📄 মথির সুসমাচার
এই সুসমাচারটির লেখক হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেন করগ্রাহী মথি। তিনি বারোজন হাওয়ারির একজন। মসিহ আলাইহিস সালামের সংস্পর্শে আসার পূর্বে তিনি কেপারনিয়াম গ্রামে রোমানদের হয়ে রাজস্ব আদায় করতেন। মসিহ আলাইহিস সালাম তাকে দ্বীনের দাওয়াত দিলে তিনি ঈমান আনেন। অতঃপর মসিহ আলাইহিস সালাম তাকে নিজের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। যেমন, সুসমাচারটিতে বর্ণিত হয়েছে, “আর সেই স্থান হইতে যাইতে যাইতে যীশু দেখিলেন, মথি নামক এক ব্যক্তি করগ্রহণ-স্থানে বসিয়া আছে; তিনি তাহাকে কহিলেন, আমার পশ্চাতে আসো। তাহাতে সে উঠিয়া তাঁহার পশ্চাৎ গমন করিল। পরে তিনি গৃহমধ্যে ভোজন করিতে বসিয়াছেন, আর দেখ, অনেক করগ্রাহী ও পাপী আসিয়া যীশুর এবং তাঁহার শিষ্যদের সহিত বসিল। তাহা দেখিয়া ফরীশীরা তাঁহার শিষ্যদিগকে কহিল, তোমাদের গুরু কী জন্য করগ্রাহী ও পাপীদের সহিত ভোজন করেন? তাহা শুনিয়া তিনি কহিলেন, সুস্থ লোকদের চিকিৎসকের প্রয়োজন নাই, বরং পীড়িতদেরই প্রয়োজন আছে।” [৪৫৪]
ইহুদিরা রাজস্ব আদায়কারীদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখত। কেননা, তারা প্রজাদের ওপর জুলুম করত। দখলদার রোমানদের শাসনকে মজবুত করতে তাদের পক্ষ হয়ে ইহুদিদের মধ্য থেকেই একজন প্রতিনিধি রাজস্ব আদায়ের কাজটি করত।
মথি তার সুসমাচার লিখতে গিয়ে দুটি উৎসের ওপর নির্ভর করেছেন।
প্রথম উৎস: লুকিয়া। এটি মসিহ আলাইহিস সালামের নসিহতের সংকলন। ইতিপূর্বে মথি নিজেই এটি সন্নিবেশ করেছিলেন। কিন্তু অল্পদিনেই এটি হারিয়ে যায়। তার কিছু অংশ মথি স্বীয় সুসমাচারে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন।
দ্বিতীয় উৎস: মার্কের সুসমাচার। অনেকগুলো অনুচ্ছেদই তিনি মার্কের সুসমাচার থেকে গ্রহণ করেছেন। [৪৫৫] বরং মার্কের সুসমাচারের ছয়শ ষাটটি অনুচ্ছেদের মধ্য থেকে ছয়শ ছয়টি অনুচ্ছেদই মথি তার সুসমাচারে উদ্ধৃত করেছেন। [৪৫৬]
মসিহ আলাইহিস সালামের ঊর্ধ্বারোহণের পর তার দাওয়াতের মিশন নিয়ে মথি দেশে দেশে ঘুরতে লাগলেন। একসময় তিনি হাবশায় গিয়ে থিতু হন। সেখানে তেইশ বছর অবস্থানের পর ৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন।
এই সুসমাচারের ভাষা সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে। অনেক আরব ঐতিহাসিকের মতে মথি এটি হিব্রু ভাষায় রচনা করেছিলেন। [৪৫৭] ইবনে খালদুনসহ আরও অনেকেই এই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “মথি তার সুসমাচারটি বাইতুল মুকাদ্দাসে বসে হিব্রু ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। এরপর সিবদিয়ের পুত্র যোহন এটিকে ল্যাটিন ভাষায় রূপান্তর করেন।"
কিন্তু আমাদের হাতে মথির যে সুসমাচারটি পৌঁছেছে সেটি গ্রিক ভাষার অনুবাদ। এটি মূল রচনার অব্যবহিত পরেই একই বছর অর্থাৎ ৬০ খ্রিষ্টাব্দে অনূদিত হয়েছে।
এই অনুবাদক কে ছিলেন তা নির্ধারণ করতে গিয়ে আলেমগণ নানান মত ব্যক্ত করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, মথি নিজেই এটি গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ইবনে খালদুন, ইবনে বিতরিক এবং তৃতীয় হিজরির একজন খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক মনে করেন এই অনুবাদটি যোহনের, যিনি নিজেও একটি সুসমাচারের রচয়িতা।
খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের মাঝে আরেকটি মতভেদপূর্ণ বিষয় এই যে, মথি কর্তৃক রচিত সুসমাচারটি কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে নাকি রক্ষা পেয়েছে? ইউরোপিয়ান লেখকগণ মনে করেন, সুসমাচারটির সঠিক পরিণতি জানা যায় না। বর্তমানে প্রচলিত সুসমাচারটি কোনো এক অজ্ঞাত লেখক কর্তৃক রচিত। ১৭৩ খ্রিষ্টাব্দের আগে এটির কোনো পরিচয়ই ছিল না। প্রফেসর হ্যারিং এই মতটিই পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, "মথির সুসমাচারটি ৮০-১০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে রচিত হয়েছে। লোকেরা মনে করে এটি হাওয়ারি মথির রচনা। অথচ বিশুদ্ধ মত হলো এটি অন্য কোনো ব্যক্তি রচনা করেছেন যিনি অজানা কোনো উদ্দেশ্যে নিজেকে গোপন রেখেছেন।” [৪৫৮]
আরিয়ুনুস বিশ্বাস করেন এই সুসমাচারটি হাওয়ারি মথির রচনা নয়। কেননা, এতে মার্কের সুসমাচার থেকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এটি মথির কোনো এক শিষ্য ৮৫-৯০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে রচনা করেছেন। [৪৫৯]
সংকলনের ইতিহাস এবং অনুবাদ সম্পর্কে অজ্ঞতা খ্রিষ্টানদের মাঝে প্রচলিত এই সুসমাচারের ওপর আস্থা নষ্ট করে দেয়। শায়খ আবু যুহরা বলেন, "সন্দেহ নেই যে সংকলন ইতিহাস, মূল হিব্রু কপি, অনুবাদক, অনুবাদকের সততা, ধর্মীয় জ্ঞান, ভাষাজ্ঞানের মাত্রা প্রভৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এর ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একজন গবেষক সংকলন-ইতিহাস ও অনুবাদসংক্রান্ত বিষয়ে ছাড় দিলেও বর্ণনার ধারাবাহিকতার অপূর্ণাঙ্গতাকে তিনি কোনোভাবেই ছাড় দিতে পারেন না। বিশেষত যখন অনুবাদ সম্পর্কেই জানা যায় না। অনুবাদের এই ত্রুটির কারণে আমরা মূল গ্রন্থ সম্পর্কে অবগত হওয়ার চেষ্টা করেছি। যাতে করে আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি অনুবাদ মূলানুগ হয়েছে নাকি বিকৃতি ঘটেছে? অনুবাদক বাক্যের যথার্থ অর্থ ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পেরেছেন কিনা? অনুধাবনটা বাক্যের বাহ্যিক অর্থ, কিংবা ইশারা থেকে হোক অথবা লেখকের সামগ্রিক উদ্দেশ্য থেকেই আঁচ করা হোক না কেন। কিন্তু মূল গ্রন্থ সম্পর্কে অবগত হওয়া আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।” [৪৬০]
মথির সুসমাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, এটি একদিক থেকে পুরাতন নিয়মের বর্ধিতাংশের মতো। বিশেষত একথা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যে, মসিহ আলইহিস সালাম বনি ইসরাইলের ইতিহাসকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই আগমন করেছেন। তাইতো সুসমাচারটির বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মসিহ আলাইহিস সালাম শিষ্যগণকে শুধু ইহুদিদের নিকটই পাঠিয়েছিলেন। এবং তাদেরকে সামেরিয়ানদের শহরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।
ড. মরিস বুকাইলি মথির সুসমাচারটি সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তের সারনির্যাস এভাবে ব্যক্ত করেছেন, "সবকিছু ছাপিয়ে মথির সুসমাচার সম্পর্কে এ কথা বলা যায় যে, এটি একদল ইহুদির সুসমাচার।” [৪৬১]
টিকাঃ
[৪৫৪] মথি, অধ্যায়: ৯, অনুচ্ছেদ: ৯-১২। অনুচ্ছেদটির বর্ণনাভঙ্গি আমাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে যে, হাওয়ারি মথি নিজেই এই সুসমাচারের লেখক কিনা?
[৪৫৫] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২০৯।
[৪৫৬] আযলিয়্যাতুল আনাজিল, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১২৭। সঠিক তথ্য হলো, মার্কের সুসমাচারের অনুচ্ছেদ সংখ্যা হলো ছয়শ আটষট্টিটি। আর মথির সুসমাচারের অনুচ্ছেদের সংখ্যা হলো দশ হাজার একাত্তরটি।
[৪৫৭] কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাসের লেখকও এই মত ব্যক্ত করেছেন।
[৪৫৮] তারিখুস সুহুফিস সামাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১১।
[৪৫৯] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১ পৃষ্ঠা: ২০৮।
[৪৬০] মুহাদারাতুন ফিন নাসরানিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৫৩-৫৪।
[৪৬১] দিরাসাতুল কুতুবিল মুকাদ্দাসাহ ফি জওইল মাআরিফিল হাদিসাহ, পৃষ্ঠা: ৮৩।
📄 মার্কের সুসমাচার
মার্কের প্রকৃত নাম যোহন। ল্যাটিন ভাষায় তার উপাধি মার্ক। এর অর্থ হচ্ছে হাতুড়ি। তিনি জেরুযালেমে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত। কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস গ্রন্থের লেখক বলেন, "ধারণা করা হয় মার্ক হলেন সেই যুবক যিনি শত্রুহস্তে সমর্পণের রাতে মসিহ এর পিছু পিছু অনুসরণ করেছিলেন।” [৪৬২] পিতর তাকে পুত্র বলে সম্বোধন করতেন। [৪৬৩] তিনি সাইপ্রাস ও এশিয়া মাইনরের দাওয়াতি সফরে পোল ও বরনাবার সাথে ছিলেন। এরপর প্রধান হাওয়ারি পিতরের সাথে জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সময় অতিবাহিত করেন। এবং তার অনুগামী হয়ে রোমে গমন করেন।
মার্কের ধর্মীয় জ্ঞানের উৎস ছিলেন পোল এবং শিষ্যবৃন্দ। তিনি ছিলেন বরনাবার ভাগিনা। পোল কলসিয়দের প্রতি তার লিখিত পত্রে বলেন, "আমার সহবন্দি আরিষ্টার্থ, এবং বরনাবার কুটুম্ব, মার্ক- যাঁহার বিষয়ে তোমরা আজ্ঞা পাইয়াছ; তিনি যদি তোমাদের কাছে উপস্থিত হন, তবে তাঁহাকে গ্রহণ করিও।” [৪৬৪]
মার্ককে কেন্দ্র করে পোল এবং বরনাবার মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। যেমন, প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, “কতক দিন পরে পৌল বরনাবাকে কহিলেন, চল, আমরা যে সকল নগরে প্রভুর বাক্য প্রচার করিয়াছিলাম, সেই সকল নগরে এখন ফিরিয়া গিয়া ভ্রাতৃগণের তত্ত্বাবধান করি, দেখি, তাহারা কেমন আছে। আর বারনাবা চাহিলেন, যোহন যাঁহাকে মার্ক বলে, তাঁহাকেও সঙ্গে লইয়া যাইবেন; কিন্তু পৌল মনে করিলেন, যে ব্যক্তি পাস্ফুলিয়াতে তাঁহাদিগকে ছাড়িয়া গিয়াছিল, তাঁহাদের সহিত কার্যে গমন করে নাই, এমন লোককে সঙ্গে করিয়া লওয়া উচিত নয়। ইহাতে এমন বিতণ্ডা হইল যে, তাঁহারা পরস্পর পৃথক হইলেন; বরনাবা মার্ককে সঙ্গে করিয়া জাহাজে কুপ্রে (সাইপ্রাস) গমন করিলেন।” [৪৬৫]
এরপর মার্ক আবার পোলের কাছে ফিরে যান। নিজেকে পোলের সেবায় নিয়োজিত করেন। [৪৬৬] প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে লেখক লুক মতবিরোধের এই বিষয়টি অত্যন্ত হালকাভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এ ঘটনার বর্ণনায় তার ব্যবহৃত শব্দটি রহস্যময়। যদ্দরুন বোঝা যায় মতবিরোধের ভিত্তি এর চেয়ে বড় কিছুই ছিল। প্রেরিতদের কার্যবিবরণীর ব্যাখ্যাকার ব্লেইকলক (Blaiklock) বলেন, “লুক এ পর্যায়ে পোল এবং বরনাবার মাঝে সংঘটিত বিরোধ সম্পর্কে আলোচনা করছেন। তিনি যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলো (Paraxusmus) আর ইংরেজি অনুবাদক জেমস এখানে (Sharp) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এরপর পোল এবং বরনাবা আরও একবার মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছেন।” [৪৬৭]
লুক মতবিরোধের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বরনাবার চেয়ে বেশি কিছু বলেননি। বরনাবার আকাঙ্ক্ষা ছিল খ্রিষ্টধর্মের দাওয়াতি সফরে মার্ক তাদের সাথে থাকবেন। কিন্তু পোল এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু এই ছোট্ট কারণে তারা পৃথক হয়েছেন বলাটা বোধগম্য নয়। বরং এখানে আরও কিছু কারণ ছিল, যা সুসমাচারের লেখকগণ গোপন রেখেছেন। স্পষ্ট করে বলতে গেলে মতবিরোধের অন্যতম কারণ ছিল মসিহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে পোলের ধর্মবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি।
আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি। বিখ্যাত ঐতিহাসিক বি. সি. বি. (মৃত: ৩৪০ খ্রিষ্টাব্দ) তার গ্রন্থ তারিখুল কানিসাহ-তে মার্কের সুসমাচারের আলোচনা এনেছেন। তিনি নিকিয়ার মহাসভায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শামের বিশপ। ইতিহাসগ্রন্থে তিনি বলেন, "মার্ক গ্রিক ইহুদিদের বংশোদ্ভূত। তিনি পোল এবং বরনাবার সাথি। পরবর্তীতে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি তাদেরকে ত্যাগ করে পিতরের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। নিরোর অত্যাচারে পিতর নিহত হওয়ার পর তিনি মসিহের জীবনী লেখার কাজে মনোনিবেশ করেন।” এই ঐতিহাসিক এসব ঘটনাবলি দ্বিতীয় শতাব্দীর ঐতিহাসিক প্যাপিয়াস (Papias) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। প্যাপিয়াস ১৪০ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত তার রচনায় বলেন, "আমি এই বর্ণনাগুলো প্রথম শতাব্দীর একজন ব্যক্তি থেকে শুনেছি। কিন্তু প্যাপিয়াস ব্যক্তিটির নাম উল্লেখ করেননি। [৪৬৮] ইতিহাসবিদগণ মনে করেন এই ব্যক্তিটি হলেন মার্ক। প্যাপিয়াস আরও বলেন, “মার্ক তার সুসমাচারটি পিতরের স্মৃতিচারণ উপদেশাবলি থেকে রচনা করেছেন।” [৪৬৯]
তবে মার্ক তার সুসমাচারে মসিহ আলাইহিস সালামের পুনরুত্থান এবং ঊর্ধ্বারোহণের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। এজন্যই ওয়েস্ট ক্যাট, হার্টসহ বিংশ শতাব্দীর অনেক ঐতিহাসিকই বলেছেন, মসিহ আলাইহিস সালামের পুনরুত্থান ও ঊর্ধ্বারোহণের গল্পটি মার্কের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় শতাব্দীতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
পোলের হত্যাকাণ্ডের পর মার্ক প্রথমে আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে গমন করেন। সেখান থেকে মিশরে গিয়ে তিনি খ্রিষ্টধর্মের প্রচার করেন। মিশরে তিনি ‘স্কুল অব আলেকজান্দ্রিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি কিবতিদের অধীনে। তারা নিজেদেরকে মার্কের প্রতিনিধি বিবেচনা করে থাকেন। মার্ক ৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মিশরেই নিহত হন। বলা হয়ে থাকে মার্কের দিকে সম্বন্ধিত এই সুসমাচারটি রোম নগরীতে ৬৩ কিংবা ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়েছে। কোনো কোনো খ্রিষ্টান পণ্ডিতের মতে মার্ক মসিহ আলাইহিস সালামের শিষ্য ছিলেন না। তিনি পিতর থেকে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। সম্রাট নিরোর সময়ে পিতর নিহত হওয়ার পর মার্ক খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষাগুলোকে লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রোম নগরীতে বসে তিনি লেখালেখির কাজটি সম্পাদন করেন। কিন্তু এটি হারিয়ে যায়। পরবর্তিতে তিনি এটিকে গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। বর্তমানেও এই অনুবাদটি আমাদের হাতের নাগালে রয়েছে। এই গ্রিক অনুবাদ থেকেই পরবর্তীতে সুসমাচারটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এই গ্রিক অনুবাদের বেশ কিছু সুস্পষ্ট ভুলের কথা স্বীকার করে থাকেন। আরিয়ুনুসের মতে এই ভুলগুলো এখনো বিদ্যমান। বলা হয়ে থাকে মার্ক এবং তার গুরু পিতর মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বকে অস্বীকার করতেন। এজন্যই ওয়েলস (Wells) বলেন, “সমালোচকদের মতে মসিহের জীবনীসংক্রান্ত আলোচনার সবচেয়ে বিশুদ্ধ সুসমাচার হলো মার্কের সুসমাচার।”
টিকাঃ
[৪৬২] কামুসুল কিতাবিল মুকাদ্দাস, পৃষ্ঠা: ৮৫৩।
[৪৬৩] পিতর ১ম, অধ্যায়: ৫, অনুচ্ছেদ: ১৩।
[৪৬৪] কলসিয়, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ১০। কলসিয় হলো এশীয় মাইনরের একটি ফ্রিজিয়ান (Phrygia) নগরী। এটি লাওডোসিয়া (Laodicea) থেকে বারো মাইল দূরে লাইকাস (Lycus) নদী ও তার শাখা মায়েনদর (Maendr)-এর মিলনকেন্দ্রে অবস্থিত।
[৪৬৫] প্রেরিত, অধ্যায়: ১৫, অনুচ্ছেদ: ৩৬-৩৯।
[৪৬৬] ফিলিমন, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ২৪।
[৪৬৭] Commentary on Acts, page : ১১৭, উর্দু ভাষায় রচিত মা হিয়াল মসিহিয়্যাহ গ্রন্থের ১২৮ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত।
[৪৬৮] তারিখুস সুহুফিস সামাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৮।
[৪৬৯] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২০৭।
📄 লুকের সুসমাচার
প্রফেসর বারাকাত তার গ্রন্থ তারিখুল ইনজিলে লুক সম্পর্কে বলেন, “ইনি গ্রিক বংশোদ্ভূত। পৌত্তলিক ধর্ম থেকে তিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত পোলের সান্নিধ্যে থাকেন। প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে তিনি তার সুসমাচারটি এবং প্রেরিতদের কার্যবিবরণী রচনা করেন।” [৪৭০]
লুক এন্টিয়ক (Antioch)-এ জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এ পেশাতেই মনোনিবেশ করেন। অতঃপর খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি পোলের সাথে অনেক দাওয়াতি সফরে অংশ নেন। পোল তাকে 'প্রিয় ডাক্তার' বলে সম্বোধন করতেন। যেমন কলসিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্রে তিনি বলেন, "তোমাদিগকে প্রিয় ডাক্তার লুক অভিবাদন জানাচ্ছে।” এর দ্বারা বোঝা যায়, লুক মসিহ কিংবা শিষ্যগণের শিষ্যও ছিলেন না। তিনি ছিলেন পোলের অনুসারী। রোমান সাগরের তীরে ট্রাউস (Trowse) নগরীতে পৌঁছলে তিনি পোলের বক্তব্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন। তার দিকে সম্বন্ধিত সুসমাচারটি খ্রিষ্টানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুসমাচার হিসেবে বিবেচিত।
লুক সুসমাচারটি কোন ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন তা নিয়ে অদ্যাবধি বিরোধ বিদ্যমান। এটি কি গ্রিক ভাষায় রচিত হয়েছে নাকি ল্যাটিন ভাষায়? তবে এটি ৬৩ কিংবা ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়েছে। সুসমাচারটি তিনি এমন একটি বাক্য দিয়ে শুরু করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় সম্রাট থিওফিলাস (Theophilos)-এর উদ্দেশ্যেই তিনি এটি রচনা করেছেন। বাক্যটি হলো, "প্রথম অবধি যাঁহারা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, এবং বাক্যের সেবা করিয়া আসিয়াছেন, তাঁহারা আমাদিগকে যেমন সমর্পণ করিয়াছেন, তদনুসারে অনেকেই আমাদের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে গৃহীত বিষয়াবলির বিবরণ লিপিবদ্ধ করিতে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, সেই জন্য আমিও প্রথম হইতে সকল বিষয় সবিশেষ অনুসন্ধান করিয়াছি বলিয়া, হে মহামহিম থিয়ফিল, আপনাকে আনুপূর্বিক বিবরণ লেখা বিহিত বুঝিলাম; যেন, আপনি যে সকল বিষয় শিক্ষা পাইয়াছেন, সেই সকল বিষয়ের নিশ্চয়তা জ্ঞাত হইতে পারেন।” [৪৭১]
সুসমাচারের সূচনা থেকে বোঝা যায় এটি প্রথম যুগের খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জ নিয়ে রচিত হয়েছে। মসিহ আলাইহিস সালামের বাণীর সংকলন এটি নয়। এতদসত্ত্বেও সুসমাচারটিতে মসিহ আলাইহিস সালামের অনেকগুলো বাণী স্থান পেয়েছে। লুক তার সুসমাচারে মসিহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে পূর্ববর্ণিত ঘটনাবলির মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। এটি রচনার পেছনে ইহুদিদের হিদায়াতের চেয়ে অ-ইহুদি কাফির সম্প্রদায়ের হিদায়াতই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি মার্কের সুসমাচার থেকে প্রচুর পরিমাণে উদ্ধৃত করেছেন। মার্কের সুসমাচরে অনুচ্ছেদ রয়েছে ছয়শ একষট্টিটি। লুক সেখান থেকে তিনশ পঞ্চাশটি নিজ সুসমাচারে উল্লেখ করেছেন। লুকের সুসমাচারের কতগুলো অনুচ্ছেদ মথির সুসমাচারের সাথে মিল পাওয়া গেলেও মার্কের সুসমাচারে পাওয়া যায় না। সম্ভবত তিনি এগুলো মথি থেকেই উদ্ধৃত করেছেন কিংবা তিনি এবং মথি উভয়ে তৃতীয় কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করেছেন, যে উৎস সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। [৪৭২]
টিকাঃ
[৪৭০] তারিখুস সুহুফিস সামাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১২০।
[৪৭১] লুক, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১-৪।
[৪৭২] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২০৯।
📄 যোহনের সুসমাচার
যোহন ছিলেন শীর্ষ বারোজন হাওয়ারির একজন। তার পিতা ছিলেন একেবারে প্রথম দিকের খ্রিষ্টান এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রচারক। মসিহ আলাইহিস সালাম যোহনকে ভালোবাসতেন এবং 'প্রিয় হাওয়ারি' বলে সম্বোধন করতেন। চারটি সুসমাচারের একটি তার দিকে সম্বন্ধ করা হয়। বলা হয়ে থাকে, এই সুসমাচারটি তিনি ৯০ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেছেন। সুতরাং সংকলন বিবেচনায় সবচেয়ে নতুন সুসমাচার এটি। পূর্ববর্তী সুসমাচারগুলোর প্রায় ত্রিশ বছর পর এটি রচিত হয়েছে।
কিন্তু মসিহ আলাইহিস সালামের হাওয়ারি যোহনের দিকে সম্বন্ধিত এই সুসমাচারটি যোহন নিজে লিখেছেন নাকি অন্য কেউ রচনা করেছেন তা নিয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের মাঝে রয়েছে তুমুল বিতর্ক। প্রাচীন খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এটিকে যোহনের দিকে সম্বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা এর লেখক বলেন, “সন্দেহাতীতভাবে যোহনের সুসমাচারটি একটি জাল পুস্তক। এর লেখক মূলত দুজন সাধু তথা যোহন [৪৭৩] এবং মথির মাঝে বিরাজমান পারস্পরিক বিরোধ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছেন। প্রতারক লেখক পুস্তকের বিবরণীতে নিজেকে মসিহের প্রিয় হাওয়ারি বলে দাবি করেছেন। তারপরও ত্রুটিপূর্ণ এই বাক্যটিকে চার্চগুলো গ্রহণ করে নিয়েছে। দৃঢ়তার সাথে স্বীকৃতিও দিয়েছে যে, এই লেখক হলেন হাওয়ারি যোহন। এমনকি পুস্তকের ওপর তার নামও সেঁটে দিয়েছে। অথচ এ কথা নিশ্চিত যে, এর লেখক হাওয়ারি যোহন ভিন্ন অন্য কেউ। এটি তাওরাতের ওই সমস্ত পুস্তকের মতো যেগুলোর সাথে লেখক হিসেবে সম্বন্ধিত ব্যক্তির কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের করুণা হয় ওই সব ব্যক্তিবর্গের ওপর যারা এই পুস্তকের সাথে কথিত লেখকের সম্পর্ক খোঁজার জন্য বৃথা চেষ্টা ব্যয় করেছেন। তারা এই পুস্তকের লেখক ব্যক্তিটির সাথে গালিলের মৎস্যজীবী হাওয়ারি যোহনের সম্পর্ক প্রমাণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যয় করেছেন। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
দাইরাতুল মাআরিফিল ফারানসিয়্যাহ যেটি লা রওসুল করনিল ইশরিন নামে পরিচিত তাতে লিখা হয়েছে, “যোহনের দিকে এই সুসমাচার ও নতুন নিয়মের আরও তিনটি পুস্তক সম্বন্ধ করা হয়। কিন্তু আধুনিক ধর্মতত্ত্ব গবেষণা এই সম্বন্ধকরণের শুদ্ধতা খুঁজে পায়নি।” একইভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীর খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণ এই সুসমাচারটিকে হাওয়ারি যোহনের দিকে সম্বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই অস্বীকৃতি এসেছে আরিনুসের পক্ষ থেকে। আরিনুস ছিলেন যোহনের সরাসরি শিষ্য পলিকার্পের (Polycarp) শাগরিদ। একইভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে অ্যালেগিন নামক একটি খ্রিষ্টান উপদলও এই সুসমাচারটিসহ যোহনের দিকে সম্বন্ধিত সকল পুস্তককে অস্বীকার করত। এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা এর লেখক মনে করেন এই সুসমাচারটি শ্রিনটাস এর রচনা। [৪৭৪]
যোহনের সুসমাচার নিয়ে খ্রিষ্টান পণ্ডিতগণের যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের কারণ হলো আকিদা-সংক্রান্ত কিছু বিষয়। মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্ব, ত্রিত্ববাদ প্রভৃতি আকিদার আলোচনা প্রথম এই সুসমাচারটিতেই স্থান পেয়েছে। পূর্ববর্তী সুসমাচারগুলো তথা মথি, লুক ও মার্ক কেউই এই আকিদাগুলোর আলোচনা তাদের সুসমাচারে আনেননি। তবে এগুলোর পরবর্তী যুগের অনুবাদগুলোতে মূল অর্থকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছে, যা এই ভ্রান্ত আকিদার ইঙ্গিত বহন করে। এ কারণেও যোহনের সুসমাচারের লেখকের পরিচয় অদ্যাবধি রহস্যের আড়ালেই রয়ে গিয়েছে।
ধর্মতত্ত্ব গবেষকগণ এই সুসমাচারটির রচনাকাল নিয়েও একমত হতে পারেননি। গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, কোনো এক গ্রিক দার্শনিক এটি রচনা করেছেন। মসিহ আলাইহিস সালামের হাওয়ারিদের কেউই এটি রচনা করেননি। এই দাবির কারণ হলো সুসমাচারটিতে গ্রিক দেব-দেবী সংশ্লিষ্ট অনেক আলোচনা স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে ইহুদি দার্শনিক ফিলো এর [৪৭৫] দর্শন এখানে স্থান পেয়েছে। অথচ গবেষকগণের কাছে এ কথা প্রসিদ্ধ যে, হাওয়ারি যোহন নিরক্ষর ছিলেন। প্রেরিতদের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, "তখন পিতরের ও যোহনের সাহস দেখিয়া এবং ইহারা যে অশিক্ষিত সামান্য লোক ইহা বুঝিয়া তাহারা আশ্চর্যজ্ঞান করিলেন।” [৪৭৬]
একইভাবে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, এর লেখক ইহুদিদের উচ্চশ্রেণির কেউ ছিলেন। [৪৭৭] অথচ যোহন ছিলেন মৎস্যজীবী। এ ছাড়াও এই সুসমাচারটি বক্তব্যের ধরন, বিষয়বস্তু, বর্ণনাভঙ্গি প্রভৃতি দিক থেকে অন্যান্য সুসমাচার থেকে ভিন্ন। জেমস মাইক ক্যানন এ কথা স্বীকার করে বলেন, "লেখকগণ হাওয়ারি যোহন ও এই সুসমাচারের লেখক মহামতি যোহনের মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।” পাকিস্তানি খ্রিষ্টান পণ্ডিত সাধু বরকতুল্লাহ বলেন, "এই সুসমাচারটি হাওয়ারি যোহনের রচনা হওয়া অসম্ভব। কেননা, সুসমাচারটির বিষয়বস্তু সাক্ষ্য দেয় যে, এর লেখক চার্চের প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি হবেন।” এরপর তিনি নিজ দাবি প্রমাণের জন্য সুসমাচারটি থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। [৪৭৮]
যোহনের সুসমাচারের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এর লেখককে মসিহ আলাইহিস সালাম ভালোবাসতেন। কিন্তু এই অনুচ্ছেদগুলো সম্পর্কে সুসমাচারের ব্যাখ্যাকার ওয়েস্ট কোর্টের মন্তব্য হলো, "এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, অনুচ্ছেদগুলো পরবর্তীতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।” আধুনিক যুগে বিশপ গোরেও (Gore) একই মত পোষণ করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো সুসমাচারটির সিনাই কপিতে এই অনুচ্ছেদগুলো নেই। ওয়েস্ট কোর্ট তো সুস্পষ্টভাবে বলেই দিয়েছেন যে, মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বে বিশ্বাসীগণ বিরুদ্ধবাদীদের সামনে নিজেদের দাবি প্রমাণ করার জন্য এই অনুচ্ছেদগুলো বাড়িয়ে নিয়েছে।
অন্যান্য সুসমাচারের লেখকগণ মসিহ আলাইহিস সালামের জীবনবৃত্তান্ত দিয়ে আলোচনা শুরু করলেও যোহন তা করেননি। উইল ডুরান্ট বলেন, “তিনি (যোহন) ঈশ্বরের কালিমা, জগতের সৃষ্টিকর্তা, মানবতার পরিত্রাণদাতা প্রভৃতি গুণ বর্ণনার দ্বারা মসিহকে ইলাহরূপে উপস্থাপন করেছেন। এটি অন্যান্য সুসমাচারের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সুসমাচারে "বিশ্বাস নয়, জ্ঞানেই মুক্তি" ধারণা ও ম্যাটাফিজিক্সের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি দৃঢ় সমর্থন থাকায় গবেষকগণ এই সুসমাচার সম্পর্কে সন্দেহ করেছেন যে, এটি বাস্তবে যোহনের রচনা কি না?” [৪৭৯]
টিকাঃ
[৪৭৩] এখানে যোহন থেকে মার্ক উদ্দেশ্য। কেননা মার্কের প্রকৃত নাম ছিল যোহন যা আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি।
[৪৭৪] দাইরাতুল মাআরিফিল ব্রিতানিয়্যাহ, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ৯৮।
[৪৭৫] ফিলো নামক এই ইহুদি মসিহ আলাইহিস সালামের সামসময়িক ছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় তার দর্শনের বেশ প্রচার-প্রসার ছিল। গ্রিক দর্শনের আদলে তার নিজস্ব দর্শনের বিশেষ স্কুলও ছিল।
[৪৭৬] প্রেরিত, অধ্যায়: ৪, অনুচ্ছেদ: ১৩।
[৪৭৭] উদাহরণস্বরূপ দেখুন প্রেরিত, অধ্যায়: ১৮, অনুচ্ছেদ: ১৫-১৬; অধ্যায়: ৩, অনুচ্ছেদ: ১; অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৫; অধ্যায়: ১৯, অনুচ্ছেদ: ৩৮; অধ্যায়: ৭, অনুচ্ছেদ: ৪৫, অধ্যায়: ১১, অনুচ্ছেদ: ৪৭ প্রভৃতি।
[৪৭৮] আযলিয়্যাতুল আনাজিলিল আরবাআ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩১।
[৪৭৯] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২০৯।