📄 পোল কর্তৃক খ্রিস্টানদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ
পোল নিজেকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার মিথ্যা দাবি করেন। রোমানদের পৌত্তলিক ধর্ম সম্পর্কে তার যথেষ্ট অবগতি ছিল। একইভাবে জেনোর বৈরাগ্যবাদী দর্শনের (Stoicism) সাথেও ছিল তার সখ্য। জেনোর মতবাদটি তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটি দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল। সেখান থেকে রোমান উপনিবেশগুলোতে এটি ছড়িয়ে পড়ে। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা এমন এক আত্মায় বিশ্বাস করে যা বিশ্বজগতের পরিচালক। তাদের মতে এই আত্মা বিশ্বজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মাটি জগতের সকল বস্তুতে এমনভাবে বিরাজ করে, যেভাবে গাছের মধ্যে পানি এবং অঙ্গারের মধ্যে আগুন বিরাজ করে। তাদের মতবাদের সর্বশেষ বক্তব্য হলো, জগতের মধ্যে আত্মা এবং দেহের আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। উভয়ে মিলে একক অস্তিত্বের অধিকারী। একটি ছাড়া অপরটি কল্পনা করা যায় না। এটিই হলো বাস্তব অস্তিত্ব। জেনোর বৈরাগ্যবাদী মতবাদে এই বিশ্বাসকে 'ওয়াহদাতুল উজুদ' নামে অভিহিত করা হয়।
খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশের পূর্বে পোলের এই মতবাদ সম্পর্কে যথেষ্ট অবগতি ছিল। তাই সে একেশ্বরবাদী খ্রিষ্টধর্মের সাথে পৌত্তলিকতার মিশেল ঘটায়। তার পত্র এবং উপদেশসমূহ জেনোর এই নাস্তিক্যবাদী বৈরাগ্যের দর্শনে পরিপূর্ণ। সুসমাচারের লেখকগণ কেউই মসিহ আলাইহিস সালামের সরাসরি শিষ্য ছিলেন না। তারা পোলের পৌত্তলিক ও ধর্মদ্রোহী চিন্তাধারা থেকে অনেক কিছুই তাদের রচনায় গ্রহণ করেন। নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত খ্রিষ্টানদের অসতর্কতার সুযোগে তারা এগুলোকে মসিহ আলাইহিস সালামের বক্তব্য বলে চালিয়ে দেন। কেননা, খ্রিষ্টানদের কাছে সমাদৃত চারটি সুসমাচার তথা মথির সুসমাচার, মার্কের সুসমাচার, লুকের সুসমাচার ও যোহনের সুসমাচার তৃতীয় শতাব্দীর সূচনাতেই পরিচিতি লাভ করে। এগুলোর বিষয়ে প্রথম কথা বলেছেন আরিয়ুনুস ২০৯ খ্রিষ্টাব্দে। এ কারণেই সুসমাচারগুলোসহ খ্রিষ্টানদের যাবতীয় ধর্মীয় গ্রন্থের ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়।
প্রাচীন খ্রিষ্টানগণ এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন এটি মসিহ আলাইহিস সালামের তাওহিদের দাওয়াতকে পৌত্তলিকতায় বদলে দেবে। তবে তাদের এই চিন্তা হুকুমত কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে পারেনি। ফলে সূচনাতেই খ্রিষ্টধর্মের ওপর ধেয়ে আসা এই বিধ্বংসী তরঙ্গের সামনে তা ধ্বসে পড়ে। অনেকগুলো সুসমাচার, পত্র, ওয়াজ, নসিহত হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া এই পুস্তকগুলোতেই ছিল মসিহ আলাইহিস সালামের বিশুদ্ধ দাওয়াতের বর্ণনা। যদি বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত এগুলোতে না থাকত তাহলে পৌত্তলিক ইহুদি পোলের অনুসারীরা এগুলো লুকিয়ে ফেলত না।
আল-ফাসিল বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল গ্রন্থের লেখক বলেন, “হে প্রবঞ্চিত! বল দেখি, তোমাদের ধর্মের বর্ণনাকারীদের সততার ব্যাপারে কী নিশ্চয়তা আছে? তোমাদের আদর্শিক বক্তব্যের সত্যতার আছে কি কোনো প্রমাণ? তোমরা ভালোভাবেই জান এবং স্বীকারও কর যে, ঈসা আলাইহিস সালাম নিজে কখনো কলম ধরেননি। লিখিত কোনো কিছুই তিনি রেখে যাননি। তার বক্তব্য লিপিবদ্ধ করার জন্য কাউকে দায়িত্বও দেননি। কোনো মানুষকে দিয়ে তার শরিয়ত লিখিয়ে নেননি। তার সকল বক্তব্য ও নসিহত ছিল মৌখিক। তার জীবদ্দশায় এগুলো কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ হয়নি। এমনকি তিনি চলে যাওয়ার পর কাছাকাছি সময়েও এগুলোর কোনো সংকলন তৈরি হয়নি। কেননা, তোমাদের ধর্ম বেড়ে উঠেছে নাসরতে স্বল্পসংখ্যক মৎস্যজীবীদের মাঝে। ইহুদিদের সাথে সংমিশ্রণ এবং নিজেদের অজ্ঞতার কারণে মসিহ আলাইহিস সালামের কোনো বক্তব্য সংকলনের সামর্থ্য তাদের ছিল না।” [৪৪৯]
এরপর সুসমাচারগুলোর বিভ্রান্তি ও স্ববিরোধী বক্তব্যের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সুসমাচারগুলোর প্রথম লিপিবদ্ধকরণের কাজ হয়েছিল ৬০-১২০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালে। এরপর দীর্ঘ দুই শতাব্দী যাবৎ এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃতির শিকার হয়। জাতির উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে এগুলোর বর্ণনার মাঝে আনা হয় ব্যাপক পরিবর্তন। প্রথম শতাব্দীর লেখকগণ এই সুসমাচারগুলো থেকে কখনোই উদ্ধৃতি দিতেন না।” [৪৫০]
পাঠক সমীপে এ পর্যায়ে আমরা খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন পুস্তক ও চিঠিপত্রের আনুমানিক রচনাকাল চার্ট আকারে তুলে ধরছি।
ক্রমিক | পুস্তক/চিঠি | রচনাকাল | প্রকার
১ | থিষলনিকিয়দের প্রতি প্রেরিত প্রথম পত্র | ৫০ খ্রিষ্টাব্দ
২ | থিষলনিকিয়দের প্রতি প্রেরিত দ্বিতীয় পত্র | ৫০ খ্রিষ্টাব্দ
৩ | গালাতিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৫০-৫১ খ্রিষ্টাব্দ
৪ | করিন্থিয়দের প্রতি প্রেরিত প্রথম পত্র | ৫৫ খ্রিষ্টাব্দ | পোল কর্তৃক লিখিত পত্র
৫ | করিন্থিয়দের প্রতি প্রেরিত দ্বিতীয় পত্র | ৫৫ খ্রিষ্টাব্দ
৬ | রোমিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৫৬ খ্রিষ্টাব্দ
৭ | ফিলিপিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দ
৮ | ফিলিমনীয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দ
৯ | কলিসিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দ
১০ | ইফিষিয়দের প্রতি লিখিত পত্র | ৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দ
১১ | মার্কের সুসমাচার | ৬৮ খ্রিষ্টাব্দ | অধিকাংশ সুসমাচার ও প্রেরিতদের কার্যবিবরণী
১২ | লুকের সুসমাচার | ৯০ খ্রিষ্টাব্দ
১৩ | প্রেরিতদের কার্যবিবরণী | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৪ | মথির সুসমাচার | ৯৫-১১২ খ্রিষ্টাব্দ
১৫ | যোহন ভাববাদীর স্বপ্ন/প্রকাশিত বাক্য | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৬ | ইবরিয়দের প্রতি প্রেরিত পত্র | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ | ক্যাথলিক পত্রসমূহ
১৭ | পিতরের প্রথম পত্র | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৮ | যিহুদার পত্র | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৯ | যাকোবের পত্র | ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
২০ | তিমথিয়ের প্রতি প্রেরিত প্রথম পত্র | ১০০ খ্রিষ্টাব্দ | দাওয়াতি পত্র
২১ | তিমথিয়ের প্রতি প্রেরিত দ্বিতীয় পত্র | ১০০ খ্রিষ্টাব্দ
২২ | তিতের প্রতি প্রেরিত পত্র | ১০০ খ্রিষ্টাব্দ
২৩ | যোহনের সুসমাচার | ১০০-১২৫ খ্রিষ্টাব্দ
২৪ | যোহনের প্রথম পত্র | - | জ্ঞানবাদীদের (Gnosticism) [৪৫১] বিরুদ্ধে লিখিত পত্র
২৫ | যোহনের দ্বিতীয় পত্র | -
২৬ | যোহনের তৃতীয় পত্র | -
২৭ | ইগনাটিউসের পত্র | ১১০-১১৫ খ্রিষ্টাব্দ
২৮ | পলিকার্টের পত্র | -
২৯ | বরনাবার পত্র | ১৩৫ খ্রিষ্টাব্দ
৩০ | বারোজন প্রেরিতের শিক্ষা | -
৩১ | পিতরের দ্বিতীয় পত্র | ১৫০ খ্রিষ্টাব্দ | প্রেরিতদের বিলম্বিত পুস্তক
৩২ | সুসমাচার চতুষ্টয়ের বিধিসম্মতকরণ | ১৫০ খ্রিষ্টাব্দ
৩৩ | ক্লেমেন্টের দ্বিতীয় পত্র | -
ফ্রেডরিক গ্র্যান্ট কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এই চার্টটিতে বর্ণিত সময়কাল পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এখানে অনিশ্চিতভাবে কাছাকাছি একটি রচনাকাল বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। [৪৫২]
এই তালিকার ওপর অধ্যাপক আহমদ আব্দুল ওয়াহহাব একটি পর্যালোচনা লিখেছেন। তিনি বলেন, “এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, নতুন নিয়মের পুস্তকগুলো এমন কিছু ব্যক্তিবর্গের সংকলন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে যারা তালিকায় বর্ণিত তারিখের কয়েক দশক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা নিহত হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, পিতর এবং পোলের কথাই ধরা যাক। তারা উভয়ে ৭০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই নিহত হন। অথচ তালিকায় পিতরের প্রথম পত্রের রচনাকাল লেখা হয়েছে ৯৫ খ্রিষ্টাব্দ। আর পিতরের দ্বিতীয় পত্রের রচনাকাল লেখা হয়েছে ১৫০ খ্রিষ্টাব্দ। একইভাবে তিমথিয়বাসীদের নিকট লিখিত পোলের প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র এবং তিতের কাছে লিখিত পত্রের সময়কাল উল্লেখ করা হয়েছে ১০০ খ্রিষ্টাব্দ।”
এরপর লেখক বলেন, “আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, পৃথিবীতে মসিহ আলাইহিস সালামের শেষ সময় এবং ঊর্ধ্বারোহণের আনুমানিক সময়কাল হলো ৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় সবচেয়ে প্রাচীন সুসমাচার (মার্ক) লিখিত হয়েছে মসিহের ঊর্ধ্বারোহণের পঁয়ত্রিশ বছর পর। আর সবচেয়ে নতুন সুসমাচারটি (যোহন) লিখিত হয়েছে মসিহ পরবর্তী ৭০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে। এসব কিছু হয়েছে এমন একটা যুগে যে যুগে কঠোরতা ও পৌত্তলিকতা ছড়িয়ে পড়েছিল।” [৪৫৩]
খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ সম্পর্কে ভূমিকাস্বরূপ এ কয়েটি কথা আলোচনার পর আমরা এ পর্যায়ে নতুন নিয়মের পর্যালোচনা শুরু করব। নতুন নিয়মের গ্রন্থগুলো তিন প্রকার।
টিকাঃ
[৪৪৯] ড. মুহাম্মদ শামা কর্তৃক তাহকিককৃত আবু উবাইদা আল-খাজরাযির রচিত পুস্তক বাইনাল ইসলাম ওয়াল মসিহিয়্যাহ থেকে চয়নকৃত। পৃষ্ঠা: ১৭৪।
[৪৫০] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ২০৭।
[৪৫১] মসিহ আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্বে প্রকাশিত একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন। এটি খ্রিষ্টধর্মকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। শিষ্যদের যুগে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন সিমোন। তার অনুসারীরা তাকে মসিহ বলত। এই লোকটি জাদুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করত। ফলে প্রথমদিকের অনেক খ্রিষ্টান তার মতাদর্শের অনুসারী হয়।
[৪৫২] আল-মসিহু ফি মাসাদিরিল আকাইদিল মসিহিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৩১।
[৪৫৩] প্রাগুক্ত