📄 বিশুদ্ধ আমলের পুরস্কার
যে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করবে তার সৌভাগ্যের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহপাক নিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, আখেরাতেই হয় যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে এক ধরনের অমুখাপেক্ষিতা (কোন কিছুর অভাব বোধ করে না, নিজের প্রাপ্তি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে) তৈরি করে দেন এবং তার বিচ্ছিন্ন বিষয়াবলি জমা করে দেন। (অর্থাৎ এরূপ বান্দার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কার্যাবলী সম্পাদনের যাবতীয় উপকরণ প্রস্তুত করে দেন, এতে তার মন প্রশান্ত করেন।) এরূপ ব্যক্তির কাছে দুনিয়া নিজেই লাঞ্ছিত হয়ে আসে। পক্ষান্তরে যার মূল উদ্দেশ্যই হয় দুনিয়া, আল্লাহ তাআলা তার জন্য দারিদ্রতা সৃষ্টি করে দেন, তার জমা হয়ে থাকা (সাজানো) বিষয় ছিন্ন করে দেন। (দুনিয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপে তার সবিশেষ কোনো লাভ হয় না।) তার জন্য দুনিয়ার যতটুকু নির্ধারিত আছে, কেবল ততটুকুই আসে।
**দুনিয়াবি আমলের প্রকারভেদ**
দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের জন্য মানুষ যে আমল করে তা অনেক প্রকারে বিভক্ত। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ চারভাগে ভাগ করেছেন। এখানে আমরা তার প্রকারভেদগুলো (যা তিনি সালাফদের থেকে গ্রহণ করেছেন) তুলে ধরছি—
১. অনেক মানুষই এমন আছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের সৎ কাজ যেমন সালাত, সদকা, মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার, জুলুম-নিপীড়ন প্রতিহতকরণ ইত্যাদি করে থাকে, এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য তার নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বেঁচে থাকে; কিন্তু একটা সংকটের কারণে তাদের এসবকিছু বিশেষ উপকারে আসে না। তা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যের সাথে সাথে তাদের এসব সৎকাজ হয় দুনিয়ার স্বার্থকেন্দ্রিক। এসব নেক আমলের মাধ্যমে তাদের দুনিয়ার বিভিন্ন উপকারলাভের যেমন মালের হেফাজত, সম্পদের প্রবৃদ্ধি, পরিবার-পরিজনের সুরক্ষা এবং তার পরিবার ও নিজের ওপর নেয়ামতের অবারিত ধারা চালু থাকা ইত্যাদির আশা থাকলেও আখেরাতে কোনোকিছু পাওয়ার আশা থাকে না। জান্নাত লাভ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এসবের কোনো আকাঙ্ক্ষা তাদের জন্মে না; দুনিয়াই তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু। এদের সৎকাজগুলো যেহেতু স্রেফ দুনিয়াকেন্দ্রিক, দুনিয়াতেই তারা তাই তাদের নেককাজের পূর্ণ প্রতিদান পেয়ে যাবে। আখেরাতে তাদের চাওয়া পাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। এ প্রকারটা ইবনু আব্বাস রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
২. দ্বিতীয় প্রকার অনেকটা প্রথমটার মতোই। এখানেও আখেরাতে কোনো কিছু লাভের আশা তারা রাখে না। তাদের উদ্দেশ্য কেবল লৌকিকতা প্রদর্শন; কিন্তু ফলাফল ও প্রাপ্তির বিবেচনায় এটা প্রথম প্রকারের তুলনায় বেশি ভয়ানক। মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে এ প্রকারটা বর্ণিত আছে।
৩. ব্যক্তি তার যাবতীয় সৎকাজ করে দুনিয়ার জন্য, দুনিয়ার হীন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। অন্যের পক্ষ থেকে সে হজ করছে, কিন্তু তার ভেতরের উদ্দেশ্য আরেকজনের বদলি হজ করা নয়; সুবিধালাভ তার উদ্দেশ্য। সে হিজরত করছে ঠিকই, কিন্তু উদ্দেশ্য দুনিয়ার কোনো প্রাপ্তি। রণাঙ্গনে প্রাণপণে লড়াই করছে; কিন্তু এর পেছনে তার লক্ষ্য গনিমতলাভ। দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করছে; কিন্তু তা দ্বীনকে জানা, বোঝা ও মেনে চলার জন্য না; তার শিক্ষার মূল স্বপ্ন সার্টিফিকেট অর্জন। সে কুরআন শিখছে বা সালাত আদায় করছে, কিন্তু সওয়াবপ্রাপ্তির প্রত্যাশা সে রাখে না। সালাত আদায় করতে হয় তাই করছে। তিলাওয়াত করতে হয়, তাই তিলাওয়াত করা। এখানে যে তিলাওয়াতের মাধ্যমে সাওয়াব হবে, সালাতের মাধ্যমে আল্লার নৈকট্য অর্জন হবে এরকম কোনো উদ্দেশ্য তার নেই। মোটকথা, এরূপ ব্যক্তির কোনো সৎকাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আখেরাতের কল্যাণ লাভের কোনো আশা থাকে না।
৪. সে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর পরিপূর্ণ ইতাআত (অনুসরণ) করার চেষ্টা করছে, প্রচুর আমল করে করে যাচ্ছে; কিন্তু কোনো একটা আমলের ক্ষেত্রে এসে সে তার মাঝে সংকট দেখা দেয় এবং সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এটা বর্ণিত।
একজন মুসলিমের উচিত, যেসব জিনিশ সব আমলকে বিনষ্ট করে দেয়; যা আল্লাহর ক্রোধ টেনে আনে তা থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন। সবাই বেঁচে থাকুক ‘দুনিয়ার জন্য করা সব ধরনের আমল’ থেকে।
টিকাঃ
৪৯. জামি তিরমিজি : ২৪৬৫; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪১০৫; মান: আলবানি একে সহিহ বলেছেন; দেখেন—সহিহুল জামে, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫১; আল-আহাদিসুস সাহিহাহ: ৯৫০
৪৮. ফাতহুল মাজিদ শারহু কিতাবিত তাওহিদ: ৪৪৪; তাইসিবুল আজিজিল হামিদ: ৫৩৬; আল-কাওলুস সাদিদ ফি মাকাসিদিত তাওহিদ, সাদি: ১২৬