📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 ত্রিত্ববাদের আকিদা (TRINITARIAN, DOCTRINE)

📄 ত্রিত্ববাদের আকিদা (TRINITARIAN, DOCTRINE)


৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নিকিয়ার মহাসভার পরই ত্রিত্ববাদের আকিদা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মাঝে স্থির হয়ে যায়। এর পূর্বে এই আকিদাতে খ্রিষ্টানদের মাঝে মতবিরোধ বিদ্যমান ছিল। তাদের অনেকেই তাওহিতে বিশ্বাসী ছিল। তারা তাওহিদের দিকে দাওয়াত দিত। মসিহের প্রভুত্ব এবং ত্রিত্ববাদের আকিদাকে অস্বীকার করত। পোল এবং তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামত। তাদের অভিযোগ ছিল পোল তলোয়ার ও ক্ষমতার বলে খ্রিষ্টধর্মকে দমাতে না পেরে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে খ্রিষ্টান ধর্মে ফেসাদ লাগিয়ে দিয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ছুতোয় সে এটিকে তাওহিদ থেকে পৌত্তলিকতার দিকে নিয়ে গেছে।

পোলের আহ্বানে সাড়া প্রদানকারী খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইহুদিবাদ, পৌত্তলিকতা, দর্শন প্রভৃতি নানান কিসিমের প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। তা ছাড়া মসিহ আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্বে হাজার বছর ধরে শাম ও মিশরের পথ ধরে আর্যদের হিজরতেরও সুস্পষ্ট প্রভাব এতদঞ্চলে বিরাজমান ছিল। আর্যদের ধর্ম শেষের দিকে ত্রিত্ববাদে গিয়ে স্থির হয়। তাদের এই ত্রিত্ববাদের প্রকৃতি হলো; প্রভু অস্তিত্বের পূর্বেও ছিলেন। অতঃপর তিনি সৃষ্টিজগৎকে নিজের পরিচয় দিতে চাইলেন। এরপর তিনি জগৎ সৃষ্টি করলেন এবং নিজের নাম রাখলেন ব্রহ্মা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা। অতঃপর জগতের দেখভাল ও হেফাজতের নিমিত্ত তার থেকে দ্বিতীয় প্রভুর আবির্ভাব ঘটে। এই স্তরে তিনি নিজের নাম রাখেন বিষ্ণু। জগৎ যেহেতু সৃষ্টিকর্তার ন্যায় স্থায়ী নয় এবং এর ফলস্বরূপ সকল সম্ভাব্য অস্তিত্বের পরিণতিই হলো ধ্বংস ও সমাপ্তি তাই তার থেকে তৃতীয় প্রভুর আবির্ভাব ঘটে। এই স্তরে তিনি নিজের নাম রাখেন শিব। বাস্তবে তিনি একক প্রভু। তার সত্তাগত গুণ তিনটি। এর প্রত্যেকটি আবার আলাদা সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। সন্দেহ নেই যে, ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা এই আদিম ব্যাখ্যায় প্রভাবিত ছিল।

পোল যখন ভেতর থেকে খ্রিষ্টবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মনস্থ করলেন তখন এই বক্তব্যের কাছাকাছি একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন। এই বক্তব্যকে তৎকালে মানুষের সর্বশেষ চিন্তাধারা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পোল খ্রিষ্টবাদকে তাওহিদ থেকে বের করে আনার জন্য সেখানে পৌত্তলিক হিন্দুত্ববাদ প্রবেশ করান। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, খ্রিষ্টবাদ ব্যাবিলনিয়দের আকিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যারা তিন প্রভুতে বিশ্বাস করতো। এই তিন প্রভু হলেন—
১। আকাশ, পৃথিবী ও সমুদ্রের প্রভু।
২। সূর্য ও চন্দ্রের প্রভু।
৩। ইনসাফ ও বিধিবিধানের প্রভু।

হাবিব সাইদ বলেন, এই আকিদাটি প্রাচীনকালে এবং বর্তমানেও গুরুত্বপূর্ণ পৌত্তলিক ধর্মগুলোতে বিরাজমান ছিল। ফিনিশিয়দের প্রতিটি শহর ও প্রতিটি জনপদের আলাদা আলাদা তিন প্রভু ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ জুবাইলে এই ত্রিত্ববাদের সন্ধান পেয়েছেন। এ পর্যায়ে আমরা পাঠক সমীপে খ্রিষ্টধর্মের পূর্বে বিভিন্ন ধর্মের ত্রিত্ববাদের ধারণা নিয়ে একটি চার্ট উপস্থাপন করছি।

ফিনিশিয়: ইল (অর্থাৎ ভাগ্য), শমুয (অর্থাৎ নেতা) (রিজিকদাতা), আওলাম (অর্থাৎ অনন্ত)
মিসরিয়: ওসিরিস, আইসিস, হোরাস
হিন্দু: ব্রহ্মা[৫৯৩] (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু, শিব (ধ্বংসকারী)
ব্যাবিলনিয়: আকাশ, পৃথিবী ও সমুদ্রের দেবতা, সূর্য ও চন্দ্রের দেবতা, ইনসাফ ও বিধিবিধানের দেবতা

ত্রিত্বের ধারণাটি চীনাদের মধ্যেও রয়েছে। তারা বিষয়টিকে একটি সমবাহু ও সমকোণী ত্রিভূজ দ্বারা প্রকাশ করে।[৫৯৪] সম্ভবত ব্যাবিলনিয়রাই প্রথম ত্রিত্বের প্রবক্তা ছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে তাদের মাঝে এই বিশ্বাসের উদ্ভব ঘটে। ব্যাবিলনিয়রা বহু দেবতায় বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু তারা এই দেবতাদেরকে তিনটি দলে ভাগ করে। প্রত্যেক দল ক্ষমতা ও অবস্থানের দিক থেকে ভিন্ন। প্রথম দলটি দেবতাদের শীর্ষে। এই দলে রয়েছে আকাশের দেবতা, জমিনের দেবতা ও সমুদ্রের দেবতা। দ্বিতীয় দলে রয়েছে চন্দ্রদেবতা ও সূর্যদেবতা। তৃতীয় দলে রয়েছে ইনসাফ ও বিধিবিধানের দেবতা।[৫৯৫]

ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্বের প্রফেসর জন হিক (JOHN HICK) তার ঈসা ওয়াল আদইয়ানুল আলামিয়্যা গ্রন্থের একটি অনুচ্ছেদে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেহধারণ আকিদায় ঈসা এবং গৌতম বুদ্ধের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “গৌতম বুদ্ধকে বিবেচনা করা হয় তিনি মানব থেকে অনন্ত ঈশ্বরের দেহ ধারণ করেছেন। অথবা তিনি ঈশ্বরপুত্র। মহাযান গ্রন্থে মহাত্মন বুদ্ধ সদাসত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন যেভাবে খ্রিষ্টধর্মে শাশ্বত পুত্র ঈশ্বরপিতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।”[৫৯৬] এরপর জন হিক বলেন, “কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, খ্রিষ্টধর্মীয় আকিদা যদি পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্যে স্থানান্তর না হয়ে পূর্বে হিন্দুস্থানে বদল হতো তাহলে ঈসার ধর্মীয় গুরুত্ব প্রকাশ পাওয়া সম্ভব ছিল। হিন্দু সভ্যতায় তাকে পবিত্র অবতার (AWTAR) হিসেবে গ্রহণ করা হতো।”[৫৯৭]

লেখকের বক্তব্যের সাথে আমরা এ কথা যুক্ত করতে চাই যে, হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে ঈসার (মানবাকৃতিতে ঈশ্বর) ধারণাটি বিদ্যমান আছে। যেমন বিষ্ণুর অবতার বরুণ। ফিরিশতারা তার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আকাশে তার মর্যাদার গীত গাওয়া হয়েছে। অবতার হিন্দুদের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর একটি। তাদের ভাষায় এর অর্থ হলো অবতরণ করা। এ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বয়ং ঈশ্বর তথা ব্রহ্মা অথবা বিষ্ণু কিংবা শিব মানবাকৃতিতে জমিনে নেমে আসা। এ বিষয়ে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে লিখিত আমার গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।[৫৯৮] হিন্দু পণ্ডিত বিহারি লাল বর্মা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, খ্রিষ্টধর্ম বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।[৫৯৯]

সাধু 'হান্না মাক্কার আলইসসাবি' ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা আবু উবাইদা আল-খাযরাজিকে লিখিত পত্রে বলেন, "ঈশ্বর স্বয়ং আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। কুমারি মারইয়ামের গর্ভে একীভূত হয়েছেন। আদিতে লিখিত বিধান অনুযায়ী (ঈশ্বরের) নুর তার থেকে পর্দা গ্রহণ করেছেন। কেননা সূচনাতে কালিমাই ছিলেন ঈশ্বর। তিনি দেহের দিক থেকে মাখলুক। সত্তাগতভাবে খালিক। তিনি নিজ দেহ সৃষ্টি করেছেন। নিজ মাতাকেও সৃষ্টি করেছেন। তার মাতা পূর্বে ছিলেন মানব প্রকৃতিতে। তিনি ছিলেন ঈশ্বর প্রকৃতিতে। তিনিই বিরাজমান ঈশ্বর। তিনিই পূর্ণাঙ্গ মানব।”[৬০০] হিন্দুদের অবতার আর এই বক্তব্য ব্যাখ্যাগতভাবে এক ও অভিন্ন।

একইভাবে গবেষকগণ মনে করেন, খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ আধুনিক প্লেটোর চিন্তাধারার ফসল। জগৎ এবং এর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়ার প্রধান প্লেটো (২০৫-২৭০ খ্রিষ্টাব্দ) মনে করেন, "ঈশ্বরই হলেন বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। কোনো ক্ষণস্থায়ী গুণে তাকে বিশেষায়িত করা যায় না। তিনি মৌল নন এবং অমৌলও নন। তার চিন্তা আমাদের চিন্তার মতো নয়। তার ইচ্ছা আমাদের ইচ্ছার মতো নয়। তিনি সকল পূর্ণাঙ্গ গুণাবলিতে গুণান্বিত। তিনি বস্তুসমূহকে অস্তিত্বের নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি কোনো অস্তিত্ব দানকারীর মুখাপেক্ষী নন। এই সৃষ্টিকর্তা থেকে প্রথম যে জিনিসটি প্রকাশিত হয়েছে তা হলো "আকল”। এরপর আকল থেকে ওই রুহের উৎপত্তি যা সকল রুহের একক। এই ত্রয়ী থেকেই সকল বস্তুর প্রকাশ। এবং এই ত্রয়ী থেকেই সবকিছুর জন্ম।” নিকিয়ার মহাসভার অনেক আগে থেকেই এই মতবাদটি প্রসিদ্ধ ছিল। এটিই ছিল স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়ার দার্শনিক মতবাদ। নিকিয়ার মহাসভায় আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ ছিলেন ত্রিত্ববাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিতার্কিক। সুতরাং আমদের এ কথা বলা আশ্চর্যের কিছু নয় যে খ্রিষ্টানধর্মে ত্রিত্ববাদের আকিদা আধুনিক প্লেটোর দর্শন প্রভাবেই উৎপন্ন হয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদের প্রভাব ও পৌত্তলিক প্রবণতা যাই হোক না কেন; এ কথা সুনিশ্চিত যে, এটি মসিহ আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল না। তার আকিদাও ছিল না। এদিকেই ইঙ্গিত করে কুরআনুল করিম বলছে- يُضَاهِؤُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ এরা পূর্ববর্তী কাফিরদের মতো কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে? [সুরা তাওবা, আয়াত: ৩০]

কিন্তু এই চিন্তাধারা খ্রিষ্টধর্মে কীভাবে স্থানান্তরিত হলো? এর সহজ জবাব হচ্ছে, পোল খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশ করে এটি আমদানি করেছেন। তিনি গ্রিক দর্শন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়া ছিল এই দর্শনের প্রতিনিধিত্বকারী। পোল খ্রিষ্টানদের দুঃখজনক অবস্থা ও পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেন। তাদের জন্য তিনি সুদূর পরিসরে প্রাচীন পৌত্তলিকতার আদলে নতুন কিছু চিন্তা ও তত্ত্বের আবিষ্কার করেন। পৌত্তলিকতা থেকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত লোকজন এগুলো গ্রহণ করে নেয়। কোনো কোনো হাওয়ারি পোলের এই দাওয়াতের বিরুদ্ধে নেমেছিলেন। কিন্তু পোলের ব্যক্তিত্ব ও তার চিন্তাধারার সামনে এই প্রতিরোধ সফলতার মুখ দেখেনি।

লিও গোথিয়ার বলেন, “খ্রিষ্টধর্ম প্রচুর পরিমাণে গ্রিক দর্শনের চিন্তাধারা গ্রহণ করেছিল। মসিহের ঈশ্বর হওয়ার বিষয়টিও একই উৎস থেকে গৃহীত। আর এই উৎসটি ছিল আধুনিক প্লেটোর দর্শনের আদলে গড়া। তাই আমরা উভয়ের মাঝে অনেক মিল দেখতে পাই।”[601]

মসিহ আলাইহিস সালাম তার জীবদ্দশায় ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে কোনো বিবৃতি দেননি এবং কোনো ইঙ্গিতও করেননি। তিনি বলেননি: ঈশ্বর তিন সত্তার সমষ্টি। তিনি এও বলেননি যে, আমিই ঈশ্বর তোমাদের পাপ মার্জনার জন্য পৃথিবীতে নেমে এসেছি। বরং তিনি আল্লাহর জন্য ইবাদাত করতেন এবং নিজের জন্য ক্ষমা চাইতেন। বিদ্যমান সুসমাচারগুলোর প্রায় ষাটেরও বেশি স্থানে তিনি নিজেকে ইবনে আদম তথা আদম সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী যুগের অনেক খ্রিষ্টান লেখক অনুভব করতে পেরেছেন যে, মসিহের দাওয়াত থেকে ত্রিত্ববাদের কোনো কিছু প্রমাণ করা কঠিন। তাই আমরা তাদের অনেককেই দেখতে পাই এই আকিদা থেকে নিজেদের দায়মুক্তি ঘোষণা করেছেন এবং আকিদাটির সমালোচনা করেছেন।

এদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একজন হলেন বিংশ শতাব্দীর জার্মান পণ্ডিত প্রফেসর হারনিক (HARNIC)। জার্মানিতে খ্রিষ্টানদের মাঝে লেকচারের কারণে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। DAS WESEN DES CHRISTIANITY নামে তার এই লেকচারগুলো সংকলন করা হয় এবং WHAT IS CHRISTIANITY? নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। তিনি তার আলোচনা শুরু করেছেন এবং বারংবার এই কথা উল্লেখ করেছেন যে, মসিহ কখনো নিজের উপাসনার জন্য মানুষকে আহ্বান করেননি। বরং তিনি সর্বদা সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর পিতার দিকে মানুষকে ডেকেছেন। নিজেকে তার নির্দেশের অনুগামী করেছেন। তার নির্দেশ পালন করেছেন। এই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে নানান দুর্ভোগ ও মুসিবত ভোগ করেছেন। তিনি তাঁর নির্দেশ, সিদ্ধান্ত ও তাকদিরের সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন। এটাই হলো বাস্তবতা যা আমরা সুসমাচারগুলোতে দেখতে পাই।[৬০২]

তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি ত্রিত্ববাদের আকিদাকে অস্বীকার করেছিলেন সিবেলিউস (SIBELIUS)। তার প্রসিদ্ধ উক্তি ছিল: ত্রিত্ববাদ ঈশ্বর সম্পর্কে বাস্তবসম্মত কিছু নয়। এটি একটি বহিরাগত প্রচারণা। তাই এটি ক্ষণস্থায়ী। স্থায়ী কিছু নয়।

এরপর চতুর্থ শতাব্দীতে আরিয়ুসের আবির্ভাব ঘটে। তিনি প্রচার করলেন যে, একমাত্র পিতাই অবিনশ্বর। পুত্র এবং পবিত্র আত্মা উভয়ে মাখলুক। তবে অন্যান্য মাখলুকের তুলনায় তারা বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

এরপর পৌত্তলিক ইথানাসিয়ুস আসলেন। তিনি ত্রিত্ববাদের পক্ষে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করলেন। তার বক্তব্যকে নিকিয়ার মহাসভায় খ্রিষ্টানরা গ্রহণ করে নেয়।

টিকাঃ
[৫৯৩] এটিই শুদ্ধ। কিন্তু হাবিব সাইদ বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেছেন, ১-বুদ্ধ, ২-ব্রহ্মা ও ৩- বিষ্ণু। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হিন্দুদের আলোচনায় আসবে। এখানে হাবিব সাইদ কর্তৃক বুদ্ধ উল্লেখ কারাটা ভুল।
[৫৯৪] আদইয়ানুল আলাম, পৃষ্ঠা: ৩০৪
[৫৯৫] ড. মদকুর, তারিখুল ফালসাফা, পৃষ্ঠা: ৬
[৫৯৬] ঈসা ওয়াল আদইয়ানুল আলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৯
[৫৯৭] শায়খ আব্দুস সামাদ শরফুদ্দিন রচিত উসতুরাতু তাজাসসুদিল ইলাহ, পৃষ্ঠা: ২৪-২৫ থেকে চয়নকৃত。
[৫৯৮] এই গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড।
[৫৯৯] বিশ্ব ধর্ম দর্শন, পৃষ্ঠা: ২৫৭১
[৬০০] বাইনাল ইসলাম ওয়াল মসিহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৮৩-৮৪
[601] ড. আহমদ শালবি কর্তৃক রচিত আলমসিহিয়্যাহ গ্রন্থের ১১২ পৃষ্ঠা থেকে আল-মাদখাল লিদিরাসাতিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ এর পৃষ্ঠা ৯৩ সূত্রে চয়নকৃত।
[৬০২] What is Christianity?, page: 147, New York, 1912

৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নিকিয়ার মহাসভার পরই ত্রিত্ববাদের আকিদা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মাঝে স্থির হয়ে যায়। এর পূর্বে এই আকিদাতে খ্রিষ্টানদের মাঝে মতবিরোধ বিদ্যমান ছিল। তাদের অনেকেই তাওহিতে বিশ্বাসী ছিল। তারা তাওহিদের দিকে দাওয়াত দিত। মসিহের প্রভুত্ব এবং ত্রিত্ববাদের আকিদাকে অস্বীকার করত। পোল এবং তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামত। তাদের অভিযোগ ছিল পোল তলোয়ার ও ক্ষমতার বলে খ্রিষ্টধর্মকে দমাতে না পেরে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে খ্রিষ্টান ধর্মে ফেসাদ লাগিয়ে দিয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ছুতোয় সে এটিকে তাওহিদ থেকে পৌত্তলিকতার দিকে নিয়ে গেছে।

পোলের আহ্বানে সাড়া প্রদানকারী খ্রিষ্টানদের মধ্যে ইহুদিবাদ, পৌত্তলিকতা, দর্শন প্রভৃতি নানান কিসিমের প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। তা ছাড়া মসিহ আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্বে হাজার বছর ধরে শাম ও মিশরের পথ ধরে আর্যদের হিজরতেরও সুস্পষ্ট প্রভাব এতদঞ্চলে বিরাজমান ছিল। আর্যদের ধর্ম শেষের দিকে ত্রিত্ববাদে গিয়ে স্থির হয়। তাদের এই ত্রিত্ববাদের প্রকৃতি হলো; প্রভু অস্তিত্বের পূর্বেও ছিলেন। অতঃপর তিনি সৃষ্টিজগৎকে নিজের পরিচয় দিতে চাইলেন। এরপর তিনি জগৎ সৃষ্টি করলেন এবং নিজের নাম রাখলেন ব্রহ্মা অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা। অতঃপর জগতের দেখভাল ও হেফাজতের নিমিত্ত তার থেকে দ্বিতীয় প্রভুর আবির্ভাব ঘটে। এই স্তরে তিনি নিজের নাম রাখেন বিষ্ণু। জগৎ যেহেতু সৃষ্টিকর্তার ন্যায় স্থায়ী নয় এবং এর ফলস্বরূপ সকল সম্ভাব্য অস্তিত্বের পরিণতিই হলো ধ্বংস ও সমাপ্তি তাই তার থেকে তৃতীয় প্রভুর আবির্ভাব ঘটে। এই স্তরে তিনি নিজের নাম রাখেন শিব। বাস্তবে তিনি একক প্রভু। তার সত্তাগত গুণ তিনটি। এর প্রত্যেকটি আবার আলাদা সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। সন্দেহ নেই যে, ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা এই আদিম ব্যাখ্যায় প্রভাবিত ছিল।

পোল যখন ভেতর থেকে খ্রিষ্টবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মনস্থ করলেন তখন এই বক্তব্যের কাছাকাছি একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন। এই বক্তব্যকে তৎকালে মানুষের সর্বশেষ চিন্তাধারা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পোল খ্রিষ্টবাদকে তাওহিদ থেকে বের করে আনার জন্য সেখানে পৌত্তলিক হিন্দুত্ববাদ প্রবেশ করান। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, খ্রিষ্টবাদ ব্যাবিলনিয়দের আকিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যারা তিন প্রভুতে বিশ্বাস করতো। এই তিন প্রভু হলেন—
১। আকাশ, পৃথিবী ও সমুদ্রের প্রভু।
২। সূর্য ও চন্দ্রের প্রভু।
৩। ইনসাফ ও বিধিবিধানের প্রভু।

হাবিব সাইদ বলেন, এই আকিদাটি প্রাচীনকালে এবং বর্তমানেও গুরুত্বপূর্ণ পৌত্তলিক ধর্মগুলোতে বিরাজমান ছিল। ফিনিশিয়দের প্রতিটি শহর ও প্রতিটি জনপদের আলাদা আলাদা তিন প্রভু ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ জুবাইলে এই ত্রিত্ববাদের সন্ধান পেয়েছেন। এ পর্যায়ে আমরা পাঠক সমীপে খ্রিষ্টধর্মের পূর্বে বিভিন্ন ধর্মের ত্রিত্ববাদের ধারণা নিয়ে একটি চার্ট উপস্থাপন করছি।

ফিনিশিয়: ইল (অর্থাৎ ভাগ্য), শমুয (অর্থাৎ নেতা) (রিজিকদাতা), আওলাম (অর্থাৎ অনন্ত)
মিসরিয়: ওসিরিস, আইসিস, হোরাস
হিন্দু: ব্রহ্মা[৫৯৩] (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু, শিব (ধ্বংসকারী)
ব্যাবিলনিয়: আকাশ, পৃথিবী ও সমুদ্রের দেবতা, সূর্য ও চন্দ্রের দেবতা, ইনসাফ ও বিধিবিধানের দেবতা

ত্রিত্বের ধারণাটি চীনাদের মধ্যেও রয়েছে। তারা বিষয়টিকে একটি সমবাহু ও সমকোণী ত্রিভূজ দ্বারা প্রকাশ করে।[৫৯৪] সম্ভবত ব্যাবিলনিয়রাই প্রথম ত্রিত্বের প্রবক্তা ছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে তাদের মাঝে এই বিশ্বাসের উদ্ভব ঘটে। ব্যাবিলনিয়রা বহু দেবতায় বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু তারা এই দেবতাদেরকে তিনটি দলে ভাগ করে। প্রত্যেক দল ক্ষমতা ও অবস্থানের দিক থেকে ভিন্ন। প্রথম দলটি দেবতাদের শীর্ষে। এই দলে রয়েছে আকাশের দেবতা, জমিনের দেবতা ও সমুদ্রের দেবতা। দ্বিতীয় দলে রয়েছে চন্দ্রদেবতা ও সূর্যদেবতা। তৃতীয় দলে রয়েছে ইনসাফ ও বিধিবিধানের দেবতা।[৫৯৫]

ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্বের প্রফেসর জন হিক (JOHN HICK) তার ঈসা ওয়াল আদইয়ানুল আলামিয়্যা গ্রন্থের একটি অনুচ্ছেদে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি দেহধারণ আকিদায় ঈসা এবং গৌতম বুদ্ধের মাঝে তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “গৌতম বুদ্ধকে বিবেচনা করা হয় তিনি মানব থেকে অনন্ত ঈশ্বরের দেহ ধারণ করেছেন। অথবা তিনি ঈশ্বরপুত্র। মহাযান গ্রন্থে মহাত্মন বুদ্ধ সদাসত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন যেভাবে খ্রিষ্টধর্মে শাশ্বত পুত্র ঈশ্বরপিতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।”[৫৯৬] এরপর জন হিক বলেন, “কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, খ্রিষ্টধর্মীয় আকিদা যদি পশ্চিমে রোমান সাম্রাজ্যে স্থানান্তর না হয়ে পূর্বে হিন্দুস্থানে বদল হতো তাহলে ঈসার ধর্মীয় গুরুত্ব প্রকাশ পাওয়া সম্ভব ছিল। হিন্দু সভ্যতায় তাকে পবিত্র অবতার (AWTAR) হিসেবে গ্রহণ করা হতো।”[৫৯৭]

লেখকের বক্তব্যের সাথে আমরা এ কথা যুক্ত করতে চাই যে, হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে ঈসার (মানবাকৃতিতে ঈশ্বর) ধারণাটি বিদ্যমান আছে। যেমন বিষ্ণুর অবতার বরুণ। ফিরিশতারা তার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। আকাশে তার মর্যাদার গীত গাওয়া হয়েছে। অবতার হিন্দুদের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর একটি। তাদের ভাষায় এর অর্থ হলো অবতরণ করা। এ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বয়ং ঈশ্বর তথা ব্রহ্মা অথবা বিষ্ণু কিংবা শিব মানবাকৃতিতে জমিনে নেমে আসা। এ বিষয়ে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে লিখিত আমার গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।[৫৯৮] হিন্দু পণ্ডিত বিহারি লাল বর্মা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, খ্রিষ্টধর্ম বৌদ্ধধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।[৫৯৯]

সাধু 'হান্না মাক্কার আলইসসাবি' ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা আবু উবাইদা আল-খাযরাজিকে লিখিত পত্রে বলেন, "ঈশ্বর স্বয়ং আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। কুমারি মারইয়ামের গর্ভে একীভূত হয়েছেন। আদিতে লিখিত বিধান অনুযায়ী (ঈশ্বরের) নুর তার থেকে পর্দা গ্রহণ করেছেন। কেননা সূচনাতে কালিমাই ছিলেন ঈশ্বর। তিনি দেহের দিক থেকে মাখলুক। সত্তাগতভাবে খালিক। তিনি নিজ দেহ সৃষ্টি করেছেন। নিজ মাতাকেও সৃষ্টি করেছেন। তার মাতা পূর্বে ছিলেন মানব প্রকৃতিতে। তিনি ছিলেন ঈশ্বর প্রকৃতিতে। তিনিই বিরাজমান ঈশ্বর। তিনিই পূর্ণাঙ্গ মানব।”[৬০০] হিন্দুদের অবতার আর এই বক্তব্য ব্যাখ্যাগতভাবে এক ও অভিন্ন।

একইভাবে গবেষকগণ মনে করেন, খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ আধুনিক প্লেটোর চিন্তাধারার ফসল। জগৎ এবং এর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়ার প্রধান প্লেটো (২০৫-২৭০ খ্রিষ্টাব্দ) মনে করেন, "ঈশ্বরই হলেন বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। কোনো ক্ষণস্থায়ী গুণে তাকে বিশেষায়িত করা যায় না। তিনি মৌল নন এবং অমৌলও নন। তার চিন্তা আমাদের চিন্তার মতো নয়। তার ইচ্ছা আমাদের ইচ্ছার মতো নয়। তিনি সকল পূর্ণাঙ্গ গুণাবলিতে গুণান্বিত। তিনি বস্তুসমূহকে অস্তিত্বের নিয়ামত দিয়েছেন। তিনি কোনো অস্তিত্ব দানকারীর মুখাপেক্ষী নন। এই সৃষ্টিকর্তা থেকে প্রথম যে জিনিসটি প্রকাশিত হয়েছে তা হলো "আকল”। এরপর আকল থেকে ওই রুহের উৎপত্তি যা সকল রুহের একক। এই ত্রয়ী থেকেই সকল বস্তুর প্রকাশ। এবং এই ত্রয়ী থেকেই সবকিছুর জন্ম।” নিকিয়ার মহাসভার অনেক আগে থেকেই এই মতবাদটি প্রসিদ্ধ ছিল। এটিই ছিল স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়ার দার্শনিক মতবাদ। নিকিয়ার মহাসভায় আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ ছিলেন ত্রিত্ববাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিতার্কিক। সুতরাং আমদের এ কথা বলা আশ্চর্যের কিছু নয় যে খ্রিষ্টানধর্মে ত্রিত্ববাদের আকিদা আধুনিক প্লেটোর দর্শন প্রভাবেই উৎপন্ন হয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদের প্রভাব ও পৌত্তলিক প্রবণতা যাই হোক না কেন; এ কথা সুনিশ্চিত যে, এটি মসিহ আলাইহিস সালামের দাওয়াত ছিল না। তার আকিদাও ছিল না। এদিকেই ইঙ্গিত করে কুরআনুল করিম বলছে- يُضَاهِؤُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ এরা পূর্ববর্তী কাফিরদের মতো কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে? [সুরা তাওবা, আয়াত: ৩০]

কিন্তু এই চিন্তাধারা খ্রিষ্টধর্মে কীভাবে স্থানান্তরিত হলো? এর সহজ জবাব হচ্ছে, পোল খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশ করে এটি আমদানি করেছেন। তিনি গ্রিক দর্শন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়া ছিল এই দর্শনের প্রতিনিধিত্বকারী। পোল খ্রিষ্টানদের দুঃখজনক অবস্থা ও পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেন। তাদের জন্য তিনি সুদূর পরিসরে প্রাচীন পৌত্তলিকতার আদলে নতুন কিছু চিন্তা ও তত্ত্বের আবিষ্কার করেন। পৌত্তলিকতা থেকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত লোকজন এগুলো গ্রহণ করে নেয়। কোনো কোনো হাওয়ারি পোলের এই দাওয়াতের বিরুদ্ধে নেমেছিলেন। কিন্তু পোলের ব্যক্তিত্ব ও তার চিন্তাধারার সামনে এই প্রতিরোধ সফলতার মুখ দেখেনি।

লিও গোথিয়ার বলেন, “খ্রিষ্টধর্ম প্রচুর পরিমাণে গ্রিক দর্শনের চিন্তাধারা গ্রহণ করেছিল। মসিহের ঈশ্বর হওয়ার বিষয়টিও একই উৎস থেকে গৃহীত। আর এই উৎসটি ছিল আধুনিক প্লেটোর দর্শনের আদলে গড়া। তাই আমরা উভয়ের মাঝে অনেক মিল দেখতে পাই।”[601]

মসিহ আলাইহিস সালাম তার জীবদ্দশায় ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে কোনো বিবৃতি দেননি এবং কোনো ইঙ্গিতও করেননি। তিনি বলেননি: ঈশ্বর তিন সত্তার সমষ্টি। তিনি এও বলেননি যে, আমিই ঈশ্বর তোমাদের পাপ মার্জনার জন্য পৃথিবীতে নেমে এসেছি। বরং তিনি আল্লাহর জন্য ইবাদাত করতেন এবং নিজের জন্য ক্ষমা চাইতেন। বিদ্যমান সুসমাচারগুলোর প্রায় ষাটেরও বেশি স্থানে তিনি নিজেকে ইবনে আদম তথা আদম সন্তান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী যুগের অনেক খ্রিষ্টান লেখক অনুভব করতে পেরেছেন যে, মসিহের দাওয়াত থেকে ত্রিত্ববাদের কোনো কিছু প্রমাণ করা কঠিন। তাই আমরা তাদের অনেককেই দেখতে পাই এই আকিদা থেকে নিজেদের দায়মুক্তি ঘোষণা করেছেন এবং আকিদাটির সমালোচনা করেছেন।

এদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একজন হলেন বিংশ শতাব্দীর জার্মান পণ্ডিত প্রফেসর হারনিক (HARNIC)। জার্মানিতে খ্রিষ্টানদের মাঝে লেকচারের কারণে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। DAS WESEN DES CHRISTIANITY নামে তার এই লেকচারগুলো সংকলন করা হয় এবং WHAT IS CHRISTIANITY? নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। তিনি তার আলোচনা শুরু করেছেন এবং বারংবার এই কথা উল্লেখ করেছেন যে, মসিহ কখনো নিজের উপাসনার জন্য মানুষকে আহ্বান করেননি। বরং তিনি সর্বদা সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর পিতার দিকে মানুষকে ডেকেছেন। নিজেকে তার নির্দেশের অনুগামী করেছেন। তার নির্দেশ পালন করেছেন। এই নির্দেশ পালন করতে গিয়ে নানান দুর্ভোগ ও মুসিবত ভোগ করেছেন। তিনি তাঁর নির্দেশ, সিদ্ধান্ত ও তাকদিরের সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন। এটাই হলো বাস্তবতা যা আমরা সুসমাচারগুলোতে দেখতে পাই।[৬০২]

তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি ত্রিত্ববাদের আকিদাকে অস্বীকার করেছিলেন সিবেলিউস (SIBELIUS)। তার প্রসিদ্ধ উক্তি ছিল: ত্রিত্ববাদ ঈশ্বর সম্পর্কে বাস্তবসম্মত কিছু নয়। এটি একটি বহিরাগত প্রচারণা। তাই এটি ক্ষণস্থায়ী। স্থায়ী কিছু নয়।

এরপর চতুর্থ শতাব্দীতে আরিয়ুসের আবির্ভাব ঘটে। তিনি প্রচার করলেন যে, একমাত্র পিতাই অবিনশ্বর। পুত্র এবং পবিত্র আত্মা উভয়ে মাখলুক। তবে অন্যান্য মাখলুকের তুলনায় তারা বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

এরপর পৌত্তলিক ইথানাসিয়ুস আসলেন। তিনি ত্রিত্ববাদের পক্ষে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করলেন। তার বক্তব্যকে নিকিয়ার মহাসভায় খ্রিষ্টানরা গ্রহণ করে নেয়।

টিকাঃ
[৫৯৩] এটিই শুদ্ধ। কিন্তু হাবিব সাইদ বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেছেন, ১-বুদ্ধ, ২-ব্রহ্মা ও ৩- বিষ্ণু। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হিন্দুদের আলোচনায় আসবে। এখানে হাবিব সাইদ কর্তৃক বুদ্ধ উল্লেখ কারাটা ভুল।
[৫৯৪] আদইয়ানুল আলাম, পৃষ্ঠা: ৩০৪
[৫৯৫] ড. মদকুর, তারিখুল ফালসাফা, পৃষ্ঠা: ৬
[৫৯৬] ঈসা ওয়াল আদইয়ানুল আলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৯
[৫৯৭] শায়খ আব্দুস সামাদ শরফুদ্দিন রচিত উসতুরাতু তাজাসসুদিল ইলাহ, পৃষ্ঠা: ২৪-২৫ থেকে চয়নকৃত。
[৫৯৮] এই গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড।
[৫৯৯] বিশ্ব ধর্ম দর্শন, পৃষ্ঠা: ২৫৭১
[৬০০] বাইনাল ইসলাম ওয়াল মসিহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৮৩-৮৪
[601] ড. আহমদ শালবি কর্তৃক রচিত আলমসিহিয়্যাহ গ্রন্থের ১১২ পৃষ্ঠা থেকে আল-মাদখাল লিদিরাসাতিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ এর পৃষ্ঠা ৯৩ সূত্রে চয়নকৃত।
[৬০২] What is Christianity?, page: 147, New York, 1912

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 খ্রিস্টানদের মতে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা কী?

📄 খ্রিস্টানদের মতে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা কী?


কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাসের লেখক বলেন: ঈশ্বরের প্রকৃতি হলো সমপর্যায়ের তিন সত্তার সমন্বয়। পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর। সৃষ্টির বিষয়টি পিতার দিকে সম্বন্ধিত। পুত্রের দিকে সম্বন্ধিত আত্মোৎসর্গ। আর পবিত্র আত্মার দিকে সম্বন্ধিত পবিত্রকরণ। তবে তিন সত্তাই পরস্পর ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডগুলো ভাগ করে নেন। আমরা পিতা ইশ্বরের বিষয়টি বুঝলাম। কিন্তু পুত্র ইশ্বর ও পবিত্র আত্মা ইশ্বর মানে কী?

খ্রিষ্টানরা বলে-
১. প্রভুর সত্তাই হলো ইশ্বর পিতা। তিনি আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তার মৌলিক গুণাবলি হলো সৃষ্টি, ইনসাফ, উৎসর্গ ও নিষ্কৃতি।
২. যে কালিমা বা বাক্য তিনি মারইয়ামের অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করেছেন তা হলো পুত্র। পুত্রের মধ্যেও পিতার ন্যায় প্রভুত্ব বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম পার্থক্য নেই। কেননা তিনি আকল ও মহব্বতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
৩. প্রভুর সত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইলম ও হায়াতই হলো পবিত্র আত্মা (HOLY SPIRIT)। পবিত্র আত্মার দিকে পবিত্রকরণের কাজ সম্বন্ধিত করা হয়।

এই তিন সত্তা দিয়ে এক ঈশ্বরসত্তার পরিচয় প্রদান করা হয়। একের ভিতর তিন। তিনের ভিতর এক।
১. GOD THE FATHER
২. GOD THE SON
৩. GOD THE HOLY GHOST

এখানে আরেকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো, ঈশ্বর এক, বাহ্যিকভাবে তার তিন সত্তা। মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, “অতএব তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর; পিতার ও পুত্রের ও পবিত্র আত্মার নামে তাহাদিগকে বাপ্তাইজ কর।”[৬০৩]

পিতা-পুত্রের মাধ্যমে সমগ্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন। পুত্র উৎসর্গকে পূর্ণতা দিয়েছেন এবং তা সম্পাদন করেছেন। আর পবিত্র আত্মা অন্তর ও জীবনকে পবিত্র করেছেন। তবে তিনজনই ঐশ্বরিক সকল কাজে সমানভাবে অংশীদার।[৬০৪]

এই হলো ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যায় খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এর বোধের দৌড়। বাস্তবতা এটাই যে খ্রিষ্টানদের এই ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে মানুষ অধ্যয়ন করতে শুরু করলেই প্রচণ্ডভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবে। নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার মতো কোনো কিছুই সে পাবে না। এজন্যই খ্রিষ্টানরা জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সকলের জন্য এই প্রসিদ্ধ বাক্যটির উদ্ভব ঘটিয়েছে যে; 'না বুঝেই আমি বিশ্বাস করি।' আমার জানা নেই যে ধর্ম বোধগম্য নয় তার ফায়দাটাই বা কি?

যাই হোক, বাস্তবতা হলো স্বয়ং খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ নিজেরাই ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা বোধগম্য হওয়ার মতো কোনো দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, সেখানে অন্যদের কথা আর কি বলবো। তাই মসিহের ঊর্ধ্বারহণের পর থেকে আজ অবধি খ্রিষ্টধর্মের ছায়ায় থেকেও একদল গবেষক ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করছেন এবং তাওহিতে বিশ্বাস স্থাপন করে আসছেন। যেমন হাওয়ারি বরনাবা, চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মিসরের আরিয়ুস, ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে জার্মানির সারভিথিউস, সপ্তদশ শতাব্দীর আগে ইন্তেকাল করা শিরাবরি। এভাবে হাজারো চিন্তাবিদ ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন এটি বোঝা অসম্ভব। কিন্তু তাদের এই আওয়াজ উলুবনে মুক্তো ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই হলো না। কোনো চার্চই তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেনি। কেননা, চার্চগুলো এই আওয়াজকে ভয় করতো। এতে সাধারণ জনতার দৃষ্টিতে তাদের "পবিত্রতা” ধুলোয় মিশে যাওয়ার ভয় ছিল। এটি গৃহীত হলে তাদের কাছে ক্ষমাপত্র নেওয়ার জন্য আর কেই বা যাবে?

এখানে আমি আপনাদের সামনে একজন পাদরির প্রচেষ্টায় খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া তিন ব্যক্তির গল্প উপস্থাপন করছি। খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে এদের জ্ঞান ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের। লোকগুলো পাদরির সান্নিধ্যে অবস্থান নিয়েছিল এবং তার প্রয়োজনীয় সেবা করে যাচ্ছিল। একদিন পাদরির এক বন্ধু তাদেরকে দেখতে এলেন। লোকগুলো খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে শুনে বন্ধুটি যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাদের ঈমানের বিশুদ্ধতা যাচাই করে দেখতে মনস্থ করলেন। তাদের একজনকে তিনি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে উত্তর দিলো: আমার মনিব আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন যে, ঈশ্বর তিনজন। একজন আকাশে। দ্বিতীয় জন মারইয়ামের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন। আর এই দ্বিতীয় জনের বয়স ত্রিশ পূর্ণ হওয়ার পর তার ওপর কবুতর আকৃতিতে তৃতীয় জন অবতরণ করেছেন। জবাব শুনে পাদরি রেগে গিয়ে তাকে ঈশ্বরের অনুগ্রহ থেকে বিতাড়িত করলেন। বললেন, এ অজ্ঞ। এরপর দ্বিতীয় জনকে প্রশ্ন করা হলো। সে জবাব দিলো: আমার মনিব আমাকে শিখিয়েছেন যে, ঈশ্বর তিন জন। একজনকে শূলিতে চড়ানো হয়েছে। আর দুজন জীবিত আছেন। পাদরি রাগান্বিত হয়ে তাকে অভিশাপ দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন। এবার তৃতীয় জনের পালা আসল। এই ব্যক্তি ছিল বুদ্ধিমান। সে অভিশাপ ও বিতাড়িত হওয়াকে ভয় পেল। তথাপি সে ঈশ্বরের হামদ ও মসিহের প্রশংসা করে জবাব দিলো: আমার মনিব ঈশ্বর মসিহের অনুগ্রহে আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ত্রিত্ববাদ মানে হলো তিনের ভেতরে এক, একের ভেতরে তিন। পাদরি খুশি হলেন। তার সফলতাও ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বেচারা জবাবের ধারাবাহিকতায় বলতে লাগল: তাদের একজনকে শূলিতে দেওয়ায় তিনি মারা গেছেন। আর ঈশ্বর তিনজনই যেহেতু এক তাই একজনের মৃত্যুতে সবাই মারা গেলেন। কেননা সকলের মৃত্যু না হলে তাদেরকে একক বলা যায় না। তখন পাদরি তার ওপরেও রেগে যান এবং বিতাড়িত করে দেন।

এই হলো ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা। যখনই আপনি এটাকে বুঝতে চেষ্টা করবেন তখনই আরও বড় সমস্যা সামনে এসে হাজির হবে। এতৎসত্ত্বেও আমি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে খ্রিষ্টানদের বক্তব্য তুলে ধরছি।

টিকাঃ
[৬০৩] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১৯।
[৬০৪] কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ১০৮। কেউ কেউ পবিত্র আত্মার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন: ঈসা আসমানে গমনের পর মুমিনদের সাথে বসবাস করা ও মুমিনদের অন্তরে অবস্থান নেওয়ার জন্য রুহ বা আত্মা প্রেরণ করেন। এই রুহ প্রধান হাওয়ারি পিতর ও মসিহের উর্দ্ধারোহনের পর খ্রিস্টান দাবীদার পোলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তার জ্ঞান ও শিক্ষা এই রুহ থেকেই গৃহীত। এই রুহই হলেন পবিত্র আত্মা।

কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাসের লেখক বলেন: ঈশ্বরের প্রকৃতি হলো সমপর্যায়ের তিন সত্তার সমন্বয়। পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মা ঈশ্বর। সৃষ্টির বিষয়টি পিতার দিকে সম্বন্ধিত। পুত্রের দিকে সম্বন্ধিত আত্মোৎসর্গ। আর পবিত্র আত্মার দিকে সম্বন্ধিত পবিত্রকরণ। তবে তিন সত্তাই পরস্পর ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডগুলো ভাগ করে নেন। আমরা পিতা ইশ্বরের বিষয়টি বুঝলাম। কিন্তু পুত্র ইশ্বর ও পবিত্র আত্মা ইশ্বর মানে কী?

খ্রিষ্টানরা বলে-
১. প্রভুর সত্তাই হলো ইশ্বর পিতা। তিনি আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তার মৌলিক গুণাবলি হলো সৃষ্টি, ইনসাফ, উৎসর্গ ও নিষ্কৃতি।
২. যে কালিমা বা বাক্য তিনি মারইয়ামের অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করেছেন তা হলো পুত্র। পুত্রের মধ্যেও পিতার ন্যায় প্রভুত্ব বিরাজমান। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম পার্থক্য নেই। কেননা তিনি আকল ও মহব্বতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
৩. প্রভুর সত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইলম ও হায়াতই হলো পবিত্র আত্মা (HOLY SPIRIT)। পবিত্র আত্মার দিকে পবিত্রকরণের কাজ সম্বন্ধিত করা হয়।

এই তিন সত্তা দিয়ে এক ঈশ্বরসত্তার পরিচয় প্রদান করা হয়। একের ভিতর তিন। তিনের ভিতর এক।
১. GOD THE FATHER
২. GOD THE SON
৩. GOD THE HOLY GHOST

এখানে আরেকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো, ঈশ্বর এক, বাহ্যিকভাবে তার তিন সত্তা। মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, “অতএব তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর; পিতার ও পুত্রের ও পবিত্র আত্মার নামে তাহাদিগকে বাপ্তাইজ কর।”[৬০৩]

পিতা-পুত্রের মাধ্যমে সমগ্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন। পুত্র উৎসর্গকে পূর্ণতা দিয়েছেন এবং তা সম্পাদন করেছেন। আর পবিত্র আত্মা অন্তর ও জীবনকে পবিত্র করেছেন। তবে তিনজনই ঐশ্বরিক সকল কাজে সমানভাবে অংশীদার।[৬০৪]

এই হলো ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যায় খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এর বোধের দৌড়। বাস্তবতা এটাই যে খ্রিষ্টানদের এই ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে মানুষ অধ্যয়ন করতে শুরু করলেই প্রচণ্ডভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবে। নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার মতো কোনো কিছুই সে পাবে না। এজন্যই খ্রিষ্টানরা জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সকলের জন্য এই প্রসিদ্ধ বাক্যটির উদ্ভব ঘটিয়েছে যে; 'না বুঝেই আমি বিশ্বাস করি।' আমার জানা নেই যে ধর্ম বোধগম্য নয় তার ফায়দাটাই বা কি?

যাই হোক, বাস্তবতা হলো স্বয়ং খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ নিজেরাই ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা বোধগম্য হওয়ার মতো কোনো দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, সেখানে অন্যদের কথা আর কি বলবো। তাই মসিহের ঊর্ধ্বারহণের পর থেকে আজ অবধি খ্রিষ্টধর্মের ছায়ায় থেকেও একদল গবেষক ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করছেন এবং তাওহিতে বিশ্বাস স্থাপন করে আসছেন। যেমন হাওয়ারি বরনাবা, চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মিসরের আরিয়ুস, ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে জার্মানির সারভিথিউস, সপ্তদশ শতাব্দীর আগে ইন্তেকাল করা শিরাবরি। এভাবে হাজারো চিন্তাবিদ ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন এটি বোঝা অসম্ভব। কিন্তু তাদের এই আওয়াজ উলুবনে মুক্তো ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই হলো না। কোনো চার্চই তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেনি। কেননা, চার্চগুলো এই আওয়াজকে ভয় করতো। এতে সাধারণ জনতার দৃষ্টিতে তাদের "পবিত্রতা” ধুলোয় মিশে যাওয়ার ভয় ছিল। এটি গৃহীত হলে তাদের কাছে ক্ষমাপত্র নেওয়ার জন্য আর কেই বা যাবে?

এখানে আমি আপনাদের সামনে একজন পাদরির প্রচেষ্টায় খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া তিন ব্যক্তির গল্প উপস্থাপন করছি। খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে এদের জ্ঞান ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের। লোকগুলো পাদরির সান্নিধ্যে অবস্থান নিয়েছিল এবং তার প্রয়োজনীয় সেবা করে যাচ্ছিল। একদিন পাদরির এক বন্ধু তাদেরকে দেখতে এলেন। লোকগুলো খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে শুনে বন্ধুটি যারপরনাই খুশি হলেন। তিনি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাদের ঈমানের বিশুদ্ধতা যাচাই করে দেখতে মনস্থ করলেন। তাদের একজনকে তিনি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে উত্তর দিলো: আমার মনিব আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন যে, ঈশ্বর তিনজন। একজন আকাশে। দ্বিতীয় জন মারইয়ামের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন। আর এই দ্বিতীয় জনের বয়স ত্রিশ পূর্ণ হওয়ার পর তার ওপর কবুতর আকৃতিতে তৃতীয় জন অবতরণ করেছেন। জবাব শুনে পাদরি রেগে গিয়ে তাকে ঈশ্বরের অনুগ্রহ থেকে বিতাড়িত করলেন। বললেন, এ অজ্ঞ। এরপর দ্বিতীয় জনকে প্রশ্ন করা হলো। সে জবাব দিলো: আমার মনিব আমাকে শিখিয়েছেন যে, ঈশ্বর তিন জন। একজনকে শূলিতে চড়ানো হয়েছে। আর দুজন জীবিত আছেন। পাদরি রাগান্বিত হয়ে তাকে অভিশাপ দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন। এবার তৃতীয় জনের পালা আসল। এই ব্যক্তি ছিল বুদ্ধিমান। সে অভিশাপ ও বিতাড়িত হওয়াকে ভয় পেল। তথাপি সে ঈশ্বরের হামদ ও মসিহের প্রশংসা করে জবাব দিলো: আমার মনিব ঈশ্বর মসিহের অনুগ্রহে আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ত্রিত্ববাদ মানে হলো তিনের ভেতরে এক, একের ভেতরে তিন। পাদরি খুশি হলেন। তার সফলতাও ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বেচারা জবাবের ধারাবাহিকতায় বলতে লাগল: তাদের একজনকে শূলিতে দেওয়ায় তিনি মারা গেছেন। আর ঈশ্বর তিনজনই যেহেতু এক তাই একজনের মৃত্যুতে সবাই মারা গেলেন। কেননা সকলের মৃত্যু না হলে তাদেরকে একক বলা যায় না। তখন পাদরি তার ওপরেও রেগে যান এবং বিতাড়িত করে দেন।

এই হলো ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা। যখনই আপনি এটাকে বুঝতে চেষ্টা করবেন তখনই আরও বড় সমস্যা সামনে এসে হাজির হবে। এতৎসত্ত্বেও আমি ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে খ্রিষ্টানদের বক্তব্য তুলে ধরছি।

টিকাঃ
[৬০৩] মথি, অধ্যায়: ২৮, অনুচ্ছেদ: ১৯।
[৬০৪] কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ১০৮। কেউ কেউ পবিত্র আত্মার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন: ঈসা আসমানে গমনের পর মুমিনদের সাথে বসবাস করা ও মুমিনদের অন্তরে অবস্থান নেওয়ার জন্য রুহ বা আত্মা প্রেরণ করেন। এই রুহ প্রধান হাওয়ারি পিতর ও মসিহের উর্দ্ধারোহনের পর খ্রিস্টান দাবীদার পোলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তার জ্ঞান ও শিক্ষা এই রুহ থেকেই গৃহীত। এই রুহই হলেন পবিত্র আত্মা।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ক্যাথলিকদের আকিদা

📄 আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ক্যাথলিকদের আকিদা


ক্যাথলিকগণ বলেন: ইশ্বর তিন জন। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন। পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। যোহনের সুসমাচারের প্রথম বাক্য "আদিতে বাক্য (কালিমা) ছিলেন” এর ব্যাখ্যায় তারা বলেন কালিমা এবং তাকে যিনি জন্ম দিয়েছেন উভয়ে স্বতন্ত্র। পিতা পুত্র নন। পুত্রও পিতা নন। তবে উভয়ে প্রকৃতি, সত্তা, হিকমা ও অস্তিত্বের দিক থেকে এক।

তাদের এই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বুঝা যায়, মসিহ ঐশ্বরিক বিবেচনায় পিতার সমপর্যায়ের। আর মানবসত্তার বিবেচনায় পিতার চেয়ে নিচু স্তরের। এটি প্রোটেস্টান্টদেরও মতো। এদের দিকেই ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে-
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوْا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
নিশ্চয় তারা কাফির, যারা বলে, আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা স্বীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ৭৩]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تَقُولُواْ ثَلاثَةُ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَهُ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً .
আর এ কথা বলো না যে, আল্লাহ তিনের এক, এ কথা পরিহার কর; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তানসন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমানসমূহ ও জমিনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। [সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১]

এই তিন সত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা তাদের ভ্রান্ত আকিদার পক্ষে এখনো বিভিন্নভাবে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ বিশ শতাব্দীতেও এই আকিদাটি বিজ্ঞমহলে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে পারেনি। পাঠক এ পর্যায়ে 'ইলিয়াস মাক্কার' নামক একজন সাধুর আরও কিছু হাস্যকর বক্তব্য শুনুন-

১. যে ব্যাক্তি নিষ্কৃতি পেতে চায় তার জন্য সর্বাগ্রে ক্যাথলিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক। অর্থাৎ খ্রিষ্ট চার্চের সমন্বিত সাধারণ বিশ্বাসকে।
২. এই বিশ্বাসকে অনিষ্ট থেকে যে হেফাজত করবে না নিশ্চিত সে চিরস্থায়ী ধ্বংস হবে।
৩. ক্যাথলিক বিশ্বাস হলো, আমরা ত্রিত্বের ভেতর এক এবং একত্বের ভেতর ত্রয়ীর উপাসনা করি।
৪. তিন সত্তার মিশ্রণ হয় না।
৫. পিতার আলাদা সত্তা পুত্রের আলাদা সত্তা এবং পবিত্র আত্মারও ভিন্নসত্তা।
৬. কিন্তু পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা একক সত্তা, একই সমান অস্তিত্ব এবং একসাথেই তারা চিরস্থায়ী মহিমার অধিকারী।
৭. পিতা মাখলুক নন। পুত্র মাখলুক নন। পবিত্র আত্মাও মাখলুক নন।
৮. পিতা যেমন পুত্রও তেমন, পবিত্র আত্মাও তেমনই।
৯. পিতা অসীম। পুত্র অসীম। পবিত্র আত্মা অসীম।
১০. পিতা চিরন্তন। পুত্র চিরন্তন। পবিত্র আত্মা চিরন্তন।
১১. কিন্তু এই চিরন্তন একক। আলাদা তিন চিরন্তনতা নয়।
১২. একইভাবে তিন গাইরে মাখলুক নন। একক গাইরে মাখলুক। তিন অসীম নন। একক অসীম।
১৩. পিতা সবকিছুর ধারক। পুত্র সবকিছুর ধারক। পবিত্র আত্মা সবকিছুর ধারক।
১৪. কিন্তু তিন জন ধারক নন। এক জন ধারক।
১৫. একইভাবে পিতা ঈশ্বর। পুত্র ঈশ্বর। পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
১৬. কিন্তু তারা তিন ঈশ্বর নন। তিনে মিলে এক ঈশ্বর।
১৭. এভাবে পিতা পালনকর্তা। পুত্র পালনকর্তা। পবিত্র আত্মা পালনকর্তা।
১৮. কিন্তু তারা তিন পালনকর্তা নন। বরং তিনে মিলে এক পালনকর্তা।
১৯. খ্রিষ্টীয় সত্য আমাদেরকে বাধ্য করে এ কথা স্বীকার করতে যে, এই তিন সত্তার প্রত্যেকেই স্বয়ং ঈশ্বর ও পালনকর্তা।
২০. ক্যাথলিক ধর্ম আমাদেরকে তিন ঈশ্বর ও তিন পালনকর্তার অস্তিত্বের বিশ্বাস থেকে নিষেধ করে।
২১. পিতা কারও থেকে প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। কারও থেকে জন্মও নেননি।
২২. পুত্র পিতা থেকে। তবে তিনি প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। বরং জন্মগ্রহনকারী।
২৩. পবিত্র আত্মা পিতা ও পুত্র থেকে। তবে প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। জন্মগ্রহনকারী নন। তবে উৎপন্ন।
২৪. সুতরাং এক পিতা। তিন পিতা নন। এক পুত্রা তিন পুত্র নন। এক পবিত্র আত্মা। তিন পবিত্র আত্মা নন।
২৫. এই ত্রয়ীর মাঝে কেউ আগেও নন, পরেও নন। কেউ বড়ও নন, ছোটও নন।
২৬. কিন্তু প্রত্যেক সত্তাই সমপর্যায়ের ও একই সাথে চিরন্তন।
২৭. যা বলা হলো তার ভিত্তিতে আমাদের ওপর কর্তব্য ত্রয়ীর মাঝে একত্বের ইবাদত করা। এবং একত্বের মাঝে ত্রয়ীর ইবাদত করা।
২৮. সুতরাং যে মুক্তি পেতে চায় তার কর্তব্য হলো ত্রয়ীর ব্যাপারে এভাবে জোরদার বিশ্বাসী হওয়া।
২৯. একইভাবে মুক্তির জন্য আমানতদারিতার সাথে আমাদের প্রভু যিশুর দেহধারণের আকিদায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে।
৩০. কেননা, সংগত বিশ্বাস হলো, আমানতদারিতার সাথে আমাদের এই বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আমাদের প্রভু যিশু ঈশ্বরের পুত্র। তিনি ঈশ্বর এবং মানুষ।
৩১. তিনি ঈশ্বর পিতার মৌল থেকে। যুগের পূর্বে তিনি জন্মেছেন। তিনি মানুষ মায়ের মৌল থেকে। এই যুগে তিনি অস্তিত্বশীল।
৩২. তিনি পূর্ণ ঈশ্বর ও পূর্ণ মানুষ। সত্তাগত বাকসম্পন্ন ও মানব দেহধারী।
৩৩. ঐশ্বরিক দিক থেকে পিতার সমান। মানবীয় দিক থেকে পিতার নিচে।
৩৪. তিনি যদিও ঈশ্বর এবং মানুষ তথাপি তিনি একক মসিহ। দ্বৈত নন।
৩৫. কিন্তু এমন একজন যার ঐশ্বরিক সত্তা দেহে রূপান্তরিত নয় বরং মানবীয় সত্তা ঐশ্বরিক সত্তায় গ্রহণ করে।
৩৬. সার্বিকভাবে এক। বিভিন্ন মৌলের সংমিশ্রণে নয়। বরং সত্তাগুলোর একত্বের দ্বারা।
৩৭. যেভাবে বাকসম্পন্ন আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে একজনই মানুষ একইভাবে ঈশ্বর এবং মানব মিলে একজন মসিহ।
৩৮. আমাদের মুক্তির জন্য তিনি কষ্ট ভোগ করেছেন। জাহিমে[৬০৫] অবতরণ করেছেন। তৃতীয় দিন তিনি মৃতদের থেকে উত্থিত হয়েছেন।
৩৯. তিনি আসমানে উঠে গেছেন। সবকিছুর ধারক পিতার ডানপাশে তিনি উপবিষ্ট হয়েছেন।
৪০. সেখান থেকেই তিনি জীবিত ও মৃতদেরকে প্রতিদান দেওয়ার জন্য আগমন করবেন।
৪১. তার আগমনে সকল মানুষ স্বশরীরে উত্থিত হবে। সবাই নিজের ব্যক্তিগত আমলের হিসাব দেবে।
৪২. অতঃপর যারা ভালো কর্ম সম্পাদন করেছেন তারা স্থায়ী জীবনে প্রবেশ করবেন। আর যারা মন্দ কর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা স্থায়ী জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
৪৩. এটাই হলো ক্যাথলিক বিশ্বাস। এর ওপর আমানত ও ইয়াকিনের সাথে বিশ্বাস স্থাপন না করলে কারোরই পক্ষেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।[৬০৬]

টিকাঃ
[৬০৫] অর্থাৎ রুহজগৎ অথবা হাবিয়া নামক জাহান্নাম অথবা তৃতীয় দিন পর্যন্ত মসিহের মৃত্যুর অধীনে থাকা। এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন "আমার বিশ্বাস” গ্রন্থের লিখক।
[৬০৬] আকানিমুন নাসারা, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭২

ক্যাথলিকগণ বলেন: ইশ্বর তিন জন। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন। পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। যোহনের সুসমাচারের প্রথম বাক্য "আদিতে বাক্য (কালিমা) ছিলেন” এর ব্যাখ্যায় তারা বলেন কালিমা এবং তাকে যিনি জন্ম দিয়েছেন উভয়ে স্বতন্ত্র। পিতা পুত্র নন। পুত্রও পিতা নন। তবে উভয়ে প্রকৃতি, সত্তা, হিকমা ও অস্তিত্বের দিক থেকে এক।

তাদের এই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বুঝা যায়, মসিহ ঐশ্বরিক বিবেচনায় পিতার সমপর্যায়ের। আর মানবসত্তার বিবেচনায় পিতার চেয়ে নিচু স্তরের। এটি প্রোটেস্টান্টদেরও মতো। এদের দিকেই ইঙ্গিত করে কুরআনে বলা হয়েছে-
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوْا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
নিশ্চয় তারা কাফির, যারা বলে, আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা স্বীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের ওপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ৭৩]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تَقُولُواْ ثَلاثَةُ انتَهُوا خَيْرًا لَّكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَهُ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً .
আর এ কথা বলো না যে, আল্লাহ তিনের এক, এ কথা পরিহার কর; তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তানসন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমানসমূহ ও জমিনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। [সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১]

এই তিন সত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা তাদের ভ্রান্ত আকিদার পক্ষে এখনো বিভিন্নভাবে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ বিশ শতাব্দীতেও এই আকিদাটি বিজ্ঞমহলে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে পারেনি। পাঠক এ পর্যায়ে 'ইলিয়াস মাক্কার' নামক একজন সাধুর আরও কিছু হাস্যকর বক্তব্য শুনুন-

১. যে ব্যাক্তি নিষ্কৃতি পেতে চায় তার জন্য সর্বাগ্রে ক্যাথলিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক। অর্থাৎ খ্রিষ্ট চার্চের সমন্বিত সাধারণ বিশ্বাসকে।
২. এই বিশ্বাসকে অনিষ্ট থেকে যে হেফাজত করবে না নিশ্চিত সে চিরস্থায়ী ধ্বংস হবে।
৩. ক্যাথলিক বিশ্বাস হলো, আমরা ত্রিত্বের ভেতর এক এবং একত্বের ভেতর ত্রয়ীর উপাসনা করি।
৪. তিন সত্তার মিশ্রণ হয় না।
৫. পিতার আলাদা সত্তা পুত্রের আলাদা সত্তা এবং পবিত্র আত্মারও ভিন্নসত্তা।
৬. কিন্তু পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা একক সত্তা, একই সমান অস্তিত্ব এবং একসাথেই তারা চিরস্থায়ী মহিমার অধিকারী।
৭. পিতা মাখলুক নন। পুত্র মাখলুক নন। পবিত্র আত্মাও মাখলুক নন।
৮. পিতা যেমন পুত্রও তেমন, পবিত্র আত্মাও তেমনই।
৯. পিতা অসীম। পুত্র অসীম। পবিত্র আত্মা অসীম।
১০. পিতা চিরন্তন। পুত্র চিরন্তন। পবিত্র আত্মা চিরন্তন।
১১. কিন্তু এই চিরন্তন একক। আলাদা তিন চিরন্তনতা নয়।
১২. একইভাবে তিন গাইরে মাখলুক নন। একক গাইরে মাখলুক। তিন অসীম নন। একক অসীম।
১৩. পিতা সবকিছুর ধারক। পুত্র সবকিছুর ধারক। পবিত্র আত্মা সবকিছুর ধারক।
১৪. কিন্তু তিন জন ধারক নন। এক জন ধারক।
১৫. একইভাবে পিতা ঈশ্বর। পুত্র ঈশ্বর। পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
১৬. কিন্তু তারা তিন ঈশ্বর নন। তিনে মিলে এক ঈশ্বর।
১৭. এভাবে পিতা পালনকর্তা। পুত্র পালনকর্তা। পবিত্র আত্মা পালনকর্তা।
১৮. কিন্তু তারা তিন পালনকর্তা নন। বরং তিনে মিলে এক পালনকর্তা।
১৯. খ্রিষ্টীয় সত্য আমাদেরকে বাধ্য করে এ কথা স্বীকার করতে যে, এই তিন সত্তার প্রত্যেকেই স্বয়ং ঈশ্বর ও পালনকর্তা।
২০. ক্যাথলিক ধর্ম আমাদেরকে তিন ঈশ্বর ও তিন পালনকর্তার অস্তিত্বের বিশ্বাস থেকে নিষেধ করে।
২১. পিতা কারও থেকে প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। কারও থেকে জন্মও নেননি।
২২. পুত্র পিতা থেকে। তবে তিনি প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। বরং জন্মগ্রহনকারী।
২৩. পবিত্র আত্মা পিতা ও পুত্র থেকে। তবে প্রস্তুতকৃত নন। মাখলুক নন। জন্মগ্রহনকারী নন। তবে উৎপন্ন।
২৪. সুতরাং এক পিতা। তিন পিতা নন। এক পুত্রা তিন পুত্র নন। এক পবিত্র আত্মা। তিন পবিত্র আত্মা নন।
২৫. এই ত্রয়ীর মাঝে কেউ আগেও নন, পরেও নন। কেউ বড়ও নন, ছোটও নন।
২৬. কিন্তু প্রত্যেক সত্তাই সমপর্যায়ের ও একই সাথে চিরন্তন।
২৭. যা বলা হলো তার ভিত্তিতে আমাদের ওপর কর্তব্য ত্রয়ীর মাঝে একত্বের ইবাদত করা। এবং একত্বের মাঝে ত্রয়ীর ইবাদত করা।
২৮. সুতরাং যে মুক্তি পেতে চায় তার কর্তব্য হলো ত্রয়ীর ব্যাপারে এভাবে জোরদার বিশ্বাসী হওয়া।
২৯. একইভাবে মুক্তির জন্য আমানতদারিতার সাথে আমাদের প্রভু যিশুর দেহধারণের আকিদায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে।
৩০. কেননা, সংগত বিশ্বাস হলো, আমানতদারিতার সাথে আমাদের এই বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আমাদের প্রভু যিশু ঈশ্বরের পুত্র। তিনি ঈশ্বর এবং মানুষ।
৩১. তিনি ঈশ্বর পিতার মৌল থেকে। যুগের পূর্বে তিনি জন্মেছেন। তিনি মানুষ মায়ের মৌল থেকে। এই যুগে তিনি অস্তিত্বশীল।
৩২. তিনি পূর্ণ ঈশ্বর ও পূর্ণ মানুষ। সত্তাগত বাকসম্পন্ন ও মানব দেহধারী।
৩৩. ঐশ্বরিক দিক থেকে পিতার সমান। মানবীয় দিক থেকে পিতার নিচে।
৩৪. তিনি যদিও ঈশ্বর এবং মানুষ তথাপি তিনি একক মসিহ। দ্বৈত নন।
৩৫. কিন্তু এমন একজন যার ঐশ্বরিক সত্তা দেহে রূপান্তরিত নয় বরং মানবীয় সত্তা ঐশ্বরিক সত্তায় গ্রহণ করে।
৩৬. সার্বিকভাবে এক। বিভিন্ন মৌলের সংমিশ্রণে নয়। বরং সত্তাগুলোর একত্বের দ্বারা।
৩৭. যেভাবে বাকসম্পন্ন আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে একজনই মানুষ একইভাবে ঈশ্বর এবং মানব মিলে একজন মসিহ।
৩৮. আমাদের মুক্তির জন্য তিনি কষ্ট ভোগ করেছেন। জাহিমে[৬০৫] অবতরণ করেছেন। তৃতীয় দিন তিনি মৃতদের থেকে উত্থিত হয়েছেন।
৩৯. তিনি আসমানে উঠে গেছেন। সবকিছুর ধারক পিতার ডানপাশে তিনি উপবিষ্ট হয়েছেন।
৪০. সেখান থেকেই তিনি জীবিত ও মৃতদেরকে প্রতিদান দেওয়ার জন্য আগমন করবেন।
৪১. তার আগমনে সকল মানুষ স্বশরীরে উত্থিত হবে। সবাই নিজের ব্যক্তিগত আমলের হিসাব দেবে।
৪২. অতঃপর যারা ভালো কর্ম সম্পাদন করেছেন তারা স্থায়ী জীবনে প্রবেশ করবেন। আর যারা মন্দ কর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা স্থায়ী জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
৪৩. এটাই হলো ক্যাথলিক বিশ্বাস। এর ওপর আমানত ও ইয়াকিনের সাথে বিশ্বাস স্থাপন না করলে কারোরই পক্ষেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।[৬০৬]

টিকাঃ
[৬০৫] অর্থাৎ রুহজগৎ অথবা হাবিয়া নামক জাহান্নাম অথবা তৃতীয় দিন পর্যন্ত মসিহের মৃত্যুর অধীনে থাকা। এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন "আমার বিশ্বাস” গ্রন্থের লিখক।
[৬০৬] আকানিমুন নাসারা, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭২

ফন্ট সাইজ
15px
17px