📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ

📄 সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ


১। তিন সত্তা তথা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মাকে খ্রিষ্টধর্মের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। [৪২৭]
২। উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসা আদিপাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই মসিহ দুনিয়াতে এসেছেন।
৩। ব্যাপ্তাইজমকে খ্রিষ্টধর্মের মূল ভিত্তিগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। চাই সেটা পানি ছিটানোর মাধ্যমে হোক কিংবা দেহের বৃহদাংশ পানিতে ডোবানোর মাধ্যমে হোক। এটি মূলত যোহন ব্যাপ্তাইজক (ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম) কর্তৃক মসিহকে জর্ডান নদীতে ব্যাপ্তাইজমের দিকে সম্বন্ধ করে করা হয়।
৪। ভোজ উৎসব: উৎসর্গকৃত সকল বস্তু মসিহের দেহের প্রতীক। আর উৎসবে মদপান ক্রুশে মসিহের প্রবাহিত রক্তের ইঙ্গিত বহন করে। [৪২৯]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “রোমান পোপ নিজের পক্ষ থেকে দুজন লোক প্রেরণ করেন। এরপর তারা সবাই আরিয়ুস এবং তার সাথিদেরকে বিতাড়নের ব্যাপারে একমত হন। আরিয়ুস ও তার অনুসারীদেরকেও তারা লানত করেন। তারা এ কথা সাব্যস্ত করেন যে, সৃষ্টির পূর্ব থেকেই পুত্র পিতা থেকে জন্মেছেন। আর পিতা-পুত্র একই প্রকৃতির। পুত্র মাখলুক নন। তারা এ কথার ওপরও একমত হন যে, খ্রিষ্টানদের ঈদুল ফেসাখ ইহুদিদের ঈদুল ফেসাখের পরদিন অর্থাৎ রবিবারে।”

এরপর শাইখুল ইসলাম বলেন: সম্রাট কনস্টানটিন তিনটি রীতির প্রবর্তন করেন।
এক, মূর্তিভাঙা এবং মূর্তিপূজারিদের হত্যা করা।
দুই, সরকারি দফতরে শুধু খ্রিষ্টানরাই থাকবে। তারাই হবে আমির ও সেনাপতি।
তিন, মানুষেরা জুমাতুল ফেসাখ ও পরবর্তী জুমা পালন করবে। এ সময়ে তারা কোনো কাজ করবে না। যুদ্ধেও জড়াবে না। [৪৩০]

আর এভাবেই আসিয়ুত, মেসিডোনিয়া ও ফিলিস্তিন চার্চের পতন ঘটে। এই চার্চগুলো আরিয়ুসের মত অনুযায়ী মসিহ আলাইহিস সালামের মানবত্ব ও মাখলুক হওয়ার দাওয়াত দিত। এ সময়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ না করা প্রচুর ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল। গির্জার ফটকে শুকর জবাই করে তার গোশত বণ্টন করা হতো। ঈদুল ফেসাখের দিন যে কেউ গির্জা থেকে বের হলে এক লোকমা শুকরের গোশত খাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কেউ খেতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যা করা হতো।

আরিয়ুসের অনুসারীরা কিছুদিন তরবারির ভয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। কনস্টানটিন এর মৃত্যুর পর তারা দ্রুত সংঘটিত হয়। এরপর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নতুন সম্রাট তথা সম্রাট কনস্টানটিন এর পুত্রের কাছে এসে বলেন, "নিকিয়া সম্মেলনে জড়ো হওয়া তিনশ আঠারোজন যাজকের নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। পিতা ও পুত্রকে একই হিসেবে অভিহিত করে তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। আপনি এ বক্তব্যকে নিষিদ্ধ করুন। কেননা, এটা ভুল। সম্রাট তাদের কথা বাস্তবায়নের ইচ্ছেও করেছিলেন। [৪৩১] কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশপের চিঠি পেয়ে তিনি মত পাল্টে ফেলেন। চিঠিতে লেখা ছিল, "আপনার সম্মানিত পিতার যুগে ক্রুশ মধ্যগগনে সূর্যের ন্যায় দীপ্তি ছড়িয়েছিল। আপনার সময়ে ব্র্যানিয়ন (গলগথা) এর উপরে নুরের ক্রুশ প্রকাশিত হয়েছে। যার আলোকচ্ছটা সূর্যের আলোকে হার মানিয়েছে।” বিশপ আরও লিখেন, “আরিয়ুসের অনসারীরা সত্য থেকে বিচ্যুত। তিনশ আঠারোজন যাজক তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। তাদের বক্তব্য সমর্থনকারীদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন।” সম্রাট এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেন।” [৪৩২]

খ্রিষ্টানদের এই সম্মেলনগুলো সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
এক. শরিয়তের কোনো নসের ভিত্তি ছাড়া স্বাধীনভাবে এই মহাসভাগুলো হালাল-হারাম সাব্যস্ত করার অধিকার রাখে কিনা?
二. খ্রিষ্টধর্মের ঘোষণা দেওয়া একজন বাদশার মতামতের মূল্য কতটুকু যিনি কোনো পুরোহিতও নন, কোনো সেইন্ট বা সাধুপুরুষও নন?
তিন. দ্বিতীয় কনস্টানটিন এর কাছে লেখা চিঠিতে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশপ কর্তৃক আকাশে ক্রুশ দেখা যাওয়ার দাবিতে আমরা কতটুকু আস্থা রাখতে পারি?
চার. যাজক ইউসেবিয়ুসের উপরই বা আমরা কীভাবে আস্থা রাখতে পারি, যিনি সম্রাটের সামনে তলোয়ারের ভয়ে মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন? এরপর আবার মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বকে অস্বীকারকারী আরিয়ুসের মাযহাবের পক্ষে দাওয়াত দিতে শুরু করেন!

এই মহাসভায় পবিত্র আত্মার প্রভুত্বের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তাই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে মসিহ আলাইহিস সালামের অনুসারীদের মধ্যে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অতঃপর সম্রাট থিয়োডোসিয়াস (Theodosius the Great)-এর নির্দেশে ৩৮১ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টানটিনোপোলে আরেকটি মহাসভার আয়োজন করা হয়। এই মহাসভার সদস্যসংখ্যা ছিল একশ পঞ্চাশজন।

সদস্যগণ মেসিডোনিস (Mecedonius) [৪৩৩] কর্তৃক প্রচারিত মতবাদ নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তার মতবাদ ছিল পবিত্র আত্মা প্রভু নন। তিনি মাখলুক তথা সৃষ্ট। উক্ত মহাসভায় আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ বলেন, "পবিত্র আত্মা ঈশ্বরেরই আত্মা। ঈশ্বরের আত্মা চিরঞ্জীব। যদি আমরা পবিত্র আত্মাকে মাখলুক বলি তখন তার হায়াতকেও মাখলুক বলতে হবে। আর তার হায়াতকে মাখলুক বলার অর্থ হলো তাকে নশ্বর সাব্যস্ত করা। আর এটা তার সাথে কুফরি করা বৈ কিছু নয়। তার এই বক্তব্যের পর সদস্যগণ মেসিডোনিসের মতবাদের অনুসারীদের অভিসম্পাত করে। পাশাপাশি এই মহাসভায় আরও অন্যান্য কিছু মতাবলম্বীদেরও অভিসম্পাত করা হয়। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পবিত্র আত্মা নিজেই খালিক বা সৃষ্টিকর্তা। মাখলুক নন। তিনি ঈশ্বরের সম্ভূত ঈশ্বর। তিনি পিতা-পুত্রের একই সত্তার অন্তর্ভুক্ত। নিকিয়ার মহাসভায় স্থিরকৃত সিদ্ধান্তে তারা একথাও যোগ করেন যে, "আমি পিতার সমভূত জীবনদাতা পরম প্রভুর পবিত্র আত্মায় বিশ্বাস করি, যিনি পিতা-পুত্রের সমতুল্য স্তুতির আধার, আরাধনার ভাজন।”

পবিত্র আত্মার প্রভুত্বের স্বীকৃতি দিয়ে এই মহাসভার সমাপ্তি ঘটে। তারা ঘোষণা করেন যে, পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা স্বতন্ত্র তিন সত্তা। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তারা তিনের ভেতরে এক। একের ভেতরে তিন। মেসিডোনিস ও তার মতানুসারী যাজকগণের নিন্দা জ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মহাসভার সমাপ্তি ঘোষিত হয়।

শাহরাসতানি তার গ্রন্থ আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল-এ উপর্যুক্ত সিদ্ধান্তদ্বয়কে নিম্নোক্ত ইবারতে উল্লেখ করেছেন।

"আমরা এক ঈশ্বর পিতার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করি। তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা দৃশ্য- অদৃশ্য এর সৃষ্টিকর্তা। আমরা আরও বিশ্বাস স্থাপন করি, ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র যীশু খ্রিষ্টের ওপর। সমগ্র সৃষ্টিজগতের পূর্বে তিনি পিতা থেকে জন্মলাভ করেছেন। তিনি মাখলুক নন। তিনি ঈশ্বর। তার পিতা ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকেই তার অস্তিত্ব। যে পিতা নিজ হাতে সমগ্র জগৎকে সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। এসব সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাদের জন্য। মানুষের কল্যাণে। আমাদের মুক্তির জন্য তিনি আসমান থেকে অবতরণ করিয়াছেন। পবিত্র আত্মার মাধ্যমে দেহ ধারণ করিয়াছেন। মানবাকৃতি ধারণ করিয়াছেন। কুমারী মাতা মরিয়মের গর্ভস্থ হইয়াছেন। তার হইতেই জন্ম লইয়াছেন। পিলাতের সময়ে তাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয়। এরপর সমাহিত করা হয়। তৃতীয় দিন তিনি পুনরুত্থিত হইয়া আকাশে গমন করেন। অতঃপর পিতার ডান পাশে উপবিষ্ট হন। তিনি মৃত ও জীবিতদের মাঝে ফয়সালা করার নিমিত্ত আবার আগমন করার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছেন। আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি এক পবিত্র আত্মার উপর। তিনি পিতা হইতে উদ্ভূত। আমরা বিশ্বাস করি একটি ব্যাপ্তাইজম সকল গুনাহের ক্ষমার জন্য যথেষ্ট। আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি দেহের পুনরুত্থানে এবং স্থায়ী জীবন দ্বারা চিরঞ্জীব হওয়ায়। [৪৩৪]

টিকাঃ
[৪২৭] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৯৬।
[৪২৮] এই পাণ্ডুলিপিটি মাকতাবাতুদ দিয়ারিল মুহাররাক এর ১০৩ নং পাণ্ডুিলিপি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটি কিবতি ভাষায় রচিত। এর প্রতিটি পৃষ্ঠার পরবর্তী পৃষ্ঠায় আরবি অনুবাদ সংযোজিত আছে।
[৪২৯] আল-আদইয়ান ফি কিফফাতিল মিযান, পৃষ্ঠা: ৪৫।
[৪৩০] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪-২৫।
[৪৩১] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৯।
[৪৩২] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩০।
[৪৩৩] মেসিডোনিস হলেন কনস্টানটিনোপোল এর বিশপ। তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে এ কথা প্রচার করেছিলেন যে, পবিত্র আত্মাও অন্যান্য মাখলুকের মতো মাখলুক।
[৪৩৪] আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية