📘 ইহুদি ও খ্রিষ্টান জাতির ইতিহাস 📄 চতুর্থ শতাব্দী

📄 চতুর্থ শতাব্দী


চতুর্থ শতাব্দীতে রোম সম্রাট কনস্টানটিন এর খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থার সৃষ্টি হয়। তন্মধ্যে সবচেয়ে কঠোর প্রকৃতির ছিল হলিক্রস, যার উদ্দেশ্য ছিল মসিহকে অস্বীকারকারী সকল রোমানদের মূলোৎপাটন করা। দীর্ঘ তিন শতাব্দী যাবৎ জুলুমের শিকার হয়ে আসা খ্রিষ্টানরা পৌত্তলিক রোমানদের থেকে প্রতিশোধ নিতে শুরু করল। এ সময়ে তারা হিংস্রতার দিক থেকে বিগত সময়ের রোমানদের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। এমনকি এ সময়টাকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বীভৎস সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই জুলুম-নির্যাতন শুধু কাফির ও পৌত্তলিকদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্বকে অস্বীকারকারী খ্রিষ্টানরাও এই নিপীড়নের শিকার হয়। কেননা, রোমান সম্রাট কনস্টানটিন পোল কর্তৃক প্রচারিত খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করেছিলেন। তাই বিরুদ্ধবাদীদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চলতে শুরু করে।

একারণেই দেখা যায়, এ শতাব্দীতে খ্রিষ্টানদের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশেষ করে পোল ও অন্যান্য কিছু ইহুদির উদ্দেশ্যমূলকভাবে খ্রিষ্টধর্মে প্রবেশের পরই আকিদাগত এই পরিবর্তনের সূচনা ঘটে।

তাওহিদবাদী খ্রিষ্টান বিশ্বাসীগণ এবং মসিহ এর প্রভুত্বের দাবিদার পোলের অনুসারীদের মাঝে দ্বন্দ্ব চলমান ছিল। জুলুম-নির্যাতনের সময়ে রচিত কিতাবগুলো পোলের মতবাদ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। বিশেষ করে সুসমাচারসমূহ এবং পত্রাবলি। এজন্যই আমরা এগুলোতে অর্থ ও বাচনভঙ্গি প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিরোধ দেখতে পাই। এমনকি এ সময়ে এই পুস্তকগুলোর সনদও হারিয়ে যায়।

শায়খ রহমতুল্লাহ কিরানবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইযহারে হকে বলেন, “আমরা বহুবার তাদের বিশেষজ্ঞ উলামাদের কাছে তাদের গ্রন্থগুলোর অবিচ্ছিন্ন সনদ উপস্থাপনের দাবি করেছিলাম। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। আমার এবং তাদের মাঝে সংঘটিত বিভিন্ন বিতর্ক সভায় তাদের অনেক পাদরি এ ব্যাপারে অপারগতা পেশ করেছেন। তারা বলেছেন দীর্ঘ তিনশ তেরো বছর যাবৎ খ্রিষ্টানদের ওপর আপতিত নানা ফিতনা ও মুসিবতের সময় আমাদের কাছ থেকে সনদ বা বর্ণনাসূত্র হারিয়ে গেছে।

তাদের কাছে রক্ষিত বর্ণনাসূত্রগুলোতেও আমরা নজর বুলিয়েছি। দেখতে পেলাম সেগুলো কিছু ধারণাপ্রসূত বর্ণনাসূত্র বৈ কিছু নয়। কিছু ইঙ্গিতসূচক বিষয় এবং ধারণার ওপর নির্ভর করেই তারা এগুলো বর্ণনা করে থাকে। আমি বলেছি এমন নাজুক বিষয়ে ধারণাপ্রসূত কিছু উপযুক্ত নয়। এখন পর্যন্ত তারা উপযুক্ত কোনো প্রমাণ, অবিচ্ছিন্ন বর্ণনাসূত্র নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হতে পারেনি। আমাদের জন্য যথেষ্ট যে তারা আসছে না। কেননা, দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা তাদের দায়িত্ব। আমাদের নয়।”

বাস্তবতা হলো নির্যাতনের সময়টাতে তারা পুস্তকগুলো রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের ইচ্ছেমতো সেখানে সংযোজন-বিয়োজন করে ও হাওয়ারিদের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্যের অবতারণা করে। এ ধরনের সংযোজন, বিয়োজন ও মিথ্যা থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্র থাকা। অথচ এগুলোতে তা একেবারেই অনুপস্থিত।

একইভাবে প্রথম শতাব্দীতে রোমান ও মিশরীয়দের অনেকগুলো দল খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। তাদের বিবেক-বুদ্ধির ওপর আগ থেকেই রোমান ও গ্রিক দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। খ্রিষ্টানরা এসব ভিনদেশি দর্শন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং মসিহ আলাইহিস সালামের প্রভুত্ব ও ত্রিত্ববাদের মতো আকিদার অনুপ্রবেশ ঘটায়।

এজন্যই প্রাচ্যবিদ গোথিয়ার (Gauthier) তার গ্রন্থ 'আল-মাদখাল লি-দিরাসাতিল ফলসাফাতিল ইসলামিয়া' গ্রন্থে দাবি করেন যে, ত্রিত্ববাদ খ্রিষ্টানদের থেকে উদ্ভব হয়নি। এটি গ্রিক দর্শন থেকে এসেছে। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা আমরা ত্রিত্ববাদ-সম্পর্কিত আলোচনায় উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px