📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 পোলের খ্রিস্টধর্মীয় জ্ঞানের উৎস

📄 পোলের খ্রিস্টধর্মীয় জ্ঞানের উৎস


ইতিপূর্বে আমরা বলেছি যে পোল মসিহের শিষ্য ছিলেন না। তাঁর কোনো নসিহতও কোনো দিন শোনেননি। বরং মসিহ আলাইহিস সালামের পুরো জীবদ্দশায় তিনি কুফরি এবং বিরোধিতাই করেছেন। [৪২১] খ্রিষ্টধর্মের নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থেও পোলের ধর্মীয় জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি। এতসত্ত্বেও তার চিঠির সংখ্যা চৌদ্দটি। এই চিঠিগুলো তাদের কিতাবুল মুকাদ্দাস এর বিরাট অংশ দখল করে আছে। এগুলোতে রয়েছে খ্রিষ্টানদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের বিধিবিধান, আকিদা-বিশ্বাস ও দ্বীনের বুনিয়াদি বিষয়সমূহ। রয়েছে তাসবিহ, আধ্যাত্মিক গীত প্রভৃতি। এতে আরও সন্নিবেশিত হয়েছে বিবাহ, তালাক প্রভৃতি পারিবারিক ও সামাজিক বিধানসমূহ। এত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পাওয়া সত্ত্বেও এই জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে খ্রিষ্টানদের কোনো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা হয়নি। তবে বলা হয়ে থাকে এসব মূলনীতি ও বিধিবিধানগুলো পোল ওহির মাধ্যমে সরাসরি মসিহ থেকে শিক্ষা করেছেন। এ দাবি তিনি নিজেই করেছেন। তিনি বলেছেন, “কেননা, হে ভ্রাতৃগণ, আমার দ্বারা যে সুসমাচার প্রচারিত হইয়াছে, তাহার বিষয়ে তোমাদিগকে জানাইতেছি যে, তাহা মানুষের মতানুযায়ী নয়। কেননা, আমি মানুষের নিকট হইতে তাহা গ্রহণও করি নাই, এবং শিক্ষাও পাই নাই; কিন্তু যীশু খ্রীষ্টের প্রত্যাদেশ দ্বারা পাইয়াছি।” [৪২২]

কিন্তু পোলের এই মূলনীতিগুলো গবেষণা করলে দেখা যায় তিনি এগুলোর কতেক পৌত্তলিক রোমানদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন, যারা সূর্য ও আগুনের পূজা করত। আর কিছু নিয়েছেন প্রভুর তিন সত্তায় বিশ্বাসী হিন্দু ব্রাহ্মণদের থেকে। কিছু কিছু আবার গ্রিক দর্শন থেকেও ধার করেছে।

এভাবেই কট্টর এই ইহুদি সম্পূর্ণ নতুন এক ধর্ম আবিষ্কার করেন এবং নিজেই এ ধর্মের প্রধান শিক্ষকে পরিণত হন। তিনি দাবি করেন, মসিহ নিজেই তাকে এগুলো শিক্ষা দিয়েছেন। তার এই পৌত্তলিক নীতির বিপরীতে অল্পসংখ্যক খ্রিষ্টানই তাওহিদের ওপর অটল ছিলেন। পিতর ও বরনাবার মতো অনেকেই মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের বিষয়টি অস্বীকার করতেন।

চতুর্থ শতাব্দীতে তাওহিদের এই পতাকা বহন করছিলেন মিশরীয় যাজক আরিয়ুস বা আরিয়ানুস (ARIUS) (মৃ. ৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দ)। তার অনুসারীদের আরিসি বলা হয়। আরিয়ুস ছিলেন চার্চ অব আলেকজান্দ্রিয়ার যাজক। তিনি মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে দাওয়াত দিতেন। মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভু কিংবা প্রভুর পুত্র না হওয়া এবং একজন সৃষ্ট মাখলুক হওয়ার স্বপক্ষে শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ পেশ করতেন। তিনি সুসমাচারগুলোতে বর্ণিত মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের ইঙ্গিত বহনকারী সকল বক্তব্যের বিরোধিতা করতেন। যেহেতু এই সুসমাচারগুলোর সবগুলোই মুলহিদ পোলের চিঠিগুলোর পরেই সংকলিত হয়েছে তাই এটা অসম্ভব নয় যে সুসমাচারগুলোর লেখকগণ এই পত্রগুলো থেকে বাক্য চয়ন করেছেন। এজন্যই দ্বিতীয় শতাব্দীর বিশিষ্ট সাধু সেন্ট জাস্টিন সুসমাচারগুলোকে প্রেরিতদের প্রতিবেদন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

চতুর্থ শতাব্দীতে পোল এবং আরিয়ুসের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করে। উভয় গ্রুপের সংঘর্ষে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়। এমন সংঘাতময় সময়ে রোমান সম্রাট কনস্টানটিন খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। অতঃপর তিনি এই দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য একটি ধর্মীয় মহাসভার আয়োজন করেন। খ্রিষ্টান বিশ্বের সকল চার্চের প্রতিনিধিগণ এ মহাসভায় উপস্থিত হন। নিকিয়াতে (NICAEA) অনুষ্ঠিত এই মহাসভায় দুই হাজার আটচল্লিশ জন যাজক যোগদান করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা ব্যর্থ হন।

সম্রাট কনস্টানটিন এর সামসময়িক ঐতিহাসিক ইউসেবিয়াস কায়সারি (Eusebius Caesarea) এই অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “এই ভারসাম্যহীনতা দিক-দিগন্তে বিরাজমান ছিল। কেননা, আলেকজান্দ্রিয়ায় এ দ্বন্দ্ব উস্কে দেওয়া ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন প্রদেশের যাজকদের কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যারা কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করতো। ফলে তারাও একই বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।” [৪২৩]

এ সময়কার খ্রিষ্টান জাতির অবস্থা সম্পর্কে একই লেখক বলেন, "প্রত্যেক শহরে যাজকগণ পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। তারা একে অপরের সাথে রূপকথার পাথরের ন্যায় সংঘর্ষ বাধাতে লাগলো। এমনকি উত্তেজনাবশত নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে বিবেকবর্জিত কাজ করতে শুরু করে দিল।” [৪২৪]

নিকিয়ার মহাসভায় কোন কোন যাজক দাবি করলেন, “ঈশ্বর নন। মসিহ এবং মারইয়ামই হলেন প্রভু।” আবার অনেকে বলল, "পিতার তুলনায় মসিহ আলাইহিস সালামের দৃষ্টান্ত হলো আগুনের শিখার মতো। আগুনের একটি শিখা অপরটিকে প্রজ্জ্বলিত করে। কিন্তু এতে করে প্রথম শিখাটিতে কোনো ঘাটতি আসে না।”

কারও কারও বক্তব্য হলো, "মারইয়াম নয় মাস গর্ভধারণ করেননি। বরং তাঁর উদরের ভেতর দিয়ে একটি নূর এমনভাবে অতিক্রম করেছে যেভাবে নালা দিয়ে পানি গড়িয়ে যায়। মোটকথা আল্লাহর কালিমা তাঁর কান দিয়ে প্রবেশ করে লজ্জাস্থান দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে।”

আবার অনেকে তিন খোদার অস্তিত্বের মত প্রকাশ করেন। তিন খোদার একজন ভালো, আরেকজন মন্দ, আর তৃতীয় জন হলেন মধ্যপন্থী। কেউ কেউ বলেন, "আমাদের প্রভু ও প্রতিপালক হলেন যিশু।”

আবার কারও কারও বক্তব্য হচ্ছে, “মসিহ হলেন মানুষ। তবে তিনি সৃষ্টি হয়েছেন ঐশ্বরিক সত্তা থেকে। বাহ্যিকভাবে তিনি আমাদের মতোই। পুত্রের সূচনা মারইয়াম থেকে। তাকে নির্বাচন করা হয়েছে মানবতাকে নিষ্কৃতি দিতে। সাথে ছিল তাঁর ইলাহি অনুকম্পা। সেখান থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে প্রেম ও ইচ্ছেশক্তি। এজন্যই তাকে আল্লাহর পুত্র বলা হয়।”

তাদের কারও কারও মতামত হচ্ছে, “আল্লাহ তাআলা একক সত্তা। তবে এরা তাকে তিন নামে নামকরণ করে থাকে। পবিত্র বাক্য, পবিত্র আত্মায় তারা বিশ্বাস করে না।”

আবার কারও কারও বক্তব্য হলো, “মসিহ সত্য প্রভু এবং সত্য মানব। তাঁর দ্বৈত সত্তা এবং দ্বৈত ইচ্ছাশক্তি।” এর বিপরীতে অনেকের মত হলো, “মসিহ একক সত্তা ও একক ইচ্ছাশক্তির অধিকারী।” [৪২৫]

মসিহ সম্পর্কে এরূপ আরও বহু মতামত তারা ব্যক্ত করেন। প্রত্যেকে নিজের মতের সমর্থনে বিতর্ক করেন। অন্যদের বিরোধিতা করেন। এমনকি বিরোধী মতাবলম্বীদেরকে কাফির বলেও অভিহিত করেন। একসময় বিরোধ এতটাই তুঙ্গে পৌঁছে যায় যে, তারা পরস্পর পরস্পরকে লানত করতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনশ আঠারোজন যাজক ব্যতীত বাকিরা ফিরে আসে।

একথা স্পষ্ট যে কনস্টানটিন মসিহ আলাইহিস সালাম প্রভুত্বের দাবিদারদের প্রতি দুর্বল ছিলেন। কেননা, ইতিপূর্বে তিনি পৌত্তলিক ছিলেন। সেখান থেকেই খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশ করেন। ফলে তার পৌত্তলিক চিন্তাধারা মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের বিষয়টির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়। [৪২৬] উপস্থিত যাজকগণের মধ্য থেকে তিনি তিনশ আঠারোজন যাজককে একত্রিত করেন, যারা এ মতের পক্ষে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে ছিলেন।

টিকাঃ
[৪২১] তাই মসিহ আলাইহিস সালামের শিক্ষা সরাসরি গ্রহণ করার সুযোগ পোলের ছিল না। একইভাবে মসিহ আলাইহিস সালামের শিষ্যগণ থেকেও শেখার সুযোগ হয়নি। কেননা পোল ছিলেন তাদের শত্রু। আকস্মিক তিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন এবং নেতৃত্বের আসনে চড়ে বসেন। -অনুবাদক।
[৪২২] গালাতিয়, অধ্যায়: ১, অনুচ্ছেদ: ১১-১২।
[৪২৩] হায়াতু কিসতিনতিন আল-আজিম, পৃষ্ঠা : ৭৩।
[৪২৪] হায়াতু কিসতিনতিন আল-আজিম, পৃষ্ঠা: ৮৫।
[৪২৫] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২২-২৩।
[৪২৬] ঐতিহাসিকগণ আজ অবধি কনস্টানটিনের আস্থাবান হয়ে খ্রিষ্টান ধর্মে প্রবেশের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে থাকেন। অধিক সম্ভব তিনি রাজনৈতিক কারণে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি খ্রিষ্টানদের সহযোগিতায় বিজয় লাভ করেছিলেন। এদিকে তার মাতা হেলেনা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সন্তানকে খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে উৎসাহ দিতে থাকেন। খ্রিষ্টানদের মনোতুষ্টির জন্য ধর্মান্তর হওয়া ব্যতীত আর কোন উপায় তার সামনে ছিল না। তাই মৌখিকভাবে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ঘোষণা দিলেও আকিদাগত দিক থেকে তিনি পৌত্তলিকই রয়ে গিয়েছিলেন। এজন্যই তিনি সর্বদা নিজেকে পৌত্তলিক দার্শনিক বিজ্ঞজনদের দ্বারা বেষ্টিত রাখতেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো নিকিয়া মহাসভা। এখানে তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য তাওহিদের নীতি বাদ দিয়ে পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণাকে গ্রহণ করেছেন। শিরক ও পৌত্তলিকতা থেকে উঠে আসা ব্যক্তির পক্ষ থেকে এমনটাই আশা করা যায়। একইভাবে তিনি রীতি অনুযায়ী নবদীক্ষিত খ্রিষ্টানদেরকে মতো ব্যাপ্টিজম করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ

📄 সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ


১। তিন সত্তা তথা পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মাকে খ্রিষ্টধর্মের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। [৪২৭]
২। উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসা আদিপাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্যই মসিহ দুনিয়াতে এসেছেন।
৩। ব্যাপ্তাইজমকে খ্রিষ্টধর্মের মূল ভিত্তিগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। চাই সেটা পানি ছিটানোর মাধ্যমে হোক কিংবা দেহের বৃহদাংশ পানিতে ডোবানোর মাধ্যমে হোক। এটি মূলত যোহন ব্যাপ্তাইজক (ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম) কর্তৃক মসিহকে জর্ডান নদীতে ব্যাপ্তাইজমের দিকে সম্বন্ধ করে করা হয়।
৪। ভোজ উৎসব: উৎসর্গকৃত সকল বস্তু মসিহের দেহের প্রতীক। আর উৎসবে মদপান ক্রুশে মসিহের প্রবাহিত রক্তের ইঙ্গিত বহন করে। [৪২৯]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “রোমান পোপ নিজের পক্ষ থেকে দুজন লোক প্রেরণ করেন। এরপর তারা সবাই আরিয়ুস এবং তার সাথিদেরকে বিতাড়নের ব্যাপারে একমত হন। আরিয়ুস ও তার অনুসারীদেরকেও তারা লানত করেন। তারা এ কথা সাব্যস্ত করেন যে, সৃষ্টির পূর্ব থেকেই পুত্র পিতা থেকে জন্মেছেন। আর পিতা-পুত্র একই প্রকৃতির। পুত্র মাখলুক নন। তারা এ কথার ওপরও একমত হন যে, খ্রিষ্টানদের ঈদুল ফেসাখ ইহুদিদের ঈদুল ফেসাখের পরদিন অর্থাৎ রবিবারে।”

এরপর শাইখুল ইসলাম বলেন: সম্রাট কনস্টানটিন তিনটি রীতির প্রবর্তন করেন।
এক, মূর্তিভাঙা এবং মূর্তিপূজারিদের হত্যা করা।
দুই, সরকারি দফতরে শুধু খ্রিষ্টানরাই থাকবে। তারাই হবে আমির ও সেনাপতি।
তিন, মানুষেরা জুমাতুল ফেসাখ ও পরবর্তী জুমা পালন করবে। এ সময়ে তারা কোনো কাজ করবে না। যুদ্ধেও জড়াবে না। [৪৩০]

আর এভাবেই আসিয়ুত, মেসিডোনিয়া ও ফিলিস্তিন চার্চের পতন ঘটে। এই চার্চগুলো আরিয়ুসের মত অনুযায়ী মসিহ আলাইহিস সালামের মানবত্ব ও মাখলুক হওয়ার দাওয়াত দিত। এ সময়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ না করা প্রচুর ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল। গির্জার ফটকে শুকর জবাই করে তার গোশত বণ্টন করা হতো। ঈদুল ফেসাখের দিন যে কেউ গির্জা থেকে বের হলে এক লোকমা শুকরের গোশত খাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কেউ খেতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যা করা হতো।

আরিয়ুসের অনুসারীরা কিছুদিন তরবারির ভয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। কনস্টানটিন এর মৃত্যুর পর তারা দ্রুত সংঘটিত হয়। এরপর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নতুন সম্রাট তথা সম্রাট কনস্টানটিন এর পুত্রের কাছে এসে বলেন, "নিকিয়া সম্মেলনে জড়ো হওয়া তিনশ আঠারোজন যাজকের নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। পিতা ও পুত্রকে একই হিসেবে অভিহিত করে তারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। আপনি এ বক্তব্যকে নিষিদ্ধ করুন। কেননা, এটা ভুল। সম্রাট তাদের কথা বাস্তবায়নের ইচ্ছেও করেছিলেন। [৪৩১] কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশপের চিঠি পেয়ে তিনি মত পাল্টে ফেলেন। চিঠিতে লেখা ছিল, "আপনার সম্মানিত পিতার যুগে ক্রুশ মধ্যগগনে সূর্যের ন্যায় দীপ্তি ছড়িয়েছিল। আপনার সময়ে ব্র্যানিয়ন (গলগথা) এর উপরে নুরের ক্রুশ প্রকাশিত হয়েছে। যার আলোকচ্ছটা সূর্যের আলোকে হার মানিয়েছে।” বিশপ আরও লিখেন, “আরিয়ুসের অনসারীরা সত্য থেকে বিচ্যুত। তিনশ আঠারোজন যাজক তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। তাদের বক্তব্য সমর্থনকারীদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন।” সম্রাট এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেন।” [৪৩২]

খ্রিষ্টানদের এই সম্মেলনগুলো সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
এক. শরিয়তের কোনো নসের ভিত্তি ছাড়া স্বাধীনভাবে এই মহাসভাগুলো হালাল-হারাম সাব্যস্ত করার অধিকার রাখে কিনা?
二. খ্রিষ্টধর্মের ঘোষণা দেওয়া একজন বাদশার মতামতের মূল্য কতটুকু যিনি কোনো পুরোহিতও নন, কোনো সেইন্ট বা সাধুপুরুষও নন?
তিন. দ্বিতীয় কনস্টানটিন এর কাছে লেখা চিঠিতে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশপ কর্তৃক আকাশে ক্রুশ দেখা যাওয়ার দাবিতে আমরা কতটুকু আস্থা রাখতে পারি?
চার. যাজক ইউসেবিয়ুসের উপরই বা আমরা কীভাবে আস্থা রাখতে পারি, যিনি সম্রাটের সামনে তলোয়ারের ভয়ে মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন? এরপর আবার মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বকে অস্বীকারকারী আরিয়ুসের মাযহাবের পক্ষে দাওয়াত দিতে শুরু করেন!

এই মহাসভায় পবিত্র আত্মার প্রভুত্বের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তাই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে মসিহ আলাইহিস সালামের অনুসারীদের মধ্যে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অতঃপর সম্রাট থিয়োডোসিয়াস (Theodosius the Great)-এর নির্দেশে ৩৮১ খ্রিষ্টাব্দে কনস্টানটিনোপোলে আরেকটি মহাসভার আয়োজন করা হয়। এই মহাসভার সদস্যসংখ্যা ছিল একশ পঞ্চাশজন।

সদস্যগণ মেসিডোনিস (Mecedonius) [৪৩৩] কর্তৃক প্রচারিত মতবাদ নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তার মতবাদ ছিল পবিত্র আত্মা প্রভু নন। তিনি মাখলুক তথা সৃষ্ট। উক্ত মহাসভায় আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ বলেন, "পবিত্র আত্মা ঈশ্বরেরই আত্মা। ঈশ্বরের আত্মা চিরঞ্জীব। যদি আমরা পবিত্র আত্মাকে মাখলুক বলি তখন তার হায়াতকেও মাখলুক বলতে হবে। আর তার হায়াতকে মাখলুক বলার অর্থ হলো তাকে নশ্বর সাব্যস্ত করা। আর এটা তার সাথে কুফরি করা বৈ কিছু নয়। তার এই বক্তব্যের পর সদস্যগণ মেসিডোনিসের মতবাদের অনুসারীদের অভিসম্পাত করে। পাশাপাশি এই মহাসভায় আরও অন্যান্য কিছু মতাবলম্বীদেরও অভিসম্পাত করা হয়। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পবিত্র আত্মা নিজেই খালিক বা সৃষ্টিকর্তা। মাখলুক নন। তিনি ঈশ্বরের সম্ভূত ঈশ্বর। তিনি পিতা-পুত্রের একই সত্তার অন্তর্ভুক্ত। নিকিয়ার মহাসভায় স্থিরকৃত সিদ্ধান্তে তারা একথাও যোগ করেন যে, "আমি পিতার সমভূত জীবনদাতা পরম প্রভুর পবিত্র আত্মায় বিশ্বাস করি, যিনি পিতা-পুত্রের সমতুল্য স্তুতির আধার, আরাধনার ভাজন।”

পবিত্র আত্মার প্রভুত্বের স্বীকৃতি দিয়ে এই মহাসভার সমাপ্তি ঘটে। তারা ঘোষণা করেন যে, পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা স্বতন্ত্র তিন সত্তা। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তারা তিনের ভেতরে এক। একের ভেতরে তিন। মেসিডোনিস ও তার মতানুসারী যাজকগণের নিন্দা জ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মহাসভার সমাপ্তি ঘোষিত হয়।

শাহরাসতানি তার গ্রন্থ আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল-এ উপর্যুক্ত সিদ্ধান্তদ্বয়কে নিম্নোক্ত ইবারতে উল্লেখ করেছেন।

"আমরা এক ঈশ্বর পিতার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করি। তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা দৃশ্য- অদৃশ্য এর সৃষ্টিকর্তা। আমরা আরও বিশ্বাস স্থাপন করি, ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র যীশু খ্রিষ্টের ওপর। সমগ্র সৃষ্টিজগতের পূর্বে তিনি পিতা থেকে জন্মলাভ করেছেন। তিনি মাখলুক নন। তিনি ঈশ্বর। তার পিতা ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকেই তার অস্তিত্ব। যে পিতা নিজ হাতে সমগ্র জগৎকে সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। এসব সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাদের জন্য। মানুষের কল্যাণে। আমাদের মুক্তির জন্য তিনি আসমান থেকে অবতরণ করিয়াছেন। পবিত্র আত্মার মাধ্যমে দেহ ধারণ করিয়াছেন। মানবাকৃতি ধারণ করিয়াছেন। কুমারী মাতা মরিয়মের গর্ভস্থ হইয়াছেন। তার হইতেই জন্ম লইয়াছেন। পিলাতের সময়ে তাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয়। এরপর সমাহিত করা হয়। তৃতীয় দিন তিনি পুনরুত্থিত হইয়া আকাশে গমন করেন। অতঃপর পিতার ডান পাশে উপবিষ্ট হন। তিনি মৃত ও জীবিতদের মাঝে ফয়সালা করার নিমিত্ত আবার আগমন করার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছেন। আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি এক পবিত্র আত্মার উপর। তিনি পিতা হইতে উদ্ভূত। আমরা বিশ্বাস করি একটি ব্যাপ্তাইজম সকল গুনাহের ক্ষমার জন্য যথেষ্ট। আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি দেহের পুনরুত্থানে এবং স্থায়ী জীবন দ্বারা চিরঞ্জীব হওয়ায়। [৪৩৪]

টিকাঃ
[৪২৭] কিসসাতুল হাদারাহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৯৬।
[৪২৮] এই পাণ্ডুলিপিটি মাকতাবাতুদ দিয়ারিল মুহাররাক এর ১০৩ নং পাণ্ডুিলিপি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটি কিবতি ভাষায় রচিত। এর প্রতিটি পৃষ্ঠার পরবর্তী পৃষ্ঠায় আরবি অনুবাদ সংযোজিত আছে।
[৪২৯] আল-আদইয়ান ফি কিফফাতিল মিযান, পৃষ্ঠা: ৪৫।
[৪৩০] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪-২৫।
[৪৩১] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৯।
[৪৩২] আল-জাওয়াবুস সহিহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মসিহ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩০।
[৪৩৩] মেসিডোনিস হলেন কনস্টানটিনোপোল এর বিশপ। তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে এ কথা প্রচার করেছিলেন যে, পবিত্র আত্মাও অন্যান্য মাখলুকের মতো মাখলুক।
[৪৩৪] আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px