📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 এই দলের গুরুত্বপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাস

📄 এই দলের গুরুত্বপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাস


১। এরা বিশ্বাস করে পবিত্র আত্মার উদ্ভব হলো পিতা-পুত্রের সমষ্টি থেকে।
২। এই দলের অনুসারীরা মনে করে পিতা এবং পুত্র উভয়ে সমমর্যাদার।
৩। এরা মসিহের দ্বৈত প্রকৃতিতে বিশ্বাস করে। একটি ঐশ্বরিক। অপরটি মানবীয়।
৪। এদের বিশ্বাস পৃথিবীর অভ্যন্তরে একটি ছোট্ট জাহান্নাম আছে। যারা জীবদ্দশায় পাপাচারে লিপ্ত হয় তাদের আত্মাকে সেখানে পোড়ানো হয়। আত্মা পুড়ে পবিত্র হয়ে আকাশের ফিরদাউসের বাসিন্দা হওয়ার উপযুক্ততা লাভ করে। এই বিশ্বাসের ভিত্তি সুসমাচার নয়। বরং এই আকিদার প্রবক্তা হলেন পোপ গ্রেগরিদ্য গ্রেট। ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই আকিদার প্রচার করেন।
৫। চার্চে পাদরিদের প্রার্থনা ক্লিষ্ট আত্মার আজাব দূর করে। এখান থেকেই মূলত ক্ষমাপ্রদান আকিদার উদ্ভব ঘটে। আকিদাটি হলো চার্চের প্রতিনিধিগণ ধ্বংসে নিমজ্জিত আত্মার জন্য প্রার্থনার মাধ্যমে শান্তি বন্ধ করতে সক্ষম।
৬। পাপ স্বীকারের পদ্ধতি হলো মানুষ পাদরির কাছে গিয়ে নিজের অপরাধের কথা খুলে বলবে। এরপর কৃত অপরাধের ওপর নিজের লজ্জাবোধ এবং ভবিষ্যতে সেই অপরাধ না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করবে। এরপর পাদরি তার সেই বক্তব্যকে গ্রহণ করবেন এবং তার জন্য কল্যাণের প্রার্থনা করবেন। তার নামে একটি ক্ষমাপত্রও প্রদান করবেন। এই আকিদাটি প্রথমদিকে খ্রিষ্টানদের মধ্যে ছিল না। ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ মহাসভায় এটি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এ স্বীকৃতিও দেওয়া হয় যে প্যাপাল চার্চ (Papal Charch) ক্ষমা করার অধিকার রাখে এমনকি যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করতে পারে।
৭। ঈশ্বরভোজ (Eucharist): ঈশ্বরভোজ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈসা আলাহিস সালাম কর্তৃক শিষ্যগণের সাথে ভোজসভা। তারা বিশ্বাস করে যে প্রার্থনাকারীগণ যে রুটি ও শরাব প্রস্তুত করে থাকেন তা মসিহের দেহ এবং রক্তে রূপান্তরিত হয়।
মথির সুসমাচারের ছাব্বিশতম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, 'পরে তাঁহারা ভোজন করিতেছেন, এমন সময়ে যীশু রুটি লইয়া আশীর্বাদপূর্বক ভাঙ্গিলেন, এবং শিষ্যদিগকে দিলেন, আর কহিলেন, লও, ভোজন কর, ইহা আমার শরীর। পরে তিনি পানপাত্র লইয়া ধন্যবাদপূর্বক তাঁহাদিগকে দিয়া কহিলেন, তোমরা সকলে ইহা হইতে পান কর; কারণ ইহা আমার রক্ত, নূতন নিয়মের রক্ত, যাহা অনেকের জন্য, পাপমোচনের নিমিত্ত, পাতিত হয়।[৫৮৭]
১৫৪৫ এবং ১৫৬৩ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত টরেন্টো এর মহাসভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই প্রার্থনা পদ্ধতিকে তথা ঈশ্বরভোজকে আবশ্যক করা হয়। রবিবারে সকলে জড়ো হয়ে পাদরির বক্তব্য শোনেন। এরপর প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নজরানা পেশ করেন। অতঃপর সিজদা সম্পন্ন করে সবাই রুটি-শরাব গ্রহণ করে। তাদের ধারণা এই ঐশ্বরিক ভোজে স্বয়ং মসিহ বিরাজমান থাকেন। ভোজসভায় উপস্থিত সকলের অর্ধদিন উপবাস করা আবশ্যক। তবে এই উপবাসকালীন সময়ে খাদ্য গ্রহণ নিষিদ্ধ হলেও পানীয় গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আর মুসাফিরদের জন্য এই উপবাস পালন না করার অনুমতি রয়েছে।
৮। ক্যাথলিক চার্চ তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। সমস্যা যত প্রকটই হোক না কেন বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা বৈধ নয়। এমনকি পরকিয়ার মতো সংকটের ক্ষেত্রেও তালাক বা বিচ্ছেদের কোনো সুযোগ নেই।
৯। ব্যাপ্তাইজম (Baptism): এটি মূলত নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গোসল করানোকে বুঝায়। খ্রিষ্টানদের প্রায় সকল দলই এর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত। তাদের ভ্রান্ত ধারণা অনুযায়ী আল্লাহর নবি ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া আলাইহিমাস সালাম যিরিহোর (জেরিকো) দক্ষিণে জর্ডান উপত্যকায় ব্যাপ্তাইজম করাতেন। যেমন মার্কের সুসমাচারে বলা হয়েছে, 'তদনুসারে যোহন উপস্থিত হইলেন, ও প্রান্তরে বাপ্তাইজ করিতে লাগিলেন, এবং পাপমোচনের জন্য মনপরিবর্তনের বাপ্তিস্ম প্রচার করিতে লাগিলেন।[৫৮৮]
ব্যাপ্তাইজমের ব্যাখ্যা হলো পাপীগণের দেহকে গোসলের মাধ্যমে তাওবার দিকে ধাবিত করা। তাদের বিশ্বাসমতে যোহন (ইয়াহইয়া) মসিহকেও ব্যাপ্তাইজম করিয়েছেন। এজন্যই তাকে যোহন ব্যাপ্তাইজক বলা হয়।[৫৮৯] যিশুর ব্যাপ্তাইজমের পর সম্রাট হেরোড তাকে হত্যা করেন।
মসিহ আলাইহিস সালামের সমকালীন ইহুদি ঐতিহাসিক যোসেফাইন বলেন, 'যোহন ছিলেন বিশাল হৃদয় ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী একজন ব্যক্তি। তিনি ইহুদি জাতিকে পূর্ণতা অর্জনে উৎসাহিত করেছেন। তাদেরকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা দিয়েছেন। ভ্রাতাদের সাথে লেনদেনে, আল্লাহর সাথে এবং ব্যাপ্তাইজমের ক্ষেত্রেও। তখন প্রত্যেক উঁচুনিচু ভূমি থেকে লোকজন তার দিকে ছুটে গেল। এতে করে হেরোড যোহনের কারণে বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোল সৃষ্টির ভয় করলেন। এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিনি যোহনকে বন্দি করে ম্যাকারিয়ুস দুর্গে প্রেরণ করেন। সেখানেই তার মস্তকচ্ছেদ করা হয়।[৫৯০]
ব্যাপ্তাইজমের পদ্ধতি হলো খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণেচ্ছু ব্যক্তিকে চার্চের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই কক্ষে পশ্চিম দিকে মুখ করে হাত উপরে তুলে তাকে বলতে হয়, 'হে শয়তান! আমি তোমার থেকে এবং তোমার সকল কর্ম থেকে মুক্ত। অতঃপর পূর্ব দিকে মুখ করে খ্রিষ্টধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসে ইমানের ঘোষণা দিতে হয়। এরপর তাকে অপর একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। কক্ষে সে তার পরিধেয় সকল বস্ত্র ত্যাগ করে। অতঃপর পাদরি তার শরীরে ঝাড়ফুঁক করে তেল মালিশ করেন। এরপর তাকে নির্দিষ্ট হাউজে (Pigmentation bath) ডুব দেওয়ানো হয়। এ সময়ে পাদরি তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ?' তখন সে হ্যাঁ-বোধক জবাব দেয়। এরপর পুনরায় তার শরীরে তৈল মর্দন করা হয় এবং সাদা পোশাক পরিধান করানো হয়। সাদা হলো সকল পাপ থেকে পবিত্রতার প্রতীক। এরপর সে ঈশ্বরভোজে অংশ নেওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তাকে খ্রিষ্টধর্মের একনিষ্ঠ বিশ্বাসীদের কাতারে গণ্য করা হয়।
কিতাবুল উসুল ওয়াল ফুরু এর লেখক ব্যাপ্তাইজম সম্পর্কে বলেন, 'এটি একটি পবিত্র বিধান। পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার নাম নিয়ে পানি দিয়ে গোসল করা যিশুখ্রিষ্টের রক্ত দিয়ে আত্মাকে পাপ থেকে পবিত্র করার ইঙ্গিত বহন করে। ব্যাপ্তাইজম হলো এককভাবে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার ওপর ঈমান ও আনুগত্যের প্রকাশ্য ঘোষণা।[৫৯১]
তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো সুসমাচারগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী মসিহ আলাইহিস সালাম কাউকে ব্যাপ্তাইজম করাননি।[৫৯২]

টিকাঃ
[৫৮৭] মথি, অধ্যায়: ২৬, অনুচ্ছেদ: ২৬-২৮।
[৫৮৮] মার্ক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ৪
[৫৮৯] পাঠক, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন কায়রোর দারুশ শাআব থেকে প্রকাশিত আব্দুর রাযযাক নওফেল কর্তৃক রচিত ইউহান্না আল-মুআম্মিদান গ্রন্থটি।
[৫৯০] লামহাতুন মিনাত তারিখ ফিল ইনজিল, পৃষ্ঠা: ৫৪-৫৫।
[৫৯১] ইয়াসসু আল-মসিহ, পৃষ্ঠা: ২১০, ডক্টর শালবি রচিত আল-মাসিহিয়্যাহ গ্রন্থের ১৪৩ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত।
[৫৯২] যোহন, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px