📄 তিন. শরিয়ত তথা বিধিবিধান
সুসমাচারগুলো অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় ঈসা আলাইহিস সালামের শরিয়তে পুরাতন নিয়মের বিধি-বিধান ও মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক ইহুদিদের জন্য প্রবর্তিত বিধিবিধানকে স্থির রাখা হয়েছে। ইহুদিদের বিধিবিধান থেকে খুব অল্প সংখ্যক বিধানকেই রহিত করা হয়েছে কিংবা পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রদত্ত প্রসিদ্ধ অসিয়তের মধ্যে এ কথাও ছিল যে, "আর উক্ত হইয়াছিল, “যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে, সে তাহাকে ত্যাগপত্র দিউক”। কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, যে কেহ ব্যভিচার ভিন্ন অন্য কারণে আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে, সে তাহাকে ব্যভিচারিণী করে; এবং যে ব্যক্তি সেই পরিত্যক্তা স্ত্রীকে বিবাহ করে, সে ব্যভিচার করে।” [৪৮২]
"তিনি তাঁহাদিগকে কহিলেন, যে কেহ আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীকে বিবাহ করে, সে তাহার বিরুদ্ধে ব্যভিচার করে; আর স্ত্রী যদি আপন স্বামীকে পরিত্যাগ করিয়া আর একজনকে বিবাহ করে, তবে সেও ব্যভিচার করে।” [৪৮৩]
বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রী এক দেহ এক সত্তায় পরিণত হয়। ফলে পরবর্তী সময় তারা আর সত্তাগতভাবে আলাদা হতে পারে না। মসিহ আলাইহিস সালাম বলেন, "অতঃপর ঈশ্বর যাহার যোগ করিয়া দিয়াছেন মনুষ্য তাহার বিয়োগ না করুক।” [৪৮৪]
কিসাসের ব্যাপারে তিনি বলেন, “তোমরা শুনিয়াছ, উক্ত হইয়াছিল, “চক্ষুর পরিশোধে চক্ষু ও দন্তের পরিশোধে দন্ত”। কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা দুষ্টের প্রতিরোধ করিও না; বরং যে কেহ তোমার দক্ষিণ গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহার দিকে ফিরাইয়া দেও। আর যে তোমার সহিত বিচার-স্থানে বিবাদ করিয়া তোমার আঙরাখা লইতে চায়, তাহাকে চোগাও লইতে দেও। আর যে কেহ এক ক্রোশ যাইতে তোমাকে পীড়াপীড়ি করে, তাহার সঙ্গে দুই ক্রোশ যাও। যে তোমার কাছে যাজ্ঞা করে, তাহাকে দেও; এবং যে তোমার নিকটে ধার চায়, তাহা হইতে বিমুখ হইও না।”[৪৮৫]
ব্যভিচারিণীর রজমের ব্যাপারে যোহন বর্ণনা করেন, “পরে তাহারা প্রত্যেকে আপন আপন গৃহে গেল, কিন্তু যীশু জৈতুন পর্বতে গেলেন। আর প্রত্যুষে তিনি পুনর্বার ধর্মধামে আসিলেন; এবং সমুদয় লোক তাঁহার নিকটে আসিল; আর তিনি বসিয়া তাঁহাদিগকে উপদেশ দিতে লাগিলেন। তখন অধ্যাপক ও ফরীশীগণ ব্যভিচারে ধৃত একজন স্ত্রীলোককে তাঁহার নিকটে আনিল, ও মধ্যস্থানে দাঁড়াইয়া তাঁহাকে কহিল, হে গুরু, এই স্ত্রীলোকটি ব্যভিচারে, সেই ক্রিয়াতেই, ধরা পড়িয়াছে। ব্যবস্থায় মোশি এই প্রকার লোককে পাথর মারিবার আজ্ঞা আমাদিগকে দিয়াছেন; তবে আপনি কি বলেন? তাহারা তাঁহার পরীক্ষা ভাবেই এই কথা কহিল, যেন তাঁহার নামে দোষারোপ করিবার সূত্র পাইতে পারে। কিন্তু যীশু হেঁট হইয়া অঙ্গুলি দ্বারা ভূমিতে লিখিতে লাগিলেন। পরে তাহারা যখন পুনঃ পুনঃ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল তিনি মাথা তুলিয়া তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ, সেই প্রথমে ইহাকে পাথর মারুক। পরে তিনি পুনর্বার হেঁট হইয়া অঙ্গুলি দিয়া ভূমিতে লিখিতে লাগিলেন। তখন তাহারা ইহা শুনিয়া, এবং আপন আপন সংবেদ দ্বারা দোষীকৃত হইয়া, একে একে বাহিরে গেল, প্রাচীন লোক অবধি আরম্ভ করিয়া শেষ জন পর্যন্ত গেল; তাহাতে কেবল যীশু অবশিষ্ট থাকিলেন, আর সেই স্ত্রীলোকটি মধ্যস্থানে দাঁড়াইয়াছিল। তখন যীশু মাথা তুলিয়া, স্ত্রীলোকটি ছাড়া আর কাহাকেও দেখিতে না পাইয়া, তাহাকে কহিলেন, হে নারি, যাহারা তোমার নামে অভিযোগ করিয়াছিল, তাহারা কোথায়? কেহ কি তোমাকে দোষী করে নাই? সে কহিল, না, প্রভু, কেহ করে নাই। তখন যীশু তাহাকে বলিলেন, আমিও তোমাকে দোষী করি না; যাও, এখন অবধি আর পাপ করিও না।”[৪৮৬]
এর অর্থ হলো মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়ত অনুযায়ী ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে রজম করার বিষয়টিকে মসিহ আলাইহিস সালাম রহিত করে দিয়েছেন। কিন্তু এ অধিকার তার ছিল না। কেননা, তিনি মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তকে পরিপূর্ণ করতে এসেছেন। রহিত করতে নয়।
মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তে আপনজনকে মহব্বত ও শত্রুকে ঘৃণার কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে মসিহ আলাইহিস সালাম বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সকলকে ভালোবাসতে বলেছেন। যেমন মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, "তোমরা শুনিয়াছ, উক্ত হইয়াছিল, “তোমার প্রতিবাসীকে প্রেম করিবে,” এবং 'তোমার শত্রুকে দ্বেষ করিবে'। কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা আপন আপন শত্রুদিগকে প্রেম করিও, এবং যাহারা তোমাদিগকে তাড়না করে, তাহাদের জন্য প্রার্থনা করিও; যেন তোমরা আপনাদের স্বর্গস্থ পিতার সন্তান হও, কারণ তিনি ভালো-মন্দ লোকদের উপরে আপনার সূর্য উদিত করেন, এবং ধার্মিক-অধার্মিকগণের উপরে জল বর্ষান। কেননা, যাহারা তোমাদিগকে প্রেম করে, তাহাদিগকেই প্রেম করিলে তোমাদের কি পুরস্কার হইবে?”[৪৮৭]
মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তে নরহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। মসিহ আলাইহিস সালাম আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়ার চিন্তাকেও নিষিদ্ধ করেছেন। যেমন মথির সুসমাচারে বলা হয়েছে, তোমরা শুনিয়াছ, পূর্বকালের লোকদের নিকটে উক্ত হইয়াছিল, "তুমি নরহত্যা করিও না," আর 'যে নরহত্যা করে, সে বিচারের দায়ে পড়িবে'। কিন্তু আমি তোমাদিগকে কহিতেছি, যে কেহ আপন ভ্রাতার প্রতি ক্রোধ করে, সে বিচারের দায়ে পড়িবে; আর যে কেহ আপন ভ্রাতাকে বলে, 'রে নির্বোধ,' সে মহাসভার দায়ে পড়িবে। আর যে কেহ বলে, 'রে মূঢ়,' সে অগ্নিময় নরকের দায়ে পড়িবে।”[৪৮৮]
টিকাঃ
[৪৮২] মথি, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ৩১-৩২।
[৪৮৩] মার্ক, অধ্যায়: ১০, অনুচ্ছেদ: ১১-১২।
[৪৮৪] মার্ক, অধ্যায়: ১০, অনুচ্ছেদ: ৯।
[৪৮৫] মথি, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ৩৮-৪২।
[৪৮৬] যোহন, অধ্যায় ৮, অনুচ্ছেদ: ১-১১।
[৪৮৭] মথি, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ৪৩-৪৬।
[৪৮৮] মথি, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ২১-২২।
📄 চার. বিবাহ ও পরিবার গঠন
সাধারণভাবে সুসমাচারগুলো বিবাহের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ন্যাসব্রত ও কৌমার্যের প্রতি উৎসাহিত করে।
করিন্থিয়দের প্রতি লিখিত পত্রে পোল বলেন, "কিন্তু যে ব্যক্তি হৃদয়ে স্থির, যাহার কোনো প্রয়োজন নাই, এবং আপনি আপন ইচ্ছা সম্বন্ধে কর্তা, সে যদি আপন কন্যাকে কুমারী রাখিতে হৃদয়ে স্থির করিয়া থাকে, তবে ভাল করে। অতএব যে আপন কুমারী কন্যার বিবাহ দেয়, সে ভাল করে; এবং যে না দেয়, সে আরও ভাল করে। "[৪৮৯]
পোল আরও বলেন, "আবার তোমরা যে সকল কথা লিখিয়াছ, তাহার বিষয়ে- স্ত্রীলোককে স্পর্শ না করা মনুষ্যের ভাল।"[৪৯০]
তবে যে নিজের ব্যাপারে অপরাধের ভয় করে সে বিয়ে করে নিতে পারে। অন্যত্র তিনি বলেন, “পরন্তু অবিবাহিত লোকদের ও বিধবাদের কাছে আমার কথা এই, তাহারা যদি আমার মত থাকিতে পারে, তবে তাহাদের পক্ষে তাহাই ভাল; কিন্তু তাহারা যদি ইন্দ্রিয় দমন করিতে না পারে, তবে বিবাহ করুক; কেননা, আগুনে জ্বলা অপেক্ষা বরং বিবাহ করা ভাল।”[৪৯১]
এরই মাধ্যমে আমরা দল-উপদল নির্বিশেষে খ্রিষ্টানদের নিকট সমাদৃত চারটি সুসমাচার সম্পর্কে আলোচনা শেষ করেছি। এ পর্যায়ে আমরা খ্রিষ্টধর্মের অন্যান্য উৎস তথা পবিত্র পুস্তকসমূহ নিয়ে আলোচনা করব।
টিকাঃ
[৪৮৯] করিন্থিয়, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৩৭-৩৮।
[৪৯০] প্রাগুক্ত, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ১।
[৪৯১] প্রাগুক্ত, অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৮-৯।