্লাহ দ্বীন (ইসলাম), মর্যাদা ও দুনিয়াতে তাদের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের সম্মান সমুন্নত করেছেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ার জন্য আখেরাতের আমল করবে, আখেরাতে তার কোনো ‘হিস্যা’ (অংশ) থাকবে না।
সাত. রিয়া মুসলিম উম্মাহর পরাজয়ের কারণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—আল্লাহ তাআলা এই উম্মত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিজয়ী করেন দুআ, সালাত ও ইখলাসের মাধ্যমে।
খেয়াল করেন, এখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট বলেছেন, ইখলাস মুসলিম উম্মাহর বিজয়ের কারণ; বিপরীতে রিয়া তাদের পরাজিত করে।
আট. রিয়া গোমরাহি ও ভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মুনাফিকদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কারিমের ইরশাদ—
يخادعون الله والذين آمنوا وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون.
(মুনাফিকরা) আল্লাহ ও মুমিনগণকে তারা প্রতারিত করতে চায়। অথচ তারা যে নিজেদের ছাড়া ভিন্ন কাউকে প্রতারিত করে না, তা তারা বুঝতে পারে না।
في قلوبهم مرض فزادهم الله مرضا ولهم عذاب أليم بما كانوا يكذبون.
তাদের (মুনাফিক) অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। এরপর, আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন ও তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি; কারণ, তারা মিথ্যাবাদী।
(মুনাফিকরা অন্তরের কপটতা সত্ত্বেও তারা ঈমানদার হওয়ার দাবি করত। মুসলিমদের দেখানোর জন্য আমল করত; কিন্তু তারা এই ধোঁকার মাধ্যমে মূলত নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে।)

টিকাঃ
৪৯. সুনানু ইবনি মাজাহ : ৪২০৪; আলবানি একে সহিহ বলেছেন। দেখেন—সহিহ সুনানু ইবনি মাজাহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪১০
৫০. জামি তিরমিজি: ২৩৭৬; মুসনাদে আহমদ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৫৬; মান : আলবানি এর সনদ সহিহ বলেছেন। দেখেন—সহিহ সুনানুত তিরমিজি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৮০
৫১. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪
৫২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬৬
৫০. সহিহ মুসলিম: ২৯৮৫
৫৪. জামি তিরমিজি: ৩১৫৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২০৩; মান: আলবানি একে সহিহ বলেছেন; দেখেন—সহিহূত তারগিব ওয়াত তারহিব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮;, সহিহ্রত তিরমিজি, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৭৪
৫৫. সহিহ মুসলিম : ১৯০৫
৫৬. সহিহ বুখারি: ৬৪৯৯; সহিহ মুসলিম: ২৯৮৬
৫৭. মুসনাদে আহমদ, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১৩৪; মুসতাদরাকে হাকেম, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১১৮; মান: আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখেন—সহিহুত তারগিব, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ১৫
৫৮. সুনানুন নাসায়ি: ৩১৭৮; আলবানি সহিহ বলেছেন; আত-তারগিব, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬
৫৯. সূরা বাকারা, আয়াত: ৯
৬০. সূরা বাকারা, আয়াত: ১০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00