📄 পায়শ্চিত্যের আকিদা ও ত্রিত্ববাদে তার প্রভাব
খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদের ভিত্তি হলো প্রায়শ্চিত্যের আকিদা। আকিদাটির সারকথা হলো, পুত্র ঈশ্বর আদমসন্তানকে পাপ থেকে পবিত্র করতে নিজের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হওয়া বেছে নিয়েছেন। কেননা, ক্রুশবিদ্ধকরণ না হলে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ অপবিত্র থেকে যেত।[৬১৬]
খ্রিষ্টানরা বলে: মানুষ জন্ম থেকেই পাপী। কারণ, আল্লাহর নবি আদম আলাইহিস সালাম এবং তার স্ত্রী তথা পৃথিবীর প্রথম নারী পাপে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের সেই পাপ বংশপরিক্রমায় প্রত্যেক মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে। আর নেক আমল মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা, আল্লাহ তার বান্দাকে নেক আমলের উসিলায় রহম করলে তার রহমতের গুণ ইনসাফের ওপর প্রাধান্য পায়। আর ইনসাফ মানে হলো আদমের ভুলের কারণে সকল আদম সন্তানের হিসাবের মুখোমুখি করা। মূলত বীর্যের মাধ্যমে এই পাপ বংশানুক্রমিক স্থানান্তরিত হয়।
তারা আরও বলে: ইনসাফ ও রহম এই দুই গুণ একত্রিত হতে পারে না। তাই আল্লাহ নিজেকে মসিহের আকৃতিতে মারইয়ামের পেট থেকে জন্ম দিলেন। যেহেতু বীর্যের মাধ্যমে এই পাপ স্থানান্তরিত হয় তাই তিনি বীর্য ছাড়া নিষ্পাপ জন্ম নিতে চাইলেন। অতঃপর তিনি তার মায়ের সাথে কোনো পুরুষের সঙ্গম ব্যতিরেকেই নিষ্পাপ জন্ম নিলেন। এরপর বনি আদমের মুক্তির জন্য নিজেকে তিনি উৎসর্গের জন্য পেশ করলেন। সুতরাং তাদের কাছে দ্বিতীয় ঈশ্বর-পুত্রঈশ্বর- মানবজাতির জন্য এমন কাজ করলেন যা পিতা ঈশ্বর করেননি।
এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা এর লেখক প্রায়শ্চিত্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন: খ্রিষ্টানদের মতে প্রায়শ্চিত্যের উদ্দেশ্য হলো, বনি আদমের মুক্তির জন্য মসিহ কর্তৃক উৎসর্গ ও কুরবানি। আদম কর্তৃক কৃত পাপের কারণে মানুষ ঈশ্বরের রহমত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। এই বিশ্বাসের দ্বারা মানুষ আবার ঈশ্বরের রহমতের নিকটবর্তী হতে পারে। তাই ঈশ্বরের কালাম আকৃতি ধারণ করেছেন। নতুনভাবে মানুষকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী করতে পুত্র মানবের আকৃতি বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু আমরা বিভিন্নভাবে এই আকিদার খণ্ডন করতে পারি। যেমন:
১. খ্রিষ্টানরা মনে করে আদম থেকে নিয়ে মসিহ পর্যন্ত এবং মসিহ পরবর্তী সকল মানুষ পাপী। কিন্তু কিতাবুল মুকাদ্দাস এই মিথ্যা দাবি খণ্ডন করে। কিতাবুল মুকাদ্দাস নবি ইয়াহইয়া, আদমপুত্র হাবিল, নবি দানিয়েল, নবি যাকারিয়া ও তার স্ত্রী, সম্রাট যিহিস্কেল, নবি শমুয়েল প্রমুখকে নিষ্পাপ বলে অভিহিত করেছে এবং বলেছে যে তারা কখনো কোনো পাপ করেননি। সুতরাং খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোই এই নবসৃষ্ট আকিদাকে খণ্ডন করে।
২. সমস্ত মানবজাতির পাপের বোঝার নিমিত্তে মসিহ ক্রুশকে বরণ করে নিয়েছেন। যে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে সে সকল পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যাবে। এমনকি সে অশ্লীল ও মন্দ কাজে লিপ্ত হলেও মসিহের উপর বিশ্বাসই তার মুক্তির জন্য যথেষ্ট। আমলের কোনো প্রয়োজন নেই। এই আকিদাটিও তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। কেননা ধর্মীয় গ্রন্থগুলো সুস্পষ্ট বলছে; কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। পুরাতন নিয়মের পঞ্চম পুস্তক দ্বিতীয় বিবরণে বলা হয়েছে, "সন্তানের জন্য পিতার, কিংবা পিতার জন্য সন্তানের প্রাণদণ্ড করা যাইবে না; প্রতিজন আপন আপন পাপপ্রযুক্তই প্রাণদণ্ড ভোগ করিবে।”[৬১৭]
যিহিস্কেল গ্রন্থে বলা হয়েছে, "যে প্রাণী পাপ করে, সেই মরিবে; পিতার অপরাধ পুত্র বহন করিবে না; ও পুত্রর অপরাধ পিতা বহন করিবে না।”[৬১৮]
এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় খ্রিষ্টানদের পবিত্র গ্রন্থসমূহের শিক্ষাই হলো; সৎলোক তার সততার ফল পাবে। আর অসৎলোক তার অপরাধের ফল পাবে। পুরাতন নিয়মের এই সুস্পষ্ট অনুচ্ছেদগুলোই তাদের দাবি খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট যারা বলে মসিহ বনি আদমের পাপের বোঝা বহন করে নিজেকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে তাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন।
৩. আদম কর্তৃক জান্নাতে কৃত পাপ বীর্যের মাধ্যমে বংশানুক্রমিক চলে আসার দাবিটি কোনোরূপ প্রমাণ ছাড়াই ভিত্তিহীন একটি দাবী। বরং এ দাবির আবশ্যিক চাহিদা হচ্ছে নারীর মাধ্যমে পাপ স্থানান্তরিত হওয়া। পুরুষের বীর্যের মাধ্যমে নয়। কেননা, তাদের কিতাবুল মুকাদ্দাস স্পষ্ট বলছে হাওয়া আদমকে পাপের প্রতি প্রলুব্ধ করেছে। তাহলে মসিহকে কীভাবে নিষ্পাপ বলা যায়? তিনি তো নারীর গর্ভে জন্ম নিয়েছেন? নারীই তো ছিল পাপের প্রতি আহ্বানকারী। সুতরাং পিতাবিহীন জন্ম নেওয়ায় মসিহকে তারা নিষ্পাপ হওয়ার যে দাবি তারা করে থাকে তা অযৌক্তিক।[৬১৯]
এসব আলোচনার পর আমি অকপটে স্বীকার করতে চাই যে, তাদের এই 'একের ভেতর তিন, তিনের ভেতর এক' এর মর্ম আমার বোধগম্য নয়। বরং এটি কারোরই বোধগম্য নয়। আল্লাহ তাআলা অযৌক্তিক বিষয় বুঝতে বাধ্য করেন না। কিংবা না বুঝে বিশ্বাস স্থাপন করতেও বাধ্য করেন না। আমরা সকলেই যেটা বুঝি: ১+১+১=৩। কিন্তু ১+১+১=১ এই হিসাবটি কারোরই বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। আলকিমস বাসিবিলিয়ুস ইসহাক তার আল-ইলমু বিততাসলিস গ্রন্থে এটিকে বোধের ঊর্ধ্বে বলে অভিহিত করেছেন। আততাসলিস ওয়াত তাওহিদ গ্রন্থে মনসুর বলেছেন: আমাদের ক্ষুদ্র বিবেক দিয়ে এটি বোঝার চেষ্টা করা বোকামি।
আওদ শিমিয়ন তার গ্রন্থ আল্লাহু যাতুহু ওয়া নাওউ ওয়াহদানিয়্যাতিহি গ্রন্থে বলেন: আমরা অস্বীকার করি না যে ত্রিত্ববাদ বিবেক ও বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। অনেক দার্শনিকই কিতাবুল মুকাদ্দাসে আল্লাহর জাত সম্পর্কিত ঘোষণাগুলোর ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। ত্রিত্বের এককত্বের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তারা কোনো পথ খুঁজে পাননি। কেননা তারা তার বক্তব্য থেকে পদচ্যুত হয়েছেন। শুধু বিবেকের ওপর নির্ভর করেছেন।
সাধু তাওফিক জাইয়িদ তার সিররুল আযল গ্রন্থে বলেন: ত্রিত্ব হলো রহস্য। এটি বোঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। ত্রিত্বকে পরিপূর্ণভাবে বুঝার চেষ্টা করা আর সমুদ্রের সব পানিকে হাতের তালুতে নেওয়ার চেষ্টা করা একই কথা।
খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমরা শুধু এতটুকুই বলতে পারি: দার্শনিক, পুরোহিত, বড় বড় প্রফেসর সকলেই যদি এই ত্রিত্ব বুঝতে অপারগ হয়ে পড়েন তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে বুঝবেন? মানুষ কি তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত এক ঈশ্বরের ওপর ঈমান আনতে বাধ্য? দুর্ভোগ! শত দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা এমন বক্তব্য প্রদান করে। আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন-
لَهُمْ قُلُوبٌ لا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالأَنْعামِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ .
তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ। [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯]
টিকাঃ
[৬১৬] এটি খ্রিষ্টানদের মাঝে একটি নবউদ্ভাবিত চিন্তাধারা। এডলফ হেনরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, খ্রিষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো পুস্তকেই ক্রুশ, প্রায়শ্চিত্য প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ নেই। তিনি তার তারিখুল আকিদা গ্রন্থে এমনটি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
[৬১৭] দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় ২৪, অনুচ্ছেদ: ১৬।
[৬১৮] যিহিস্কেল, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ২০
[৬১৯] আমরা মুসলিমরাও ঈসা আলাইহিস সালামসহ সকল নবি-রাসুলকে নিষ্পাপ বলে বিশ্বাস করি। তবে ঈসা আলাইহিস সালামের নিষ্পাপ হওয়াটা পিতাবিহীন জন্ম নেয়ার কারণে নয়।