📄 লুকের সুসমাচার
প্রফেসর বারাকাত তার গ্রন্থ তারিখুল ইনজিলে লুক সম্পর্কে বলেন, “ইনি গ্রিক বংশোদ্ভূত। পৌত্তলিক ধর্ম থেকে তিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত পোলের সান্নিধ্যে থাকেন। প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে তিনি তার সুসমাচারটি এবং প্রেরিতদের কার্যবিবরণী রচনা করেন।” [৪৭০]
লুক এন্টিয়ক (Antioch)-এ জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এ পেশাতেই মনোনিবেশ করেন। অতঃপর খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি পোলের সাথে অনেক দাওয়াতি সফরে অংশ নেন। পোল তাকে 'প্রিয় ডাক্তার' বলে সম্বোধন করতেন। যেমন কলসিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্রে তিনি বলেন, "তোমাদিগকে প্রিয় ডাক্তার লুক অভিবাদন জানাচ্ছে।” এর দ্বারা বোঝা যায়, লুক মসিহ কিংবা শিষ্যগণের শিষ্যও ছিলেন না। তিনি ছিলেন পোলের অনুসারী। রোমান সাগরের তীরে ট্রাউস (Trowse) নগরীতে পৌঁছলে তিনি পোলের বক্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন। তার দিকে সম্বন্ধিত সুসমাচারটি খ্রিষ্টানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুসমাচার হিসেবে বিবেচিত।
লুক সুসমাচারটি কোন ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন তা নিয়ে অদ্যাবধি বিরোধ বিদ্যমান। এটি কি গ্রিক ভাষায় রচিত হয়েছে নাকি ল্যাটিন ভাষায়? তবে এটি ৬৩ কিংবা ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়েছে। সুসমাচারটি তিনি এমন একটি বাক্য দিয়ে শুরু করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় সম্রাট থিওফিলাস (Theophilos)-এর উদ্দেশ্যেই তিনি এটি রচনা করেছেন। বাক্যটি হলো, "প্রথম অবধি যাঁহারা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, এবং বাক্যের সেবা করিয়া আসিয়াছেন, তাঁহারা আমাদিগকে যেমন সমর্পণ করিয়াছেন, তদনুসারে অনেকেই আমাদের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে গৃহীত বিষয়াবলির বিবরণ লিপিবদ্ধ করিতে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, সেই জন্য আমিও প্রথম হইতে সকল বিষয় সবিশেষ অনুসন্ধান করিয়াছি বলিয়া, হে মহামহিম থিয়ফিল, আপনাকে আনুপূর্বিক বিবরণ লেখা বিহিত বুঝিলাম; যেন, আপনি যে সকল বিষয় শিক্ষা পাইয়াছেন, সেই সকল বিষয়ের নিশ্চয়তা জ্ঞাত হইতে পারেন।” [৪৭১]
সুসমাচারের সূচনা থেকে বোঝা যায় এটি প্রথম যুগের খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জ নিয়ে রচিত হয়েছে। মসিহ আলাইহিস সালামের বাণীর সংকলন এটি নয়। এতদসত্ত্বেও সুসমাচারটিতে মসিহ আলাইহিস সালামের অনেকগুলো বাণী স্থান পেয়েছে। লুক তার সুসমাচারে মসিহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে পূর্ববর্ণিত ঘটনাবলির মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। এটি রচনার পেছনে ইহুদিদের হিদায়াতের চেয়ে অ-ইহুদি কাফির সম্প্রদায়ের হিদায়াতই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি মার্কের সুসমাচার থেকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ধৃত করেছেন। মার্কের সুসমাচরে অনুচ্ছেদ রয়েছে ছয়শ একষট্টিটি। লুক সেখান থেকে তিনশ পঞ্চাশটি নিজ সুসমাচারে উল্লেখ করেছেন। লুকের সুসমাচারের কতগুলো অনুচ্ছেদ মথির সুসমাচারের সাথে মিল পাওয়া গেলেও মার্কের সুসমাচারে পাওয়া যায় না। সম্ভবত তিনি এগুলো মথি থেকেই উদ্ধৃত করেছেন কিংবা তিনি এবং মথি উভয়ে তৃতীয় কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করেছেন, যে উৎস সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। [৪৭২]
টিকাঃ
[৪৭০] তারিখুস সুহুফিস সামাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১২০।
[৪৭১] লুক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১-৪।
[৪৭২] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২০৯।
📄 যোহনের সুসমাচার
যোহন ছিলেন শীর্ষ বারোজন হাওয়ারির একজন। তার পিতা ছিলেন একেবারে প্রথম দিকের খ্রিষ্টান এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রচারক। মসিহ আলাইহিস সালাম যোহনকে ভালোবাসতেন এবং 'প্রিয় হাওয়ারি' বলে সম্বোধন করতেন। চারটি সুসমাচারের একটি তার দিকে সম্বন্ধ করা হয়। বলা হয়ে থাকে, এই সুসমাচারটি তিনি ৯০ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেছেন। সুতরাং সংকলন বিবেচনায় সবচেয়ে নতুন সুসমাচার এটি। পূর্ববর্তী সুসমাচারগুলোর প্রায় ত্রিশ বছর পর এটি রচিত হয়েছে।
কিন্তু মসিহ আলাইহিস সালামের হাওয়ারি যোহনের দিকে সম্বন্ধিত এই সুসমাচারটি যোহন নিজে লিখেছেন নাকি অন্য কেউ রচনা করেছেন তা নিয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের মাঝে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। প্রাচীন খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এটিকে যোহনের দিকে সম্বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা এর লেখক বলেন, “সন্দেহাতীতভাবে যোহনের সুসমাচারটি একটি জাল পুস্তক। এর লেখক মূলত দুজন সাধু তথা যোহন [৪৭৩] এবং মথির মাঝে বিরাজমান পারস্পরিক বিরোধ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছেন। প্রতারক লেখক পুস্তকের বিবরণীতে নিজেকে মসিহের প্রিয় হাওয়ারি বলে দাবি করেছেন। তারপরও ত্রুটিপূর্ণ এই বাক্যটিকে চার্চগুলো গ্রহণ করে নিয়েছে। দৃঢ়তার সাথে স্বীকৃতিও দিয়েছে যে, এই লেখক হলেন হাওয়ারি যোহন। এমনকি পুস্তকের ওপর তার নামও সেঁটে দিয়েছে। অথচ এ কথা নিশ্চিত যে, এর লেখক হাওয়ারি যোহন ভিন্ন অন্য কেউ। এটি তাওরাতের ওই সমস্ত পুস্তকের মতো যেগুলোর সাথে লেখক হিসেবে সম্বন্ধিত ব্যক্তির কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের করুণা হয় ওই সব ব্যক্তিবর্গের ওপর যারা এই পুস্তকের সাথে কথিত লেখকের সম্পর্ক খোঁজার জন্য বৃথা চেষ্টা ব্যয় করেছেন। তারা এই পুস্তকের লেখক ব্যক্তিটির সাথে গালিলের মৎস্যজীবী হাওয়ারি যোহনের সম্পর্ক প্রমাণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করেছেন। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
দাইরাতুল মাআরিফিল ফারানসিয়্যাহ যেটি লা রওসুল করনিল ইশরিন নামে পরিচিত তাতে লিখা হয়েছে, “যোহনের দিকে এই সুসমাচার ও নতুন নিয়মের আরও তিনটি পুস্তক সম্বন্ধ করা হয়। কিন্তু আধুনিক ধর্মতত্ত্ব গবেষণা এই সম্বন্ধকরণের শুদ্ধতা খুঁজে পায়নি।” একইভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীর খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এই সুসমাচারটিকে হাওয়ারি যোহনের দিকে সম্বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই অস্বীকৃতি এসেছে আরিনুসের পক্ষ থেকে। আরিনুস ছিলেন যোহনের সরাসরি শিষ্য পলিকার্পের (Polycarp) শাগরিদ। একইভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে অ্যালেগিন নামক একটি খ্রিষ্টান উপদলও এই সুসমাচারটিসহ যোহনের দিকে সম্বন্ধিত সকল পুস্তককে অস্বীকার করত। এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা এর লেখক মনে করেন এই সুসমাচারটি শ্রিনটাস এর রচনা। [৪৭৪]
যোহনের সুসমাচার নিয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের কারণ হলো আকিদা-সংক্রান্ত কিছু বিষয়। মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্ব, ত্রিত্ববাদ প্রভৃতি আকিদার আলোচনা প্রথম এই সুসমাচারটিতেই স্থান পেয়েছে। পূর্ববর্তী সুসমাচারগুলো তথা মথি, লুক ও মার্ক কেউই এই আকিদাগুলোর আলোচনা তাদের সুসমাচারে আনেননি। তবে এগুলোর পরবর্তী যুগের অনুবাদগুলোতে মূল অর্থকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছে, যা এই ভ্রান্ত আকিদার ইঙ্গিত বহন করে। এ কারণেও যোহনের সুসমাচারের লেখকের পরিচয় অদ্যাবধি রহস্যের আড়ালেই রয়ে গিয়েছে।
ধর্মতত্ত্ব গবেষকগণ এই সুসমাচারটির রচনাকাল নিয়েও একমত হতে পারেননি। গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, কোনো এক গ্রিক দার্শনিক এটি রচনা করেছেন। মসিহ আলাইহিস সালামের হাওয়ারিদের কেউই এটি রচনা করেননি। এই দাবির কারণ হলো সুসমাচারটিতে গ্রিক দেব-দেবী সংশ্লিষ্ট অনেক আলোচনা স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে ইহুদি দার্শনিক ফিলো এর [৪৭৫] দর্শন এখানে স্থান পেয়েছে। অথচ গবেষকগণের কাছে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, হাওয়ারি যোহন নিরক্ষর ছিলেন। প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, "তখন পিতরের ও যোহনের সাহস দেখিয়া এবং ইহারা যে অশিক্ষিত সামান্য লোক ইহা বুঝিয়া তাহারা আশ্চর্যজ্ঞান করিলেন।” [৪৭৬]
একইভাবে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, এর লেখক ইহুদিদের উচ্চশ্রেণির কেউ ছিলেন। [৪৭৭] অথচ যোহন ছিলেন মৎস্যজীবী। এ ছাড়াও এই সুসমাচারটি বক্তব্যের ধরন, বিষয়বস্তু, বর্ণনাভঙ্গি প্রভৃতি দিক থেকে অন্যান্য সুসমাচার থেকে ভিন্ন। জেমস মাইক ক্যানন এ কথা স্বীকার করে বলেন, "লেখকগণ হাওয়ারি যোহন ও এই সুসমাচারের লেখক মহামতি যোহনের মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।” পাকিস্তানি খ্রিষ্টান পণ্ডিত সাধু বরকতুল্লাহ বলেন, "এই সুসমাচারটি হাওয়ারি যোহনের রচনা হওয়া অসম্ভব। কেননা, সুসমাচারটির বিষয়বস্তু সাক্ষ্য দেয় যে, এর লেখক চার্চের প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি হবেন।” এরপর তিনি নিজ দাবি প্রমাণের জন্য সুসমাচারটি থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। [৪৭৮]
যোহনের সুসমাচারের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এর লেখককে মসিহ আলাইহিস সালাম ভালোবাসতেন। কিন্তু এই অনুচ্ছেদগুলো সম্পর্কে সুসমাচারের ব্যাখ্যাকার ওয়েস্ট কোর্টের মন্তব্য হলো, "এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, অনুচ্ছেদগুলো পরবর্তীতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।” আধুনিক যুগে বিশপ গোরেও (Gore) একই মত পোষণ করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো সুসমাচারটির সিনাই কপিতে এই অনুচ্ছেদগুলো নেই। ওয়েস্ট কোর্ট তো সুস্পষ্টভাবে বলেই দিয়েছেন যে, মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বে বিশ্বাসীগণ বিরুদ্ধবাদীদের সামনে নিজেদের দাবি প্রমাণ করার জন্য এই অনুচ্ছেদগুলো বাড়িয়ে নিয়েছে।
অন্যান্য সুসমাচারের লেখকগণ মসিহ আলাইহিস সালামের জীবনবৃত্তান্ত দিয়ে আলোচনা শুরু করলেও যোহন তা করেননি। উইল ডুরান্ট বলেন, “তিনি (যোহন) ঈশ্বরের কালিমা, জগতের সৃষ্টিকর্তা, মানবতার পরিত্রাণদাতা প্রভৃতি গুণ বর্ণনার দ্বারা মসিহকে ইলাহরূপে উপস্থাপন করেছেন। এটি অন্যান্য সুসমাচারের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সুসমাচারে "বিশ্বাস নয়, জ্ঞানেই মুক্তি" ধারণা ও ম্যাটাফিজিক্সের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি দৃঢ় সমর্থন থাকায় গবেষকগণ এই সুসমাচার সম্পর্কে সন্দেহ করেছেন যে, এটি বাস্তবে যোহনের রচনা কি না?” [৪৭৯]
টিকাঃ
[৪৭৩] এখানে যোহন থেকে মার্ক উদ্দেশ্য। কেননা মার্কের প্রকৃত নাম ছিল যোহন যা আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি।
[৪৭৪] দাইরাতুল মাআরিফিল ব্রিতানিয়্যাহ, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ৯৮।
[৪৭৫] ফিলো নামক এই ইহুদি মসিহ আলাইহিস সালামের সামসময়িক ছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় তার দর্শনের বেশ প্রচার-প্রসার ছিল। গ্রিক দর্শনের আদলে তার নিজস্ব দর্শনের বিশেষ স্কুলও ছিল।
[৪৭৬] প্রেরিত, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ১৩।
[৪৭৭] উদাহরণস্বরূপ দেখুন প্রেরিত, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৬; অধ্যায়: ৩, অনুচ্ছেদ: ১; অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৫; অধ্যায়: ১৯, অনুচ্ছেদ: ৩৮; অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৪৫, অধ্যায়: ১১, অনুচ্ছেদ: ৪৭ প্রভৃতি।
[৪৭৮] আযলিয়্যাতুল আনাজিলিল আরবাআ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩১।
[৪৭৯] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২০৯।